Profile Photo

আবির হাসান সায়েমOffline

  • Abir-Hassan-Sayem
  • #ধারাবাহিক
    একমুঠো জোনাকি (পর্ব-১০)
    ~ আবির হাসান সায়েম

    ডাক্তার সাহেব আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমার গলায় এখনো ব্যাথা করছে, কোনো কথা বের হচ্ছে না গলা দিয়ে। ঘন্টা দেড়েক আগে একজন নার্স একটা হুইলচেয়ার নিয়ে এসে বললেন,
    “স্যার এন্ডোস্কপি করতে যেতে হবে। ”
    ” টেস্ট কি খালি পেটে করতে হবে?”
    “জি স্যার। ”
    ” হুইলচেয়ার লাগবে না। আমি হেঁটে যেতে পারব।”
    “না স্যার, আমাদের নিয়ম আছে। রোগীকে হুইলচেয়ারে করে নিয়ে যেতে হবে। ”
    আমি বেশি কথা না বাড়িয়ে হুইল চেয়ারে বসে পরলাম। দেখলাম আমার আগে আরোও দু’জন এসে বসে আছেন। ১৫ মিনিট পর পর একেকজনকে ডেকে ভিতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ৩০ মিনিট পর আমারও ডাক এলো। একজন এসে আমাকে ঠেলে ভিতরে নিয়ে গেলো। রুমটায় বমির গন্ধ মনে হচ্ছে কেও কিছুক্ষন আগে বমি করে গেছে। আমারে একটা চেয়ারে বসানো হলো। ডাক্তার বললেন,
    ” মুখ হাঁ করে উপরের দিকে তাকান।”
    আমি মুখ হাঁ করে উপরের দিকে তাকালাম। একটা লাইট আমার মুখের উপর জ্বলছে । নার্স ডাক্তারকে একটা পাইপের মতো কি যেনো দিলেন। ডাক্তার আমার মুখ দিয়ে পাইপটা আসতে আসতে ঢুকিয়ে দিলেন। আমার পেট উল্টে বমি আসছিলো। কি সাংঘাতিক।
    ডাক্তার সাহবেকে ফ্যাসফ্যাসে গলায় জিজ্ঞেস করলাম,
    “স্যার আমাকে ছুটি হবে কবে?”
    “আপনি বাসায় যাবার মতো এখনো স্টেবল নন। ”
    “ওহ আচ্ছা। আনুমানিক আর কয়দিন থাকতে হনবে?”
    “কমপক্ষে আরও দুই-তিনদিন। ”
    “আচ্ছা স্যার আমার কেবিনটা কি পাল্টানো যায়। ঘরটা খুব অন্ধকার। একটা জানালাও নেই৷ ”
    “আমি রিসিপশনের বলে যাচ্ছি যদি কেবিন খালি থাকে তাহলে আপনাকে জানানো হবে৷ ”
    “জি আচ্ছা স্যার। ”
    ডাক্তার সাহেব চলে গেলেন। আমি যে ডাক্তারের আন্ডারে চিকিৎসা নিচ্ছি তার নাম -সোলেমান বিন কাদের। বয়স ৫০/৫১ হবে৷ চুল অর্ধেকের বেশি পেকে গেছে। এমনিতেই একটু খাটো, তার উপর একটু কুজো হয়ে হাটেন। ফরিদ আর ডাক্তার সাহেবকে পাশাপাশি দাঁড় করালে, ফরিদ ডাক্তারের থেকে দুই আঙ্গুল উঁচু হবে। কিন্তু ডাক্তার সাহেবের কন্ঠস্বর খুব ভারী। ভরাট গলা। এই গলায় রবীন্দ্র সংগীত খুব মানাবে। ডাক্তার সাহেব কি কখনো গান করেছেন। একবার জিজ্ঞেস করা যেতে পারে।
    দুপুরের খাবার খেয়ে মাত্র হাত ধুয়ে বিছানায় শুয়েছি, এই সময় ঘরে ঢুকলেন শাহিন চৌধুরী ও ইয়াসমিন সুলতানা (শিলার মা-বাবা)। আমি একটু উঠে বসলাম। ফরিদ দৌড়ে গিয়ে দুইজনকে পা ধরে সালাম করল। শাহিন চৌধুরী ফরিদকে তুলে নিয়ে বললেন,
    ” থাক থাক থাক। কেমন আছিস। ”
    ফরিদ হেসে বলল,
    ” ভালা আছি। ”
    শাহিন চৌধুরী ও ইয়াসমিন সুলতানা সোফায় এসে বসলেন। আমি বললাম,
    “আসসালামুয়ালাইকুম। কেমন আছেন খালা-খালু?”
    তারা দু’জনই বললেন,
    “ভালো। ”
    শহিন চৌধুরী বললেন,
    “তুমি শুনলাম দুই রোগ এক লগে বাধায়া বসছো?”
    আমি হাসলাম কিছু বললাম না। ইয়াসমিন সুলতানা বললেন,
    “রোগ হবে না তো কি হবে। একা থাকে। কি খায় না খায়। কতবার বললাম,আমাদের সাথে এসে থাকো। কোনো কথাই শুনো না তুমি। এখন কে কষ্ট পাচ্ছে?”
    শাহিন চৌধুরী বললেন,
    “আরে থামো তো। বেছারা এমনেই অসুস্থ। এখন কি রাগ কইরা কোনো লাভ আছে?”
    শাহিন চৌধুরী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
    ” ডাক্তার সাহেব কি বলেছেন? ”
    “তিনি বলেছেন, কমপক্ষে আরও দুই -তিনদিন থাকতে হবে। ”
    ” একেবারে সুস্থ হয়ে যাওয়াই ভালো। আমরা কিন্তু এসেছিলাম যেদিন রাতে তোমার জ্ঞান ফিরল, সেইদিন বিকালে।”
    “হ্যা। শিলা বলেছিলো। ”
    “ভালো কথা। শিলার বিয়ে ঠিক হয়া গেছে তা তুমি জানো? ”
    ” হ্যা আমাকে বলেছে। ”
    ” হঠাৎ রাজি হয়ে গেলো। মেয়েটা এমন হয়েছে। কোন সময় যে কি করে বলা মুশকিল। আজকে নিলয়ের সাথে দেখা করতে যাইবার কথা। ”
    আমি কিছুই বললাম না। মুচকি হাসলাম। শাহিন চৌধুরীকে বেশ উচ্ছ্বসিত মনে হচ্ছে। তার মুখে হাসি। কিন্তু ইয়াসমিন সুলতানা মুখ গম্ভীর করে বসে আছেন। শাহিন চৌধুরী উঠতে উঠতে বললেন,
    “আমি একটু বিলিং কাউন্টারে যাচ্ছি। তোমরা গল্প কর। ”
    বলেই সে চলে যাচ্ছিলেন। ইয়াসমিন সুলতানা ফরিদকে বললেন,
    “তুইও তোর চাচার(ফরিদ শাহিন চৌধুরী কে ‘চাচা’ বলে সম্বোধন করে) সাথে যা।”
    ফরিদ অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে গেলো।
    ইয়াসমিন সুলতানা উঠে আমার খাটের পাশে এসে বসলেন।
    “আবির, শিলা তোমাকে বিয়ের ব্যাপারে বলেছে?”
    “হ্যা খালা বলেছে। ”
    “কি বলেছে? ”
    “সে বলেছে নিলয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ”
    ” সে কি বলেছে যে, বিয়েটা সে একদমই করতে চায় না? বিয়ের আগেরদিন সে পালিয়ে যাবে?”
    ” বিয়ে করতে চায় না, তা বলেছে কিন্তু পালিয়ে যাবে এমন কিছু তো বলে নি। ”
    “তোমার এইখানে শিলা কবে আসবে? ”
    ” আগামীকাল আসবে হয়তো। ”
    “তাহলে কালকে মনে হয় তোমাকে বলবে। ”
    “আপনাকে শিলা নিজে বলেছে, সে পালিয়ে যাবে?”
    “না আমি ধারণা করছি। এমনি আকাশে ঢিল ছুড়ছি না। এইরকম ধারণা করার যথার্থ কারণ আছে। ”
    “কারণটা কি জানতে পারি খালা? ”
    “অবশ্যই পারো। কিন্তু আগে কিছু প্রশ্নের উত্তর দাও। ”
    “কি প্রশ্ন? ”
    ” শিলা তোমাকে খুব পছন্দ করে তা কি তুমি জানো?”
    “হ্যা জানি। ”
    ” তুমি কি ওকে পছন্দ করো?”
    ” হ্যা করি। আপনিও আমাকে পছন্দ করেন। আমিও আপনাকে পছন্দ করি, শ্রদ্ধা করি।শিলা আমার খুব ভালো বন্ধু, তাকে পছন্দ না করার তো কোনো কারণ দেখছি না। ”
    “দেখো আবির। তুমি ভালো করেই বুঝতে পারছ আমি কেমন পছন্দের কথা বুঝাচ্ছি। না বুঝলে থাক। আমি সোজাসুজি প্রশ্ন করছি। তুমি কি শিলাকে ভালোবাসো?”
    “খালা, ভালোবাসা তো অনেকরকমের। আপনি কোন ভালোবাসার কথা বলছেন বুঝতে পারছি না। ”
    ইয়াসমিন চৌধুরী শব্দ করে হেসে উঠেলেন যেনো খুব হাসির কোনো কথা শুনলেন।
    “তুমি বুঝতে পারছো না কি রকম ভালোবাসার কথা জিজ্ঞেস করছি? বুঝেও না বুঝার অভিনয় না করে উত্তর দাও। ”
    “জি বোন হিসেবে ভালোবাসি। ”
    “আর কিছু না? ”
    “না আর কিছু না। ”
    ” ঠিক আছে। কিন্তু তুমি ঘামছো কেনো? তুমি কি জানো,মিথ্যা বললে ব্লাড প্রেসার বেড়ে যায়। ব্লাড প্রেশার বেড়ে গেলে মানুষ ঘামতে থাকে। ”
    ইয়াসমিন চৌধুরী আমার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছেন। আমি মৃদু স্বরে বললাম,
    “ওহ আচ্ছা। ”
    “তুমি কি জানো শিলা ডায়েরি লিখে?”
    “হ্যা জানি। ”
    ” তুমি অসুস্থ হবার পর প্রথম কয়দিন, শিলা যখন হাসপাতালে ছিলো তখন আমি ওর ডায়েরি পড়েছি। প্রায় তিনশত পৃষ্ঠার ডায়েরি এক রাতে শেষ করেছি। শিলা এতো সুন্দর করে গুছিয়ে লিখতে পারে তা জানতাম না। সে তোমাকে পছন্দ করে তা জানতাম। কিন্তু পছন্দের মাত্রা এতো প্রবল তা ডায়েরি না পড়লে জানতাম না। ”
    ” কারো ডায়েরি লুকিয়ে পড়া কি অপরাধ না? ”
    “হ্যা অনেক বড় অপরাধ। কিন্তু আমি মা। মা’য়েদের অনেক কিছুই করতে হয়। কাল রাতে যখন শিলা ঘুমিয়ে ছিলো তখন আমি আবার ওর ডায়েরিটা পড়ি। সেখান থেকেই জানতে পারি, নিলয়ের সাথে বিয়েতে সে রাজি না। ”
    আমি গম্ভীর মুখে তার দিকে তকিয়ে আছি। তিনি আবার শুরু করলেন,
    “ও বিয়ে ভেঙে দিতে পারছে না কারণ নিজেই রাজি হয়েছে। তাই আমার ধারণা সে বিয়ে থেকে পালাবে। ”
    “সে আত্মহত্যাও তো করতে পারে। পালাবে এইটা আপনি বুঝলেন কি করে?”
    ইয়াসমিন সুলতানা ঈষৎ হেসে বললেন,
    ” শিলা একটু জেদী হলেও আত্মহত্যা করার মতো সাহস ওর নেই। ”
    ” ওহ আচ্ছা। এখন আমি কি করতে পারি?”
    “দেখো, আবীর আমি তোমাকে খুব বেশি পছন্দ করি। তোমাকে নিজের ছেলের চোখে দেখি। তোমার কাছে একট অনুরোধ, তুমি যদি শিলাকে ভালোবাসো তাহলে বল। আমি তোমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করব। আর যদি না ভালোবাসো তাহলে শিলাকে বুঝিয়ে বল। আমার একমাত্র মেয়ে একটা অনিশ্চয়তার সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে, আমি সব জেনে কিভাবে……..
    ইয়াসমিন সুলতানা কেদে ফেললেন। আমি কিছুক্ষণ পর বললাম,
    ” আমি কাল শিলাকে বুঝিয়ে বলব। আপনি চিন্তা করবেন
    না। ”
    ইয়াসমিন সুলতানা আঁচল দিয়ে চোখ মুছে এক হেসে বললেন,
    “আমার বাবা পঞ্চাশউর্ধ্ব বয়স। মানুষের মনে কি চলছে তা হালকা হলেও আচ করতে পারি। তুমি শিলাকে ভালোবাসো তা আমি জানি। কিন্তু কেনো বারবার মানা করছ। তা বুঝতে পারছি না। ”
    ” আমি বলব। কিন্তু আজ না। কিছু কথা সবসময় বলা যায় না।কিছু কথা বলার জন্য উপযুক্ত পরিস্থিতি প্রয়োজন। ”
    ইয়াসমিন সুলতানা একটু ইতস্তত করে বললেন,
    ” তোমার সাথে আরেকটা কথা ছিলো। কিভাবে বলব বুঝতে পারছি না। পরে ফোন দিয়ে কথাটা বলবনে।”
    “খালা আমার ফোন ভেঙে গেছে। ”
    “সে কি! তাহলে তো এখনই বলতে হবে। আচ্ছা শোনো…..
    তার কথা শেষ করার আগেই আমি বললাম,
    ” খালা আমার মাথাটা ঝিমঝিম করছে। কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না। ওইযে ওইখানে একটা খাতা কলম আছে। লিখে রেখে যান। আমি কিছুক্ষন শুয়ে থাকব।”
    “আচ্ছা লিখে রেখে যাচ্ছি। রাতেই পড়ে ফেলো। ”
    আমি শুয়ে আছি। মাথায় একটা ভোঁতা ব্যাথা শুরু হয়েছে। ইয়াসমিন সুলতানা খচখচ করে লিখেই যাচ্ছেন। একটু থামছেন আবার লিখছেন। মিনিট পনেরো পরে, লেখা বন্ধ হলো। আমি বুঝতে পারছি, ইয়াসমিন সুলতানা উঠে চলে যাচ্ছেন। আমি চোখ মেললাম না।

    চলবে…

    7
    4 Comments
Skip to toolbar