Profile Photo

প্রদীপ্ত দে চৌধুরীOffline

  • Pradiptadey12006024
  • *শেষের শুরু

    পড়ন্ত বিকেল। সমুদ্র সৈকতে কাঠের লম্বা ইজিচেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে আছি। চেয়ারটার সামনের দিকে বসা প্রৌঢ় এক নারী। অনেকক্ষণ ধরে দুজনে বসে আছি। কোন কথা নেই- তাতে খারাপও লাগছে না। যতদিনই দুজনার সাথে দেখা হয়, এরকমই চুপচাপ বসে থাকি।

    “বাবু, রেবু আন্টি! তোমরা এখনো বসে? সি বীচে কি বসে থাকতে এসেছ?” তেইশ বছরের এক যুবতী বলতে বলতে ছুটে আসে আমাদের দিকে।

    আমি তাকিয়ে বললাম, “এই বয়সে কি আর দৌড়াদৌড়ি ভালো লাগে-”
    তরুণী চোখ বড় বড় করে বলল, ” কি বললে বাবু?”

    “আরি বাপরে, না না কিছু না, আসছি “- হেসে হেসে বললাম আমি। চেয়ারের পাশে রাখা লাঠিটায় ভর করে দাঁড়িয়ে গেলাম।
    “এইতো ঠিকাছে,” তারপর রেবু আন্টির দিকে তাকিয়ে বললো, “আন্টি, এসো তুমিও এসো!”

    দুজনেই উঠে পড়লে আমি থেমে বললেন, “রাইসা, তোর জামাই কোথায়? দেখছি নে”

    রাইসা হেসে বলল, ওইতো বাবু, ওই যে ওদিকে দাঁড়িয়ে আছে।

    রাইসা আমায় বাবা না ডেকে বাবু কেন ডাকে, কাছের অনেকে সেটা মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে। রাইসা তখন ক্লাস ফাইভ না ফোরে পড়ে। সারাদিন এদিক ওদিক ছুটে বেড়াতো, পড়তো না বলে মাঝে মাঝে রাগ করতাম। এরকম একদিন রাগ করে বললাম, ” যা, তোর সাথে আর কথা নেই!”
    রাইসা কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “বাবা!”
    আমি মুখ বাঁকিয়ে বললাম, “এই বাবা ডাকবি না আর আমাকে!”
    রাইসা গলা জড়িয়ে বলল, “আচ্ছা তাহলে বাবু ডাকি?”

    সী বিচে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ঘটনাটা মনে পড়ে যাওয়ায় হাসি পেয়ে গেল। বুড়ো বয়সে একটা বাতিক ধরেছে, ক্ষণে ক্ষণে পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়।
    রেবতীর দিকে তাকালাম, আমার পাশাপাশি সেও ঠিক চুপচাপ হাঁটছে। একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞাসা করলাম, “রেবতী, সি বীচ তোমার ভালো লাগছে তো!”

    রেবতী দ্রুত বলতে থাকে, “হ্যা হ্যা, অনেক সুন্দর লাগছে, অনেক দিন পর এসেছি তো-” তারপর আবার চুপ!

    রেবতী আগে এত চুপচাপ ছিল না। ভার্সিটিতে পড়াকালীন সময়ে বিয়ে হয়ে যায় রেবতীর। কয়েক বছর পর একটা ফুটফুটে মেয়েও আসে। কিন্তু বিধাতার ভাগ্য খন্ডায় কে! রেবতী ও তার স্বামী একদিন অফিস থেকে ফিরতে গিয়ে ভয়াবহ এক্সিডেন্টের মুখোমুখি হয়। রেবতীর স্বামী ওখানেই মারা যান, রেবতী বেঁচে যায়, তবে খুব খারাপ অবস্থা নিয়ে। আইসিউতে ভর্তি হয়, তারপর কোমায় চলে যায়। এক-দুই দিন নয়, পুরো আট বছর কোমায় ছিল রেবতী!

    হঠাৎ পানির ছিটে গায়ে লাগতেই ভড়কে গেলাম। “রাইসা! আমায় পানি মারছিস? দাঁড়া!” এই বলেই ছুটতে ছুটতে কয়েক মুঠো পানি হাতে নিয়ে রাইসার দিকে ছুড়ে ফেললাম।
    রেবতী কেবল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাপ মেয়ের কাণ্ড দেখে হাসতে লাগল।
    রাইসা হাসতে হাসতে বলছে, ” বাবু, সাবধান! তোমার ওই বিষম উদর নিয়ে এত দৌড়িও না! কখন উলটে পড়বে!”

    আমি বললাম, ” রাইসা! এই পেট নিয়ে কিছু বলবি না! এ আমার পৈতৃক সম্পত্তি-”

    মুখ উলটে রাইসার জবাব, “এহ নড়াচড়া করো না, আবার পৈতৃক সম্পত্তি! ওই দেখো রেবু আন্টিরে, এই বয়সেও কত ফিট, উহু!”

    রেবতী স্রেফ হেসে যায়।

    বিকেল গড়ায়, কিছুটা খাওয়া দাওয়া পরে সবাই ইজিচেয়ারে বসে বসে গল্প করে। খানিক পরে রাইসা তার জামাইকে নিয়ে কেনাকাটা কর‍তে চলে যায়। যাবার সময় রেবতীকে জিজ্ঞেস করে, “রেবু আন্টি, তোমার জন্য একটা ঝিনুকের মালা আনবো, ঠিকাছে?”

    আমি মুখ ফিরিয়ে বললাম, “হ্যা, আমি তো বানের জলে ভেসে এসেছি, আমার জন্য তো কেউ কিছু আনবে না-”
    -তোমার জন্য কি আনবো, সারাদিন তো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পড়ে ঘুরে বেড়াও- আচ্ছা আনবো নে! তারপর যেতে যেতে বললো,” রেবু আন্টি, যাচ্ছি ঠিকাছে?”

    রাইসা রেবতীকে রেবু আন্টি বলে ডাকে, যদিও তার আজকে… মা বলে ডাকবার কথা। হ্যা, রাইসা রেবতীরই মেয়ে। রেবতীর দুর্ঘটনার খবর শুনে যখন প্রথম হাসপাতালে গেলাম, রাইসা তখন তার চাচা- চাচীর কোলে বসে কান্না করছিল। রাইসাকে কে রাখবে- এই নিয়ে চাচা-চাচীর মধ্যে ঝগড়াঝাটি শুনতে পাচ্ছিলাম। ছোট্ট রাইসার দিকে একপলক তাকিয়েই কি ভেবে যেন সাহস সঞ্চার করে তাদের সামনে গিয়ে বলে ফেললাম, “আমি রাখবো রাইসাকে!”

    রাইসার চাচা-চাচী সাথে সাথে দিলেন না, কিন্তু ছয় মাস যাওয়ার পরও যখন দেখলেন, রেবতী কোমা থেকে উঠতে পারছে না- রাইসার ভরণপোষণের দায়িত্ব তখন আমায় দিয়ে দেওয়া হয়।
    আমি তখন তরুণ, একটা মেয়েকে কিভাবে বড় করে তুলতে হয়- তার কোন ধারণা আমার ছিল না। শত প্রতিকুলতায়ও দাঁতে দাঁত চেপে হাসিমুখে রাইসাকে বড় করে তুলে তাকে যখন বিয়ের আসরে বসালাম, সেদিন মনে পড়ল – আমার নিজেরই বিয়ে করাটা হয়নি!
    অসুখ সেরে পুরোপুরি ঠিকঠাক হয়ে রেবতীর সাথে প্রায় বারো বছর পর দেখা হয়। আমার একটা প্রচন্ড ভয় ছিল, রেবতী যদি রাইসাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে নেয়, তাহলে আমি বাঁচবো কি আশায়? কিন্তু সেরকম কিছু হয়নি, রেবতী শুধু মাঝে মাঝে রাইসাকে দেখবার অনুমতি চায় আমার কাছে!

    রাইসা চলে আসে, তারপর একটা ঝিনুকের মালা রেবতীর গলায় পরিয়ে আমায় জিজ্ঞেস করে, ” দ্যাখো তো, কেমন লাগে রেবু আন্টিকে?” আমার হুট করেই মুখটা মলিন হয়ে যায়, আমার মনে হয় আমি সেই বিশ পচিশ বছর আগের রেবতীকে দেখছি। অনেক কষ্টে বলি, “ভালো দেখাচ্ছে!”

    রাইসা আমার হাতে একটা ব্রেসলেট পরিয়ে দেয়, আমি অন্যমনস্ক হয়ে থাকি। আমার কেবলই মনে হতে থাকে সেই দিনগুলোর কথা, রেবতী আর আমি – একই ব্যাচে পড়তাম। কতদিন তাকে অগোচরে, লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা হয়েছে- তার ইয়ত্তা নেই! দুজন দুজনে কথা হয়েছে অনেকবার, কিন্তু “রেবতী ভালো লাগে তোমায়” কখনো বলা হয়নি! কত কত দিন সাহস করে সামনে দাঁড়িয়ে কথাটা বলবার জন্য আকুতি করেছিলাম, কিন্তু বলা হয়নি। একটাসময় শুনি, বিয়ে হয়ে যাবে রেবতীর। দমে গেলাম আমি, আর কথা হয়নি রেবতীর সাথে।
    তারপরের কথাটা হয় বারো বছর পর যখন রেবতী মাঝে মাঝে রাইসাকে দেখা করবার জন্য বলছিল আমায়।

    সূর্যটা তখন নিভু নিভু প্রায়। লাল একটা আলো দিগবিদিক ছড়িয়ে যেন এক অদ্ভূত স্নিগ্ধ করে তুলছে সবদিকে। রাইসা আর তার জামাই দুজনে এখনো সৈকতজুড়ে হাঁটাহাঁটি করছে। রেবতী তাকিয়ে আছে তাদের দুজনার দিকে- চুপচাপ!

    সূর্যের লাল আলোটা রেবতী আর তার ঝিনুকের মালার উপর পড়ছিল। হঠাৎ করেই তাকে যেন সেই বিশ বছর আগের ভার্সিটি পড়ুয়া তরুণী রেবতীর মতো ঠেকে। আর আমি- ভার্সিটির এক কোণে চুপি চুপি দেখতে থাকা সেই মুগ্ধ তরুণ।

    আমি মৃদু স্বরে ডাকলাম, “রেবতী-”

    “হুম?” রেবতীর ছোট্ট জবাব।

    বার কয়েকবার চোখের পলক ফেলে, কাপা স্বরে আমার প্রশ্ন, “আমায় বিয়ে করবে?”

    6
    7 Comments
    • অসাধারণ লেখা। বয়সের সাথে সাথে স্মৃতির ডাইরিটা মোটা হয় লাল নীল গল্পে ভরা প্রতিটি পৃষ্ঠা সমুদ্র তটে বসে পড়ার এক অদ্ভুত আনন্দ। খুব সুন্দর।

    • অপুর্ব গল্প। বাক্যের সুন্দর বিন্যাস। লিখে যান।

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 04 May 2021 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তুলতে সহায়তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 05 July 2022 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 05 April 2023 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 15 October 2024 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন। আপনার এই লেখাটি আজ 29 July 2025 তারিখে ‘এডিটর’স চয়েস’ হিসাবে নির্ধারিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং আপনার চমৎকার কোয়ালিটির লেখা শেয়ার করে মঞ্চকে একটি সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে গড়ে তোলাতে আপনার অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

Friends

Skip to toolbar