Profile Photo

বিজয় দেবOffline

  • LetWrit
  • Profile picture of বিজয় দেব

    বিজয় দেব

    4 years, 4 months ago

    ১৯৯৭ সাল,
    যশোর, কালীগঞ্জ, রায়পাড়া। গত ২টা দিন এখানে কাটাচ্ছি। প্রথম দিনটা ভালোই কেটেছে। আরো কিছ ুআত্মীয় নিয়ে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ালাম, মনিহার সিনেমা হলের অনেক নাম শুনেছি। এর পর্দা নাকি বিশাল, দেখে তেমনই মনে হলো। প্রকৃতি দেখা, দল বেঁধে ছবি তোলা আর বিয়ের অনুষ্ঠানে আসা অন্যান্যদের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় কাটছে।
    নিজেকে বন্দি মনে হতে লাগলো সন্ধ্যা নামার পর থেকে। ৮টার মধ্যে রাতের খাবার শেষ করে গৃহস্থরা ঘুমের ব্যবস্থা করেন। তাঁরা খুবই ভোরে ঘুম থেকে উঠেন। কিন্তু আমরা বেনিয়মে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, যতদূর মনে পড়ে স্বেচ্ছায় কখনই রাত ১টা ২টার আগে ঘুমুতে যাই না। কিন্তু এখানে ৮টার পর থেকে চারদিক নিরব হতে শুরু করে। আমরা যারা ঢাকা থেকে এসেছি তারা তাস নিয়ে বসলাম। ৮টায় ঘুমানো তো অসম্ভব। মেয়েদের কথা আলাদা। সত্যি, তারা যেকোন ভাল কিছুর সাথে সুন্দর মিশে যেতে পারে। যত সমস্যা আমাদের মধ্যে।
    যাই হোক, প্রায় ঘন্টা দুই খেলার পর এক ঘেঁয়েমি লাগতে লাগলো। তাস খেলা ফেলে বাইরে থেকে একটু হেঁটে আসি মনে করে যেই উঠোন পেরিয়ে বাইরে বেরুতে যাবো তখনই ৮-১০ কুকুরের দল একসাথে ডেকে উঠলো। রাত এখানে খুবই নিরব হয়। যাকে বলে পিত পতন নিরবতা। এই বাড়ি তো অবশ্যই আশে পাশের বাড়িগুলোতেও আলো জ্বলতে দেখতে পেলাম। মূহুর্তেই বিভিন্ন বাড়ি থেকে লোকজন জড়ো হতে থাকলো। ভয় পাওয়ার মতো বা অন্যায় কিছু তো করিনি । যেসব বাড়ি থেকে লোকজন আসতে লাগলো তাদের কারো হাতে আলো আর বেশির ভাগ মানুষের হাতে লাঠি-সোটা। একসাথে এতোগুলো কুকুরের ডাক নিস্তব্ধ একটা এলাকাকে জাগিয়ে তুলতেই পারে আর মূহুর্তের জন্য হলেও আমরা চমকে উঠতেই পারি। এই কারণে এতো লোক লাঠি-সোটা হাতে এগিয়ে আসছে কেন বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল। আমরা কিন্তু কেউ কুকুরের ডাক বা লোকজন থেকে ভয়ে পালানোর চেষ্টা করিনি বরং আমাদের কারো হাতে গাছের মোটা ডাল আর কারো হাতে ইটের টুকরো উঠে এসেছিল।
    দলবদ্ধ লোকজন কাছে আসতে আসতে পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিলাম। আমরা নিশ্চিন্ত বোধ করলাম। পরিচিত মুরুব্বীরা আমাদের দেখে শুরু করলেন ঝাড়ি। আমাদের মুখে কথা নেই। অপরিচিত মুরুব্বীগুছের একজন কাছে এসে বললেন ” তোমরা মাস্টার বাড়িতে এসেছো? ” বললাম ”জ্বী”। তিনি বুঝালেন ” সদর রাস্তা আলাদা কথা, গ্রামের ভেতর দিয়ে একদল অপরিচিত মানুষ এতো রাতে হেঁটে গেলে কুকুরগুলো ডেকে উঠে, এমন খুব কমই হয়। তখন আমরা বুঝতে পারি চোর-ডাকাত এলো বোধ হয়। তোমরা গ্রামের বাইরে যেতে পারো নি তাই রক্ষা, চর এলাকার পাশের যারা বাসিন্দা তারা ২০-৩০ ফুট দূর থেকে বল্লম ছুঁড়ে শরীর এপার-ওপার করে দিতে পারে।”
    আর কিছু শোনার প্রয়োজন ছিল না। বিব্রত, লজ্জিত আর একই সাথে বিরক্ত হয়ে ঘরে ঢুকলাম। এদিকে বাড়ির মুরুব্বীরা বকাঝকা করে যাচ্ছে। এর কোন উত্তর দিতে পারছি না। বাধ্য হয়ে শুয়ে পরলাম, কিন্তু ঘুম এলো না। ৫-৬ ঘন্টা এভাবেই বিছানায় শুয়ে নিজেরা কথা বলছিলাম। একজন বলল- ”সকালে সামনে যে কয়টা কুত্তা পরবো শালাগো ঠ্যং ভাইঙ্গা ফালামু”। আমরা কিছু বললাম না। কারণ যে বলেছে সে তো অবশ্যই আমরাও জানি এটা করা সম্ভব না। গ্রামের মানুষ কুকুরদের ক্ষতি হতে দেবে না। এভাবে কথা বলতে বলতেই আশে পাশে মানুষের কণ্ঠ পেলাম। অর্থাৎ ভোর হচ্ছে। উঠে বাড়ির বাইরে এলাম। এবার তো ঘুরে আসতে পারবো। দু’তিন ঘন্টা ঘুরাঘুরি করে উন্মুক্ত বিশুদ্ধ বাতাসে নিকোটিন মিশিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরে এসে দিলাম ঘুম। তখন ৬টা কি ৭টা বাজে।
    আজই বিয়ে। দুপুর দুটোর দিকে ঘুম থেকে উঠেছি। খাওয়া দাওয়া সেরে লেগে পরলাম আনন্দ আয়োজনে। দূরুন আনন্দে কাটলো সময়। বিয়ে শুরু হবে রাত ১২টায়। বিকেল থেকেই উৎসব। সবচেয়ে আকর্ষণ করছিল সন্ধ্যার পর থেকে মাইকে গান। কতো বার শোনা গান, টুইটর দেয়া স্পিকারে- রাতের নীরবতায়। কিন্তু এই ভালো লাগার সাথে সেটার তুলনা অসম্ভব। অতিথিদের খাবার দেয়ার দ্বায়িত্ব আমাদের হাতে। বিয়ের অনুষ্ঠানে খাবার সার্ভ করাও একটা মজার ব্যাপার। এভাবেই বিয়ের সময় হয়ে এলো। সবাই উঠোনের মাঝখানে কলাগাছ দিয়ে তৈরী করা স্টেজের (মন্ডপ) সামনে। আমি চেয়ার নিয়ে একটু দূরে বসে মাইকে গান চালালাম। জগন্ময় মিত্র গাইছেন ”…তুমি কি এখন দেখিছো স্বপন…” এই পরিবেশে গানটা সমস্ত মনকে যেন নতুন অনুভূতিতে ভরিয়ে দিল।
    বেশ কিছুক্ষন পর একটা সাহসের কাজ করলাম। বাড়ি থেকে বেরুলাম, একাই। আজ গ্রামটা নিস্তব্ধ নয়। মানুষের কণ্ঠস্বর, মাইকে গান। বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোক এসেছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটু দূরে একটা রাস্তা, রাস্তাটা উঁচু মাটির তৈরী।। গ্রামের ভেতরে রাস্তাটা এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামের সাথে সংযোগ ঘটিয়েছে। চাঁদের অল্প আলোতেও আশে পাশের দৃশ্য কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম। সেই আলোতেই উচু রাস্তাটায় উঠলাম। দারুণ ব্যাপার। অনেক গল্প উপন্যাসে পড়েছি রাত রহস্যময়, দিনের আলোর পরিচিত দৃশ্যটাও রাতে রহস্যময় হয়ে উঠে। সত্যিই তাই। চারদিকের গাছপালা, যতদূর চোখ যায় মাটির রাস্তাটাকে আর নিচের বাড়িগুলোকেও অদ্ভুত অপরিচিত মনে হলো। একটু সামনে একটা দিঘি আছে। দীঘিতে পানি নেই, গাছপালায় ভর্তি। ভাবলাম দীঘির পাড়ে গিয়ে বসি। সিগারেটে আগুন ধরিয়ে দীঘির দিকে এগিয়ে গেলাম।
    পৃথিবীতে যতো সুন্দর দৃশ্য আছে তার সবটাই প্রকৃতিতে। কোন কোন সৌন্দর্য্য মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়। মুখে ভাষা থাকে না। মোহময় আর সম্মোহিত করে দেয় সে সৌন্দর্য্য। প্রাকৃতিক সেসব সৌন্দর্য্য অনেক দেখেছি, কোনটা ক্যামেরায় আবার কোনটা মনের ফ্রেমে বন্দি। তুলনাহীন সেসেব সৌন্দর্য্য। আমি হাঁটতে হাঁটতে দীঘির পাড়ে এসে দাড়িয়েছি। তারপর থেকে আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। দৃষ্টি দীঘির গভীরে গাছপালার জঙ্গলে আটকে গেছে। দীঘিতে আলো খেলা করছে। মনে হলো দীঘিতে আগুন লেগেছে। সে আগুন কখনও দীঘির পাড় ঘেসে উপড়ে উঠছে আবার নিচে নেমে যাচ্ছে। আবার এক জায়গায় জড়ো হয়ে কখনও নীল, কখনও হলুদ বিভিন্ন আলো ছড়াচ্ছে। আলো- অনেক অনেক আলো জ্বলছে নিভছে। দৃশ্যটা যখন দেখছি তখন আমি আমার মধ্যে নেই। মনে হচ্ছে আশে পাশে আর কিছ নেই, আমি আর সামনের সেই কোটি কোটি বিন্দু বিন্দু আলোর জ্বলা নেভা ছাড়া।
    কখন যে দীঘির পাড় বেয়ে নিচে নেমে এসেছি বুঝতে পারি নি। গাছপালার জঙ্গল কোন বাঁধা বলে মনে হয় নি। আলোর বিন্দূরা তখন আমার গায়েও এসে পড়ছে। স্কুলের কোন ক্লাসে একটা কবিতা পড়েছিলাম, কবি বা কবিতার নাম মনে পড়ছে না। সে কবিতার কয়েকটা লাইন এরকম-
    …হাঁসি হাঁসি মুখটি নিয়ে
    তোমরা এলে কারা,
    তোমরা কি ভাই নীল আকাশের তারা?

    আলোর পাখি নাম জোনাকি
    জাগি রাতের বেলা
    নিজেকে জ্বেলে এই আমাদের
    ভালবাসার খেলা।
    তারা নইকো, নইকো তারা
    নই আকাশের চাঁদ
    ছোট্ট বুকে আছে শুধু
    ভালবাসার সাধ…

    কোটি কোটি জোনাকির আলোয় আমি কতোটা বিমোহিত বা সম্মোহিত হয়েছি তা ব্যাখ্যা করতে পারবো না। আজ ঢাকায় ফিরে যখন এই লেখাটা লিখছি তখনও চারদিন শূন্য মনে হচ্ছিল। আবার যখন নিজের মাঝে ফিরে আসছি তথন মনে হচ্ছে কি যেন নেই। কি যেন হারিয়ে ফেলেছি। বলতে খারাপ লাগছে না যে, এই সময়টা চোখে কখন জল আসে বুঝতে পারি না।
    যাই হোক, ভোরের দিকে আত্মিয়-স্বজনেরা আমাকে দীঘির মাঝখান থেকে তুলে নিয়ে আসে। আমি তখন আর কোন আলো দেখতে পাচ্ছিলাম না। ঘোর তখনও কাঁটেনি আমার, শুধু দিদির কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছিলাম, কান্না জড়িত কণ্ঠে দিদি বলছে ডাক্তার ডাকতে।
    সেদিন দুপুরে যখন আমার ঘুম ভাঙ্গে তখন সবাই বলছিল আমার শরীরে প্রচণ্ড জ্বর ছিল। সবাই ধারণা করেছিলেন সাপ বা বিষাক্ত কিছু কামড়েছে। পরে ডাক্তার নিশ্চিত করেছেন যে বিষাক্ত কিছু কামড়ায়নি, ভয় অথবা কুয়াশায় ভিজে জ্বর আসতে পারে। তবে কুয়াশায় ভিজে এতো জ্বর আসার কথা না। তিনি এখন ভয়ের কিছু নেই বলে গিয়েছেন। আমার এসব কিছু মনে নেই। বাড়ির মানুষেরা জানতে চাইছিল ”দীঘির মাঝখানে কিভাবে গেলি মনে আছে”। আমি বলেছিলাম ”আছে, আমি নিজেই নেমিছি।” কিন্তু কেউ বিশ্বাস করলো বলে মনে হলো না।
    সেদিনই আমরা ঢাকায় চলে আসি। সবার ইচ্ছা ছিল আরও কয়টা দিন থাকার কিন্তু কোন এক অজানা আশংকায় সবাই চলে আসাই ঠিক করলো। আমি অনেক অনুরোধ করলাম আজকের রাতটা থেকে পরের দিন যেতে। আমি দীঘিতে জোনাকির আলো দেখছিলাম, জ্বর এলো কিভাবে জানি না। আজ রাতটা আবার দেখবো, তোমাদেরও দেখাবো। কিন্তু কেউ পাত্তা দেয়নি আমার কথা। সন্ধ্যার দিকে সেই দীঘির পাড় দিয়ে ভ্যানে করে আমরা বাস স্টেশনে যাচ্ছি। দীঘিতে তাকিয়ে আছি আমি, সেই থেকে শূন্যতা শুরু। যেতে যেতে আরও কয়েকবার অনুরোধ করলাম, কিন্তু দিদির ধমক এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে মার খাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল।
    সেই রাত- জোনাকীদের সাথে কাটানো রাতটা সারা জীবনের জন্য মনের বাড়ি মস্তিস্কের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে নিয়েছে। হঠাৎ কখনও সে অংশটা সক্রিয় হয়ে উঠলে বাকি সব শূণ্য অর্থহীন মনে হয়। জীবনটা যেন মায়ার জালে আটকে পড়েছে।

    পূনশ্চ: ২০০২ সনে, যখন আমার কোথাও যেতে আর অনুমতির প্রয়োজন হয় না, তখন আমি গিয়েছিলাম রায়পাড়া। কাঁচা রাস্তাটা পাঁকা হয়েছে। দীঘি ছোট হয়ে ছোট পুকুরে পরিণত হয়েছে, সে পুকুরে টলটল করছে জল।পুকুর পাড়ের অদূরেই চারদিকে গড়ে উঠেছে জনবসতি। সেদিন রাত পর্যন্ত থাকার আর অপেক্ষা করিনি। এক রাতে যা দেখেছিলাম যা অনুভব করেছিলাম সেটা মনের ওই অংশটাই লালন করবে সারা জীবন। হয়তো কোন এক রাতে, কোন এক গ্রামের দীঘিতে আবার দেখতে পাবো সেই আলো। জোনাকীদের জন্য একজন অতি সাধারণ মানুষ অপেক্ষা করে আছে, থাকবে সারা জীবন -এ্ই খবরটা যদি জোনাকি মহলে একবার পৌছে দেয়া যেত !!

    5
    3 Comments
    • যুদ্ধস্মৃতি সতত স্মরণীয়। লিখে রেখে যাও। অভিনন্দন।

    • চমৎকার স্মৃতিগল্প! মাঝের কবিতাটিও খুব ভালো লাগল। আরো পড়তে চাই এমন প্রাণবন্ত লেখা। শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন।

    • সুন্দর একটা স্মৃতিচারণ। শুভেচ্ছা।

Friends

Profile Photo
Shubha-Jit-Datta
@shubha-jit-datta
Profile Photo
charumannan
@charumannan
Profile Photo
m. rashiduzzaman
@m-rashiduzzaman
Profile Photo
Joyanta Nath Prokash
@prokash840
Profile Photo
[email protected]
@mh7522677gmail-com
Profile Photo
Fahmida-Reea-Fahmida-Reea
@fahmida-reea-fahmida-reea
Skip to toolbar