Profile Photo

Fahmida AfrinOffline

  • Fahmida-Afrin
  • Profile picture of Fahmida Afrin

    Fahmida Afrin

    4 years, 6 months ago

    ||পুনরাবৃত্তি||
    _Fahmida Afrin

    ‘ এই শুনছো? ওঠো, ওঠো! আর কত ঘুমাবে বলোতো? কত বেলা হয়ে যাচ্ছে। ‘
    ‘ উহ আরিফা, শান্তিতে একটু ঘুমাতেও দেবেনা আমাকে ? ‘
    ‘ আরে বাবা শান্তি করেই তো ঘুমাবে এরপর থেকে। এখন তাড়াতাড়ি উঠে ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি নাস্তা রেডি করে টেবিলে রাখছি , দ্রুত আসো। আরে ভালো কাজে দেরি করতে নেই। ‘

    খুব আনন্দের সঙ্গে স্বামী রাহুলকে কথাগুলো বলে গেলো আরিফা।আজকে যেনো তার খুশি আর চেপে রাখতে পারছেনা। খুশি উথলে পড়ছে আজ। এদিকে স্ত্রীর কথা মতো বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হতে চলে গেলো রাহুল। ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করার জন্য এসে চেয়ার টেনে বসে পড়লো রাহুল।

    ‘কই দাও খাবার?এখনো কি হয়নি? ‘

    রান্নাঘর থেকে আরিফা জবাব দিলো
    ‘ এইতো আসছি, হয়ে গেছে। ‘
    ‘ উহ্, রান্না শেষ হয়নি তাহলে এতো দ্রুত আমার ঘুম ভাঙালে কেনো? ধুর ছাই। ‘

    খাবার গুলো টেবিলে রাখতে রাখতে আরিফা বেশ সুন্দর একটা হাসি দিলো। তার হাসিই বলে দিচ্ছে সে কতটা খুশি। আজ বেশ ঘটা করে রাহুলের পছন্দের খাবার গুলো তৈরি করেছে আরিফা। রাহুল এসব দেখে ‘হা’ হয়ে গেছে।

    ‘ তুমি সকাল সকাল এতোকিছু করেছো ! ‘

    ‘ তুমি কী বলোতো? এতোদিনে আমার মনের মতো একটা কাজ করতে যাচ্ছো তুমি,আর তোমাকে এটুকু করে খাওযাবোনা ? আজ যে আমি ভীষণ খুশি। আহ; কী যে ভালো লাগছে বলে বোঝাতে পারবোনা তোমাকে। ‘
    রাহুল খুব মনোযোগ সহকারে খাবার খাচ্ছে, সাথে সাথে বউ এর কথা শুনে মিটিমিটি হাসছে।

    ‘ আচ্ছা হয়েছে, এমন করছো কেনো? একটু শান্ত হয়ে বসোতো। এসো তুমিও খাও। ‘

    আরিফার হাত ধরে টেনে পাশের চেয়ারটায় বসিয়ে প্লেট থেকে খাবার তুলে আরিফাকে খাইয়ে দিলো রাহুল।

    ‘ হিহি,পাপা তুমি মাকে থাইয়ে দিত্তো? ‘

    দরজার পাশে দাঁড়িয়ে বাবা-মায়ের খাবার খাওয়া দেখে হেসে ফেললো রোহান। রাহুল-আরিফার একমাত্র সন্তান রোহান। বাবা, মা ও দাদুর আদরের রোহান। বয়স মাত্র পাঁচ বছর, তবে এই বয়সেই সে বেশ পাকা পাকা কথা বলে,দুষ্টু খুব। ছেলের এমন কথা শুনে দুজনেই হাসি বন্ধ করে রোহানের দিকে তাকিয়ে আছে । রোহান মুখ টিপে হাসছে।

    ‘পাজি ছেলে, আবার মুখটিপে হাসা হচ্ছে? এদিকে এসো। ‘

    রোহান কে কোলে তুলে নিয়ে খাইয়ে দিলো আরিফা।রাহুলও একটু খাইয়ে দিলো ছেলেকে। খাওয়ানো শেষে রোহানকে কোলে থেকে নামিয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে পরম যত্নে মুখ মুছিয়ে দিলো আরিফা।

    ‘ বাবাই,তুমি গিয়ে তোমার দাদুকে ডেকে নিয়ে আসোতো। ‘
    ‘ দাত্তি মা ‘

    রোহান দৌড়ে সোজা দাদুর ঘরে ঢুকে গেলো।দাদু জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে কিছু করছিলেন, রোহান ডাকতেই তিনি ফিরে তাকালেন রোহানের দিকে। রোহান ছোট্ট বাচ্চা হলেও ভেজা চোখ ঠিকই ধরতে পেরেছে।

    ‘দাতু,তুমি কাঁচ্চো ?’

    ‘ না রে ভাই, ও কিছুনা। আয় কোলে আয় ভাই।’

    রোহান দৌড়ে গিয়ে দাদুর কোলে উঠে পড়লো।রাহাত সাহেব নাতিকে জড়িয়ে ধরে আবার চোখের পানি ছেড়ে দিলেন। একটু থেমে থেমে বারবার রাহুলের গালে, কপালে চুমু একে দিলেন। রাহুল হাসছে, দাদুর এমন আদর করা দেখে তার খুব আনন্দ হচ্ছে। খিলখিলিয়ে হাসছে রোহান। তার ডাগর ডাগর আঁখিদ্বয় চকচক করে উঠেছে মুহুর্তেই।

    ‘ হিহিহি,দাতু তুমু দিত্তে হিহি ‘

    ‘ হ্যাঁ রে ভাই, জানিনা আবার কবে তোকে এভাবে বুকে জড়িয়ে আদর করতে পারবো।তাইতো সব আশ মিটিয়ে নিচ্ছি। ‘

    ‘দাতু, ও দাতু!মা ডাকতে ‘

    ছোট্ট হাত দিয়ে খাবার ঘরের দিকে দেখিয়ে বললো রোহান। চোখর পানি মুছে রোহানকে কোলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন রাহাত সাহেব। খাবার ঘরের সামনে যেতেই ছেলে-বউএর হাসির শব্দ শুনতে পেলেন তিনি। দুজনেই খুব আনন্দে আছে মনে হচ্ছে। যতই তাদের হাসি কানে আসছে ততই যেনো বুকের ভেতর কষ্ট বেড়ে যাচ্ছে রাহাত সাহেবের। কিন্তু তিনি কাঁদলেন না।একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ওদের সামনে গেলেন।

    ‘ ওহ তুমি এসেছো বাবা। বসো, দেখো তোমার বউমা কতকিছু রান্না করেছে।খেয়ে নাও। ‘

    নিঃশব্দে এগিয়ে এসে চেয়ারে বসলেন রাহাত সাহেব। নাতিকেও কোলে বসিয়ে রাখলেন। খাবার নিজে মুখে না তুলে নাতির মুখে দিতে যাবেন ওমনি বউমা তাঁকে থামিয়ে দিলো।

    ‘ বাবা! থাক ওকে আমরা খাইয়ে দিয়েছি। আপনিই খান। ‘

    ‘ একটু খাইয়ে দিইনা মা? জানিনা আর পারবো কি-না। এই শেষ বার..’

    আরিফা কিছু বললোনা,বিরক্তিমাখা মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলো। রাহুল ও কিছু বললোনা। রোহান দাদুর কথা বুঝতে পারছেনা, শুধু তাকিয়ে আছে দাদুর ভেজা চোখের পাপড়িগুলোর দিকে।

    জানালা দিয়ে সূর্যকিরণ এসে বৃদ্ধচোখের পাপড়িগুলোকে ছুঁয়ে দিচ্ছে । ভেজা পাপড়িগুলো চিকচিক করছে আলোয়। রোহান হা করে সেটা দেখছে।

    ‘নে ভাই, একটু খা আমার হাত থেকে। ‘

    রোহান ভালো ছেলেটির মতো হা করলো।রাহাত সাহেবের মলিন মুখে এক চিলতে হাসি দেখা গেলো। খাওয়ানো শেষ করে নিজেও কয়েকবার মুখে তুলে নিলেন খাবার।

    ‘ বাবা ঠিক করে খেয়ে নাও, বাড়ির খাবার বলে কথা।’
    রাহাত সাহেব চুপচাপ খাবার খেয়ে নিলেন।
    আরিফা মহানন্দে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ‘বাবা তাহলে তৈরি হয়ে নিন। আপনার ছেলে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসবে এক্ষুনি। ‘

    রাহাত সাহেব কিছুক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে রইলেন।একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রোহান কে কোলে থেকে নামিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ছেলের মুখের দিকে একবার তাকালেন,কেমন নির্বিকার সে! বাবার দিকে চোখ পড়তেই অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো রাহুল। রাহাত সাহেব নিজের ঘরে চলে গেলেন। ঘরে গিয়ে নিজের কয়টা পাঞ্জাবি-পাজামা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলেন। তাঁর ব্যাগে আরো ঠাঁই পেলো কয়েকটি বই, একটি ডায়েরি, একটি কলম ও স্মৃতিস্বরুপ একটি ছবি। বেশ পুরনো ছবিটি, সদ্য বিবাহিত দম্পতির ছবি। ছবিটি রাহাত সাহেব এবং তাঁর মৃতা স্ত্রী রাশেদা বেগমের। তাদের হাস্যোজ্জ্বল মুখগুলো এখনো খুবই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। প্রেমের বিয়ে ছিলো সেটা,দু’জনেই দু’জনকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। আর তাঁদের ভালোবাসার চিহ্ন তাদের একমাত্র সন্তান রাহুল। প্রিয়তমার হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রীর ওপর দু ফোঁটা অশ্রু টপটপ করে পড়ে জায়গা দখল করে নিলো। রাহাত সাহেব দ্রুত সেই অশ্রু মুছে ফেললেন। ছবিতে প্রিয়তমার মুখটা যদি স্পষ্ট আর না দেখা যায় সেই ভয়ে। পেছনে হঠাৎ করেই রাহুল এসে দাঁড়ালো। বাবাকে দ্রুত তৈরি হওয়ার জন্য বলতে এসেছে সে। রাহাত সাহেব চোখ দুটো মুছে ব্যাগটা হাতে নিয়ে বাইরের দিকে হাঁটা ধরলেন।

    বাড়ির বাইরে রাহুলের বিলাসবহুল গাড়িটা রাখা,সেখানে সে আগেই গিয়ে বসে পড়েছে অপেক্ষা শুধুমাত্র রাহাত সাহেবের। তিনিও ব্যাগ হাতে নিয়ে গাড়ির দরজার এপারে দাঁড়ালেন, ভেতর থেকে রাহুল বিরক্তিমাখা স্বরে বললো
    ‘ বাবা কী এমন গোছগাছ করছিলে? এতো দেরি করলে। জানোনা আমার অপেক্ষা করতে ভালো লাগে না।’

    রাহাত সাহেব মাথা নিচু করে গাড়ির পেছন সিটে গিয়ে বসে পড়লেন। এদিকে রোহান বায়না জুড়েছে সেও দাদুর সাথে যাবে, কান্নাকাটিও করছে খুব। দৌড়ে গাড়ির পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো রোহান। আরিফা রেগে এক থাপ্পড়ও বসিয়ে দিয়েছে গালে, বেচারা আরো বেশি কাঁদছে এইজন্য। রসগোল্লার মতো গালদুটো টমেটোর মতো লাল হয়ে গেছে। গাড়ির ভেতর থেকে রাহাত সাহেব নাতির কান্না দেখে আর সইতে পারছেন না। মুখটা জানালার কাছে নিয়ে এসে আরিফাকে ডাকলেন তিনি।

    ‘ বউমা! ওকে মেরোনা। আমি ওকে বুঝিয়ে বলছি। দাদু ভাই রে! এমন করিসনা ভাই। তুই তোর বাবা মায়ের সঙ্গেই থাক। আর কাঁদছিস কেনো বোকা? আমার সাথে তোর আবার দেখা হবে তো, তখন অনেক আদর করবো। এখন কান্না থামা ভাই।

    ‘ দাতুর সাতে দাবো,দাবো।’

    বারবার একি কথা বলছে রোহান।
    রাহুল বিরক্তবোধ করছে এসব দেখে।

    ‘ বাবাই, কান্না করোনা। তোমাকে নিয়ে আমরা ঘুরতে যাবো বিকেলে। ঠিক আছে? ‘ রোহান কান্না থামালো, বেড়ানোর কথা শুনে। হেসে বললো, ‘দাবো!’

    ‘আচ্ছা বাবাই তাহলে যাই?’

    গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লো রাহুল। রাহাত সাহেব শেষ বারের মতো হাজারো স্মৃতিমাখা এই বাড়িখানার দিকে তাকালেন। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়িতে! সেই প্রথম স্বামী-স্ত্রী একসাথে এই বাড়িতে এসেছিলেন। রাহুলও জন্মেছে এই বাড়িতেই। গুটিগুটি পায়ে পুরো বাড়িতে ছুটে বেড়াতো ছোট্ট রাহুল। আর রাহুলের মা খাবার হাতে নিয়ে রাহুলের পিছুপিছু ছুটতো। স্বামী-স্ত্রী দুজন মিলে একমাত্র আদরের সন্তানকে খাইয়ে দিতেন। রাহুল বড় হলো, পড়াশোনা শেষ করলো,চাকরি পেলো আর বিয়েও করলো।
    তারপর,একসকালে রাহুলের মা চলে গেলেন না ফেরার দেশে । অবশ্য শেষ সময় গুলো খুব কষ্টে কাটিয়েছেন তিনি। ছেলেবউ এর আচরণে খুব কষ্ট পেতেন। স্ত্রী মারা যাবার পর রাহাত সাহেবের জীবনের আকাশে
    কষ্টের কালো মেঘ আরো চিরস্থায়ীভাবে বাসা বেঁধে ফেললো। দীর্ঘ ৩৫টা বছর সুখে সংসার করেছেন এই বাড়িতে। যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিলো ততক্ষণ বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকলেন তিনি।

    ______________________

    রাহুল গাড়ি থামালো। গাড়ি থেকে নেমে বাবাকেও নামতে বললো। রাহাত সাহেব বাইরে বেরিয়ে এসে প্রথমেই বড় গেইটটার দিকে তাকালেন।

    বড় বাড়িটার সামনে গেইটের সাথে ঝুলছে বিশাল এক বোর্ড, বোর্ডে বড় করে লেখা ‘আপন নিবাস বৃদ্ধাশ্রম ‘

    ভেতরে গিয়ে সব কাজ মিটিয়ে রাহাত সাহেবের ব্যাগটা এক হাতে নিয়ে আরেক হাতে রাহাত সাহেবের হাত ধরে একটা ঘরের দিকে নিয়ে গেলো রাহুল।

    ‘ এইযে বাবা, তোমার নতুন ঘর। দেখো তোমার কোনো অসুবিধা হবেনা এখানে। আর মাসে মাসে সব খরচের জন্য টাকা আমি পাঠিয়ে দেবো। আর তোমার একাকীও লাগবেনা, এইযে দেখো তোমার মতো আরো কতজন আছেন এখানে।’

    ‘ আর তুই? তুই আসবি আমার সাথে দেখা করতে? ‘

    ‘ আহ বাবা! আমার ওতো সময় কোথায়? তুমি জানোনা আমি কাজে কত বিজি থাকি? ইন্জিনিয়ারদের এতো ফালতু সময় কোথায়? আচ্ছা ঠিক আছে, কখনো সময় পেলে চেষ্টা করবো এখানে আসার।’

    রাহাত সাহেব মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
    ______

    ভগ্ন হৃদয় নিয়ে অঝোরে কাদঁতে কাঁদতে ধপ করে বসে পড়লেন রাহাত সাহেব।
    দরজা দিয়ে পথ দেখা যাচ্ছে, পথ ধরে রাহুল সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দুর থেকেও যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিলো রাহুলকে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাহাত সাহেব তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিলেন। অঝোরে চোখর পানি ফেলতে ফেলতে নিজের কৃতকর্মের কথা ভাবছেন তিনি।
    কেনোই বা তার স্থান আজ বৃদ্ধাশ্রমে হবেনা? এতো তার কর্মেরই ফল। পাশে থেকে একজন বৃদ্ধ এগিয়ে এসে রাহাত সাহেবসে ধরলেন।

    ‘ কাঁদবেন না এভাবে। নিজেকে সামলান। কেঁদে আর কী হবে বলুন? বাবা-মায়ের চোখের পানির দাম যদি এসব সন্তানদের কাছে থাকতো তাহলে কি আর আজ আমরা এইখানে থাকতাম? ‘

    চোখের পানি মুছে লোকটির দিকে তাকালেন রাহাত সাহেব। কান্নামিশ্রিত কন্ঠে তিনি বললেন,

    ‘কী করে দাম দেবে ভাই? আমি নিজেই কি দাম দিয়েছিলাম? যে, আজ আমার ছেলে আমার চোখের পানির দাম দেবে। ‘

    পাশে বসা বৃদ্ধটি ভ্রুু কুঁচকে রাহাত সাহেবের দিকে তাকালেন। উনার কথাগুলো বৃদ্ধটি ঠিক বুঝতে পারছেননা। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন শুধু

    ‘ আজ, আজ বাবার কথা খুব মনে পড়ছে ভাই।
    একই ঘটনা ঘটেছিলো ৩০বছর আগে।ঠিক এইভাবেই আমিও আমার বৃদ্ধ বাবাকে ত্রিশ বছর আগে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে গিয়েছিলাম। হয়তো বাবারো এভাবেই বুক ফেটে যাচ্ছিলো সেদিন যেদিন আমি বাবাকে নির্দয়ভাে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে এভাবেই চলে গিয়েছিলাম। হয়তো সেদিন বাবাও স্মৃতিভারাতুর চোখে বাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হয়তো উনিও ঘরের এক কোণে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছিলেন। হয়তো উনিও এভাবেই আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন যখন আমি উনাকে ফেলে চলে যাচ্ছিলাম। সেদিন আমিও আমার বাবার চোখের দিকে ফিরে তাকাইনি ।বাবার অশ্রুর কোনো মূল্যই দিইনি। আর আজ আমার সন্তানও তাই-ই করলো! ‘

    বৃদ্ধলোকটি রাহাত সাহেবের দিকে তাকিয়ে ছিলেন এতোক্ষণ। চুপচাপ সব শুনছিলেন।এবার উনি মুখ খুললেন।

    একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লোকটি বললেন, ‘এগুলো তো হওয়ারই ছিলো। আমরা যে যেমন কর্ম করবো তেমন ফলই ভোগ করবো। বাবা মায়ের অশ্রু ঝরেছে আমাদের জন্য। আর এসবই হচ্ছে তার কিফারাহ্। এই জীবন দিয়ে এইটুকু অভিজ্ঞতা হলো! আমরা কারোর সাথে অন্যায় করে ভাবি যে পার পেয়ে যাবো। কিন্তু আসলে সেটা হবেনা, আমরা আজ কারোর সাথে যে অন্যায়টা করবো কাল একই অন্যায় আমাদের সাথেও হবে। যে-কোনভাবেই হোক, আমরা আমাদের অন্যায়ের শাস্তি ঠিকই পাবো। ‘

    রাহাত সাহেব কোনো কথা বললেন না। মাথা নিচু করে বসে রইলেন।বৃদ্ধটি উনার কাঁধ চেপে ধরলেন।

    ‘ কিছু করার নেই ভাই, কর্মফল ভুগতেই হবে।আসুন নামাজে যাই, ওইতো আজান হলো। ‘

    _____________________

    ‘ চলে এসেছো! আহ্ আমার যা আনন্দ হচ্ছে রাহুল তোমাকে কী বলবো! আপদ বিদায় হয়েছে। ‘

    ‘ আহা আরিফা এভাবে বলোনা, উনি তো তোমার শ্বশুড় হন তাইনা? ‘
    ‘ বাদ দাও তোমার ন্যাকা ন্যাকা কথা। ‘

    রোহান ও মা-বাবার কাছে চলে এলো

    ‘ পাপা, ও পাপা দাতু কই? ‘

    ‘ বাবাই, তোমার দাদুকে আমি উনার বন্ধুের বাড়িতে রেখে এসেছি। এখানে তো তোমার দাদুর কোনো বন্ধু ছিলোনা। উনি একা থাকতেন তাই উনাকে উনার বন্ধুদের কাছে রেখে এসেছি। ভালো করেছি তাইনা বাবাই? ‘

    ‘দাতুর বনতু! হাহা৷ আত্তা পাপা, তুমি যখন দাতুর মত বুড়ো হবে, তোমাকে আর মাকেও তোমাদের বনতুর কাছে রেখে আসবো। হিহি! হিহি! ‘

    রাহুল ও আরিফার হাসি বন্ধ হয়ে গেলো মুহুর্তেই! ছেলের কথা শুনে মুখ কালো করে একে অন্যের দিকে তাকালো দুজনেই ।

    ___ সমাপ্ত ___
    [ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন দয়া করে🙏, আমি নতুন লেখালেখি জগতে। সকলে পড়বেন এবং কোনো পরামর্শ / উপদেশ থাকলে দেবেন।]

    10
    8 Comments

Friends

Skip to toolbar