-
গল্পঃ মোটিভেশান
লেখাঃ আল মাহমুদ বাপ্পি
১
“আমি আপনার পোর্টফলিও দেখলাম। আপনি কোন অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজ করেন?”
“ফাইভার।”
“কত লেভেল।”
“নিউ সেলার।”
“আপনার ফাইভার অ্যাকাউন্ট লিংক দেয়া যাবে কি?”
লিংক কপিই ছিল, বাপ্পি ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের ইনবক্সে সেটা পেস্ট করে দেয়। ম্যাসেঞ্জারের ওপাশে যিনি আছেন তিনি হয়তো ‘নিউ সেলার’ কথাটি শুনে অবাক হয়েছেন। বাপ্পি নিশ্চিত, ফাইভার প্রোফাইল ভিজিট করে সে আরও অবাক হবে।ম্যাসেঞ্জারের ওপাশে থাকা লোকটি অবাক হল কিনা বোঝা গেল না। কারণ আর কোনো ম্যাসেজ এলো না। বাপ্পি দীর্ঘশ্বাস চেপে আরেকটি মিডলম্যান কিংবা বায়ার খুঁজতে লাগলো। সে একজন গ্রাফিক ডিজাইনার। আরও পরিষ্কারভাবে ভেক্টর ডিজাইনার। যারা ছবি আঁকাআঁকির কাজ ডিজিটালভাবে কম্পিউটারে ফুটিয়ে তোলে তারাই মূলত ভেক্টর আর্টিস্ট।
নিজের ফাইভার অ্যাকাউন্টে সে ভিজিট করলো। এখন রাতের শুরু। সারাদিনের হিসেবে দশটার মাঝে আরও চারটি বায়ার রিকুয়েস্ট পেন্ডিং আছে। সে একটি বায়ারের রিকুয়েস্ট পড়তে শুরু করলো —
‘আমি একটি লোগো খুঁজছি। এটি আমার রিয়েল স্টেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে রিপ্রেজেন্ট করবে। লোগোটি হতে হবে সাধারণ, কিন্তু পরিচ্ছন্ন। লোগোর নাম ও আরও রিকুয়েরমেন্ট জানতে আপনার পোর্টফলিও সাবমিট করুন।’
লোগো ডিজাইনের বাজেট দেয়া আছে মাত্র কুড়ি ডলার। বাপ্পি এখন আর বাজেট নিয়ে মাথা ঘামায় না। আসলে কাজ না পেলে মাথা এম্নিই ঘেমে যায়, তখন আর বাড়তি প্রেশার ইচ্ছা থাকলেও নেয়া যায় না। বাপ্পি ভেবেছিল খুব যত্ন করে অফার সেন্ট করবে। সে কীভাবে লোগোটা প্রিফেয়ার করবে, লোগোর ইনিশিয়াল কালার কী হবে এবং লোগোটি কোন ক্যাটাগরির হবে সেসব জানিয়ে পোর্টফলিও লিংক সাবমিট করবার পিছে মনে পড়লো হঠাৎ ফাইভার অ্যাকাউন্ট খুলবার দু’মাসে সে কমপক্ষে সাড়ে চারশোটি বায়ার রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে, কেউই রেসপন্স করেনি।
ব্যাপারটা চরম হাস্যকর!
এই মুহূর্তে তার করার কিছুই নেই। এটা ভেবে সে নিজের ওপর বিরক্ত। কারণ সে নিজেও জানে তার যথেষ্ট প্রগ্রেস আছে, শুধুমাত্র নিজেকে প্রমাণের অভাবে কিছু করতে পারছে না।২
“এই, তুমি আমার ফোন ধরো না কেন?”
বাপ্পি কিছু বলতে যাবার আগেই ওপাশ থেকে বলল মেয়েটি, তুমি কি আর ভালবাসো না আমায়?
সে কিছু বলল না। কেন জানি হঠাৎ চুপ করে শুধু মেয়েটির কথা শুনতে ইচ্ছে হচ্ছে।
“কথা বলছ না কেন? আর শোনো, তোমার মাস্টারকার্ডের মেয়াদ কিন্তু শেষ। আমাকে নতুন মাস্টারকার্ড পাঠাও।”
বাপ্পি বিড়বিড় করতে লাগলো ‘মাস্টারকার্ড, মাস্টারকার্ড’। আহ, কত স্বপ্ন এই মাস্টারকার্ডজুড়ে! মেয়েটি তার বিড়বিড় শুনতে পেয়ে বলে, আরে হ্যা, তোমার ঐ মাস্টারকার্ড। ওটা আমি ওয়েট পেপার বাস্কেটে ছুড়ে ফেলেছি।
বাপ্পি এই প্রথম বলল, ভালো করেছেন..
“এক্সকিউজ মী! এটা কার গলা? আপনি তো রাজ নন। আপনি কে?”
“মাস্টারকার্ড আমারও আছে।”
“গড ড্যাম, আই অ্যাম আস্কিং হু আর ইউ!?”
বাপ্পি জবাব না দিয়ে লাইন কাটলো। রঙ নাম্বারে আর কথা বাড়িয়ে কী লাভ?সে এখন তার বুকশেলফের কাছে। একটা বইয়ের ফ্ল্যাপ খুলে সে তার মাস্টারকার্ড বার করলো, যে বইয়ের ফ্ল্যাপে লেখা — ‘টাকা থাকলে তুমি ভুলে যাবে তুমি কে, না থাকলে দুনিয়া ভুলে যাবে তুমি কে’।
তার মাস্টারকার্ডের মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। তবে কি তার পরিশ্রমের মেয়াদ শেষ? বাপ্পির চোখ ধ্বক করে ওঠে। হার্ডওয়ার্কই সব — ভাবে সে। হার্ডওয়ার্কই পারে তার মাস্টারকার্ডে অর্থ আনতে। বাপ্পি ছুটে গেল কম্পিউটারের দিকে। যাবার আগে তার মুখে শোনা গেল একটি কথা — ‘আপেক্ষিক জগতে ডেস্টিনি শেষ কথা নয়’!
৩
ইলাস্ট্রেটর অন করে বাপ্পি আর্টবোর্ডের দিকে তাকিয়ে আছে। আর্টবোর্ডে বাপ্পির নিজের আঁকা একটি আধা ছায়ামূর্তি বিশিষ্ট রাগী কল্পিত চরিত্র দেখা যাচ্ছে, যেটা ভার্চুয়াল গেইমের ওপর বেজ করে বানানো একটা চরিত্রের অনুকরণ। সে মূলত একজন মাস্কট বেজড গেমিং লোগো ডিজাইনার। বিভিন্ন গেমিং স্ট্রিমিং চ্যানেলে সে এই লোগোগুলো সেল করার চেষ্টা করে থাকে।স্কেচটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বাপ্পির আশেপাশের জগৎ যেন অদৃশ্য ইরেজারে মুছে গেল। শুধু দৃশ্যমান রইলো কম্পিউটারের আর্টবোর্ডটুকু। সেখানে মাউস ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সে পেন টুলে এঁকে চলেছে, মনের অজান্তেই কম্পিউটারে ছেড়ে রেখেছে গান — ‘পেইন, ইউ মেড মী এ বিলিভার’!
টানা তিনঘণ্টা ধরে সে ভেক্টর ট্রেস(ডিজিটাল আর্ট) করলো স্কেচটার ওপর। তারপর কালার আর শ্যাডোর কম্বাইনে টেক্সট জুড়ে দিয়ে একটি লোগো বানালো। সোশ্যাল মিডিয়ায় সে তেমন পরিচিত নয়, বাস্তবেও নয়। তবু কয়েকটি সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে সে লোগোটির ইমেজ কপি ছেড়ে দিলো। তারপর তিনঘণ্টা পরিশ্রমের ক্লান্তিতে নিজের অজান্তেই ঘুমিয়ে গেল।
ঘুম ভাঙতেই ম্যাসেঞ্জারে টুংটাং আওয়াজ। তার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টের একজন ইউএস কান্ট্রির বাসিন্দা, যার নাম নিকোলাস বুলেন্টিনি সে নক করেছে, তুমি কি একটা গেইমিং লোগো বানাতে পারো আমার জন্য?
বাপ্পি চমকালো না। উদাস হয়ে ভাবলো, অন্যান্য দিনের মত এই বায়ারও হাতছাড়া হবে। সে লিখলো তবু, সরি, কুড়ি পার্সেন্ট আগাম পেমেন্ট না নিয়ে কাজ করি না।
“ঠিক আছে, আমি রাজি।”
বাপ্পি তখনও অবিশ্বাসী। তবে পজিটিভ রেসপন্স পেয়ে তার কিছুটা ভালো লাগলো। সে তার পেপাল(সাইপ্রাস কান্ট্রির পেপাল, যা একসময় বাংলাদেশে যে কেউ খুলতে পারতো) অ্যাড্রেস দিয়ে বাজেট জানালো আর রিকুয়েরমেন্ট চেয়ে নিলো। আশ্চর্য, ৯০ ডলার ফিক্সড বাজেটের মধ্যে প্রায় ১৮ ডলার সত্যিই কুড়ি পার্সেন্ট হিসেবে চলে এলো। বাপ্পি এবারে সিরিয়াস হয়ে রিকুয়েরমেন্ট পড়তে শুরু করলো।সেদিন রাতেই বায়ারকে কাঙ্ক্ষিত লোগো পাঠিয়ে দেবার পর থেকে সে এখন আর কাজ নিয়ে ফ্রাস্ট্রেটেড থাকে না। কারণ তার বিশ্বাস জন্মেছে, লক্ষ্য মত হার্ডওয়ার্ক থাকলে আর পিছু তাকাতে হয় না। এজন্যই এর প্রায় দু’বছরের ব্যবধানে বাপ্পি লেভেল টু সেলার হিসেবে ফাইভারে জায়গা করে নিলো।
কাজের চাপে সে ক্লান্ত হলেই মনে মনে ইলন মাস্ককে স্মরণ করে। যেটা তার মোটিভেশান ফিরিয়ে দেয়। তিনি বলেছেন, ‘আমি দিনে প্রতিদিন ১৮ ঘন্টা পরিশ্রম করি, তবু কিছু মানুষ আমাকে সৌভাগ্যবান মনে করে’।
10 Comments
Friends
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Humayun Kabir Surjo
@humayunkabir-surjo
Foyzur Khan
@foyzur-khan
Habibun Nahar Mimi
@habibunnahar13
Zahidul Jamy
@zahidul
জুবায়ের বি এ এইচ অন্তর
@zubair
Ashaduzzaman-Khokon
@ashaduzzaman-khokon
নোমান খালভী
@nomankhalovi



দারুণ লিখেছেন।