-
একজন আহত মুক্তিযোদ্ধার কথা
রানা জামানমসজিদে আযান শোনার সাথে সাথে মুসলেমা বিবির ঘুম ভেঙে যায়। সেদিনও তাই হলো। তখন দেশ ব্যাপি মুক্তিযুদ্ধ চলছিলো।দেশের মানুষেরা একটা ভয়ের মধ্যে কাল কাটাচ্ছিলো।
মুসলেমা বিবি একটি ছোট্ট কুড়েঘরে একা থাকেন। স্বামী মারা গেছে বহু বছর হলো। কোনো সন্তানও নেই। পাঁচ কাঠা জমি আছে। এই জমি বর্গা দিয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে তার দিন চলে যায়।
মুসলেমা বিবির কাজ বলতে নিয়ম মেনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা আর বাকি সময়টা আল্লাহ তাআলাকে ডাকা।
মুসলেমা বিবি স্বভাবসুলভ আস্তে আস্তে হেঁটে বাড়ির পেছনে বয়ে যাওয়া নদী ফুলেশ্বরীর দিকে যেতে থাকেন।বাড়ির সামনে কোনো পুকুর না থাকায় গোসলসহ অন্যান্য কাজের জন্য মুসলেমা বিবি ঐ নদী থেকে পানি এনে ওযু করে ফজরের নামাজ আদায় করেন। এটা তাঁর অভ্যাস। একটি পিতলের লোটা হাতে নিয়ে ঘরের ঝাপ খুললেন মুসলেমা বিবি। ঘরের বাইরে এসে ঝাপটা আটকে দিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। ধ্রুবতারা জ্বলজ্বল করছে আকাশের পূর্বকোণে। ফর্সা হয়ে আসছে আকাশ; সুবেহ সাদেক। গুটিগুটি পায়ে হেঁটে মুসলেমা বিবি চলে এলেন নদীর পাড়ে। আশেপাশে কেউ নেই। এ ধরনের আলোআঁধারিতে মুসলেমা বিবির ভয় করে না।
নদীতে কোনো ঘাট নেই। এক জায়গা দিয়ে মুসলেমা বিবি সবসময় নদীতে নামেন। তিনি ঐ জায়গায় এসে দাঁড়ালেন। নিচে নামতে যাবেন, তখন অদূরে একটা কিছু দেখে দৃষ্টি আটকে গেলো ওর। তিনি পায়ে পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেলেন। কাছাকাছি গিয়ে জিনিসটা দেখে চমকে উঠলেন। বুকটা তাঁর ধড়ফড় করতে লাগলো। একটা মানুষের লাশ। উপুর হয়ে আছে। কী করবেন তিনি বুঝতে পারছেন না। হঠাৎ ওঁর ভয় করতে লাগলো। তিনি হাতের লোটা ফেলে বাড়ির দিকে দৌড়াতে লাগলেন।মুসলেমা বিবি বাড়িতে ঢুকে হাঁপাতে লাগলেন। আশেপাশের বাড়িতে তখনো কেউ জাগে নি। তিনি পশ্চিম দিকের বাড়িতে ঢুকে শোবার ঘরের বারান্দায় উঠে দরজায় একবার টোকা দিলেন।
সাথে সাথে শরীফ আহমেদ সাড়া দিলেন, কেডা? কী হইছে?
মুসলেমা বিবি ভীত কণ্ঠে বললেন, দরজা খুলো বড় মিয়া। জরুলি দরকার!
শরীফ আহমেদ দরজা খুলে চৌকাঠের উপড় দাঁড়ালেন। গায়ে হাতাওয়ালা সাদা গেঞ্জি। জিজ্ঞেস করলেন, কী চাচি? এতো সকালে কী কাম? চোরে সিং কাটছে নাকি?
মুসলেমা বিবি কণ্ঠ নামিয়ে বললেন, নদীর পাড়ে একটা লাশ দেইখা আইছি!
চমকে উঠে শরীফ আহমেদ বললেন, কী কও চাচি? হাছা কইতাছো? নাকি কোনো গাছের ঠোমরে লাশ মনে করছো?
নাগো বড় মিয়া। আমি ঠিক লাশই দেখছি।
মনে হয় কোনো মুক্তিযোদ্ধার লাশ। পাক বাহিনী মাইরা নদীত ফালায়া দিছে। তুমি কাউরে কিছু কয়ো না চাচি। আমি যাইতাছি।তুমি ঘরে যাও।
মুসলেমা বিবি ঘরের দিকে গেলেন। আর শরীফ আহমেদ গোমস্তা রশীদকে সাথে নিয়ে ছুটলেন ফুলেশ্বরি নদীর দিকে। তখন পূর্বাকাশ লালচে, দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে।শরীফ আহমেদ সহজেই লাশটাকে খুঁজে পেলেন। তিনি নেমে গেলেন নিচে। লাশটাকে উল্টে বুকে কান ঠেকালেন। এবং চমকে উঠে রশীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, বুকের ভিতরে দিলটা ধড়ফড় করতাছে রে রশীদ! অহনো জেতা আছে!
রশীদ বললো, কী কও তুমি চাচা?
শরীফ আহমেদ বললেন, তুই বুকে কান লাগাইয়া দেখ!
শরীফ আহমেদ একটু সরে দাঁড়ালেন এবং রশীদ লোকটির কাছে গিয়ে বুকে কান ঠেকিয়ে চমকে উঠে শরীফ আহমেদের দিকে তাকিয়ে বললো, হ চাচা।বুকে অহনো জান আছে! কী করবাইন অহন?
লোকটা মুক্তিযোদ্ধা। দেশের জন্য যুদ্ধ করতাছে। আমি তো যুদ্ধে যাইতে পারি নাই। এই মুক্তিডারে চিকিসসা দিয়া সুস্থ করতে হইবো। তয় খুব সাবধান। কামডা গোপনে করতে হইবো এবং ঘটনাডা গোপন রাখেতে হইবো। রাজাকাররা টের পাইলে এও শেষ, আমরাও শেষ হয়া যায়াম। মনে থাকবো কথাডা?
মনে থাকবো চাচা।
তাইলে অহন এই মুক্তিডারে কান্দে উঠায়া তাড়াতাড়ি বাড়িত চল। মানুষ দেখলে বিপদ বাড়বো।
শরীফ আহমদে আহত মুক্তিযোদ্ধাকে বাড়ি নিয়ে এলেন। শোবার ঘরে ভেতরের কক্ষে শুইয়ে দিয়ে বাড়ির সবাইকে ডেকে আনলেন। সবাইকে একে একে দেখে বললেন, এই লোকটা একজন মুক্তিযোদ্ধা। আহত হয়া নদীর পাড়ে পইড়া আছিলো। আমি লইয়া আইছি। এরে চিকিসসা আর সেবা কইরা সুস্থ করত হইবো। এ আবার যুদ্ধে যাইবো; পাক বাহিনীকে পরাজিত কইরা দেশটারে স্বাধীন করবো। দেশ স্বাধীন না হইলে আমরা কেউ বাচতাম না। এই ঘটনা য্যান কেউ জানতে না পারে! রাজাকাররা টের পাইলে আমাদের মাইরা বাড়িঘর জ্বালাইয়া দিবো।
আায়েশা খাতুন স্বামীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এই মুক্তিডার চিকিসসা করতে হইলে ডাক্তর লাগবো। ডাক্তর পাইবাইন কই?
ডাক্তর লাগতো না। আমরাই চিকিসসা করবাম। আগে দেখি জখমডা ক্যামন। তারপর শুরু হইবো টোটকা চিকিসসা।
শরীফ আহমেদ আহত মুক্তিযোদ্ধার জখম পরীক্ষা করলেন। গুলিটা লেগেছে বাম কাঁধে। এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেছে।অর্থাৎ ভেতরে গুলি নেই।
শরীফ আহমেদ খুশি হয়ে বললেন, কান্দে গুলিডা লাইগা বাইর হয়া গেছে। তুমি কাঁচা হলদি বাইট্টা নিয়া আসো।কাঁচা হলদি ঘরে না থাকলে ক্ষেত থাইকা তুইলা নিয়া আসো। আর দুধ গরম কইরা রাখো। জ্ঞান ফিরলে গরম দুধ খাওয়াইতে হইবো।নাম না জানা আহত মুক্তিযোদ্ধাকে সুস্থ্য করে তোলার জন্য চললো শরীফ আহমেদের টোটকা চিকিৎসা। খুবই গোপনে। বাড়ির কেহই এ ঘটনা কাউকে বলছে না। পরদিন আহত মুক্তিযোদ্ধার জ্ঞান ফিরলো; তবে গায়ে প্রচণ্ড জ্বর থাকায় প্রলাপ বকতে থাকলো। বাজার থেকে জ্বরের ঔষধ এনে খাওয়ানো হলো।
পরদিন রাতে মুক্তিযোদ্ধার জ্বর কমে এলো। সবাই ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।সবার মুখে তৃপ্তির আভা।
আহত মুক্তিযোদ্ধা সবাইকে একবার দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কোথায়? পাক বাহিনীর ক্যাম্পে নাকি?
শরীফ আহমেদ মৃদু হেসে বললেন, পাক বাহিনীর ক্যাম্পে কি কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে এইভাবে নরোম বিছানায় শুইতে দিবো? তুমি আমার বাড়িতে আছো এবং নিরাপদেই আছো। এখন ক্যামন লাগতাছে তাই কও।
মুক্তিযোদ্ধাটি বুঝতে পারলেন তার আর কোনো বিপদ নেই। তিনি স্বস্থির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, এখন খুব ভালো লাগছে চাচা। আমি ভেবেছিলাম মরেই গেছি।
ঘটনাটা কী হইছিলো একটু কও দেহি মুক্তিযোদ্ধা ভাতিজা।
উলুহাটিতে একটা অপারেশন করতে গিয়ে রাজাকারের হাতে ধরা পড়ে যাই। ওরা নান্দাইল পাক বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়া যায়।খুব অত্যাচার করে তথ্য বের করার জন্য। আমি একদম বোবা থাকি। তখন রেগেমেগে পাক বাহিনী আমাকে ফুলেশ্বরি নদীর পাড়ে নিয়া গুলি করে। এরপর আর কিছু মনে নাই।
শরীফ আহমেদ বললেন, এরপরের ঘটনা হইলো আমরা তোমারে নদীর পাড়ে পইড়া থাকতে দেইখ্যা বাড়িত লইয়া আইছি। গোপনে তোমার চিকিসসা করতাছি। তুমি খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়া উঠবা। গুলিডা কান্দে লাইগা পিঠের দিক দিয়া বাইর হয়া যাওয়ায় এইবার তুমি বাইচ্চা গেলা মুক্তি বেটা।
মুক্তিযোদ্ধা যুবক বললেন, আপনাদের হাতে না পড়লে কি আর বাঁচতে পারতাম চাচা। আপনাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। এই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারবো না।
তুমি সুস্থ হয়া আবার যুদ্ধে যাইবা, নাকি বাড়িত চইলা যাইবা? ওহো তোমার বাড়ি কই তা জানা হইলো না, তোমার নামটাও অহনো জানি না।
তখন আয়েশা খাতুন এক গ্লাস গরম দুধ হাতে নিয়ে এসে দাঁড়ালেন।দুধের গ্লাসটা যুবকের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন, কথা পরে হইবো। আগে দুধটা খায়া লন।
আহত মুক্তিযোদ্ধা যুবক দুধের গ্লাসটা হাতে নিয়ে বললেন, আমার নাম নকিব। আমার বাড়ি নেত্রকোণা মহকুমার ধোবাউড়া থানায়।4 Comments
Friends
Moniruzzaman Sarjil
@zaman2802
Jannatul Ferdous Ivy
@jannatul-f-ivy
Shadman-Shiam
@shadman-shiam
Md.Khaladur Rahman (অনল)
@wanol
অরিন্দম সাইফুল্লাহ
@arindam-saifullah
Shah Muhammad Alam
@smalam112
UTTAM KUMAR BISWAS
@uttamk
Md Suruzzaman Shohel
@suruzzaman
Sanwar Hossain
@sanwar


অনবদ্য!