-
মেড ইন জিঞ্জিরা (বাণিজ্যিক অঞ্চল)
=========================
জিঞ্জিরা বা জিনজিরা, বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক এলাকা। তাওয়াপট্টি, টিনপট্টি, আগানগর, বাসপট্টি, কাঠপট্টি, থানাঘাট, ফেরিঘাট এলাকার বাসাবাড়ি নিয়ে বিস্তৃতি ঘটেছে প্রায় ১২০০’রও বেশি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প। এ শিল্পগুলোর ওপর নির্ভর করছে ৩০ হাজার মানুষের জীবিকা নির্বাহ। ব্রিটিশ আমলে নদী সংলগ্ন জিঞ্জিরা ঘাট ছিল তৎকালীন ঢাকার উল্লেখযোগ্য একটি ঘাট।
জিঞ্জিরা ঢাকা জেলার কেরানিগঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়ন। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে এর অবস্থান।
ঐতিহাসিক পলাশী যুদ্ধের পর সিরাজ উদ-দৌলার পতনের পর তার মা আমেনা বেগম, স্ত্রী লূৎফা বেগম, মেয়ে কুদসিয়া বেগম ওরফে উম্মে জোহরা এবং খালা ঘসেটি বেগমকে কড়া পাহাড়ায় বন্দী করে রাখা হয় জিনজিরা প্রাসাদে। তাদের শিকল বা জিঞ্জির পরিয়ে বন্দি করে রাখা হয়, আর ঐতিহাসিকদের মতে এই জিঞ্জির পরানোর ঘটনা চাউর হয়ে গেলে তা থেকেই পরবর্তীকালে এ অঞ্চলের নাম হয় জিনজিরা। বাংলায় নবাবি আমল থেকে ঢাকার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে জিঞ্জিরা প্রসিদ্ধ হয়ে উঠে। নদীপথে বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন প্রকারের পণ্য বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে বিক্রির জন্য এখানকার হাটে তোলা হতো। ব্রিটিশ আমলে জিঞ্জিরা হাট কাঁচাপাট, পাটজাত দ্রব্য, টিনজাত সামগ্রী, মশলা, গজারি লাকরি (খুঁটি), বিভিন্ন প্রকারের সাইজ-কাঠ, বাঁশ ইত্যাদির জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠে। এছাড়া মৃৎশিল্প, লোহার সামগ্রীর জন্যও জিঞ্জিরা একই সময়ে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠে। এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান শাসনামলে জিঞ্জিরা এবং এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে বেশ কিছু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠে। এসবের মধ্যে আলকাতরা, নারিকেল তেল, সাবান, ডিটারজেন্ট, শাড়ি-লুঙ্গি উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতা-পরবর্তী রাসায়নিক পদার্থনির্ভর ভোগ্যপণ্য, মেলামাইনসহ আরও অনেক পণ্যের কারখানা গড়ে ওঠে এবং ক্রমেই এর প্রসার বাড়তে থাকে।
বাংলার নবাবি আমল, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে জিনজিরা ঢাকার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হলেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এটি আরো সক্রিয় হয়ে উঠে। কিন্তু ১৯৮০’র দশকে এই বাণিজ্যিক অঞ্চলটি নকল সামগ্রী তৈরির জন্য কুখ্যাত হয়ে পড়ে।
জিঞ্জিরায় তিনটি পৃথক এলাকায় তৈরি করা পণ্যের নামানুসারে তিনটি স্থান আছে। যেখানে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন কারখানা। তাওয়াপট্টিতে আছে ছোট-বড় প্রায় ৭০০ হালকা শিল্প-কারখানা আর এখানে মূলত তৈরি হয় গ্রিল কারখানা, তালা, ছাতার জালা, কব্জা, পাওয়ার প্রেস, প্লেঞ্জার, কেলাম, শিট, কয়েল, ওয়াশার, নাট-বোল্ট, স্ক্রু, তারকাঁটা, তোপকাটা, বালতি, অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল, কড়াই ইত্যাদি। টিনপট্টিতে তৈরি হয় টিন, শিট, কয়েল। এখানে ১৫-২০টি কারখানা আছে। তবে এর বাইরেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত সেকেন্ডারি শিট মজুদ এবং গোপনে ঢেউটিন তৈরির কাজ হয়। এ প্রতিষ্ঠানগুলো করোগেশন মেশিনে দিন-রাত আমদানিকৃত জিপি শিট কেটে ঢেউটিন তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে থাকে।
জিঞ্জিরার বৈশিষ্ট্য হলো এখানে খুব স্বল্পমূল্যের সামগ্রী ব্যবহার করে কারিগরেরা তৈরি করতে পারেন মানসম্পন্ন অনেক পণ্য। এমনকি তাদের দাবি মাত্র ২০-৩০ হাজার টাকা মূল্যমানের যন্ত্রে যে প্লেনশিট থেকে যে ঢেউটিন তারা তৈরি করতে পারেন, তার গুণগত মান যথেষ্ট ভালো। তবে এর সত্যতা নিশ্চিত করার মতো কোনো প্রামাণিক দলিল পাওয়া যায়নি। লোহার সামগ্রী তৈরিতে জিঞ্জিরার বিশেষ সুনাম রয়েছে। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে জিঞ্জিরা বাজারে প্রায় দুশো’রও অধিক বিভিন্ন লোহার সামগ্রী তৈরির কারখানা রয়েছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ হার্ডওয়্যার শিল্পের বিশাল যোগান দেয় বলে অভিমত রয়েছে। জিঞ্জিরার কারখানায় উৎপাদিত বিভিন্ন সামগ্রীর মধ্যে ঢেউটিন, স্ক্রু, নাট-বল্টু, ক্লাম, তারকাটা, জিআই তার, আলতালা, হ্যাসবোল্ট, কব্জা, দা-বটি, শাবল, বালতি, চাপাতি, কুড়াল, কোদাল, কুন্নি, বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ডেকোরেটর সামগ্রী, ওয়াশিং টব, পিতলের বার্নার(কেরোসিন চুলা), তামা ও পিতলের ডেগ, কলসি, ক্রোকারিজ, তাওয়া, টিফিন ক্যারিয়ার, চাইনিজ সাইলেন্সার/ডাব্বু, আশকল ডুম্বরি, নিক্তিকাঁটা, সাটার, কেচি গেট, লোহার জানালা, দরজা, অ্যালুমিনিয়ামের জগ-মগ ইত্যাদি অন্যতম। এসব উপকরণ তৈরির কাঁচামাল আসে ঢাকারই নবাবপুর, নারায়ণগঞ্জ, ফতুল্লা, পুরোন ঢাকা প্রভৃতি এলাকা থেকে। তাওয়াপট্টিতে তৈরিকৃত গ্রিল কারখানা, তালা, ওয়াসার, নাট-বোল্ট ইত্যাদি তৈরিতে নিজেদের তৈরি পাওয়ার প্রেসের মাধ্যমে বানানো হয়। একসময় পাওয়ার প্রেসসহ বড় বড় যন্ত্র বিদেশ থেকে আমদানি করতে হলেও স্থানীয় কারিগররা উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে সেখানে প্রতিস্থাপন করতে সমর্থ হয়েছেন সম্পূর্ণ নিজস্ব তৈরিকৃত যন্ত্র। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি হলো এখানকার সামগ্রীতে স্ক্র্যাপ মেটাল বা পরিত্যক্ত লোহার ব্যবহার, যা সংগৃহীত হয় ভাঙা জাহাজ কিংবা বিভিন্ন কারখানার ভাঙা সরঞ্জাম থেকে।
জিঞ্জিরা লোহার বিভিন্ন সামগ্রী ছাড়াও মেলামাইন, আলকাতরা, নারিকেল তেল, শাড়ি-লুঙ্গি ইত্যাদির জন্য প্রসিদ্ধ। এছাড়া জিঞ্জিরার কালিগঞ্জ দেশীয় গার্মেন্টস সামগ্রী, বিশেষত জিন্স প্যান্ট তৈরিতে সুনাম অর্জন করেছে। দেশীয় বাজারের জিন্সের প্রায় ৮৫ শতাংশ চাহিদা কালিগঞ্জ থেকে পূরণ হয় বলে স্থানীয়দের অভিমত পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি রোহিতপুরের লুঙ্গি, জয়পাড়ার শাড়িও বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও এই অঞ্চলে ভারত, জার্মানি, মালয়েশিয়া থেকে আনা কাঁচামালনির্ভর প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে।
উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হলো জিঞ্জিরার কারিগরেরা কাজ শেখেন দেখে দেখে। তারা প্রায় সবাই-ই স্বশিক্ষিত। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি শিক্ষা তাদের নেই। তাই তাদের কাজে ত্রুটিও লক্ষ করা যায়। কোনো কোনো ব্যবসায়ী এজন্য পণ্যের সঠিক দাম পাননা বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে একটি জাতীয় দৈনিকে “নকলের রাজ্যে কিছুক্ষণ” শিরোনামে ধারাবাহিক প্রতিবেদনে জিঞ্জিরার কারিগরদের দ্বারা নকল পণ্য তৈরির অভিযোগ প্রথম উঠে। নামিদামি দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাবান, কসমেটিক্স সামগ্রী ইত্যাদি নকল করে সেসব ব্র্যান্ডের নামেই চালিয়ে দেবার অভিযোগ ওঠে তখন জিঞ্জিরার কারিগরদের উপর। এই অভিযোগ এতোটাই ছড়িয়ে পড়ে যে, মেড ইন জিঞ্জিরা বলতেই সাধারণ লোকজন বুঝে নেন এটা তৃতীয় শ্রেণীর পণ্য কিংবা সম্পূর্ণ নকল। এছাড়াও সাধারণ্যের মাঝে জিঞ্জিরার নকল সম্ভারকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়ে জিঞ্জিরা সংস্কৃতি নামক বদনাম। কিন্তু জিঞ্জিরাবাসী কারিগরেরা (প্রেক্ষিত ডিসেম্বর ২০১১) এসব অভিযোগের সিংহভাগই ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী সেসব নকল সামগ্রীর বেশিরভাগ পুরোন ঢাকার মৌলভী বাজার, চকবাজার ও বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী বিভিন্ন চরে তৈরি হতো, কিন্তু জিঞ্জিরা ছিল এসব নকলমুক্ত। কারিগরদের দাবি অনুযায়ী যাও একটু নকল ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, তা ২০০৫/’০৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে পুলিশী অভিযানে পাঁচ টাকার নকল কয়েন তৈরির সরঞ্জাম আটকের পর থেকে দূর হয়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসনও জিঞ্জিরার নকল পণ্য তৈরির ব্যাপারে সজাগ এবং নকল পণ্য তৈরি হয়না বলে অভিমত পাওয়া যায় (২০১১)।
তবে অভিমত উল্টো কথা বললেও এখনও (ডিসেম্বর ২০১১) জিঞ্জিরার আগানগর, বাসপট্টি, থানাঘাট, ফেরিঘাট এলাকার বাসাবাড়িতে গোপনে হুবহু নকল পণ্য তৈরির ছোট ছোট গোপন কারখানা গড়ে উঠেছে; যেখানে ফ্লাস্ক, ওয়াটার হিটার, শ্যাম্পু, সাবান, আফটার শেভ লোশন, ত্বকে ব্যবহারের ক্রিমসহ বিদেশী জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নকল পণ্য তৈরি হয়ে থাকে। বিদেশি ব্র্যান্ডের মধ্যে পেনটিন প্রো-ভি, হেড অ্যান্ড শোল্ডারস, গার্নিয়ার, রিজয়েস, ডাভ, সানসিল্ক, অলক্লিয়ার শ্যাম্পু, ডাভ সাবান, জনসন বেবি লোশন, সাবান, ইম্পেরিয়াল লেদার, আফটার শেভ লোশন, নিভিয়া ইত্যাদিও তৈরি হয়ে থাকে বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
স্থানীয় কারিগর এবং মালিক সমিতি ছাড়াও অনেক সচেতন মানুষই এই অঞ্চলের উৎপাদিত সামগ্রীকে কেন্দ্র করে উজ্জল সম্ভাবনা দেখতে পান। ১৯৮০’র দশকে বেসরকারি এনজিও বিসিক জিঞ্জিরার ক্ষুদ্রশিল্পের বিকাশে একশত কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়। কিন্তু কিছু ঋণ বিতরণের পর বন্ধ হয়ে যায় সেই প্রকল্পের কার্যক্রম। এছাড়া বিসিকের উদ্যোগে তৈরি করা বিভিন্ন শিল্পে গ্যাস ও বিদ্যুতের সঠিক সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি বলেও সেসব শিল্প-উদ্যোগকে কাজে লাগানো যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। এরপর আর তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে। সেজন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করে থাকেন। বাংলাদেশের কাঁচামাল ও পণ্যের বিপুল ব্যবহার নিশ্চিত করে বলে জিঞ্জিরাকে দেশের অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনাময় শিল্পাঞ্চল হিসেবে দেখা হয়, যদিও স্থানীয় প্রশাসন বা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ সেখানে নেই।
বাংলাদেশের অনেক কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি বাংলাদেশের প্রযুক্তিবিদ্যার শীর্ষ বিদ্যাপিঠ বুয়েটের অনেক কারিগরি সহায়তার জন্য শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকগণ জিঞ্জিরা সামগ্রীর উপর নির্ভর করেন। এছাড়াও জিঞ্জিরায় তৈরি সামগ্রী ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়।
পরিশেষে বলতে হয় জিঞ্জিরা নগরী শিল্প ব্যান করে আমরা নকল পন্যের বিদেশী মার্কেটে ধর্না দিচ্ছি। চিন এগিয়ে যাবে যাক আমাদের স্বচ্ছ থাকা চাই। হয়ত এই জিঞ্জিরায় হাত ধরে বাংলাদেশ হয়ে পরতো পরাশক্তি বা আয়রন ডোমের মতো সুরক্ষিত কোন দেশ। জিঞ্জিরা থাকুক জিঞ্জিয়ায়। প্রয়োজনগুলো ধানর করি মোদের পিঞ্জিরায়।6 Comments-
@prithula شكرا لك

Nipun Chandra
News and literary personalities
আমি বৈচিত্রময় পৃথিবী গঠনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পেশায় সাংবাদিক। ছোট গল্প, উপন্যাস, ভ্রমন কাহিনী, কেসস্ট্যাডি, কবিতা ও বর্ণনা লেখা আমার শখ। যা দেখিনি দু’নয়নে, তা বলবনা এ বদনে। তাই অতি বিশ্বাসীরা আমাকে এড়িয়ে চলবেন।
আমার ব্যাক্তিগত লেখা তথ্যাদি পেতে ফেসবুকে লাইক ম্যাসেজ করে সাথে থাকুন (নীচের নামে ক্লিক করুন ডাইরেক্ট ফেসবুক)
ফেসবুক: Click now
Email: Click now
তাৎক্ষণিক প্রচার Click now
ঠিকানা Click now
Friends
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন
@muhammad-abul-hussain
Nushrat Mohima
@nushrat-jahan-mohima
বিলকিস খানম কাজল
@bilkiskhanam-kazal
Ali Sohel
@ali-sohel
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
Kazi Fahim hossin
@fahim6542
Jewel hazari
@jewel50
Rakib Hossain
@rakib-hossain
Niaz Aziz Dip
@niazdip


তথ্যবহুল সুন্দর পোস্ট।