Profile Photo

আবির হাসান সায়েমOffline

  • Abir-Hassan-Sayem
  • #ধারাবাহিক
    একমুঠো জোনাকি (পর্ব-০৬)
    ~আবির হাসান সায়েম

    একটা শব্দ হচ্ছে। শব্দটা পর্যায়ভিত্তকভাবে কমছে। আমি চোখ মেললাম। ফরিদ কি যেনো তুলল মেঝে থেকে। একটা স্টিলের বাটি। সে বাটিটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে। একটা সামান্য স্টিলের বাটিকে মানুষ এতো আগ্রহ নিয়ে দেখতে পারে, তা আগে জানতাম না। ফরিদকে নিশ্চয়ই শিলা পাঠিয়েছে। ফরিদ শিলাদের বাগান মালীর ছেলে। ছোটবেলায় মা মারা গেছে, দুইবছর আগে বাবাও মারা গেছে। বয়স কম তাই শিলাদের বিশাল বাড়িতেই সে থাকে। তার কোন নির্দিষ্ট কাজ নেই। সে কাজ করার সুযোগ খুজতে থাকে। কিন্তু যে বাড়িতে তিনটা কাজের লোক সবসময় বিদ্যমান, সেখানে কাজ খুজে পাওয়াটাও তো মুশকিল। মোটামুটি অলস জীবন যাপন করে সে। আমি যতবার গিয়েছি ততবারই ফরিদের সঙ্গে বসে গল্প করেছি। সে অনেক গল্প জানে। যখনি জিজ্ঞেস করি, এতো গল্প সে কোত্থেকে জানল,তখন একটা দারুণ হাসি হেসে বলে,
    ” আব্বায় কইসে। সে নাকি তার নানা’র থেইক্কা শুনসে। প্রেত্যেকদিন একটা কইরা গল্প কইতো আমারে৷ যেদিন মইরা গেলো তার আগেরদিনও একটা গল্প কইসিলো আমারে। মৃত্যু নিয়া গল্প। গল্পডা বড়ই দুঃখের। গল্পডা শুনবেন?”
    আমি কোনো বারই তার দুঃখের গল্প শুনি না৷ তেরো-চৌদ্দ বছরের ছেলের কাছে দুঃখের গল্প শুনতে ইচ্ছে করে না।
    ফরিদকে চমকে দেয়ার জন্য হঠাৎ বললাম,
    “কি ফরিদ কেমন আছিস? ”
    ফরিদ নির্বিকার ভঙিতে বলল,
    “জ্বে ভালো। ”
    “আমি হঠাৎ কথা বললাম তুই চমকে গেলি না কেনো?”
    ফরিদ বাটি থেকে মুখ সড়িয়ে বলল,
    ” বাটির মইধ্যে আপনার চেহারা দেখা যায়। আমি আগেই দেখসি, আপনে আমার দিকে তাকায়া ছিলেন। ”
    আমি হাসতে হাসতে বললাম,
    “ওহ আচ্ছা। তোর তো দেখি অনেক বুদ্ধি। কখন এসেছিস? ”
    ” দুই ঘন্টা আগে। ”
    “শিলা এসেছিলো? ”
    ” হ, আপা অনেক্ষণ বয়া আসিলো। এক ঘন্টা অপেক্ষা কইরা চইল্লা গেসে। আর একটা খাম দিয়া গেসে। খামের মইধ্যে মনে হয় চিডি। ”
    আমি খামটা নিলাম না৷ খামটা নিতে ইচ্ছে করছে না৷
    “ফরিদ, এখন রেখে দে পরে পড়ব। এখন পড়তে ইচ্ছে করছে না৷ ”
    “কিন্তু আফা তো কইসে, আপনে জাগলেই এইডা পড়তে। ”
    “আচ্ছা ফরিদ, তুই পড়ে শুনা, আমি শুনছি। ”
    “ভাই, আমি তো পড়তে পরি না। ”
    ” সে কি তুই পড়তে পারিস না কেনো? স্কুলে যাস না?”
    “না।”
    “পড়াশোনা করতে ভালো লাগে না? ”
    “না পড়তে ভাল লাগে কিন্তু স্কুলে যাইতে ভাল্লাগে না। আর স্কুলে যাই না বইল্লা পড়াও হয় না। ”
    ” যতদিন আমার সাথে থাকবি ততদিন আমি তোকে পড়াবো। পড়বি না? ”
    “পড়মু কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু ‘বই -খ্যতা’ পাইবেন কই?”
    “বই লাগবে না কিন্তু ‘খ্যাতা’র ব্যবস্থা করতে হবে। আচ্ছা তুই একটি চিঠিটা আমার মুখের সামনে খুলে ধরতে পারিস? আমার হাতে কেনোলার লাগানো, উঠালেই ব্যাথা করে। ”
    “ওই জিনিসটার নাম ক্যনুলার?”
    “ক্যনুলার না ক্যানোলার। আমার সাথে বল ক্যানোলার। ”
    “ক্যা..ক্যা.. ক্যানোলার। ”
    “ভেরি গুড। শাবাশ। ”
    ফরিদ হাসি মুখে খাম থেকে চিঠি বের করে মুখের সামনে ধরল।
    খুব তাড়াহুড়ো করে লেখা হয়েছে। টানা টানা লেখা । কিছু জায়গায় কালি ছড়িয়ে গেছে। চিঠি লেখার সময় কি শিলা কাঁদছিলো?
    আবির,
    আশা করি ভালো আছিস। একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছি। আজ সকালে তোর সাথে ঝগড়া হবার পর আমি দাওয়াতে যাই। দাওয়াতে নিলয় আর তার পরিবারও আসে। আমি বাবা-মা কে আগেই বলেছিলাম নিলয়কে আমার পছন্দ হয় নি। কিন্তু নিলয় এবং তার পরিবারের আমাকে খুব পছন্দ হয়েছে। নিলয়ের বাবা আমাকে বললেন,
    “মা, আমি চাই তোমার মতো লক্ষ্মী একটা মেয়ে আমার ঘরের বউ হয়ে আসুক। তুমি কি রাজি মা?”
    তোর সাথে রাগ তখনো কমে নি, সব কথা আমার কান দিয়েও বোধ হয় ঢুকে নি। শুধু বুঝতে পারলাম, কোনো এক ব্যাপারে তারা আমার মতামত চাচ্ছে। আমি কোনোরকম বললাম,
    “জ্বি আচ্ছা। ”
    নিলয়ের বাবা বরকতউদ্দিন পুরো হলরুম কাঁপিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলে চিৎকার করে উঠলেন। তখন আমার মাথার টনক নড়ল। এ আমি কি করলাম। এ আমি কি করলাম? তোর উপর রাগ করে আমি আমার জীবনের সাথে এতো বড় একটা অমানবিক কাজ করলাম।কেন করলাম কে তুই? তুই কে?
    আবির আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তুই কি……..
    ভালো থাকিস।
    ইতি,
    শিলা চৌধুরী
    [পুনশ্চঃ- ফরিদের কাছে পাঁচশ টাকা দিয়েছি। কিছু লাগলে আনিয়ে নিস। আমি কবে আসব জানি না। আমি আসলেও যা না আসলেও তা। তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠ। ]
    পুনশ্চ এর লেখাটা পরে লেখা হয়েছে। খুব সুন্দর করে লেখা। বুঝাই যাচ্ছে সময় নিয়ে লেখা হয়েছে। আমি ফরিদকে বললাম,
    “তোর কাছে শিলা টাকা দিয়েছে? ”
    “হ দিছে। পাঁচশ ট্যাকা। ”
    “একটা কাজ কর। নীচে গিয়ে আমার নাম্বারে একশো টাকা দিবি আর একটা স্পাইরেল কথা খাতা কিনবি আর জ্যামিতি বক্স কিনবি। পারবি না? ”
    ফরিদ বিষন্ন গলায় বলল,
    “আচ্ছা। ”
    “আমার কাছে এখন টাকা নেই। বাসায় গেলে তোর টাকা ফেরত দিয়ে দিবো। পাঁচশ টাকা পুরোই তোর। তুই এখন বড় হচ্ছিস। তোর হাত খরচের একটা ব্যাপার আছে না। ”
    “আইচ্ছা ভাই আমি যাই। ”
    “আমার ফোনে আগে টাকা দিবি। আমার নাম্বার লিখে নিয়ে যা। ”
    ” আপনের ফোন নাম্বার আমার মুখস্থ আছে। শিলা আপা কয়েকবার আপনের ফোনে ট্যাকা পাঠাইতে দোকানে পাঠাইসিলো। তখন মুখস্ত হয়া গেসে। শুন্য ষোল চুহাত্তুর…………। ভাই হইসে না?”
    আমি হালকা হেসে বললাম,
    “হয়েছে। তোর তো ব্রেন খুব ভালো রে ফরিদ। ফটোকপি ব্রেন পুরো। ”
    ফরিদ হয়তো প্রশংসা শুনে খানিকটা লজ্জা পেলো। লজ্জা ঢাকার জন্য হনহন করে বেরিয়ে গেলো। কিছু জিনিস শত চাইলেও লুকিয়ে রাখা যায় না। তার মধ্যে লজ্জা একটা। যতই চেষ্টা করা হোক না কেনো, কোনো না কোনোভাবে বেরিয়ে আসবেই।

    চলবে..

    8
    4 Comments
Skip to toolbar