Profile Photo

Shofia SheuleOffline

  • Shofia-B-Sheule
  • Profile picture of Shofia Sheule

    Shofia Sheule

    4 years, 7 months ago

    পড়ন্ত বিকেলের ছোঁয়া…….সুফিয়া শিউলি

    আজ দুদিন ধরে গুছিয়েও শেষ হচ্ছে না গোছানো। বাসা বদলে ধকল চেপে বসে যেন। ধীমান কিছুটা বিরক্ত হয়ে বল্লেন, সাঁঝি তোমার এই পুরনো থালা-বাসন, কাপড়চোপড়গুলো কি না নিলে হয় না? ওগুলো কাজের বুয়াকে দিয়ে দাও!
    কি যে বল না তুমি? জানো ওগুলো সময়ে কত কাজে লাগে? তুমি এর কি বুঝবে, বসে বসে সিগারেট টানা ছাড়া!
    কি… আমি শুধু সিগারেট টানছি? তোমার আলমারির জিনিসপত্রগুলো কে গোছালো শুনি? তারপর…তারপর সবগুলো প্যাকেটে কস্টেপ কে মারলো শুনি? তুমি?
    আহা… কি আমার কাজ রে, যাও এবার বুকশেলফের বইগুলো বস্তায় ভরে ভরে রাখো, আর কখন হবে সব? হাতে তো আজকের দিনটাই, কালই নাকি ওদের নতুন ভাড়াটে আসবে, বাড়িওয়ালা বলে গেছে।
    দুঢ়; রাখো তোমার বাড়িওয়ালার কথা, ওরা ওমন ভাব নেয়।
    ঠিক আছে সে যাইহোক, তুমি বইগুলোর ব্যাবস্থা কর।
    করবো, তুমি আমায় দারুন করে যদি তোমার মিষ্টি হাতে একমগ কালো কফি বানিয়ে দাও, তবে।
    সাঁঝি একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বল্লেন, ঠিক আছে তুমি যাও, আমি আসছি।

    সাঁঝি আর ধীমানের সংসার চলছে বিশ বছরের, তাদের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে, ছেলেটা এবার ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছে। মেয়েটাও পড়াশোনায় বেশ ভালো, এবার ও লেভেলে। বেশ গোছানো একটা সংসার সাঁঝির, স্বামী একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়য়ে শিক্ষকতা করেন। পৈত্রিকসূত্রেও বেশ সম্পত্তি আছে, ফলে ঢাকা শহরে তারা বেশ সচ্ছলভাবেই দিনযাপন করেন। তবে সাঁঝির মুখে একটা সুখের ভাব থাকলেও অবসরে কোথায় যেন একটা চিনচিনে ব্যাথার রেখা ফুটে ওঠে, কিন্তু সেটা ঐ পর্যন্তই, সংসারে সাঁঝি তার কোনো প্রভাবই ফেলতে দেন না…। তাঁর স্বামী ধীমান বড্ড ভালো মানুষ, কাজের বাইরে বউ, ছেলে-মেয়ে নিয়ে আড্ডা, ঘুরে বেড়াতেই বেশী পছন্দ করেন। বদভ্যেস বলতে ঐ ধুমপানটুকু…।

    টান ছাড়াই সিগারেটের ছাই ঝরে পড়ছে, ধীমানের সেদিকে লক্ষ্য নেই। তিনি মনযোগ দিয়ে একটি চিঠি পড়ছেন, যদিও অন্যের চিঠিপড়া তাঁর নীতিবিরুদ্ধ, কিন্তু তিনি কাজটি করছেন। বই গোছাতে গিয়ে হটাৎ শরৎচন্দ্রের রচনাবলীটা হাত থেকে পড়ে যায় এবং সেখান থেকে একটা ভাঁজ না করা ছোট চিঠি উড়ে মেঝেতে পড়ে যায়। শিরনামে “সন্ধ্যারও মেঘমালা” দেখে ধীমান প্রথমে এটা একটি কবিতা ভেবে পড়া শুরু করেন, কিন্তু পড়তে গিয়ে বুঝতে পারেন এটা একটা চিঠি এবং শিমুল নামে কোন এক ভীরু কবি এই চিঠি লিখেছিলেন তার প্রিয়তমা স্ত্রী সাঁঝিকে। দেখেই মনে হচ্ছে এ অনেক আগের লেখা চিঠি, হয়তো সাঁঝি তখন ক্লাস দশম বা সদ্য কলেজে, কাগজের রঙ বদলে ইটের রঙের মতো হয়ে গেছে… তবুও ধীমানের বুকটা চিনচিন করে উঠলো যেন; তিনি বার বার পড়ছেন চিঠিটা।
    দুপুরে খাবার টেবিলে তেমন কোন কথাই বললেন না ধীমান, প্রায় না খেয়ে উঠে পড়লেন। বিষয়টা সাঁঝির চোখে পড়লো ঠিকই কিন্তু ছেলে-মেয়ের সামনে কিছু না বলে, রান্নাঘর গুছিয়ে ধীমানের পাশে এসে বসে জানতে চাইলেন, কি হয়েছে তোমার? হটাৎ করে কি হল? কোন খারাপ খবর পেয়েছো কি কারো? এই তো সকালেই ঠিক ছিলে?
    ধীমান কোন কথা না বলে চুপ করে থাকলেন, তিনি শুধু একটা কথাই ভাবছেন, সেই শিমুল কি সাঁঝির মনে এখোনো বসে আছে, সাঁঝি কি দুঃখ লুকিয়ে সুখি হওয়ার ভান করে তার সাথে এতগুলো দিন কাঁটালো? দুই পরিবারের পছন্দে বিয়েটা হয়েছিলো। সাঁঝির এই বিয়েতে ইচ্ছে না থাকলে সে তখন কেন বলেনি…।
    ধীমানকে চুপ থাকতে দেখে সাঁঝি আবার জানতে চাইলেন, কি কথা বলছো না কেন?
    ধীমান এবার ধীরে ধীরে চোখ তুলে সাঁঝির দিকে তাকিয়ে বল্লেন, সাঁঝি, শিমুল কে? তুমি কেন আমাকে তাঁর কথা বলোনি? আমাকে বললে আমি তখন ঠিক একটা ব্যাবস্থা করতাম। তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে তোমার বাব-মা তোমাকে কেন আমার সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন?
    সাঁঝি যেন ধপ করে আকাশ থেকে পড়লেন, কি বলছো এসব! এতোদিন বাদে তুমি শিমুলের খোঁজ কোথায় পেলে? মানেটা কি?
    কোন মানে নেই, আমি জেনেছি। তুমি আমাকে বল, তুমি কি তাঁকে এখোনো খুব ভালোবাসো?
    তুমি পাগল হয়ে গেছো; কোথা থেকে কি জেনে পাগোলের মতো কথা বলছো!
    হা আমি পাগল, আমি পাগল…আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি এবং এতোদিন জেনেছি তুমিও শুধু আমাকেই ভালোবাসো, অথচ আজ তোমার পুরোনো বই’র পাতা থেকে জানতে পেলাম না আমি না; তুমি অন্য কারো!
    চুপ কর, আমি তোমারেই, শুধু তোমার। হা এক শিমুল ছিলো। আমি তখন কলেজে সবে ভর্তি হয়েছি। আমাকে খুব ভালোবাসতো, খুব ভালো কবিতা লেখার হাত ছিলো তাঁর, আমাকে সব সময় কবিতার মতো চিঠি লিখতো, আমারো পড়তে খুব ভালো লাগতো সে সময়। কিন্তু ঐ পর্যন্তই, আমাকে কোনদিনেই সামনাসামনি এসে বলতে পারেনি যে, আমাকে ভালোবাসে। তারপর তো আমি কলেজ পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়য়ে পড়তে চলে আসি। শিমুলের আর কোন খোঁজ থাকে না।
    শুধু এই, তুমি তো তার চিঠি পড়তে ভালবাসতে, তাহলে তুমি বলনি কেন?
    ওহহহ কি হয়েছে তোমার, সে বয়েসে সেটা পড়তে ভালো লাগতো, ব্যাচ, এতটুকুই। আমার তো কখনো মনথেকে সাড়া আসেনি; তাহলে কেন তাকে বলবো যে, আমি তাকে ভালোবাসি।
    ধীমান আর কোনো কথা না বলে সাঁঝিকে জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে। সাঁঝি, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।
    আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি…।

    পড়ন্ত বিকেলের সূর্যটাকে চোখে হারাতে হারাতে ধীমানের হাতে আলতো চাপ দিয়ে সাঁঝি জানতে চাইলেন, তুমি আমাকে তেমনি বিশ্বাস করো তো? যে ভাবে বিশ বছর আগে একটি হাত বাড়িয়ে ছিলে বিশ্বাসের?
    হটাৎ একথা বলছো কেন?
    না এমনি, তখন যে পাগলামোটা করলে…, বলে সাঁঝি একটু হাসার চেষ্টা করলেন…।
    দেখো সাঁঝি, ছেলে-মেয়েরা বড় হয়েছে, কিছুদিনের মধ্যে ওরা নিজেদের মতো জীবন কাটাবে, হয়তো আমাদের দিকে নজর দেয়ার সময়ই হবে না তাদের…..
    সকাল-দুপুর-বিকেল কাটিয়ে দিয়েছি আমরা, এখন এই সন্ধ্যেবেলায় এসে তোমাকে অবিশ্বাস করলে যে আমি একা হয়ে যাবো সাঁঝি! রাত নেমে আসা সময়টায় আমাদের একসঙ্গে থাকা দরকার।
    অবিশ্বাসে জ্বলেপুড়ে মরা চেয়ে বিশ্বাস করে ঠকাও ঢের ভালো, তাই, না?
    সাঁঝি কিছুটা অবাক, কিছুটা আত্মবিশ্বাসী চোখে স্বামীর দিকে তাকালেন, ‘তুমি বারান্দাতেই বসো, এখনই সন্ধ্যামালতি ফুটে উঠবে, দেখতে থাকো, আমি চা’টা নিয়ে আসি।
    ধীমান সাঁঝির চলে যাওয়া দেখতে দেখতে সকালে শরৎচন্দ্রের বই’র ভাজে পাওয়া পুরোনো ইট রঙের চিঠিটা কুঁটিকুঁটি করে ছয়তলা থেকে বাতাসে উড়িয়ে দিতে লাগলেন।
    কেন জানি সেই তরুণ সাঁঝিকে জনৈক শিমুলের লেখা চিঠিটাকে ধীমানের বুকে চিনচিনে ব্যাথা মনে হয়েছিল, কুঁটিকুঁটি করার পর যা এখন আর নেই।।

    ………………………………………………………………………………।।

    14
    9 Comments
Skip to toolbar