-
( আগামী কাল গল্পটির শেষপর্ব প্রকাশ করা হবে)
ধারাবাহিক গল্প
:::::::::::::::::::::#জমশেদ আলীর মেহমানদারী
—— শাহ্ কামাল
(১৭)
জমুর হাঁস ছুটে যাওয়ার ঘটনা এখন টক অব দ্যা ফুলপুর। ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ, ময়-মুরুব্বীতে দিঘীর চারপাশ লোকারণ্য হয়ে গেছে।হাঁস ধরাধরির খেলা অনেকরই ভাল লাগছে। কেউ হাসাহাসি করছে, কেউ জমুর প্রতি সহমর্মিতা দেখাচ্ছে। গরীবের স্বপ্ন কী পূরণ হবে না। কতো মানুষ আসবে আজ। মান-ইজ্জত যায় বুঝি। মেহমান বাড়িতে এসে না খেয়ে গেলে অমঙ্গল হবে। মেহমান তো আল্লাহর অতিথি। নানান ভাবনায় অস্থির জমু। দিঘীতে হাঁস খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত জমু এসবই ভাবছে পানিতে দাঁড়িয়ে।
পাড়ে থেকে হা-হুতাশ করছে বাতাসার নানী,
– ওরে ও জমু। একটা হাঁস ধরতে এতক্ষণ লাগে তগো? কী হইবো রে……..
শফি হাঁস ধরার ছবি তুলছে ক্যামেরা দিয়ে। সে কাজের মানুষ। তার কাজ তো তাকেই করতে হবে। তাই সে ছবি তোলার কাজ সেড়ে রাখছে। সে এসেছিল গরীবের মেহমানদারীর খবর নিতে; এখন তাঁর হাতে নতুন খবর উঁকি দিচ্ছে।
গোলাপজামের লাউ রান্না শেষ। জমুর মেহমানদারীতে লাউ ছিল না। অভাবের হাত। হাঁসের মাংসে কূলোবে না বলে সে কুঁজো চিংড়ি দিয়ে লাউ রান্না করেছে। ভাত এখন রান্না করলে ঠান্ডা হয়ে যাবে। তাই পরে রান্না করবে। বারান্দার একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে সেও অপেক্ষা করছে হাঁস কখন ধরা পড়বে। মুখ বেজার করে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে চম্পা। সে মাকে জিজ্ঞেস করে,
– মা, আব্বা কখন হাঁস জবা দিবো? হাঁস ত ধরতে পারতাছে না।
– চুপ থাক।
ঘোমটার আড়াল থেকে রেগে চম্পাকে একটা ধমক দিয়ে গোলাপজাম ঘরের ভিতর চলে গেল। তাঁর ভেতর রাগের পাহাড় জমলেও সে প্রকাশ করতে পারছে না। জমুর উপর সে রাগলেও প্রকাশ করে না।
বাতাসার নানী জমুকে ডেকে বলে,
– জমুরে… ও জমু….
জমু পানি থেকে বাতাসার নানীর দিকে নজর দেয়।
কথা বলা শুরু করে বাতাসার নানী,
– আমি শীল বাড়ি থেইকা যাইয়া দুইডা হাঁস নিয়াহি? বেইল নাই ত..
জমু ভেজা শরীরে দিঘীর পাড় আসে। বাতাসার নানীর উত্তর দেয় সে,
– টেকা পামু কই। আমি তো বাকিতে কিছু কিনি না।
– পরে দিস। আমি লইয়াহি।
– তারা হিন্দু মানুষ। এত বড় মেহমানদারী করামু ওদের হাঁস দিয়া?
– এইডা কি কছ রে। সারা জীবন গেল এমন কথা তো হুনি নাই। হাঁসের কি হিন্দু মুসলিম আছে?
– তাও ঠিক। যাওয়ার দরকার নাই। দেহি এইডা ধরতে পারি কিনা।
জমু সাঁতরে দূরে চলে যায়। মোকলেস পাড়ে চলে আসে। শফির কাছে এসে সে বলে,
– স্যার আপনে থাকেন। জুমার দিন। আযান হইয়া যাইবো। চেয়ারম্যান সাব খুঁজবো আমারে।
শফি মোকলেসকে চলে যাবার ইশারা দেয়।
মোকলেস ঘোড়া নিয়ে চেয়ারম্যানের বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয়।
সময় পৃথিবীর ব্যস্ত এক জড়বস্তু। সে কারো কথা শোনে না। নিমেষেই চলে যায় চোখের পলকে। গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, জীব-জন্তু, নগর, সভ্যতা, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ঢেউ পড়ে থাকবে; শুধু সময় বসে থাকব না। সে তার গতিতে এগিয়ে যায়। সে বড়ই নিষ্ঠুর। যার যার উত্থান-পতন তাঁর নিয়তির বিধান; সময় বহমান। সে বয়ে যায়, কালের সাক্ষী হয়ে পড়ে থাকে ক্যালেন্ডারের পাতায়; ইতিহাসের পাতায় সে রেখাপাতের খসড়ার ট্যালি।
জমুর হাঁস ধরা হয়নি; তবে জানাজানি হয়েছে পুরো ফুলপুরে। জুমা’র আজান হচ্ছে, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার…..
বেলা গড়াতে গড়াতে দুপুরে এসে খাবি খেল জমু।
আজানের পর ইমদাদ উঠে যায়। চারিদিকে লোকজন কমতে থাকে। দিঘীতে দুএকটা ছোট বাচ্চা আর জমুকে ছাড়া কাউকে চোখে পড়ছে না। হাঁসটা ডুব সাঁতার দিয়ে সবাইকেই ক্লান্ত করেনি নিজেও মেলা হয়রান হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণায় দিঘীর পাড়ে বাঁশঝাড় আছে। ওখানে সাপ-গোপের ভয়ে কেউ যেতে চায় না। ওখানে গিয়ে নিরিবিলি শরীরের পাখ ঝারছে হাঁসটা। বাড়ি ঘরে কেউ নেই এখন। একে একে সবাই চলে গেছে।
জমু’র চেহারাটা বিষাদে ভরা। নানান ভাবনা তাঁর গিলুতে দৌঁড়ায়। মানুষজন আসলে কি এক্টা অবস্থা না যানি হয়। শুধু চিকন চালের গরম ভাত দিলে হবে কি করে। হাঁসের গোশত তো রান্না হয়নি। থাক, গোলাপজামের লাউ তো রান্না করাই আছে। কিন্তু বিষয়টা কেমন হলো? খোদাতায়ালা কি নারাজ তাইলে? না না, নারাজ হবে কেন? নারাজ হবার মতো কিছু হয়নি। সবই তাঁর ইচ্ছা। জমুর ভাবনা ক্ষান্ত হয় না। ভাবতে সে ভেজা লুঙ্গিতেই দিঘীর পাড়ে উঠে বসে। একটা কাজ করলে কেমন হয়? আগামী জুমায় আবার দাওয়াত দিলে কেমন হয়। নাকি মসজিদের মাইকে এলান দিয়ে দিমু।
জমুর শ্বশুর আসছে। মেয়ের বাড়ি। খালি হাতে তো আসা যায় না। হাতে একটা রসগোল্লার প্যাকেট। তাপস ময়রার রসগোল্লা গোলাপজামের পছন্দ। মেয়ের বাড়ি আসলেই তাপসের রসগোল্লা নিয়ে আসে। শ্বশুরকে দেখে উঠে দাঁড়ায় জমু।
সালাম দেয়,
– সালামালাইকুম, আব্বা।
– ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রহমতুল্লাহ। কি হুনলাম, বাজান? হাঁসটা ধরতে পারছো?
– হুনছেন ঠিকই। ধরতে পারি নাই। আব্বা আপ্নের শরীলডা ভালই?
– হ, আলহামদুলিল্লা ভালা।
বাপের গলার আওয়াজ গোলাপজামের কানে পৌঁছতেই গোলাপজাম বারান্দায় আসে। তাঁর মনটা ভাল হয় কিছুটা। শ্বশুরবাড়িতে বাপের পদধূলিতে সব মেয়ের মনেই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ে। চম্পা দৌড়ে যায় নানার কাছে। বারান্দায় বেজার মুখে বসে আছে বাতাসার নানী।
জমু শ্বশুরকে ঘরে যেতে বলে হাঁসের দিকে চেয়ে থাকে আশার দৃষ্টিতে। শফি জমুকে কিছু বলার জন্য কাছে ডাকে। অবশ্য কি আর বলবে এখন। সব তো ঘটে গেছে চোখের সামনেই। জমু কাছে এসে শফির দিকে তাকায়।
– হাঁসটা তো পেলেন না। মেহমানদারী করাবেন কি দিয়ে?
– স্যার, কপালে আছে তা দিয়াই করামু। আমি ত চেষ্টা করলাম। হাঁসটার মেলা শক্তি। আগে জানলে জোর কইরা ধরতাম।
– আচ্ছা। আমার কিছু প্রশ্ন ছিল।
– জুমা পরবেন না, স্যার? নামাজের পর জিগায়েন।
– আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে। আপনার সাথেই যাবো। আপনি রেডি হয়ে আসেন।
জমুর সাথে গোলাপজাম খারাপ ব্যবহার করে না। বাতাসার নানী হতাশ স্বরে জমুকে বলে,
– এইডা কী করলি জমু? হাঁসটাও ধরতে পারলি না। কিমুনডা অইব? মানিজ্জত থাকল না রে।
জমু কোন জবাব দেয় না। জুমার নামাজ আদায় করতে সবাই মসজিদের দিকে যাত্রা করে। জমুর শ্বশুর, জমু ও শফি।হাঁসটা মাঝ দিঘীতে সাঁতার কাটতে থাকে।(চলবে)
8 Comments
Friends
Rakib Rakib
@abdurrakib
Md Ashfak Sayed
@ashfak
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
আনোয়ার পারভেজ নূর শিশির
@anwar-parvez-nur-shishir
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Md.Emamuzzaman Wahedi
@emamuzzaman
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Foyzur Khan
@foyzur-khan
sanjida akter jim
@sanjidajim


অভিনন্দন