-
#ধারাবাহিক
একমুঠো জোনাকি (পর্ব -১১)
~ আবির হাসান সায়েমবিকেলে আইনুল্লাহ এলেন। পানি ভরতি বালতি আর ঘর মোছার লাঠি নিয়ে ঢুকলেন। সাথে সাথেই পুরো ঘর ভরতি হয়ে গেলো -ফিনাইলের গন্ধে। আমি বলেলাম,
“কেমন আছেন?”
“ভালা আছি ভাই। আমার মাইয়্যাডারে আজকে নিয়ে আসছি। আপনে একটু দোয়া কইরা দেন। ”
আমি হেসে বললাম,
” আমি তো পীর -ফকির না। আপনার মেয়ে কোথায়?”
” মাইয়্যাডারে নীচে রাইখ্যা আসছি। মাইয়্যার সামনে ঘর মুছতে আমার কোনো কষ্ট নাই কিন্তু মাইয়্যাডা তো কষ্ট পাইবো। গরিব হইলে কি হইসে, আমাগোও তো মন আছে। ”
আইনুল্লাহ’র চোখ দুটি ছলছল করতে লাগল। সে ঘর মোঁছা শেষ করে বেড়িয়ে গেলন। খানিক্ষন পরে একটা ফুটফুটে মেয়েকে নিয়ে ঢুকলেন। মাথা ভরতি কালো চুল। একটা ফুলোয়ালা ফ্রক পরে এসেছে। খুব সুন্দর ফ্রেক। কোনো কোনো পোশাকে মানুষকে এতো মানায় যে মনে হয় পোশাকটা তার জন্যেই বানানো হয়েছে।
“ভাই এইডা আমার মাইয়্যা -খুকুমণি। ”
আমি হাতের ইশারায় বললাম, আসো। মেয়েটা এসে আমার বেডের পাশের টুলে বসল। আইনুল্লাহ সাথে সাথে চিৎকার করে বলল,
“এই বেয়াদব মাইয়্যা।ভাইয়ের পা ধইরা সালাম কর। ”
মেয়েটি আমার পায়ে’র কাছে যেতেই আমি পা গুটিয়ে নিয়ে বললাম, এই এই থামো থামো। এরপর আইনুল্লাহ’র দিকে তাকিয়ে রাগি গলায় বললাম, এইসব আমি পছন্দ করি না। দোয়া এমনেই করব।পা ধরার লাগবে কেনো?
আইনুল্লাহ খানিকটা নীচু গলায় বললেন, আমরা গরিব মানুষ। আমাগোর মন ছোট। কিন্তু আমরা গরিবরা ভালা মানুষের কদর করতে জানি। বড়লোকেরা তা করতে জানে না।
ফরিদ এতোক্ষন সোফায় বসে চুপচাপ নামতা পড়ছিলো। আইনুল্লাহ’র কথা শুনে বলে উঠল, একদম ঠিক কইসেন চাচা।
আইনুল্লাহ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মেয়েটা আবার টুলে এসে বসেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“তুমি কেমন আছো?”
“ভালো।আপনি কেমন আছেন? ”
“আমিও ভালো আছি। তোমার নাম কি?”
“আপনি তো অনেক বোকা। আব্বা না একটু আগে বললেন। ”
“ওহ হ্যা তাই তো। আমি তাহলে আসলেই বোকা। ”
মেয়েটা হিহি করে হাসছে। এই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই। নেই কোনো অভিনয়। এই প্রাচুর্যের পৃথিবীতে সবচেয়ে অভাব এই দূর্লভ জিনিস -নির্মল হাসি। অভিনয়ের হাসি হাসতে হাসতে, বাস্তব হাসির কথাই মানুষ ভুলে গেছে।
আমি বললাম,
“তুমি কোনো ক্লাসে পড়? ”
“ক্লাস ফাইভে। ”
“তুমি ছড়া বলতে পারো?”
“হ্যা পারি।”
“আমাকে একটা ছড়া শুনবে?”
“শুনাবো। কিন্তু কোনটা?”
” কি কি পারো তুমি? ”
” আমি হব,বীরবল, দেশদেশান্তর, ছুটি, শুভেচ্ছা….বাকিগুলা মনে নাই। ”
“তুমি হুমায়ুন আজাদের ‘শুভেচ্ছা’ কবিতা পারো?”
“হু পারি। গত বছর স্কুলের এক অনুষ্ঠানে আবৃতি করছিলাম। দ্বিতীয় হয়েছিলাম। ”
“আচ্ছা। তাহলে এইটাই শুনাও। ”
খুকুমণি দম নিয়ে শুরু করল।আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছি। মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে মেয়েটা আবৃতি করছে। আমি দেখলাম,ফরিদও মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।
শুভেচ্ছা –
লিখেছেন হুমায়ুন আজাদ
ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।
ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা
ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা
ভালো থেকো চর, ছোটো কুঁড়েঘর, ভালো থেকো।
ভালো থেকো চিল, আকাশের নীল, ভালো থেকো।
ভালো থেকো পাতা, নিশির শিশির
ভালো থেকো জল, নদীটির তীর
ভালো থেকো গাছ, পুকুরের মাছ, ভালো থেকো
ভালো থেকো কাক, ডাহুকের ডাক, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মাঠ, রাখালের বাঁশি
ভালো থেকো লাউ, কুমড়োর হাসি
ভালো থেকো আম, ছায়াঢাকা গ্রাম, ভালো থেকো।
ভালো থেকো ঘাস, ভোরের বাতাস, ভালো থেকো।
ভালো থেকো রোদ, মাঘের কোকিল
ভালো থেকো বক, আড়িয়ল বিল
ভালো থেকো নাও, মধুমাখা গাঁও, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মেলা, লাল ছেলেবেলা, ভালো থেকো।
ভালো থেকো, ভালো থেকো, ভালো থেকো।
আবৃতি শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমি আর ফরিদ তালি দিতে শুরু করলাম। আমি ভুলে গেলাম, আমার হাতে ক্যানোলার লাগানো। কই ব্যাথা করছে না তো। পরম সুখ শারীরিক কষ্টকে ভুলিয়ে দেয়। মেয়েটাও আমাদের সাথে হাত তালি দিচ্ছে। মেয়েটার চোখ জ্বলজ্বল করছে। আমি বললাম,
” খুব ভালো আবৃতি করেছো। খুব ভালো।ভেরি গুড। ”
ফরিদও বলল,
“হ, খুব ভালো। খুব ভালো ভেরি গুড। তয় ভাই, ওরে একটা ‘উপহার ‘দেয়া লাগে না?”
“হ্যা তাই তো।’উপহার’ তো দেয়া লাগে। ফরিদ দৌড়ে গিয়ে ছয়টা চকলেট নিয়ে আয়। ভালো চকলেট। ”
“ছয়ডা চকলেট কেন ভাই?”
” আমি তালি বাজিয়েছি তাই আমার একটা। তুই তালি বাজিয়েছিস আবার ‘উপহার’র কথা বলেছিস তাই তোর দুইটা। আর খুকুমণি সবচেয়ে কঠিন কাজটি করেছে তাই তার তিনটা। ”ফরিদ সাথে সাথেই উঠে গেলো। ফরিদের প্রস্থানের কিছুক্ষণ পর সেই বিশালবক্ষা নার্সটা ঢুকল।
“কেমন আছেন ভাই?”
“এইতো আপু আছি। ”
খুকুমণির দিকে তাকিয়ে নার্সটি বললেন,
“আরে খুকুমণি নাকি!কখন আসলা?”
“একটু আগে।”
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ভাইয়্যা আপনার এন্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন দেয়ার সময় হয়ে গেছে।”
“ওহ আচ্ছা।”
নার্সের এক হাতে ঔষধের প্যাকেট আরেক হাতে একটা ছোট্ট বাটি। বাটিটা আমার পাশের টেবিলা রাখতে রাখতে বললেন,
” আপনার জন্যে সামান্য একটু পায়েস রেধে আনসি। ”
” ভালো করেছেন। পায়েস আমার খুব পছন্দ। আপু আপনার নামটা কি?”
“জ্বি আমার নাম হাফসা।”
” আমি পায়েস অবশ্যই খাবো এবং অবশ্যই আপনাকে জানাবো কেমন হয়েছে খেতে। আমি আবার খাবারের বিষয়ে খুব খুতখুতে ৷ ভালো না লাগলে, মুখের উপর বলে দেই।”
হাফসা হাসতে হাসতে বললেন,
“আচ্ছা ঠিক আছে বলবেন। ”
এন্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশনের একটা কুফল হলো প্রচন্ড ঘুম আসে। ঘুমে আমার চোখের পাপড়ি ভারী হয়ে যাচ্ছে।
আমি ঘুম থেকে উঠি নি, আমার ব্রেন সচল হয়ে গেছে। আচ্ছা মেয়েটা কি চকলেট পেয়েছিলো? নাকি ফরিদ আসার আগেই আইনুল্লাহ মেয়েটাকে নিয়ে গেছে? অযথা চিন্তা করা ব্রেনের একটা বদভ্যাস।চলবে…
3 Comments
Friends
Sajibul Alam — সজীবুল আলম
@sajibulalambd
Jabed A Emon
@jabedaemongmail-com
মোঃ আবু মুনিফ আল মুকিম।
@munifalmukimrocky
বশির আহমদ
@bashir93
মীর অনাবিল
@miranabil
Maolana Abdullah al mamun
@smmamun21
স্মৃতি রানী রত্না
@srratna1990
Nipun Chandra
@nipunch
Pranto Sarkar
@pranto-sarkar


সুন্দর! খুব ভালো লাগল হুমায়ুন আজাদ এর মিষ্টি কবিতা “শুভেচ্ছা”। শুভেচ্ছা নেবেন লেখকবন্ধু।