Profile Photo

Shah KamalOffline

  • kuriparahs112384
  • Profile picture of Shah Kamal

    Shah Kamal

    4 years, 7 months ago

    ধারাবাহিক গল্প
    :::::::::::::::::::::

    #জমশেদ আলীর মেহমানদারী

    —— শাহ্ কামাল

    (শেষপর্ব)

    মসজিদে জুমা’র দিন আগে না গেলে জায়গা হয় না। ভিতর-বাহির মুসল্লীতে ভরপুর। সামনের খোলা জায়গাতে মাদুর বিছিয়েও বসেছে অনেকে। জমু শ্বশুরকে ভিতরে যেতে বলে,
    – আব্বা, আপনে ভিত্রে চইলা যান। ভাল্লাগবো।
    – নাহ। মানুষের গর্দান ঠেইলা যামু না। এইডা ভালা কাজ না। এনেই বইসা পরি।
    এ কথা বলে জমুর শ্বশুর দেরী করে না। বসে পরে। শফি আর জমুও বসে। সামনের সারিতে জমুর বরাবর বসেছে ইমদাদ। পিছনে ফিরে সে জমুকে চুপিরাসে জিজ্ঞেস করে হাঁসটা শেষ পর্যন্ত ধরতে পেরেছে কিনা। জমু মাথা নেড়ে জানিয়ে দেয়, না।
    নামাজ শেষে জমু দেরী করে না। বাড়ি চলে আসে। সাথে সাথে ইমদাদও আসে। বারান্দায় মাদুর পাতা হয়েছে। কিছু নেক ঘরেও বসতে পারবে। অবশ্য অনেকে জানে জমু’র হাঁস জবাই হয়নি। ও গরীব মানুষ। অন্য কোন ব্যবস্থা করেছে কিনা এমন কথাও ভাবছে কেউ কেউ। অনেকে আসবে না বলে ভাবছে। এক্টা সমস্যা হয়েছে তাতে কী? তাঁর বাড়িতে এক ঢোক জল খেয়ে আসলেও সে খুশি হবে— এ ভাবনা থেকে এসেছে অনেক জন। তাদের বসতে দিতে ব্যস্ত হয় জমু-ইমদাদ।চেয়ারম্যান সাহেব এসেছেন। তিনি গ্রামের মাথা। না আসলে মন্দ দেখায়। ঘোড়াটা বাড়ির পাশে বেঁধে মোকলেসও আসে। মৌলভী সাহেবও চলে এসেছেন। আসতে আসতে প্রায় বিশ-পঁচিশ জন মানুষ এসেছে। বারান্দার একটা পাশে গেদু পাগলা বসে আছে। বরুন, আজমত,
    কবিরাজ ডাক্তার, দাদন মিয়া, তোতা মিয়া, কাদির মিয়া,কালা আজগর, কাসু দাদা, হরিহর, আকরাম খাঁ আর ছিদ্দিক মিয়াকে দেখে জমু খুশি হলেও তাঁর মুখে প্রফুল্লতা নেই।
    খানদানি চেয়ারে বসেছে চেয়ারম্যান। পাশে শফি। চেয়ারম্যান জমুকে সান্ত্বনা দেয়,
    – হাঁস ধরতে পারো নাই এতে মন খারাপের কিছু নাই। আল্লাহ যা করেন ভালর জন্যই করেন। হুজুর কি বলেন?
    বারান্দা হতে মৌলভী সাহেব জবাব দেয়,
    – আল্লাহর ইশারা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। আল্লাহপাক যা করেন বান্দার মঙ্গলের জন্যই।
    জমুকে কাছে ডেকে ফিসফিসিয়ে চেয়ারম্যান জিজ্ঞেস করে,
    – এনাগো খাওয়ানোর ব্যবস্থা আছে?
    – চম্পার মা লাউ রান্না করছে।
    – আলহামদুলিল্লা। চলবে। যাও তুমি।বস যাইয়া।
    চেয়ারম্যান মৌলভীকে দোয়া করতে বলে। দোয়া শেষে গরম ভাত আর লাউ তরকারি দিয়ে শেষ হয় জমুর মেহমানদারী। সরল ভঙ্গিতে জমু সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে,
    – আমি আপনাগো কষ্ট দিলাম। ভালা কইরা মেহমানদারী করাইতে পারলাম না।
    জমুর কথা শেষ না হতেই দু’হাত উঁচিয়ে হ্যাৎ মাওলা! বলতে বলতে গেদু পাগলা চলে যায়।
    – আপ্নেরা ত সবোই জানেন। কিছু মনে নিয়েন না।
    এ কথা বলে জমুর কথা শেষ হয়। একে একে সবাই সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। জমুকে সান্ত্বনা দেয়। ইমদাদ পান সুপোরী এনে দেয় মেহমানদের। ধীরে ধীরে মেহমান চলে যেতে থাকল। যাবার সময় দিঘীর জলে চোখ পড়ে সবার।
    বিশাল দিঘীতে হাঁসটা সাঁতার কাটছে।
    বারান্দায় বসে আছে কালা আজগর আর জমুর শ্বশুর। চেয়ারম্যান যায়নি এখনো। শফি বসে আছে জমুর সাথে কথা বলার জন্য। চেয়ারম্যান তাকে বলে,
    – চলেন যাই। আর ত কাজ নাই।
    – কী বলেন! আমি তো নিউজই নিলাম না।
    – চিকন চালের গরম ভাত আর হাঁসের গোশত দিয়া মেহমানদারী হয় নাই। তাইলে নিউজ করবেন কিসের?
    – চেয়ারম্যান সাহেব। আমি সাংবাদিক। নিউজ করতে এসেছি; করব। চিকন চালের গরম ভাত আর হাঁসের গোশত দিয়া মেহমানদারী হয় নাই তো কি হয়েছে? জমু ভাইয়ের স্বপ্ন ভঙ্গের নিউজ করব আমি। আপনি যান। মোকলেসকে রেখে যান।
    – ঠিক আছে।আপ্নে থাকেন। মোকলেসের সাথে আইসেন।
    মোকলেসকে রেখে চেয়ারম্যান চলে যায়। শফিকে কাছে ডাকে শফি। উঠোনে পা রেখে এক্টা খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে জমু।
    ঘরের ভেতর খাটে বসে গোলাপজাম ফুপিয়ে কাঁদছে। জমুর জন্য তাঁর মনটা কাঁদছে। পাশে মায়ের সাথে হেলান দিয়ে বসে চম্পা।বাতাসার নানী বোঝায় গোলাপজামকে,
    – এমন করিস না বইন। কি করবি সব ত উপরওলার ইচ্ছা।
    শফি জমুকে প্রশ্ন করে,
    – আচ্ছা জমু ভাই, আপনি গরীব মানুষ। এতোগুলা মানুষের মেহমানদারী করাতে ইচ্ছা হলো কেন?

    শফির প্রশ্ন শুনে জমুর মনটা কেমন যেন বেতালা হয়ে উঠে। মনের অজানা গহিনে চাপ লাগে তাঁর। কী একটা চাপা কষ্ট বারবার তাড়া করে তাকে। মানুষের হাজার ভাবনা, হাজার বাসনা। সব কী পূরণ হয়? হয় না। তবুও মানুষ স্বপ্ন দেখে; মানুষের আশার শেষ নেই। জমুর মনেও স্বপ্ন ছিল। সে বড়ো স্বপ্ন দেখে না। সে জানে এ দুনিয়া বেশি দিনের নয়। টাকা পয়সা কিছুই না; আবার সব কিছু। তবে চাহিদার মাপকাঠিতে টাকার উঠা নামার গল্প নেই তাঁর জীবনে। আকাশের দিকে চেয়ে চোখে পানি জমে তাঁর। বিরবির করে কিছু বলতে চায় সে। ইমদাদ, শফি তার দিকে তাকিয়ে আছে। জমুর চোখের কোণে পানি জমেছে। চাপা কষ্টে যেমনটা হয়। সে বিরবির করে বলে,
    -ছোট বেলা বাবা মরছে। বাবার কোন আদর পাই নাই। কয়েক বছর আগে মাটাও আমারে ছাইড়া চিরদিনের জন্য গেছে। আমি অধম সন্তান। মা-বাবার লাইগা দুইডা হুজুর ডাইকা দোয়া করাইতে পারি নাই। অনেক লাখ লাখ টেকা খরচ করে। আমি গরীব। আমি ক্যামনে করমু? তয় মনডায় চায়। পারি না। কয়দিন আগে বাবারে খোয়াবে দেখছি। আমার বাবা কষ্টে আছে; মেলা কষ্টে। হের লাইগা চাইছি ময়-মুরব্বীদের মেহমানদারী করাইতে।সব আল্লার ইচ্ছা। গোশত দিয়া হয় নাই; এই আর কি! সবার সব আশা পূরণ হয় না।
    জমুর চোখ বেয়ে জল গড়ায়। তাঁর কথাগুলো গোলাপজামের দিলে লাগে। ও ফুপিয়ে কাঁদে। বাতাসার নানী চুপ হয়ে যায়; তাঁর চোখেও পানি। ইমদাদ চুপচাপ জমুর পাশে বসে। শফির কলম চলছে।
    কালা আজগর মনটা খারাপ করে উঠে যায়। তাঁর গলায় গানের সুর,

    দুই দিনের দুনিয়াদারী
    আছে যত বাহাদুরী
    ভবে কিছুই তো রবে না
    আশা পূর্ণ হবে না……….

    দিঘীর জলে সাঁতার কাটছে জমুর মেহমানদারীর হাঁসটা।

    সমাপ্তি

    12
    9 Comments
    • যেমনটা গতকাল বলছিলাম সুন্দর গল্প শেষ করলে আমার এমনিতেই মন খারাপ লাগে। কারন ভালো লাগার একটি ধারা ব্যহত হয়। আর এই গল্পের শেষে এমনিতেই একটা মন খারাপ দিয়ে দিয়েছেন লেখক। তাই লেখকের কাছে নতুন গল্পের আবদার রইল।
      “জমশেদ আলীর মেহমানদারী” গল্পের সাথে গ্রাম বাংলার মানুষের সারল্য বেশ মুগ্ধ করেছে আমায়। অভাব অনটনের মাঝেও সবার এক সুবিশাল হৃদয়ের অকৃত্রিম আন্তরিকতা আমার মনকে উদ্বেলিত করেছে। সবার পাতে ঐ একটি হাঁসের মাংস দিলেও আমার ব্যক্তিগতভাবে ততটা আনন্দ হত না যতটা জমুর হাঁসটির মুক্ত ভাবে দীঘির জলে ভেসে বেড়ানোর দৃশ্য কল্পনা করে লাগছে। ভালো থাক জমু, ভালো থাক জমুর হাঁস, ভালো থাক জমুকে ঘিরে থাকা প্রতিটি মানুষ। শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন লেখক।

    • সুন্দর একটা গল্পের দারুণ সমাপ্তি। সরল জামশেদ মিয়াকে মিস করবো। সামনে আবার এমন কিছু লিখবেন আশা করি।

    • অনেক অনেক অভিবাদন, শাহ কামাল। উপন্যাস লেখা মুখের কথা নয়। আমাদের গ্রামকে, সনাতন জীবন ধারাকে তুলে ধরলে। যুগ যুগ এই লেখা বাঙ্গলার পাঠকগন পড়ুক, এই কামনা করি।

    • সুন্দর হয়েছে। আপনাকে ধন্যবাদ

    • ধন্যবাদ ও অভিনন্দন একটা ভাল লেখা উপহার দেয়ার জন্য।

    • আপনাকে অভিনন্দন

    • সুন্দর লেখা। ধন্যবাদ

    • শুভেচ্ছা !

Skip to toolbar