Profile Photo

প্রদীপ্ত দে চৌধুরীOffline

  • Pradiptadey12006024
  • *অর্ডার নং-৪১ 🏵️

    কাউন্টার থেকে কেউ একজন ডাক দিল, “৪১ নম্বর অর্ডারটা কার? হয়ে গিয়েছে, নিয়ে যান!”
    রেস্টুরেন্টে বসে ঝিমুচ্ছিলাম। দুপুর-বিকেল একটানা টিউশনি শেষে সন্ধ্যার দিকে ফুড ডেলিভারির কাজটা যখন আসে, তখন বসার সুযোগ পেলেই চোখজুড়ে ঘুম নামে! যে রেস্টুরেন্টে বসে আছি, ওখানে খাওয়ার সুযোগ এ জীবনে হবে না সেটা নিশ্চিত। ফুড ডেলিভারিম্যানের কাজ করতে গিয়ে এটা একটা সুবিধা, এমন কিছু জায়গায় যাওয়া যায় যেখানে হয়তো সাধারণভাবে কখনো যাওয়া হতো না কখনো!
    কাউন্টার থেকে অর্ডারগুলো প্যাক করে পিঠের ইয়া বড় ব্যাগটাতে নিয়ে রেস্টুরেন্টে নিচে রাখা সাইকেলের কাছে চলে এলাম। গায়ে কোম্পানি লোগোওয়ালা গেঞ্জি আর কাঁধে বড় ব্যাগ নিয়ে সাইকেলের প্যাডেলে পা দিলাম!
    বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে এসে টিউশনি আর পার্টটাইম ডেলিভারিম্যানের কাজ করে আমার দিন যায়। কাজগুলো যে খারাপ লাগে তা না, কখনো কখনো অনেক ভালো লাগে। যেমন সন্ধ্যায় সাইকেল চালানোর সময় যদি একটু ঠান্ডা হাওয়া পাওয়া যায়, তাহলে রাস্তার সোডিয়াম বাতির ভেতর দিয়ে সাই সাই করে চলে যাওয়াটার মাঝেও একরকম রোমান্টিকতা কাজ করে। যদিও এসবকিছু ভাবার সময় থাকে না; সময়টাই যে বড্ড অল্প!অর্ডার যত দ্রুত পারা যায় তত তাড়াতাড়ি ডেলিভারি দেওয়াটাই মঙ্গল, নয়তো কখনো কটু কথা তো কখনো নাক সিটকানো-” আপনারা এতো লেইট কেন করেন? অর্ডার তো সেই কবে দিয়েছিলাম! কাস্টোমার সার্ভিস টু লো! এত দেরী কেন করেছেন, খিদে তো মিটেই গেল আপনার আসতে আসতে-”
    এই হড়হড়ামি তাড়াতাড়ির দুনিয়ায় আমার আর সাইকেল করে চাদনী রাতের ঠান্ডা বাতাসে সোডিয়াম আলো উপভোগ করা হয় না!

    ৪১ নং অর্ডারের ঠিকানায় পৌঁছে ফোন দিতেই ওপর পাশ থেকে এক নারী কন্ঠের আওয়াজ শোনা যায়, “আপনি নিচে থাকেন, আসছি!”
    সাইকেল এক সাইডে রেখে কাঁধে ব্যাগ থেকে অর্ডার হাতে নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকি। মিনিট পাঁচেক পড়ে এক তরুণীকে দেখতে পাওয়া যায় সামনের দালান থেকে হেঁটে আসছে। আমি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকি, তরুণী এসে জিজ্ঞেস করে, “আপনার কত হয়েছে টাকা?”

    ঠিক এই প্রশ্নটায় আমি আটকে যাই। অর্ডারের দাম আমি জানি, কত টাকা দিতে হবে সেটাও বলতে পারবো- দুইশত পয়ত্রিশ টাকা! সেটা শুনে আমি ভড়কে যাইনি, আমি ভড়কে গিয়েছি গলার আওয়াজ শুনে। এই আওয়াজটা কোথায় যেন বড্ড পরিচিত, বড্ড শোনা, বড্ড আকাঙখিত!
    আমি চোখের পলক নিচের দিকে ফেলে একটু গলা নামিয়ে বলি, “জ্বি-জ্বি, দুইশ-দুইশ পয়ত্রিশ টাকা!”
    চেহারটার দিকে তাকাতে পারি না প্রথমবার, তারপর কোন একসময় হঠাৎ চোখে পড়ে। এক মুহুর্তের জন্য মনে হয় এই পৃথিবীতে সময়-স্থান-কাল সব এক হয়ে বিলীন হয়ে পড়েছে।
    আমার হাত থেকে প্যাকেট নিয়ে তরুণী বলল, পাঁচশ টাকা ভাঙতি হবে?
    আমি তখন অপ্রস্তুতভাবে হড়হড় করে বলি, “জ্বি…ইয়ে… দেখছি…হবে…”

    তরূণী আমার দিকে তাকায় না, তাকালেও কিছু নয়, কোম্পানির লোগোওয়ালা মাস্কে আমার মুখ ঢাকা। তরুণী মাস্ক পড়েনি, তাহলেও তাঁকে চিনতে অসুবিধে হতো না, তাঁর আওয়াজ, প্রকন্ড মানুষীয় গন্ধ আমায় ঠিক চিনিয়ে দিতো।

    মিতুকে যখন প্রথম বলেছিলাম, তোমায় ভালোলাগে- তার আগে পরিচয়ে কেটেছে চারটে বছর। মিতু আমি একই বাসায় থাকতাম, প্রথম যেদিন বললাম, মিতু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমার সামনে থেকে চলে গেল। আমি চুপসে গেলাম। তার এক সপ্তাহ পরে মিতুর সাথে এক শপিং মলের লিফটে দেখা হয়। অনেক কষ্টে বললাম, “তোমায় একটা কথা বলেছিলাম যে মিতু, যদি কিছু একটা বলতে-”
    মিতু একটা কফি শপে আমায় আসতে বলে, আমি যাই। কোল্ড কফিতে চুমুক দিয়ে মিতু গম্ভীর গলায় বলে, “প্রেম আর ভালোবাসার মাঝে পার্থক্য করতে পারো, হাসান?”
    আমি তখন হ্যাঁ অথবা না শোনার জন্য বসেছিলাম, এমন উদ্ভট প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেলাম। মিতু জবাব দেয়, “প্রেম ব্যাপারটা খুব জলদি আসে, যায় খুব জলদি, ভালোবাসা ব্যাপারটায় ধীর স্থিরতা থাকে, তার আদি-অন্ত থাকে না, যাকে ভালোবাসা হয়, মনে হয় সে প্রথম থেকেই ছিল জীবনে, কোন একভাবে জানা হয়নি শুধু! তুমি প্রেমে পড়েছো, নাকি ভালোবেসেছো?”
    আমি একটু সময় নিই, তারপর আস্তে করে বলি, “ভালোবেসেছি, মিতু!”
    মিতু অনেকসময় কথা বলে না, তারপর ফের গম্ভীর গলায় বলে, “তোমার অনুভূতিতে আমার সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা আছে হাসান। তবে আমি তোমায় একটা শর্ত দিবো, তুমি এক বছর আমার সাথে যোগাযোগ করবে না। তারপর সেই এক বছর পরে এসে যদি তোমার মনে হয়, আজকের মতোই তুমি আমায় দেখছো- তাহলে মেনে নেব তুমি সত্যিই ভালোবেসেছো! সম্পর্কের ভাঙা-গড়া প্রচুর দেখেছি, হাসান, এখন বিশ্বাসে বড় কষ্ট হয়!”

    মিতুর কথা মেনেছিলাম আমি। তার সাথে যোগাযোগ আমি বন্ধ করে দিই, প্রথমে যদিও অপমান বোধ করেছিলাম, মিতু আমার কথাকে অবিশ্বাস করেছে; কিন্তু যত সময় গেল, আমার ধৈর্য ফুরিয়ে আসতে লাগলো, এই এক বছরের কথাটাকে তখন তত ভারী মনে হতে লাগলো! অন্যদিকে ভয়ও হতে শুরু হল, তবে কি আমি ভুল ছিলাম? নেহায়েত আকর্ষণ বৈ কিছু ছিল না কি? তবে যদি সেটা না হয়, যদি সত্যিই ভালোবেসে থাকি, তবে সেই ধীর স্থিরতা কেন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে আমার ভেতর- দ্বিধা আশংকায় দিন কাটতো আমার!

    মিতু বোধহয় আমার অস্থিরতা টের পেয়েছিল, তাই ছয় মাসের মাথায় আমি এক ক্যাম্পেইন থেকে ফিরে এসে দেখি মিতুরা বাসা ছেড়ে চলে গিয়েছে! মিতু নেই, আমার অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশও নেই!

    মিতুকে যখন আজকে পাঁচশ টাকার ভাঙতি দিতে পকেট থেকে টাকা বের করছি, মিতুর সাথে শেষ দেখার তখন তিন-সাড়ে তিন বছর হয়ে গিয়েছে। মিতু কিভাবে আবার এই শহরে এল সে আমার জানা নেই। আমি টাকা ভাঙতি দিয়ে অর্ডারের টাকা রেখে বাকিটুকু ফেরত দিই। মিতু ফেরত যায়।

    অন্ধকার কোণায় দাঁড়িয়ে আমার খুব করে ইচ্ছে হয়, মিতুকে “মিতু” বলে ডাক দিই, মাস্কটা খুলে বলি, আমায় চিনতে পারছো, আমি হাসান, মনে পড়ে আমার কথা?সেই কফি শপ, ১ বছরের কঠিন শর্ত, মনে পড়ে কি?

    মিতু চলে যাচ্ছে, আমার কন্ঠ ফেটে আওয়াজ আসতে চায়, কিন্তু দ্বিধান্বিত হয়ে যাই। তাকাই আমার লোগোয়ালা গেঞ্জি আর ভাঙাচোরা আমার আমি-টার দিকে, মিতু আমায় শ্রদ্ধা করতো, চাইলেই সেদিন অপমান করে দূরে ঠেলে দিতে পারতো- সেটা সে করেনি। কিন্তু আজ আমার এই কাজ দেখে সেটাও কি হারিয়ে ফেলবো আমি? আমার এই ভাঙা স্বাস্থ্য আর প্রচন্ড বদলে যাওয়া রূপে মিতু কি মেনে নিতে পারবে? দ্বিধা উৎকন্ঠায় আমি কাঁপতে থাকি। কোন এক অজানা কারণে আমি আওয়াজ দিয়ে ফেলি, “জ্বি, ম্যাম, ইয়ে..শুনছেন?”

    নিজের কন্ঠ শুনে নিজেই ভড়কে যাই, আমি কেন আওয়াজ দিলাম! মিতু ফিরে তাকিয়েছে, আমি এখন কি বলবো! এদিক ওদিক ভেবে সামনে যাই, প্রচন্ড ঘেমেনেয়ে গিয়ে বলি, “ম্যাম, আব….আপনাকে একটা জিনিস বলা হয়নি, আপনি আমাদের ফুড স্ট্রোক কোম্পানির আজকের লাকি কাস্টোমার, আপনাকে তাই…..১০০ টাকা ক্যাশব্যাক দেওয়া হবে! ম্যাম আম.. কনগ্রেচুলেশনস!”

    আমি টাকা বের করতে থাকি, আমার সামনের তরুণী আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি মুখটা পেছন দিকে ঘুরিয়ে ১০০ টাকা বের করে তরূণীর দিকে বাড়িয়ে দিই, তরূণী কেন জানি তবু চোখ সরায় না, ছোটছোট করে তাকিয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত। তারপর আওয়াজ দেয়, “আমি কি…আমি কি আপনাকে আগে….কখনো দেখেছি?”

    আমি তাকিয়ে থাকি সামনে তরুণীর দিকে। দ্বিধা অদ্বিধার মাঝে আমার স্নায়ু বইতে থাকে। আমার মনে হয়, তরুণীর ওপর পাশের রাস্তায় একজন চাদর ঢাকা মানুষ সোডিয়ামের আলোয় বসে আছেন। চোখ বন্ধ করে গম্ভীর আওয়াজে তিনি আবৃত্তি করছেন জীবনানন্দের কবিতা….

    “জীবন চলে গিয়েছে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার-
    তখন আবার যদি দেখা হয় তোমার আমার!
    তখন হয়তো মাঠে হামাগুড়ি দিয়ে পেঁচা নামে-
    বাবলার গলির অন্ধকারে
    অশত্থের জানালার ফাঁকে
    কোথায় লুকায় আপনাকে!
    চোখের পাতার মতো নেমে চুপি কোথায় চিলের ডানা থামে….

    কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়শায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে!”

    4
    2 Comments
    • অসাধারাণ গল্প।
      মিতুর জন্য খারাপ লাগছে। হায়! সে আজো জানল না হাসান শুধু তার প্রেমেই পড়েনি ভালোবেসেছিলো। ধন্যবাদ কবি জীবনানন্দের অনবদ্য কবিতাটির জন্য।

    • খুব সুন্দর গল্প। মন খারাপ হয়ে যায়।

Friends

Skip to toolbar