-
উচ্চতা সাড়ে চার ফুট
রানা জামানরবিউল হোসেন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র।সে পুলেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ছে।পুলেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়টা যশোর জেলার সদর থানায় অবস্থিত।আর রবিউল হোসেনের গ্রামের নাম ভাতুড়িয়া দাড়িপাড়া।রবিউল হোসেনের বয়স আনুমানিক পনেরো বছর।কিশোর।
উনিশ শ একাত্তর খৃস্টাব্দের মার্চ মাসে শুরু হয় স্কুলের ক্লাশে শুরু হয় অনিয়ম।বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণের পর আরো অনিয়ম বাড়তে থাকে।পচিশ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অপারেশন সার্চ লাইট শুরু হবার পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।কিশোর-তরুণ-যুবক-পৌঢ় বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে থাকে বাংলাদেশকে হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করার দৃঢ় শপথ নিয়ে।
আকাশ বাণী কলিকাতা ও বিবিসি’র সংবাদ, বাবা-চাচা এবং চারিদিকে আশেপাশের গ্রামে পাক হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের কথা শুনে রবিউলের মনে যুদ্ধে যাবার ইচ্ছা জাগে।আস্তে আস্তে ঐ ইচ্ছা প্রবল হতে থাকে।
একদিন রবিউল হোসেন বাড়িতে মা-বাবার কাছে বলেন, আমি যুদ্ধে যেতে চাই বাবা।
মা আঁতকে উঠে বলেন, না বাপ। তোর যুদ্ধে যাওনের কাম নাই।
বাবা বলেন, তুই ছোট মানুষ।তুই যুদ্ধে গিয়া কী করবি।রাইফেলই ধরতে পারবি না।
রবিউল হোসেন দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, রাইফেল ধরতে না পারলে অন্য অস্ত্র ধরবো।তবু আমি যুদ্ধে যাবো মা বাবা।তোমরা অনুমতি না দিলে আমি একদিন পালায়া যুদ্ধে চলে যাবো।
মা ছেলের কাছে এসে দুই হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, অমন কথা বলিস না বাপ।আমার এখনই কান্না পাচ্ছে।মা ফুপিয়ে উঠেন।
বাবা বলেন, দেশ স্বাধীন করতে হলে কাউকে না কাউকে যুদ্ধে যেতে হবে।তোর যুদ্ধে যেতে আমার আপত্তি নাই।কিন্তু তুই তো খুব ছোট।যুদ্ধে গিয়া কী করবি তুই?
আমি গ্রেনেড চালাবো বাবা।আরো বহু অস্ত্র আছে মা।আমাকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দাও তোমরা।
মা আকুল নয়নে বাবার দিকে তাকিয়ে রইলেন।বাবা মার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলেন।রবিউল হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলেন, ঠিক আছে।যা।কবে যাবি?
মা ভেজা কণ্ঠে বলেন, আপনি আমার দুধের বাচ্চাটাকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দিচ্ছেন? আপনি কী পাষাণ?
বাবা বলেন, যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বয়সের চাইতে সাহস দরকার। দেখো না, আমার বয়স ওর চাইতে কত বড়; কিন্তু আমার সাহস না থাকায় যাইতে পারতাছি না। আমার পোলার সাহস আমার চাইতে বেশি; তাই বয়স কম থাকা সত্ত্বেও সে যুদ্ধে যেতে চাচ্ছে।হে যুদ্ধে যাক।তুমি কেদে ওর মনটাকে নরোম করতে চাইও না রবিউলের মা।
কয়েক দিন পর এপ্রিল মাঝের মাঝামাঝি সময়ে গ্রামের ঈমান আলি, মোহাম্মাদ নুরু ও আরো কয়েক জন সহ রবিউলি হোসেন হেটে মণিরামপুর আসে। সেখানে অনেক শরণার্থি ছিলো। ওদের সাথে ইণ্ডিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করে সবাই।রাত হয়ে যাওয়ায় সাতক্ষিরা মহকুমার কলারোয়া থানায় একটি স্কুলে রাত কাটায় সবাই। পরদিন ইণ্ডিয়ার বশিরহাট মহকুমার হাকিমপুর সীমান্তে যায় সবাই।
ইণ্ডিয়ার বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স কাউকে কিছু না বললেও রবিউল হোসেনকে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কেনো এসেছো?
রবিউল হোসেন হিন্দি কিছু কিছু বুঝতে পারলেও বলতে পারে না। সে বাংলায় বলে, আমি যু্দ্ধ করতে এসেছি।
তখন ইণ্ডিয়ার বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স-এর সদস্যরা ওদের হাকিমপুর ক্যাম্পে নিয়ে যায়।ওখানে যশোরের রাজারহাট এলাকার আবুল হোসেন নামের একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি রবিউল হোসেনের কথা শুনে ছুটে আসেন।
আবুল হোসেন রবিউল হোসেনকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তুমি যুদ্ধ করতে চলে এসেছো।তুমি কি যুদ্ধ করতে পারবে?
রবিউল হোসেন দৃঢ় কণ্ঠে বলে, খুব পারবো ভাইয়া।আপনি আমাকে ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করে দেন।
আবুল হোসেন বললেন, ব্রেভো ব্রাদার! আজ বিকেলেই তোমাকে ট্রেনিং দেবো যাতে তুমি থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালাতে পারে।
রবিউল হোসেন অত্যন্ত খুশি হয়ে আবুল হোসেনকে জড়িয়ে ধরলো।আবুল হোসেনও হাসিমুখে রবিউলকে জড়িয়ে ধরলেন।ওর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন,ওকে ছোট ভাইয়া।এখন তাবুতে যাও।আর মন খারাপ করো না।ঠিক তিনটায় মাঠে চলে আসবে।ট্রেনিং হবে তোমার একার।আর ট্রেনার আমি। ওকে?
রবিউল হোসেন আবুল হোসেনের বুক থেকে সরে এসে বললো, ওকে ভাইয়া।
রবিউল হোসেনের মনে উত্তেজনা।অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ গ্রহণের উত্তেজনা।ও তাবুতে থেকে ছটফট করতে লাগলো।দুপুরে ও ভালো মতো খেতেও পারলো না।পৌণে তিনটা বাজতেই সে তাবু থেকে বেরিয়ে এলো।তিনটায় এলেন মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসে; কাঁধে একটা থ্রি নট থ্রি রাইফেল।শুরু হলো প্রশিক্ষণ।কয়েকবার দেখিয়ে দিতেই রবিউল হোসেন থ্রি নট থ্রি রাইফেল ধরা থেকে শুরু করে গুলি ছোড়া পর্যন্ত রপ্ত করে ফেললো।
আবুল হোসেন বললেন, তুমি থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালানো বেশ শিখে ফেলেছো।এখন কেমন শিখেছো তা দেখার জন্য আমার সাথে তোমাকে একটা যুদ্ধে যেতে হবে।
রবিউল হোসেন উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞেস করলো, অবশ্যই যাবো ভাইয়া।কোথায় ভাইয়া? কবে?
কলারোয়া সীমান্তে।আর ইউ রেডি?
ইয়েস ভাইয়া!
এক বেলার প্রশিক্ষণ নিয়ে রবিউল হোসেন আবুল হোসেনের সাথে কলারোয়া সীমান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন।
কিন্তু পরদিন নিয়মিত রিক্রুটিং-এর সময় রবিউল হোসেনকে উচ্চতা কম থাকায় বাদ দেয়া হয়। বাঙালিরা দৈর্ঘে কম থাকায় উচ্চতা পাচ ফুট রাখা হয়। কিন্তু রবিউল হোসেনের উচ্চতা সাড়ে চার ফুট হওয়ায় তাকে বাদ দেয়া হয়।
রবিউল হোসেনের মন খুব খারাপ হয়ে যায়।সে ক্যাম্পের এক কোণে চুপচাপ বসে থাকে।এ খবর আবুল হোসেনের কানে গেলে আবুল হোসেন খালেদ সহ আরো মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প ইন চার্জের কাছে ছুটে আসেন।আবুল হোসেন বলেন, রবিউল হোসেনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রিক্রুট না করলে আমরা কেউ যুদ্ধে যাবো না।
ক্যাম্প ইন চার্জ থমকে যান আবুল হোসেনের কথা শুনে।অনেক আলোচনার পর ক্যাম্প ইন চার্জ রবিউল হোসেনকে রিক্রুট করেন।
তখন রবিউল হোসেন আবুল হোসেনের কাছে এসে অশ্রুসিক্ত চোখে বললো, আপনাকে ধন্যবাদ ভাইয়া।
আবুল হোসেন জিজ্ঞেস করলেন, ধন্যবাদ দিচ্ছো কেনো রবিউল?
রবিউল হোসেন বললো, আপনি জিদ না ধরলে আমাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রিক্রুট করতো না ভাইয়া।
তা ঠিক।তোমার হাইটটা তো কম। সেকারণে ওদের সিদ্ধান্ত ঠিক ছিলো। কিন্তু তোমার অতি আগ্রহ আমাকে ওমন জিদটা করতে বাধ্য করেছে।তুমি আমার সম্মান রক্ষা করো ছোট ভাই।ভালো মতো ট্রেনিং নেবে আর প্রাণপণে যুদ্ধ করবে।
রবিউল হোসেন বললো, জ্বী ভাইয়া।আমি আপনার সম্মন অবশ্যই রক্ষা করবো।আমি মন লাগিয়ে ট্রেনিং নেবো এবং যুদ্ধ করবো প্রাণের মায়া ত্যাগ করে।
ওকে। এবার যাও।
রবিউল হোসেনকে সরাসরি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দিয়ে ৪২ দিনের উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য হাকিমপুর ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়।প্রশিক্ষক ছিলেন ক্যাপ্টেন ই. আর. আজম চৌধুরি, পুলিশ সুপার মাহবুব উদ্দিন আহম্মেদ ও ইণ্ডিয়ান সেনাবাহিনীর মেজর কাশ্মির সিং।হাকিমপুর ক্যাম্পে ৪২ দিন প্রশিক্ষণের পর রবিউল হোসেনকে পাঠিয়ে দেয়া হয় নদীয়া জেলার ইস্ট ইণ্ডিয়া ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
রবিউল হোসেন বহু যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন।সাতক্ষীরার ভাদিয়ালী সীমান্তের দীঘিরপাড়ে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে সংঘটিত ভয়াবহ যু্দ্ধে রবিউল হোসেন অংশ গ্রহণ করেন।এই যুদ্ধে বহু যোদ্ধা হতাহত হয়-১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং কমপক্ষে এক শ’ জন হানাদার সৈন্য নিহত হয়।
এ ছাড়াও রবিউল হোসেন ৫ ডিসেম্বর মেহেরপুর সীমান্তে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন।ঐদিন মুক্তিযোদ্ধারা রেকি করতে আসে সীমান্ত এলাকায়।তখনই এক ব্যাটালিয়ন পাকিস্তানি সেনা বাহিনী ৫০ থেকে ৬০টি সাজোয়া ট্রাক ও জিপে সজ্জিত হয়ে অতর্কিতে আক্রমণ করে।মুক্তি যোদ্ধারা প্রস্তুত থাকায় শুরু করে পাল্টা আক্রমন।শুরু এক ভয়াবহ যুদ্ধের।সারারাত যুদ্ধ চলে।প্রাণের মায়া ত্যাগ করে মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধ করতে থাকে।
অবশেষে পাক বাহিনী পরাজিত হয় ঐ যুদ্ধে।রবিউল হোসেন মুক্তিবাহিনীর প্লাটুন আত্মসমর্পণকৃত পাক বাহিনীর সদস্যদের পাকরাও করে ফেলে।
এর কিছুদিন পর দেশ স্বাধীন হয়ে যায়।4 Comments
Friends
Moniruzzaman Sarjil
@zaman2802
Jannatul Ferdous Ivy
@jannatul-f-ivy
Shadman-Shiam
@shadman-shiam
Md.Khaladur Rahman (অনল)
@wanol
অরিন্দম সাইফুল্লাহ
@arindam-saifullah
Shah Muhammad Alam
@smalam112
UTTAM KUMAR BISWAS
@uttamk
Md Suruzzaman Shohel
@suruzzaman
Sanwar Hossain
@sanwar


এমন অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের জানাই সালাম।
শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন লেখক।