Profile Photo

আসাদুজ্জামান জুয়েলOffline

  • asadjewel
  • সমকালীন রঙ্গ-৫
    আমারতো চাচা আছে, ওদের কান্দে নিবো কে!
    ………………………
    আসাদুজ্জামান জুয়েল
    ………………………
    সন্দেশে সংক্ষিপ্ত ট্যুরে গিয়ে আমি দীর্ঘদিন ছিলাম! আপনারা নিশ্চই এ বিষয়ে অবগত আছেন। সেখানকার পরিবেশ, মানুষ, কৃষ্টি কালচার দেখার জন্যই স্বপ্নে প্রাপ্ত ভিসায় গিয়েছিলাম। আমার পপি গাইড আমার সাথে যথারিতি ঘুরছে। আমাকে তাদের দেশের কৃষ্টি কালচারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। আমিতো আগেই বলেছি, আমি যা দেখি তাতেই পুলকিত হই। আর আমার পপি গাইড মোটেও তাতে পুলকিত হয় না। কিন্তু মাঝে মাঝে আমার পুলক দেখে সে ডাবল পুলকিত হয়। অবশ্য ডাবল পুলকিত হওয়ার কারনও আছে। সেই গল্প বলার জন্যই আপনাদের জন্য সমকালীন রঙ্গ নিয়ে বসেছি। তাদের রঙ্গ দেখে মনে মনে গান চলে আসছে, ‘কত রঙ্গ জানোরে সন্দেশী… কতো রঙ্গ জানো…!

    সন্দেশের রাজধানী ছানা থেকে বারোশো কিলোমিটার দূরের জেলা বাছুর ছাড়া। নাম মাত্র ভাড়ায় প্লেনের টিকেট কেটে নসিমনে চড়ে গেলাম। ভ্রমণটা মন্দ নয়। কোন ক্লান্তি নেই। বলবেন, প্লেনের টিকেট কেটে কেউ নসিমনে যায়? সন্দেশে গিয়ে মনে হয় লোকটার মাথাই খারাপ হয়ে গেছে! আসলে বিষয়টা তা নয়। সন্দেশে প্লেনের টিকেটের দাম আর নসিমনের ভাড়া একই! যেহেতু ভাড়া একই তাই নসিমনের টিকেট কেটে নিজের স্টাটাস লো করে কে, তাই প্লেনের টিকেট কেটেছি। সন্দেশে তেলের দাম আর ঘিয়ের দাম সমান। তেলের দাম আর ঘিয়ের দাম সমান হলে কি হয় সেই গল্প সমকালীন রঙ্গ ছয়তে বলবো। আজ অন্য একটি বিষয়ে বলছি।
    বাছুর ছাড়া জেলায় সু-শীল কমিউনিটির, মানে ভালো মানের নাপিত যারা তাদের নির্বাচন চলছে। নাপিততো অনেক আছে। সবাইতো আর সু-শীল নয়। আমাদের দেশে দেখেছি, কেউ পিঁড়িতে বসিয়ে দুই রানের চিপায় মাথা ঢুকিয়ে চুল কেটে দিতো। অবশ্য দুষ্ট প্রকৃতির ছেলেরা দুই রানের চিপায় থাকতে থাকতে হাপিয়ে উঠলে নাপিতের শুপারি দুটিতে টন করে টোকা দিতো! যন্ত্রনায় নাপিত কিছু বলতেও পারতো না, তখন কিছুক্ষণের বিরতি দিতো অক্সিজেন নেয়ার জন্য! আবার অনেক নাপিত আছে শীতলীকরণ যন্ত্র বসিয়ে রুম টেম্পারেচার বিবেকের টেম্পারেচারের চেয়ে নিচে নামিয়ে চুল কাটে। এদের রেট একটু বেশি! এরা কমরেটে কামাতে পারে না, কারন তাদের খরচ একটু বেশি যে! তাইতো সবার সামাজিক মর্যাদা এক হয় না, এক হতে পারে না। সেই সু-শীলদের নির্বাচন দেখলাম বেশ জমে উঠেছে।

    সন্দেশে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা আমাদের দেশের মতই। ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট, মিছিল, মিটিং, ভুরিভোজ, আদর আপ্যায়ন কোন বিষয়েই কমতি নেই। নির্বাচনে প্রার্থীদের, প্যানেলের পক্ষের কর্মীদের বেশ উৎফুল্ল দেখা যাচ্ছে। এক প্রার্থী মাছ দিয়ে বারবিকিউ পার্টি করলে আরেক প্রার্থী খাসি কোরবানি দিয়ে বারবিকিউ করে। এক প্রার্থী মোরগ দিয়ে করলে আরেক প্রার্থী গরু জবাই করে পার্টি দিচ্ছে। যে সার জীবন বাড়িতে পোল্ট্রি মুরগি খায় সেও বলে, আমি দেশি মুরগি ছাড়া মুখেই তুলি না! এভাবেই চলছে তুষ্টি আর সন্তুষ্টির প্রতিযোগিতা। তুষ্টির প্রতিযোগিতা পুষ্টিগুণে ভরপুর হলেও আরেক ধরনের পার্টি দেখে অবাক হলাম। যে আপ্যায়নে পুষ্টির চেয়ে গুষ্ঠির চোখ লাল আর পা ঢুলুঢুলই বেশি করে।

    কিছু নির্বাচনী কর্মীকে দেখি ঢুলুঢুল করছে। আমার সাথে যেহেতু পপি গাইড আছে, কোন কিছুই জানতে দেরি হয় না। জিজ্ঞেস করতেই বললো, ওরা সুরায় মত্ত আছে। দেখছেন না, পা কেমন টলছে! সন্দেশে প্রচুর আঙ্গুর চাষ হয়। তাই সুরার তেমন অভাব হয় না। আমি মনে মনে ভাবলাম, বেটা বলদ, আমাদের দেশেতো আঙ্গুর চাষ হয়ই না তাই বলে কী আমাদের দেশে সুরার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে? আমাদের দেশে চিনি কলে চিনি উৎপাদন করে বছর বছর প্রতিষ্ঠান লস দেয়, কিন্তু সেই একই প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারি কোম্পানী চিনির গাদ থেকে সুরা উৎপাদন করে প্রফিটেবল কোম্পানীতে রুপান্তরিত হয়। মনে মনে বললাম, বেটা বুঝবি নারে তুই বুঝবি না! কিছুদূর এগুতেই দেখি এক লোক আরেক লোকের কাঁধে চড়ে যাচ্ছে আর মিটি মিটি হাসছে। আমি আমার পপি গাইডকে বললাম, লোকটা কি প্রতিবন্ধী? হাটতে পারে না? আরেক লোকের কাঁধে চড়ে যাচ্ছে। আবার হাসছে দেখো। আমার পপি গাইড বললো, আমি ঐ লোকটাকে চিনি। ওতো প্রতিবন্ধী নয়। কেনইবা কাঁধে চড়ে যাচ্ছে আর হাসছেই বা কেন তা চলেন গিয়ে জিজ্ঞেস করে জেনে নেই।

    আমরা একটু এগিয়ে গিয়ে তাদের থামালাম। আমার পপি গাইড বললো, কিরে, তুই কাঁধে চড়ে যাচ্ছিস কেন? আর ঐদিকে তাকিয়ে হাসছিসই বা কেন? আমাদের দিকে চোখ তুলে একটু তাকিয়ে বললো, গাইড ভাই, কেমন আছেন? আপনার সাথে উনি কে? আমার গাইড বললো উনি আমাদের দেশে বেড়াতে এসেছে। ঘুরে দেখছে দেশটা। এখানে নির্বাচন হচ্ছে তা দেখার জন্য রাজধানী থেকে ছুটে এসেছে। লোকটি বললো, কেন ওদের দেশে নির্বাচন হয় না, নাকি সব অটোপাস? গাইড বললো, হয়, হয়। ওদের দেশে এক ধরনের নির্বাচন আর আমাদের দেশে আরেক ধরনের নির্বাচন, পার্থক্যটা বোঝার জন্য দেখতে এসেছে। এখন তুই কেন কাঁধে আর কেন হাসিস তা বল। এবার লোকটি কাঁধে বসেই বলতে শুরু করলো।

    আগেই কইয়া লই, আমারে যে কান্দে লইছে হে আমার চাচা। আমি সেই সকালে বাইর হইছি। আমার প্রার্থী খুব দিল দরিয়া মানুষ। একদম দুধের নহর! সারাদিন খাটাখাটুনির ফাঁকে ফাঁকে মৌজ মাস্তির অনেক সুব্যবস্থা ছিলো। সকালে বিয়ার দিয়া কুলকুলি কইরা দুপুরে ভদকা সহযোগে বিরিয়ানি মারছি। বিকালে হুইস্কির সাথে একটু নাস্তা সেরে রাতে ড্রাই ভেজিটেবলের সাথে কয়েক পিস নিদ্রানাশক বড়ি খাইছি। কথার ফাঁকে আমার গাইড জিজ্ঞেস করলো, ড্রাই শাক সবজি আর নিদ্রানাশক বড়ি খালি মানে বুঝলাম না! তখন বললো, আরে ড্রাই শাক সবজি মানে বুঝলি না, হালকা গঞ্জিকা মানে গাঁজা টানছি আর নিদ্রানাশক বড়ি মানে এক ধরনের ট্যাবলেট যা খেলে ঘুম আসে না। তুইতো মনে করবি ট্যাবলেট গিলছি। এই ট্যাবলেট পানি দিয়া খায় না, এটা পুইরা ধুয়াডা নিতে হয়। তোমার বয়স কম, বোঝও কম! আমি বললাম, আমি বুঝতে পেরেছি। আমাদের দেশে এই ট্যাবলেটকে মানুষ খুব শ্রদ্ধা ভক্তি করে। একে আদর করে কেউ ইয়া আব্বা, কেউ বাবা, কেউ গুডি, কেউ টেবলেট বলে।

    আমার গাইড এবার জিজ্ঞেস করলো, বুঝলাম তুই পুরা লোড। তাই হাটতে না পাইরা চাচার কান্দে উঠছোস। কিন্তু হাসতাছিলি ক্যান? এবার সে বললো, আমি সারাদিন বাইরে বাইরে নির্বাচনী কাজে কুত্তার মত পরিশ্রম করছি। বিনিময়ে বেশ নির্মলানন্দ উপভোগ করার সুযোগ দিয়েছে আমাদের বস। এখনতো আমার পা চলে না। আমি চাচারে ফোন দিয়ে বলছি, চাচা আমি এখানে আছি, বাড়িতে যাওয়ার শক্তিতো আমার নাই। শুনেই চাচা আমারে নিতে আইয়া পড়ছে। তাই চাচার কান্দে কইরা বাড়ি ফিরতাছি। কিন্তু ঐ যে দেহেন, ঐহানে কয়েকজন বইসা আমাদের মেহমানের ভাষায় ইয়া আব্বা না বাবা তা টানতাছে। ওদের অবস্থা এমন যে ওরাও আর হাটতে পারবো না। ফাও পাইয়া গাবুরের মত গিলতাছে আর টানতাছে। আমি চিন্তা করতাছি, আমার নাহয় চাচায় আছে, আমারে কান্দে কইরা বাড়ি নিয়া যাইতাছে, ওদের তো চাচাও নাই, মামুও নাই। ওদের কান্দে নিবো কে? এই কথা মনে কইরা হাসি আইসা পরছে।

    কথাটা শুনে আমারও অবাকই লাগলো। সকাল থেকে রাত অবধি টানাটানির পরও সেন্সতো দেখি পাগলার ঠিকই আছে। কথাটাতো মন্দ বলেনি, ওর নাহয় চাচা আছে, ওদের অবস্থা কি হবে একবারও কী ভেবে দেখেছে ওরা? ওদের গডফাদার এখন নিজের স্বার্থে ওদের হাতে যা সাপ্লাই দিচ্ছে, কদিন পরেইতো সাপ্লাই বন্ধ করে দিবে। গডফাদারের ব্যাংক ব্যালেন্স আছে, ভালো কামাই আছে সাথে উপরী কামাইও আছে। চাইলেই গডফাদারকে ব্যাংক কোটি কোটি টাকা লোন দেবে। দাতা বন্ধুরা ধার দিবে কোটি কোটি টাকা। গডফাদারের ব্যাংক চাচা, ইনকাম চাচা, বন্ধু চাচা, স্বজন চাচা, এত চাচা থাকতে তারতো চিন্তার কিছুই নেই। কিন্তু ঐযে পথের ধারে বসা, ওদের তো চাচা নেই। কদিন পরে যখন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবে তখন ওদের কি হবে? সবার তো চাচা থাকে না, মামা থাকে না। বাবা অথবা আব্বা অথবা পিতা নিশ্চই থাকে। না থাকলেতো জন্মনেয়ার সুযোগ নাই! তাই ভেবে চিন্তে গিলা উচিৎ। মাগনা আলকাতরা খাইলে পেটের কি হবে সেদিক চিন্তা না করলে হবে?!

    9
    7 Comments
Skip to toolbar