Profile Photo

Shah KamalOffline

  • kuriparahs112384
  • Profile picture of Shah Kamal

    Shah Kamal is with Somaiya Akter and 38 others

    • 5 years ago

    ধারাবাহিক গল্প
    :::::::::::::::::::::

    #জমশেদ আলীর মেহমানদারী

    —— শাহ্ কামাল

    (৭)

    সন্ধ্যা হয়ে এলো। সূর্য ডুবলেও আবছা আলোটা রয়ে গেছে। জমু বাড়ি আসে। মুখে তৃপ্তির রেখা না থাকলেও ওর সাদাসিধে বদনটা কখনোই চিন্তার মেঘে ঢাকা পরে নাই। জগতে এই একটা শ্রেণি। হাজার সমস্যা থাকলেও তাঁরা কখনো নিরাশ হয় না। মেহমানদারীর আয়োজন করার চিন্তা মাথায় চাপলেও কোন পেরেশানীতে নাই জমু। ঘোমটার আড়াল হতে গোলাপজাম লক্ষ্য করে জমুকে। হাতের ব্যাগটা না রাখতেই জমু’র হাত থেকে ব্যাগটা নেয় চম্পা। ছোট ছেলেমেয়েদের এক্ষেত্রে ত্বর সয় না। বাড়িতে বড়োদের হাতে ব্যাগ-পুটলি দেখলে তা খুলে না দেখা পর্যন্ত তাদের শান্তি নেই।
    যেন রূপকথার দৈত্য হাতে পায় তাঁরা। আলাদিনের চেরাগ পেয়ে আলাদিন না যতোটা খুশি তার চেয়ে বেশি খুশি হয় ছোট ছোট কচিকাচা বাচ্চার এই পুটলি খুলে। কখনো তাদেও মুখে হাসি আবার কখনো বেদনার রেখাও ফুটে ওঠে পুটলি খুলে। চম্পা ব্যাগটা খোলে। তাঁর মুখে রাগ-বিরাগের কোন চিহ্ন নাই। অনুরাগের ছায়া নাই। অতৃপ্তিও নাই। সে মায়ের মুখে তাকায়। অবশ্য কচুটা দেখে গোলাপজাম একটু খুশিই হয়। তিলের তরকারি দেখেও সে মহাখুশি। মায়ের হাতের রান্না। সবারই ভাল লাগার কথা। ব্যাগে একটা কাপড়ের পুটলিও আছে। চম্পা সেটা দেখে এত তাঁর জন্য কিছু আছে মনেহয়। গোলাপজাম তা আর খোলতে দেয় না চম্পাকে। নিজের হাতে নিয়ে নেয়। জমু’র চোখ পড়ে পুটলিতে। গোলাপজাম গিঁট খুলে একটু অবাক হয়। তিন তিনটা একশত টাকার নোট। কচকচা নোট। গোলাপজামের বোঝতে বাকি থাকে না। তাঁর মা কেন এ টাকা দিয়েছে তা সে বুঝতে পারে। মেয়ের জামাই গরীব। মেহমানদারীর চিন্তা মাথায় এলেও তাঁর সামর্থ যে নেই তা শ্বাশুরী খুব ভাল করে জানে। তাই এভাবে একটু সহযোগিতা করা। গোলাপজাম ঘোমটার আড়াল থেকে জমু’র দিকে তাকায়। জমু’র মুখটা শুকনো। নিরানন্দ মলীন চেহারা। সে চেহারায় অভিযোগ নাই; ব্যর্থতা ঢাকার অলস চেষ্টার প্রতিচ্ছবি। জমু’র সামর্থ্য সে বোঝে। কিন্তু ঘর-দোরের কতো চাহিদা। এসব সে পূরণ করতে পারে না। এতে তাঁর আক্ষেপ নেই। আল্লাহপাক ভালোই চালাচ্ছে। তবে এভাবে কারো সহযোগিতা তাঁর কামনায় না থাকলেও চলে আসে। এসব ভাল লাগে না ওর। নীরব চাহনির রেখা না মেলাতে গোলাপজাম প্রশ্ন কওে জমুকে,
    -লতু ভাই টেকা দিছে?
    কোন কথা বলে না জমু। চুপ থাকে। তাঁর চুপ থাকার ভাষা বুঝতে পারে গোলাপজাম। তারপরও সে জানতে চায়,
    – লতু ভাই কি টেকা দিছে?
    -নাহ।
    উত্তরে অতিরিক্ত কোন কথা যুক্ত করে না সে।
    – ক্যান দেয় নাই? কবে দিব? দেড় মাস হইয়া গেল।
    – জানি না। হে কী কারো টেকা টাইমমতো দেয়?
    – আফনের দরকার। বোঝাইয়া বলতেন।
    – হে শোনে?
    দুজনের কথা শেষ হয়।
    গোলাপজাম মাদুর বিছায় মেঝেতে। রাতের খাবর এক সাথে খাবে সবাই। তিন জন খেতে বসে। কুপির আলোয় ভালভাবে না দেখা গেলেও এটা বুঝতে বাকি নেই গরীবের খাবাওের পদ বেশি থাকে না। গোলাপজাম কচুর লতি রান্না করেছে। জমু লতি পছন করে। চম্পা দেখতে দেখতে সব শিখে গেছে। ও এখন সবকিছু খেতে পারে। ও জানে গরীব ঘরে সখ আহ্লাদ স্বপ্নের বিষয়। তাই সে ভাল-মন্দ খাওয়ার বায়না ধরে না। চুপচাপ খেতে বসে জমুর বাম দিকে। খাবার আগে জমুকে সে জিগ্যেস করে,
    – আব্বা, তোমার দাওয়াত দেওয়া কি শেষ?
    – হ, আম্মাজান। শেষ।
    – কত জন দাওয়াত পাইছে?
    – চল্লিশ-পঞ্চাশজন হইবো।
    জমু’র এ উত্তর শুনে গোলাপজামের হাত থেকে ওর থালাটা পরে যায়। চল্লিশ-পঞ্চাশ জন জমু কিভাবে খাওয়াবে? তাঁর তেমন সামর্থ্যও নাই। গোলাপজাম অবাক হয়ে যায়।
    – এত্তো মানু..!
    গোলাপজাম বিস্ময়ে বলে জমুকে।
    – হ।
    – আফনে খাওয়াইবেন ক্যামনে?
    – ক্যান? হইয়া যাইবো।
    – ক্যামনে হইবো? থাল-বাডি আর হাঁড়ি-পাতিলও তো নাই।
    – ও বউ। কী বল? কারো বাড়ি থাইকা আইনা নিবা। আবার পয়-পরিষ্কার কইরা দিয়া দিবা।
    গোলাপজাম বিরক্ত হয়। কিন্তু তেমন প্রকাশ করে না। কার কাছেই বা করবে। কোন লাভ নাই। জমু এমন-ই। সে খাবার খাওয়া শুরু করে। খেতে খেতে জমু গোলাপজামকে জিগ্যেস করে,
    -বউ, টেকা কত হইলো?
    – ছয় শো।
    খেতে খেতে উত্তর দেয় গোলাপজাম।
    – এই টেকায় হইবো না?
    – হইবো। ক্যান হইবো না। রাইন্ধা একডু কইরা ঝোল দিয়া খাওয়াইবেন। হাঁসের গোশত আর চিকন চাউলের ভাত!
    গোলাপজামের সুরে বিরক্তির ছাপ। প্রসঙ্গ পাল্টায় জমু,
    – বউ, উঠানডা পরিষ্কার করা দরকার।
    -ক্যান খেল করেন নাই? আইজকা পরিষ্কার করাইছি। আমি আর বাতাসার নানী মিলা করছি।
    তাদের কথা শেষ হয় না। বাইরে থেকে একটা গলার আওয়াজ পাওয়া যায়, দুইডা ভাত দিবা?
    আওয়াজ শুনে জমু আর গোলাপজাম খাওয়া বন্ধ করে সতর্ক হয়। কে ডাকছে। গলার স্বরটা স্পষ্ট শুনতে পায় না। আবার বাইওে থেকে আওয়াজ আসে, মা গো, দুইডা ভাত দিবা? খুব খিদা।
    জমু উঠে গিয়ে দরজা খোলে। পিছনে কুপি নিয়ে আসে চম্পা। সে কুপিটা সামনে এগিয়ে ধরে। জমু ভালভাবে লক্ষ করে। বলে,
    – মফিজ না?
    -হ।
    দুর্বল উত্তর আসে বাইরে থেকে।
    – কী জন্য আসছো?
    – দুই দিন ধইরা পেটে দানা-পানি পরে না।
    – আসো। বহ।
    বারান্দায় বসে মফিজ। বয়স ষাট-বাষট্টি হবে। বউ নাই। চার ছেলে। গ্রামের উত্তর দিকের শেষ বাড়িটা তাদের। তিনটা তাল গাছ আছে বলে সবাই তালগাছ ওয়ালা বাড়ি বলে। ছেলেরা জমি জিরাত লিখে নিয়ে এখন খাবার দেয় না। এর ওর বাড়ি চেয়ে চিন্তে দিন চলে তাঁর। দিনে সরাসরি হাত পাতে না কারো কাছে। ছেলেদের মান সম্মান থাকে না। তাই রাতে বের হয়। কেউ ভাত দেয়, কেউ একটু তরকারি দেয়। এভাবেই চলে যায়। রাতে কিছু ভাত বেঁচে গেলে সকালে খেয়ে সারাদিন পার করে দেয়।
    গোলাপজাম নিজের পাতের অর্ধেকটা ভাত একটা থালায় দিয়ে তিলের তরকারি দিয়ে মফিজকে খেতে দেয় বারান্দায়। জমু দেখে। কিছু বলে না। দরজাটা একটু খুলে দেয়। একটা কুপি। মফিজের খেতে আলো লাগবে। জমুর ঘরেও আলো দরকার। জমু কুপিটা মাঝামাঝি রাখে। আবছা আলোয় ভাত খাওয়া শুরু করে মফিজ। জমুও খেতে বসে তার জায়গায়। আলোর অভাবে কারো সমস্যা হয় না।
    জমু জানে গোলাপজাম তিলের তরকারি দিয়ে পেট পুরে ভাত খায়। এখন তাঁর থালায় ভাত কম। সে গোলাপজামকে তাঁর থালা থেকে অনেকটা ভাত দিয়ে দেয়। গোলাপজাম বারণ করলেও শোনে না। জমু’র মনে মায়ার কমতি নাই। মেয়েরা বাপের বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়ি চলে আসে চিরদিনের জন্য। রাগ গোস্বা যতোই থাকুক তাদের প্রতি সব স্বামীর টান থাকাটা খুব দরকার। জমু তা বিশ্বাস করে।
    খাবার দাবার সেড়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে শোকরগোজারি করে মফিজ। তাকে শুক্রবার আসতে দাওয়াত দেয় জমু।
    কুপির আলো নিভে যায়। শুয়ে পরে সবাই। অন্ধকারে জমু গোলাপজামকে বলে,
    – কাল বেনে গোলাকান্দাইল যামু হাঁস কিনতে। বিসুদবার হাট বসে গোলাকান্দাইল বাজারে।
    – যাইয়েন। এই কয় টেকায় কি করবেন জানি না।
    জমুর কোন উত্তর আসে না।

    (চলবে)

    14
    11 Comments
Skip to toolbar