-
ধারাবাহিক গল্প
:::::::::::::::::::::#জমশেদ আলীর মেহমানদারী
—— শাহ্ কামাল
(১৩)
রাত মোটামুটি কম না।
চারদিকে অন্ধকার।
চেয়ারম্যান এর কার্যালয়ে লোকদের ভীড়। ইলেক্ট্রিক বাতি জ্বলছে। চেয়ারম্যান সাহেব তাঁর চেয়ারে বসে আছেন। পাশের চেয়ারে এক ভদ্রলোক। খাকি কোর্ট গায়ে। হাতা কাটা। গোঁফ বেশ খানিকটা বড়ো। দাঁড়ি নেই। একটা ব্যাগ আর ক্যামেরা আছে সাথে। সন্ধ্যায় অনেকে আসতে দেখেছে তাকে। তিনি স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক। লেখাপড়া মেলাদূর। অন্য কোন পেশায় না গিয়ে সাংবাদিকতায় ঢুকেছে সাধারণ মানুষের অধিকার কলমে তোলার জন্য। তাকে দেখে অনেকে না চিনলেও চেয়ারম্যান চিনেন। জেলা পরিষদের অনেক মিটিং এ তাকে দেখেছে। চেয়ারম্যান কিছুটা ভাবনায়। রিলিফ নিয়ে তেমন কিছু হয় নাই। রিলিফ তো আসে না। ভিজিএফ র্কাড নিয়ে কোন সমস্যা নাই। বয়স্ক ভাতার বিষয়ে একটা সমস্যা ছিল। তাও মিটে গেছে। রাস্তার কাজের জন্য গম এসছে। সেখান থেকে চেয়ারম্যান আর সফর উদ্দিন মেম্বার দশ বস্তা গম সড়িয়ে ফেলেছে। সে খবর সাংবাদিক জানার কথা না। নাকি আবার জেনে গেল। নানান চিন্তায় অস্থির হচ্ছে চেয়ারম্যান। এর মধ্যেই সাংবাদিককে জিগ্যেস করল,
– জনাব, কী হেতুতে আগমন জানতে পারি?
চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে একটা যুতসই ভাব নিলো সাংবাদিক। চেয়ারম্যান সাহেবের কথার জবাব দিল শান্ত মেজাজে,
– আমি শফিউদ্দিন আহাম্মদ মাতুব্বর। সবাই শফি ভাই বলে ডাকে। দৈনিক সোনালী দিন পত্রিকার সাংবাদিক। সাংবাদিকতা আমার পেশা না, নেশা। পূর্ব পুরুষগণ বিচার আচার করতেন। তাই আমাদের নামের সাথে মাতুব্বর শব্দটা লেখা হয়। ফুলপুরে একটা নিউজ নিতে আসছি।
উপস্থিত লোকজনের মধ্যে একটা কানাঘুষা শুরু হল। চেয়ারম্যান আবার কী করল?
কেউ কেউ বলছে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। কিছু না করলে সাংবাদিক আসছে নাকি।
কেউ কেউ খুশি।
কেউবা বেজাড় মুখ।
কারো চোখেমুখে অনুসন্ধানী নজর।
চেয়ারম্যান একটু উদ্বিগ্ন। তাড়াহুড়ো করে চা-বিস্কুটের ব্যবস্থা করলেন শফি ভাইয়ের জন্য। বিস্কুট খেতে শফি ভাই তেমন পছন্দ করে না। কিন্তু কিছু করার নেই। সাংবাদিক মানুষ। কতো জায়গায় আনাগোনা। খবরের তেজের সাথে নানা রকমের বিস্কুট অহরহ আসে সামনে। চেয়ারম্যান দিয়েছে ড্রাই কেক। চা দিয়ে ভিজিয়ে খেতে খারাপ লাগে না। বিস্কুট মুখে দিতে দিতে শফি বলল,
-চেয়ারম্যান সাহেব, একটা নিউজ শোনলাম..
সাংবাদিক শফির কথা বেশিদূর না গড়াতেই চেয়ারম্যান আমতা আমতা করে জিগ্যেস করল,
– নিউজ? কি-সে-র?
চেয়ারম্যানের ভাব ভঙ্গি দেখে উপস্থিত লোকের আগ্রহ বেড়ে যায়। সাংবাদিক শফিও বিষয়টি লক্ষ্য করে। চেয়ারম্যান যে ভীত-সন্ত্রস্ত আছে তা বোঝা যাচ্ছে। চেয়ারম্যানের মতিগতির বিষয়টি মাথায় রেখে একটু স্বস্থির জন্য শফি বলল,
– জরুরী কোন নিউজ না। উপজেলায় শোনলাম ফুলপুরে আগামীকাল একজন মেহমানদারী করাবেন গ্রামের সকল ময়-মুরুব্বীদের। হাঁসের মাংস দিয়ে চিকন চাউলের গরম ভাত। আমার কাছে বিষয়টা ইন্টারেস্টিং লেগেছে। তাই কাল একটি নিউজ করব ভাবছি।
সকলের হুশ হল। চেয়ারম্যানের চিন্তা বিদায় হলো। রাজ্যের নানান চিন্তা ঝেঁকে বসেছিল তাঁর মাথায়। ফুলপুরে সাংবাদিক! যেই সেই সাংবাদিক নয়। জেলাতে নামকরা। কোন রিপোর্টে আবার কী সমস্যা হয়ে যায়। শফি’র উত্তরে এসব ভাবনা চিন্তা বাতাসে মিলিয়ে অদ্ভুত এক হাসির রেখা ফুটে উঠলো তাঁর চেহারায়। লোকজনের ভীড় একটু কমলো। কেউ কেউ চলে গেল হাসতে হাসতে। চেয়ারম্যান গদগদ হয়ে খুশিতে বলল,
– জমু। আমদের জমু। কাল মেহমানদারী করাইবো। আমরা সবাই যাবো। আপনেও যাইবেন আমাদের সাথে। বড় ভাল মানুষ সে। আমি মাইকিং করাইয়া দিছি। রাতটা আমার বাসায় থাকবেন। মেলা রাত। চলেন।
শফি আপত্তি করে না। লোকজন কমতে শুরু করে। চেয়ারম্যান আবার বলতে শুরু করে,
– চলেন, শফি ভাই। বাড়িতে ভাল-মন্দ খাবারের ব্যবস্থা আছে। গরীবের বাড়িতে গুণী মানুষের পদধুলি দিবেন,ভাই।
চারপাশটা ভাল করে দেখলো শফি। রাতের পরিধি দেখে তাঁর মনে হলো এ সময় না ফেরাই ভালো। ভাবনা চিন্তার পাঠ চুকিয়ে চেয়ারম্যানকে বলল,
– এতা করে বলছেন যখন চলুন।
চেয়ারম্যান আর শফি যাত্রা শুরু করলো।
চেয়ারম্যান বাড়ির বৈঠক খানার পাশে মেহমানদারীর জন্য একটি খাবার টেবিল আছে। শফি সেখানে বসেছে রাতের খাবর সাড়তে। টেবিলে একের পর এক খাবার সাজাচ্ছে মোকলেস। চেয়ারম্যান বাড়ির হর্তা-কর্তা বলতে গেলে মোকলেস। কথা বলে তোতলামো করে। এ বাড়ির কারো বুঝতে সমস্যা হয় না। চেয়ারম্যান আর শফি খাবার শুরু করলো। চেয়ারম্যানের বাড়িতে বিদ্যুৎ আছে। সমস্যা হলো বেশি সময় থাকে না। এখনো নাই। একটা চার্জার লাইট জ্বলছে। চেয়ারম্যানের শালা বদরুদ্দি দুবাই থাকে দশ বছর ধরে। চার্জার লাইটটা সে পাঠিয়েছে। বছর হলো কোন সমস্যা হচ্ছে না। আলোও উজ্জ্বল। শফি নানা বাহারের খাবার দেখে জিগ্যেস করলো,
– চেয়ারম্যান সাহেব, একটা বিষয় বুঝলাম না। এতো খাবার কেন?
চেয়ারম্যান উত্তর দেওয়ার কোন সুযোগ পায় না। উত্তরের আগেই মোকলেস বলা শুরু করে,
– আইজ বিসসুদ বার। এই বাড়ি বিসসুদ শুক্কুর বার ভালা রান্ধা অয়। আফনে মেমান, পেট ভইরা খান।
শফি মোকলেসের কথা তেমন বোঝে না। চেয়ারম্যান খাবার খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে বুঝিয়ে দেয়।
শফি আর চেয়ারম্যানের খাবার দাবার চলছে। চেয়ারম্যান মোকলেসকে জিজ্ঞেস করে,
– কিরে তুই ও কি যাবি নাকি মেমানদারী খাইতে?
চেয়ারম্যানের কথায় মোকলেসের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরে। এটা কোন কথা হলো, আজ পর্যন্ত কোন দাওয়াতে যায় নি সে? চেয়ারম্যানের সাথে সব দাওয়াতেই যায়। তাছাড়া দু’চার জন লোক লস্কর সাথে না থাকলে চেয়ারম্যানকে তো চেয়ারম্যান লাগে না। মোকলেস হুট করে রেগে উত্তর দেয় চেয়ারম্যানকে,
– কিমুন কতা কইলেন চেরম্যান সাব? আমি তো আমনের সব দাওয়াতে যাই।
– তাও ঠিক। তয় যাবি ক্যামনে? কত মানুষ আসবো।
– হেই চিন্তা আমনের না। পালকিওলার মাইয়ার জামাইর ঘোড়া আছে না? ঘোড়া দিয়া যাইবেন।
– বড়ো কাজের হইছস। কাজ-কাম তো বেবাক গোছাইয়া রাখছোস।
চেয়ারম্যানের মুখে প্রশংসা শুনে মোকলেসের মুখে একটা হাসি ফুটে ওঠে। তৃপ্তির হাসি। তবে ঘোড়ায় চড়ে দাওয়াতে যাবার বিষয়টা শফির মনে খটকা তৈরি করে। চেয়ারম্যান বুঝিয়ে দেয়। সবার মতো পায়ে হেঁটে গেলে মান থাকে না চেয়ারম্যানের। ঘোড়ায় চড়ে দাওয়াতে যাবার রীতি চেয়ারম্যানের জন্য নতুন কিছু না।
রাতের আঁধার বাড়ছে।(চলবে)
10 Comments-
দারুণ গল্প বন্ধু @tanvir3 আগের পর্বগুলো পড়ে দেখতে পারো আশা করি ভালো লাগবে।
Friends
Rakib Rakib
@abdurrakib
Md Ashfak Sayed
@ashfak
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Foyzur Khan
@foyzur-khan
sanjida akter jim
@sanjidajim



চরিত্র নির্মান আখ্যান লেখার সবচেয়ে বড় কাজ; সনাতন সমাজের বিচিত্র মানুষের ছবি আঁকো। অভিনন্দন।