Profile Photo

Shah KamalOffline

  • kuriparahs112384
  • Profile picture of Shah Kamal

    Shah Kamal

    4 years, 7 months ago

    ধারাবাহিক গল্প
    :::::::::::::::::::::

    #জমশেদ আলীর মেহমানদারী

    —— শাহ্ কামাল

    (৬)

    শান্তি নগর। জমু’র শ্বশুর বাড়ি। চারদিকে চারটি ঘর। মধ্যিখানে একটা উঠোন। পরিপাটী বাড়ি। গাছগাছালিও আছে চারপাশে। উত্তর দিকের ঘরে থাকে শ্বশুর আর ছোট শালার পরিবার। জমুকে দেখে শ্বাশুরী খুশি। জামাই বলে কথা। জমু’র কদর এ বাড়িতে কম না। ছোট শালা মুরগী জবাই দিতে চাইলেও জমু নিষেধ করে। কিছু না খাওয়ার চেষ্টা করলেও সে ছুটতে পারে না। শ্বাশুরীর হাতের গমের ছাতু তাঁর খুবই পছন্দের।গম বালুতে ভেজে ঢেঁকিতে ভাজা গম ভেঙ্গে তৈরি করা ছাতু। চিনি, লবণ আর পানি দিয়ে মেখে ছোট গোল করে নাড়ুর মতো বানিয়ে জমু’র সামনে দিলো ওর শ্বাশুরী। জমু’র শ্বশুর এ তল্লাটে নামী মানুষ। অবশ্য যে জন্য এতো নাম ডাক সেই মাতব্বরি এখন নাই। যে কোন বিচারে তাঁর ডাক ছিল সবার উপরে। বিচার-আচার করতো বলেই সবাই মাতব্বর ডাকতো। মোহাম্মদ শামসুল আলম নাম হলেও সবাই সামু মাতবর বলে ডাকে। ঘরের খাটিয়াতে জমু’র পাশেই বসা সামু মাতব্বর। জামাই শ্বশুরে তেমন কথা হয় না। তবে আচরণে শ্বশুরের প্রতি যথেষ্ট ভক্তি দেখায় জমু। মাথা নুইয়ে জমু ছাতু খাচ্ছে। একটু দূরে ঘোমটা টেনে শ্বাশুরী দাঁড়িয়ে। সামু মাতব্বর ধীরে একটা প্রশ্ন করে জমুকে,
    – চম্পা ক্যামন আছে, বা-জি?
    শ্বশুরের প্রশ্নে থতমতো খায় জমু। গলায় ছাতু আটকে খাকারি দিতে থাকে। শ্বাশুরী পানি এগিয়ে দিতে চাইলেও তা আর দরকার পরে না। জমু হাত বাড়িয়ে কাছে থাকা পানির গ্লাসটা নিয়ে গলা পরিষ্কার করে এক ঢোকে। স্বাভাবিক হয়ে উত্তর দেয়,
    – আলহামদুলিল্লাহ, ভালা।
    – আলহামদুলিল্লাহ। গোলাপজামের শরীলডা?
    – ভালাই, আব্বা। আলহামদুলিল্লাহ।
    – আলহামদুলিল্লাহ। তাগো নিয়া আসতা?
    – আমি একডু জরুরী কাজে আসছি, আব্বা।
    – জরুরী?
    – কিসের জরুরী? তোমার হাবভাবে তো জরুরীর চিহ্ন নাই।
    – জরুরী মানি সামনের শুক্কুর বার বাদ জুমা আমি গেরামের সব ময়মুরুব্বীগো মেহমানদারী করমু ভাবছি। হাঁসের গোশত দিয়া চিকন চাউলের গরম ভাত।
    – তুমি মেহমানদারী করাইবা! সব ময়মুরুব্বী? নিজের ঘর চলে না। ক্যামনে কী করবা?
    – কোন সমস্যা নাই, আব্বা। দোয়া করবেন।
    – ফি আমানিল্লাহ।
    – আব্বা, আফনের কিন্তু যাওন লাগবো।এজন্যই আমি আসছি।
    – দ্যাখা যাক। ভাল্লাগলে যামু।
    – যাইতে হইবো, আব্বা।
    সামু মাতব্বর আর কিছু বলে না। সে খুশি না বেজার তা বোঝা গেল না। শ্বাশুরী জমু’র আগমনের কারণ জেনে অবাক হলেও কোন রা করলো না। ছোট শালার দু মেয়ে জমু’র সামনে আসে। ফতুয়ার পকেট হতে সে তাদের লজেন্স বের করে দেয়। খুশি মনে চলেও যায় তারা।
    একটু পর জোহরের আজান শোনা যায়।একে একে বাড়ি আসে জমু’র চার শালা বাবু। এ বাড়ির মোট সদস্য একুশ জন। এক সাথেই খাওয়া দাওয়া সবার। এখনো হাঁড়ি আলাদা হয় নাই। ছোট খাটো বিবাদ হলেও বেশিক্ষণ থাকে না।
    সামু মাতব্বর জমুসহ চার ছেলেকে নিয়ে খেতে বসে। খাওয়ার মাঝ খানে ছোট শালা ফরিদ গলা ঝারে,
    – দুলাভাই, শোনলাম মেহমানদারী করাইবেন শুক্কুরবার। হাঁসের গোশত দিয়া চিকন চাউলের গরম ভাত।
    জমু’র খাওয়ার মধ্যে ছেদ পরে। ছোট শালার কথার উত্তর দিতে ব্যস্ত হয় না। সে একটা ভাব নেয়। তাঁর ভাব দেখে এক এক করে চার শালা। শান্ত মেজাজে জমু উত্তর দেয়,
    – শোনছো সঠিক কথা। মেহমানদারী করানো সুন্নত। নবী পাক সাল্লাহুআইহিসালাম মেহমানদারী ভালবাসতেন। আমি গরীব মানু। সাধ্য নাই। মনডা বলল বইলা ময়মুরুব্বী দাওয়ার করছি। আব্বারে দাওয়াত দিয়া গেলাম। তিনি আমার পরম মুরুব্বী।
    – তাইলে তো ঠিকই শুনচি। আমরা যাবো না?
    – দ্যাহো কী বলে। তোমরা এহনো ময়মুরুব্বী হও নাই। হইলে কী বলতে হইবো?
    খোশ মেজাজে খাবার দাবার চলতে থাকে। খেয়ে দেয়ে একটু জিরোয় জমু। বেশি সময় দেরী করা যাবে না। বাড়িতে কাজ আছে। বাড়ি ফিরতে রওয়ানা দেওয়ার সময় তাকে তাঁর শ্বাশুরী থামায়। ছোট্ট একটা কাপড়ের ব্যাগে এক বাটি তিলের তরকারি আর একটা কচু দেয় গোলাপজামের জন্য। চিংড়ি মাছ দিয়ে তিল বাটার তরকারি খুব ভালোবাসে গোলাপজাম। বাড়ির পাশে যতœ ছাড়া বেড়ে ওঠা বিশাল এক কচুর বাগ আছে সামু মাতব্বরের। সারা বছর সেখান থেকে কচু খাওয়া যায়। অনেক দিন ধরে এ বাড়িতে যাতায়াত নাই গোলাপজামের। মেয়ের জন্য মন কাঁেদ। স্বামীর সংসার খুব সুখের না হলেও গোলাপজাম বাপের বাড়ি যায় না তেমন। আজ জমু আসায় তাঁর হাতে মেয়ের প্রতি ভালবাসার চিহ্ন ব্যাগে ঢুকেছে। জমু কোন প্রশ্ন করে না। বাড়ির দিকে যাত্রা করে।
    লুৎফর রহমান। ফুলপুরের বিখ্যাত গাছ ব্যবসায়ী। কেউ গাছ বিক্রি করলে তাঁর ডাক পরে। অবশ্য মাঝে মাঝে সে নিজেও মানুষকে গাছ বিক্রি করতে জ্বালাতন করে। বাজারে এসব গাছের কাঠের চাহিদা বেশি। দামও বেশি। তবে সে মানুষকে বেশি দাম দেয় না। লোকজনও তাকে তেমন কিছু বলে না। ছাব্বিশ বছর ধরে গাছের ব্যবসা তাঁর। বাপ-দাদার পেশা। ধরে রাখতে হয়। না হয় পরম্পরা রক্ষে হয় না। অভিশাপ লাগে। আয় উন্নতি কমে যায়। এসব ভাবনা হতেই বংশে কেউ কেউ বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখে। লতুও তাদের দলে। পরম্পরা ধরে রেখেছে। মানুষকে যথেষ্ট ভোগান্তি দেয় সে। এক কিস্তিতে কারো গাছের দাম পরিশোধ করেছে এমন নজির খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। জমু’র আম গাছ কিনেছে এক মাস তের দিন হলো। সে গাছের কাঠ-কঙ্কাল কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই। কাঠ বেচা টাকা পয়সাও হজম হয়ে গেছে হয়ত। জমু’র হিস্যা অন্যে হজম করলেও তাঁর ভাগ্যে পাওনাটাই জোটেনি এখনো। শ্শুরবাড়ি হতে সে সোজা এসছে লতু’র কাছে। লতু’র পান চিবানোর অভ্যাস বহু পুরানো। এক বাক্য শেষ না হতে দশ বার পান চিবুতে হয়। ‘পাইবা, তোমার টেকা সময় মতো পাইবা। একটু সবুর কর, জমু ভাই। টেকা না দিয়া তো যামু না কোথাও। নিজের মানুষ। বাড়ি নিয়া দিয়া আসমু’- পান চিবুতে চিবুতে এ কথা বলে বিদায় করে জমুকে। শ্বাশুরীর দেয়া ব্যাগ হাতে নিরাশ বদনে বাড়ির দিকে রওয়ানা হয় জমু।

    (চলবে)

    11
    7 Comments
Skip to toolbar