Profile Photo

স্মৃতি রানী রত্নাOffline

  • srratna1990
  • পাঁচ টাকার আমড়াওয়ালা
    – স্মৃতি রানী রত্না
    বর্ষা প্রায় শেষ, শরতের আগমন, তপ্ত দুপুর বিষন্ন মন। সাই সাই করে দক্ষিন দিকে দৌরে চলছে বাস। সবাই নিস্তব্ধ, মাঝে মাঝে দু’একটি শিশুর কান্নার শব্দ। প্রচন্ড গরমের মাঝেও একটু একটু ঝিরঝিরে বাতাস। চোখের পাতা মিলিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ একটা অন্যরকম শব্দ, “আমড়া লাগবো আমড়া”। গাড়িটা লেবুখালি ফেরিতে চলে এসেছে। চারিদিকে হকারদের চিৎকার চেচামেচিতে সবাই জেগে উঠলো। কেউ গাড়ি পাল্টাচ্ছে, কেউ খাবার কিনছে, আবার কেউ পত্রিকা পরছে। কেউ কেউ গাড়িথেকে নেমে ফেরিতে ঘুরছে। আমি ছিলাম বাসের বাম পাসের সামনের সিটে বসা। সাথে আমার ছেলে ও স্বামী। আমারও কেমন অসস্তি লাগছিল। তাই ওনাকে বললাম ঠান্ডা কিছু আনতে। সবাই নেমে পরল। কয়েকজন মাত্র গারিতে ছিল। সেই আমড়াওয়ালা, বয়স ওর ৯ কিংবা ১০। হয়ত পেটের তাগিদে ওকে কলমের বদলে তুলে নিতে হয়েছিল আমড়ার থালা। সমাজে অনেক আছে , যাদের সম্পদ খাবার লোকের অভাব। আমরাকি পারিনা, তার থেকে সীমিত কিছু অসহায় দরিদ্র লোকের জন্য বিলিয়ে দিতে? পারি কিন্তু দেবনা ,কেননা যার আছে সে আরো চায়। এটাই আমাদের সমাজের মানুষের নিয়ম। আমার ভালো লাগছিলোানা তাই ওর কাছ থেকে ৫ টাকার আমড়া নিলাম এবং টাকাও দিয়ে দিলাম। আমার মত অনেকেই নিল। যদিও তেমন একটা ভালো লাগেনি তবুও খেলাম। ওই ছেলেটাও অনেক আমড়া বিক্রি করল। ফেরি ওপার থেকে আসতে একটু দেরি তাই গাড়ি ঘাটেই দাড়িয়ে আছে । আমার ঠিক বিপরিত পাসে একজন ভদ্রলোকও ওর কাছ থেকে আমড়া নিল। “দেতো বেটা ৫ টাকার আমড়া আরাম করে খাই।” বয়স তার ৪২ কি ৪৮ হবে। সাথে বোরখা পরা এক মহিলা । ওনার কি হয় তা সঠিক বলতে পারবোনা। আমি একটু আনমনা ছিলাম কেননা, গাড়ি থেকে দেখতে পেলাম মাধ্যমিক লেভেলের দুই ক্লাসমেট। হাত নেরে ওদের সাথে কথা বললাম, কোন গাড়িতে আছে জানতে চাইলাম, পরে দেখলাম ওরা আমাদের গাড়িতেই আছে। ওরা আমার জন্য চানাচুর নিয়ে এলো। এরি মাঝে গাড়ি ফেরিতে উঠে গেল। হঠাৎ শুনতে পেলাম স্যার আমার টাহাডা দেন আমি নাইম্যা যামু (স্যার আমার টাকাটা দেন আমি নেমে যাব)। মাথাটা মোর ঘুরিয়ে দেখতে পেলাম সেই আধা পাকা লোকটি, যিনি খুব আরাম করে আমড়া খেতে চেয়েছিল। ছেলেটি হাত পেতে আছে , কিন্তু লোকটির কোন প্রতিক্রিয়া নেই । সে আনমনে বসে পাসের মহিলার সাথে কথা বলছে আর আমড়া খাচ্ছে। ছেলেটা আবার চাইল স্যার ফেরিটা ছেরে দেবে আমি নেমে যাব, আমার টাকাটা দিয়ে দেন । বার বার সেই লোকটির কাছে হাত পেতে টাকা চাইছে। অথচ লোকটি মুচকি মুচকি হাসছে। মনে হচ্ছে তার কাছে কেউ ভিক্ষা চাইছে। ওদিকে ফেরি ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। লোকটির হাতে এখনো দু-এক টুকরো আমড়া আছে। ছেলেটি এবার মিনতির সুরে বলল‘ “স্যার হুধা ৫ টাহাতো দেননা স্যার” আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। লোকটি ওকে ধমক দিয়ে বলল এই বেটা এখান থেকে ভাগ, কিসের টাকা, তোর আমড়া তো ভালো না । এই নিয়ে নে তোর আমড়া । বলে হাতটা ওর দিকে বাড়িয়ে দেয়। তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে বিরবির করে কিযেন বলল। ছেলেটা অসহায়ের মত সকলের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। চোখ দুটো ওর ছলছল করছিল। মুখটা শুকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। হয়ত আর একটু হলে ও কেঁদেই ফেলবে। কিন্তু কারো কোন সারা এলোনা। আবার ডাক দিল আমড়া লইবেন আমড়া। ততক্ষনে ফেরি ছেরে দিয়েছে। আমার পাসের সিটে বসা ছিল আমাদের এলাকার এক পরিচিতু ভাই। সেও ঘটনাটা দেখছিল। তবুও আমি তাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলাম ।“ ভাই দেখুননা লোকটি আমড়া খেল অথচ টাকা দিচ্ছে না । কিন্তু তার ও কোন প্রতিক্রিয়া দেখলামনা। ছেলেটা আবার পিছন থেকে ঘুরে এসে বলল দেন স্যার টাকাটা । লোকটি বলল টাকা নেই , এক টাকা আছে নিবি? আমি আমার স্বামীকে ডেকে দেখালাম। বললাম লোকটিকে চেনো? সেও অনেকক্ষন তাকিয়ে দেখলো এবং বলল চিনিনা থাক ওসব দিয়ে আমাদের দরকার নাই এই বলে সে সোজা হয়ে বসল। এসময় অনেক লোকই তাকিয়ে আছে কিন্তু কেউই কিছু বলছেনা। ও অসহায়ের মতফ্যাল ফ্যাল করে সবার দিকে চাইছে। কিন্তু দেখলো যে এখানে তার আপন বলতে কেউ নেই। যা করতে হবে নিজেকেই করতে হবে। শক্তিতেও কাটিয়ে ওঠা যাবেনা। তাছারা বয়সেও ওনার থেকে ছোট। তখন আবার অন্যায় হয়ে যাবে। নিদারুন এই সমজে ওর পক্ষে কেউ না থাকলেও বিপক্ষে আছে অনেক। সবাই নির্বাক শ্রোতা হয়ে দেখছে। লোকটি সবার তাকানো দেখে ছেলেটার প্রতি ক্ষিপ্ত হলো। এই যাবি, না ধাক্কা মেরে গাড়ি থেকে বের করে দেবো। ওর চোখ গড়িয়ে জলপরতে লাগলো। আমার ভেতরটা কষ্টের আঘাতে দুমরে মুচরে যাচ্ছিল। কিযে কষ্ট হচ্ছিল আমার তা বলে বোঝাতে পারবোনা। আমার ইচ্ছে হয়েছিল লোকটির গালে কষে এক ঘা বসিয়ে পাঁচ টাকা উসুল করেনেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার ওর জন্য কিছুই করতে পারলামনা। পারিনি ওর অধিকার আদায় করতে, পারিনি ওর অপমানের বদলা নিতে আর না পেরেছি পাঁচ টাকা দিয়ে ওকে শান্তনা দিতে। এই পরিস্তিতিতে কি করবো আমি ভেবে পাচ্ছিলামনা। সমাজে এখনো এমন নর পিচাশ, শোষক, নিষ্ঠুর ও অবিবেচক লোক আছে? যাদের শোষণের স্বিকার এই দুর্বল অবাঞ্ছিত কোমল স্বভাবের মানুষগুলো। কিন্তু এরা কি কখনো ভাবে আল্লাহ সকল ক্ষমতার মালিক, তিনি যখন যা খুশি তাই করতে পারেন। এমনওতো হতে পারে ঐ ছেলেটার কাছেই হাত পাততে হবে ওনাকে। ভাবতে চোখে জল এসে যায়। কেউ কেউ আবার এটা নিয়ে হাসি তামাসাও করছিলো । বলল কি বেহায়া! ৫ টাকার জন্য কেমন করছে। আমি তখন একটা প্রতিবাদ করেছিলাম, বললাম ৫ টাকা দিয়ে দিলেইতো হয়। অনেকে বলে তার কাছে হয়ত টাকা নেই । কিন্তু না, এটাও তার একটা স্বভাব বলতে হবে। কারন সেটাও আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম। যখন লোকটি বুঝতে পারলো সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে তখন সে উঠে ফেরিতে নামলো, ছেলেটিও তার সাথে সাথে নামলো। সেখানে নেমে সে দশ টাকার একটা নোট বের করল । আমি ভাবলাম এবার তাহলে টাকাটা দেবে । ছেলেটির মুখেও হাসির রেখা জেগে উঠলো। কিন্তু ধারনা ছিল উল্টো। লোকটি টাকাটা হাতে নিয়ে চানাচুরওয়ালাকে বলল ১০ টাকার চানাচুর দাওতো। আর ছেলেটার সাথে তামাসা করে, টাকাটা ওর কাছে নিয়ে বলে টাকা নিবি? ছেলেটা হাত এগিয়ে দেয়। লোকটি হাত সরিয়ে ফেলে। এভাবে দু-তিন বার অভিনয চলল। ছেলেটি বুঝতে পারলো, শেষ বারেরমত চোখ মুছতে মুছতে বলে টাকাটা দেন স্যার। এই বলে ওপিছন দিকে চলে যেতে লাগলো। লোকটি আবার বলল টাকা নিবিনা? ছেলেটি পিছন ফিরে তাকিয়ে বুঝতে পারলো, টাকা দিবেনা এটাও তার তামাসা! তাই চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল। আমার মনে হলো এ পৃথিবীতে শুধু ও নয়, যারাই দরিদ্র , অসহায় তাদের আপন বলতে কেউ নেই। আমাদের সমাজে অনেক জনদরদি আছে কিন্তু ওদের পাশে দারানোর মত কেউ নেই। অনেক সমাজ সেবক আছে, যারা শুধু মুখে বলেই শান্ত। আধা পাকা লোকটার খোজ নিলেও হয়ত যানা যাবে সেও এ সমাজের বড় একজন সমাজ সেবক। এমন অনেক লোক আছে , অনেক আইন আছে যারা টাকার কাছে সত্যকে বিসর্জন দিতে কুন্ঠা বোধ করেনা। এমন অনেক লেখক আছে যারা, সমাজের টাকাওয়ালাদের গল্প সাজিয়ে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য করে লিখে দেয়। কেননা তারা তার লেখার মূল্য দিতে পারবে বলে। সামান্য এই আমড়াওয়ালা কি পারবে কোন কিছুদিতে? এসকল ঘটনাকে তারা সামান্য ভেবে ফাক ফোকরে ফেলে রাখতে চায়। কোন ফটোগ্রাফারের ক্যামেরায় কখনোকি এটা ধরা পরে? এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কখনোকি আদালতে মামলা হয়েছে? হয়নি! দরিদ্র অসহায়দের জন্য কোন আইন নেই , কোন মামলা নেই, কোন প্রতিবাদ নেই । নিজেকে আজ মানুষ বলে পরিচয় দিতে লজ্জা হয়। সৃষ্টি কর্তার কাছে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়, কি দরকার ছিল এই মানুষের, যারা মানুষকে মানুষ বলে মনে করেনা। কি দরকার ছিল এতসুন্দর এই মানব জীবনের, যদিবা মানুষের উপকার করতে পারলামনা। কি আর করবো আমিওযে অসহায় । কেইবা শুনে আমার কথা। সমাজে তার কথাই সবাই, শোনে যার ক্ষমতার দাপট আছে, যার টাকা আছে। সবাই তো মানুষ , সবারি সুন্দর ভাবে বেচে থাকার অধিকার আছে । কিন্তু তা কেন হয় না? এই মানুষ এতো সহজ আবার এই মানুষই কত কঠিন। সুন্দর এই পৃথিবীতে কত ব্যভিচার, অন্যায়, অত্যাচার। সবলেরা দুর্বলের উপর অত্যাচার করে। নির্যাতনের যাতাকলে পিষ্ঠ হচ্ছে সমাজের হত দারিদ্র মানুষগুলো । যা আইয়ামে জাহেলিয়া যুগের বর্বরতাকেও হার মানায়। কি আর করার । মানতে না চাইলেও মেনে নিতে হবে। আমিও চোখ কান বন্ধ করে এরিয়ে গেলাম এতোবর অমানবিক পাষন্ডকর ঘটনা। এ ছারা আরকোন উপায় ছিলনা আমার। যাই হোক, আর দেখাগেলোনা সেই আমড়াওয়ালা ছেলেটিকে। গারি ফেরি থেকে উঠে আবার চলতে লাগলো। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা এলো । আমরা বাড়ি পৌছালাম, একটু ঘুমাতে চাইলাম কিন্তু ঘুম আসছিলনা। কেবলই ওর চোখের জল আমাকে ভাবিয়ে তোলে । আফসোস ওর জন্য কিছুই করতে পারলামনা। ধন্যবাদ জান্ইা তোমাকে খোদা , দরিদ্র, অসহায় দের তুমি আর কিছু নাদিলেও একটা বিশাল মন দিয়েছ আর সেই মনে দিয়েছ অসিম ধৈর্য। কেননা যার এত টাকা সে ওর কাছে ৫ টাকা দিতে পারলোনা। কিন্তু ওর কিছু নেই তবুও ৫ টাকা মাফ করে দিল। তাহলে বলা যায়, গরিবের আর কিছু না থাকলেও তাদের বিশাল একটা মন আছে। তবে সৃষ্টি কর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা, ও মাফ করলেও তুমি মাফ করোনা। ওই কচি হাত যদি তোমার কাছে কিছু চায় তুমি তা ফিরিয়ে দিওনা। ওর মনের চাওয়া খোদা তুমি কবুল করে নিও। আর ওর কসুর যেন তুমি কখনো মাফ করোনা।

    16
    14 Comments

স্মৃতি রানী রত্না

Teacher and writer

নামের ‍উপরে ক্লিক করুন Facebook: স্মৃতি রানী রত্না

নামের ‍উপরে ক্লিক করুন Email: SERETY RANY RATNA

ঠিকানায় ‍উপরে ক্লিক করুন All time address: CH94+WXC, বাউফল

Skip to toolbar