Profile Photo

Anik BiswasOffline

  • anikbiswas
  • Profile picture of Anik Biswas

    Anik Biswas

    • 6 months, 1 week ago

    ||যখন সন্ধ্যা নামে||
    (সম্পূর্ণ গল্প)

    ১.
    প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার সময় আমি আর ত্রিধা এই নদীর পাড়ে এসে বসতাম।এই সময় আকাশটা দারুণ লাগে।সূর্য যখন অস্ত যায়, তখন আকাশের রঙটা অন্যরকম হয়ে যায়।
    আজ আমার পাশে ত্রিধা বসে নেই। কিছু করার নেই আমার!

    আমাদের পাড়ার দূর্গোপুজোতে ওকে প্রথমবার দেখেছিলাম।সেদিন ছিল অষ্টমী।মন্ডপে গিয়ে দেখি অঞ্জলি দেয়া শুরু হলো বলে।মন্ডপে সেদিন ভিড়ও ছিল অন্যদিনের তুলনায় অনেক। তাই ফুল-বেলপাতা কিভাবে নেয়া যায়,তাই ভাবছিলাম।এত পিছন থেকে কাকে ডাক দিয়ে ফুল-বেলপাতার কথা বলবো?অমনি পাশ থেকে মিষ্টি গলায় একটা মেয়ে বললো,“ফুল-বেলপাতা পাননি আপনি?”
    আমি বললাম,“না,আসলে…”
    মেয়েটা ওর হাতের মুঠো থেকে একটু ফুল আর বেলপাতা ছিড়ে আমার দিকে এগিয়ে দিলো।
    যেন স্বয়ং দেবী দূর্গা আমার দিকে ফুল-বেলপাতা এগিয়ে দিচ্ছেন! মেয়েটার চেহারায় এত মাধুর্য! চোখদুটো কি অসম্ভব রকমের সুন্দর!
    মেয়েটাই ত্রিধা।
    এরপর থেকে পূজো মণ্ডপে যখন ও
    আসতো,চোখের এক কোণ দিয়ে ওর দিকে চেয়ে থাকতাম।পুরোপুরি ভাবে চেয়ে থাকতে পারতাম না!কেউ যদি দেখে ফেলে যে, আমি ওকে দেখছি —খুবই বিচ্ছিরি কাণ্ড হয়ে যাবে!এটা তো কোনো ফিল্ম না,যে ওর দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে অনেকসময় চেয়ে থাকলেও কেউ কিচ্ছু দেখবে না!এটা সত্যিকারের জীবন।

    আমার পুজোর মণ্ডপে গিয়ে বসে থাকতে তেমন একটা ভালো লাগতো না।মন্ডপে অনেক মানুষ থাকে তো,বেশি মানুষের মাঝে থাকতে আমার আবার ভালো লাগে না।আমি একা থাকতেই পছন্দ করি।কিন্তু আমি গিয়ে বসে থাকতাম শুধু ওকে একটু দেখার জন্যে।বসে থাকতাম,আশা নিয়ে কখন ও আসবে!আদো আসবে কি না!
    খোঁজ-খবর নিয়ে দেখলাম,এখানে ওর মামাবাড়ি।
    এভাবে নবমী পর্যন্ত চলল।দশমীতে আমি আর থাকতে পারলাম না। একবার মনে হয়, ফিল্মি স্টাইলে গিয়ে বলি,”তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে!” আবার ভয়ও হতো!আগেই বলেছি,এটা ফিল্ম না সত্যিকারের জীবন। চড়-থাপ্পড় মেরে বসলে মানসম্মান ছাড়খার!
    কিন্তু না বলে পারলামও না,ওকে আসলেই আমার খুব ভালো লেগেছিল।
    দশমীতে সিঁদুর খেলার সময় ওকে খুব ভালো লাগছিল।ও সেদিন শাড়ি পড়েছিল।কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ।পায়ে পায়েল,আলতা।গালে সিঁদুর লেগে রয়েছিল।সবমিলিয়ে কি যে সুন্দর লাগছিল ওকে।
    প্রতিমা বিসর্জনের পরে সবাই বাসায় ফিরছিল।ত্রিধা
    আর মৌমিতাকেও দেখলাম বাসায় ফিরছে।ওদের বাসার মৌমিতা ছাড়া আর কেউ ছিল না ত্রিধার সাথে।মৌমিতা ত্রিধার মামাতো বোন।ওকে আমি চিনি।
    আমার মনে হয়েছিল মা দূর্গাই বুঝি আমার জন্য এই সময়টা করে দিয়েছেন। আমি দূগ্গা-দূগ্গা মনে মনে বলতে বলতে, পেছন থেকে ডাক দিলাম,”এই যে ত্রিধা?”
    ওরা পিছনে ফিরে তাকালো,ওদের চেহারায় অস্পষ্টতা ফুটে উঠেছে।
    ওরা নিশ্চয়ই ভাবছিল,আমি ত্রিধার নাম জানলাম কী করে!
    আমি ওদের কাছে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলাম,কি বলা যায়!কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না।ভয়ে হাত-পা যেন কাঁপছিল!গলা শুকিয়ে আসছিল।প্রথমবার কোনো মেয়েকে কিছু বলতে যাচ্ছি।এর আগে কোনো মেয়ের সাথে ভালো করে কথাই বলিনি।সেদিন অনেকটা সাহস জুগিয়েছিলাম।তাও সাহসে কুলোচ্ছিল না!হঠাৎ মৌমিতা নিরবতা ভেঙে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,”কিছু কি বলবে,তুমি?” বললাম,”সরি,আপনাদেরকে বিরক্ত করার জন্য,আসলে আপনাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম। ”ত্রিধাকে বললাম।
    ত্রিধা কিছু বলল না।কিন্তু মৌমিতা একটু কৌতূহল দেখালো।মৌমিতা আমাকে বলল,“কি বলতে চাও আর তুমি ওর নাম জানলে কি করে?”
    ”সব বলছি, একটু পরে, তুই একটু দূরে যাবি প্লিয?আমি ওনাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম।”
    ”তুমি আমার সামনে বলো।”
    ত্রিধাও বললো,”মৌমিতা এখানেই থাকুক,আপনি কি বলবেন বলুন প্লিয, আমাদেরকে বাসায় ফিরতে হবে।”

    আমি কি করে বলবো,বুঝতে পারছিলাম না।আমি একটা বড় নিশ্বাস নিয়ে, সাহস করে আমতা-আমতা করে বলতে লাগলাম,”আ-আ-আসলে আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে।”অবশেষে বলেই ফেললাম!
    আমি ত্রিধার দিকে তাকিয়ে ছিলাম,আমার বুক ধুকপুক করছিল।মৌমিতা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল।
    আমার মনে হচ্ছিল এখনই বুঝি ত্রিধা আমার গালে কষিয়ে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিবে—তবুও আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। ত্রিধা কোনো উত্তর দিলো না,মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে লাগলো।
    বুঝে গেলাম,ত্রিধার খারাপ লাগলো।
    আমি মৌমিতাকে ডাক দিয়ে বললাম,”মৌমিতা সরি,আর ওনাকেও বলে দিস।আর এখানের কথা কাউকে কিছু বলিস না প্লিয বোন।”
    —”ঠিক আছে”
    —”থ্যাঙ্কস”

    ২.
    আমি সেদিন খুব অস্বস্তি বোধ করছিলাম।আমার কথাটা বলা বোধহয় ঠিক হয়নি।আমি ঠিক করেছিলাম, ওকে সরি বলব সামনাসামনি গিয়ে। ওর সামনে যেতেও আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল।
    আমাদের বাড়িটা রাস্তার ঠিক বাঁপাশে।আমার ঘরের জানলা দিয়ে রাস্তা দেখা যায়।
    পরেরদিন বিকেলে ত্রিধা যখন আমাদের এইদিকে হাঁটতে এসেছিল,ওর সাথে মৌমিতাও ছিল।
    আমি জানলা দিয়ে ওদের দেখতেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।উদ্দেশ্য ছিল ওকে সরি বলব।
    ত্রিধা আর মৌমিতা দূর্গা মন্দিরের পুকুরঘাটের সিঁড়িতে বসে ছিল,আমিও ওখানে গেলাম—
    ”এই যে শুনুন?”
    ওরা পেছন ফিরে তাকালো।
    ”সরি,আপনাদের আবার বিরক্ত করলাম।”
    মৌমিতা বলল,”এখন আবার তুমি কি বলতে চাও?”
    ”না আসলে সেদিনের জন্য আমি খুব দুঃখিত এবং লজ্জ্বিত।সরি,ইফ ইউ কেন প্লিয…” ত্রিধাকে উদ্দেশ্য করে বললাম।
    ”না না,ইট’স ওকে” ত্রিধা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললো।
    ”থ্যাঙ্কস, আপনাকে আমার আসলেই খুব ভালো লাগে, ও…আবার সরি”
    যাক,ত্রিধার হয়তো তেমন খারাপ লাগেনি।

    ”ভালো লাগতেই পারে,ও কিছু না” বললো ত্রিধা।
    আমি কিছু বললাম না। ত্রিধাই আবার বললো,”এখন বলুন,আপনাদের এখানে ঘুরতে যাওয়ার কোনো জায়গা আছে কি?এতদিন হলো এখানে এসেছি,এখন পর্যন্ত এইজায়গাটাই ভালো করে চিনি না!তাও হয়,বলুন?”
    মৌমিতা ত্রিধাকে বলল,”দিভাই আমাকেই তো বলতে পারিস?”
    আমার তখন একটু রাগ হয়েছিল মৌমিতার ওপর। আমাকে জিগ্যেস করছিল,ও কেন উত্তর দেয়?
    ত্রিধা বলল,”তোকে তো এতদিন ধরেই বলছি, তুই তো এইখানটায় চিনিস শুধু।একজায়গায় আর ভালো লাগে না।একটু অন্যরকম,এইখানের বিশেষ কোনো জায়গা নেই কি?সব জায়গারই তো কিছু বিশেষ জায়গা থাকে।তেমন বড় কিছু না হলেও ইন্টারেস্টিং কিছু তো থাকেই।”
    আমি উৎসাহিত হয়ে বলতে লাগলাম,”ঘুরতে যাওয়ার জায়গা তেমন নেই,তবে আপনি যদি চান আপনাকে নদীর পাড়ে নিয়ে যেতে পারি। আমাদের এখান দিয়ে একটা নদী গেছে,কি সুন্দর বাঁক নদীটার,বড় বড় নদীরও এত বড় বাঁক হয় না,তাছাড়া একেবারে ৯০ ডিগ্রি বাঁক তাও আবার একটা না, পরপরই বেশ কয়েকটা।আর নদীর দুদিকের পাড়গুলো এতো বিশাল আর প্রশস্ত!দূর পর্যন্ত খোলা প্রান্তর!আশেপাশে লোকালয় নেই,কোনো কোলাহল নেই।ঘাসের ওপর দিয়ে খালি পায়ে নিশ্চিন্তে হেঁটে বেড়ানো যায়,দৌড়ানো যায়,গান গাওয়া যায়,আবার চুপচাপ শান্তিতে বসে থাকাও যায়।শুয়ে থাকা যায়,শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখা যায়।কি সুন্দর পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছে,কিচিরমিচির করছে।চোখ বুজে শুয়ে থাকলে তো কথাই নেই,চোখে ঘুম জড়িয়ে আসবে কখন বোঝা দায়।আর এত হাওয়া সবসময় কোত্থেকে বয়ে আসে সেখানে কে জানে?আর যখন সন্ধ্যা নামে আকাশটা এত সুন্দর লাগে, চারপাশটা এত অদ্ভুত লাগে,সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে মনে হবে, এই জায়গাটাই তো স্বর্গ!” আমি তো একটানা কথা বলেই যাচ্ছিলাম,এতগুলো কথা কিভাবে বলে ফেললাম!
    ওরাও আমার দিকে তাকিয়ে মনোযোগ সহকারে কথাগুলো শুনছিলো।
    ত্রিধা সুন্দর একটা হাসি দিয়ে বললো,”বাব্বাহ।এত সুন্দর করে জায়গাটার বর্ণনা দিলেন,লেখালেখি করেন নাকি?
    জায়গাটা বোধহয় আপনার অনেক প্রিয়?প্রতিদিনই যান মনে হচ্ছে।আপনার বর্ণনা শুনে না গিয়ে পারছি না।শুনেই কি ভালো লাগছে!তাছাড়া স্বর্গে কে না যেতে চায়,তাও আবার মরার আগেই।মিস করা যাবে না। চলুন তাহলে যাই,চল মৌমিতা।”এই বলে ওরা উঠে দাঁড়ালো।

    ৩.
    নদীর ধারে দারুণ হাওয়া বইছে।কোনো কোলাহল নেই।শুধু আছে পাখির কিচিরমিচির,হাওয়ার মৃদু শব্দ, নদীর স্রোতের কলকলানি,ছিল অস্তগত সূর্য,ছিল হলুদ-কমলা-নীল নানা রং মিশ্রিত অদ্ভুত সুন্দর বিশাল আকাশ আর ছিলাম শুধু আমরা তিনজন।আমি,ত্রিধা আর মৌমিতা।
    হাওয়ায় ত্রিধার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।তখন ওকে যে কি সুন্দর লাগছিল!আমি চোখ সরাতে পারছিলাম না।ও চুলগুলো সামলে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসাসূচক ঈশারা করলো।খুব লজ্জ্বায় পড়লাম তখন।চোখ তুলে তাকাতেই পারছিলাম না লজ্জ্বায়! আমি মাথা নাড়লাম।
    বেশ খানিকক্ষণ হাঁটলাম আমরা।তারপর সূর্যাস্ত দেখার জন্য নদীর পাড়ে একটা জায়গায় বসলাম।বসেই সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো,”আমাকে তোমার কেন ভালো লাগলো?”
    আমি হঠাৎ এই প্রশ্নে খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, ”আমি জানি না,তোমাকে অ… সরি আপনাকে…”
    ও আমার কথা থামিয়ে আমাকে বললো,”তুমি করেই বলতে পারো।”
    আমি তখন লক্ষ্য করেছিলাম ত্রিধাও আমাকে তুমিই বললো।আমি বলতে লাগলাম, ”ভালো লাগার কারণ থাকে কিনা জানি না।বলতেও পারবো না কেন ভালো লাগলো!তোমাকে যেদিন প্রথমবার দেখেছিলাম, কেমন জানি একটা অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হয়েছিল,কেন জানি না।সেদিন যেন একটু বেশিই আনন্দিত লাগছিলো নিজেকে,এটাও কেন জানি না।বেশি আনন্দিত হওয়ার কারণ তো কিছুই ছিল না।আমি মেয়েদের দিকে তাকাতামও না,কথাও বলতাম না। মানুষজন বেশি দেখলেই আমার অবস্হা কাহিল,আর মেয়েরা তো দূরে থাক। কিন্তু সেদিন তোমাকে দেখার পর, তোমাকে বার বার দেখার, তোমার সাথে কথা বলার কি যে তীব্র একটা ইচ্ছে হচ্ছিল!কিন্তু সাহসও তো হচ্ছিল না।তোমার দিকে সরাসরি তাকানোর সাহসই ছিল না আবার কথা বলা তো বিলাসিতা!তাছাড়া কথা বলতে গিয়ে নিজেকে মরণের দিকে ঠেলে দেওয়া!হয়তো কথা বলতে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেল!”
    ত্রিধা হেসে ফেললো। বললো,“এত সাহস তোমার?বাপরে!”
    আমি একটু হেসে বললাম,“এখন খানিকটা বেড়েছে।নাহলে সেদিন আপনাকে… সরি,তোমাকে হঠাৎ করে পেছন থেকে ডাক দিয়ে কথাটা বললাম কিভাবে?সেদিন দুঃসাহস নিয়েই কথাটা বলেছিলাম যদিও।আর এখনও তোমার সাথে কথা বলছি!আমি নিজেই অবাক হচ্ছি এত সাহস আমার হলো কিভাবে!”
    ত্রিধা একটু মুচকি হেসে বললো,”বুঝলাম।’’
    “এমনটা তো আগে হয়নি।কারও থেকে দূরে থাকলে, কথা কম বললে বরং আমি বাঁচি।আর মেয়েদের থেকে তো অলটাইম অনেক দূরে দূরে থাকতাম।
    আমার কখনোই পুজোর মণ্ডপে গিয়ে বসে থাকতে ভালো লাগতো না।কিন্তু সেদিন থেকে আমি তোমাকে দেখার জন্য মণ্ডপে গিয়ে বসে থাকতাম,তুমি কখন আসবে,তুমি আসলে তোমাকে একটু দেখবো! সরাসরি তোমার দিকে তাকানোর সাহস ছিল না,এখনও নেই!আমি চোখের এক কোণ দিয়ে দেখতাম তোমাকে,যাতে কেউ বুঝতে না পারে আমি তোমাকে দেখছি বা তোমার দিকে তাকিয়ে আছি!”
    আমি আবার বললাম,”কিন্তু আমি আসলে ঠিক করে বলতে পারবো না কেন তোমাকে ভালো লাগে!”
    ত্রিধা আমার দিকে তাকিয়ে বললো,“তুমি অনেক কথা বলতে পারো।”
    বেশিই কথা বলে ফেললাম বোধহয়!এমনিতে কথা বলি না,কিন্তু বললে কমও বলি না!ত্রিধা বিরক্ত হয়েছে!
    ত্রিধা আবার বললো,“খুব সুন্দর করে কথা বলো তুমি।কথাগুলো শুনতে একটুও বিরক্তি লাগে না।আসলেই লেখালেখি করো নাকি,কবিতা-টবিতা লিখো?কবিমশাই নও তো?”
    আমি হাসলাম।
    সন্ধ্যা নামলো।
    ত্রিধা কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বললো,”সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এবার স্বর্গ থেকে মর্ত্যলোকে ফিরে যাওয়া যাক?’’
    মৌমিতা এতক্ষণ আমাদের কথা শুনছিল। ও বললো,”হ্যাঁ, চল দিভাই সন্ধ্যা হয়ে গেছে।”
    ”মৌমিতা বাড়িতে যদি বলে কোথায় ছিলে, কি বলবি?”ত্রিধা মৌমিতাকে জিজ্ঞেস করলো।
    ”কি বলবো?”
    ”বলবি পুকুরঘাটে বসে ছিলাম।এদিক-সেদিক একটু হাঁটাহাঁটি করছিলাম”
    ”ঠিক আছে দিভাই।”
    আমি আর কিছু বললাম না।

    ৪.
    পরেরকদিন ত্রিধা আসেনি।
    আমি ত্রিধার আসার সময়টা আন্দাজ করে জানলার কাছে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতাম ত্রিধা আসে কিনা!
    যখন ত্রিধা আসবে,আমিও ঘর থেকে বেরিয়ে যাব।
    মাঝের কদিন ও না আসায় মনটা একটু খারাপ হলো।ও বাড়ি চলে যায়নি তো?চলে যেতেও পারে,এতদিন তো আর কেউ বেড়াবে না!তাতে আমার কি কে জানে?আমার খারাপ লাগার কি আছে?
    একদিন বিকেলে জানালার কাছটায় বসে কি একটা কাজ করছিলাম।সেদিন ওর অপেক্ষা করছিলাম না।ততদিনে আমি ধরেই নিয়েছি,হয়তো ও বাড়ি চলে গেছে।
    একটু বিরক্ত লাগছিল।হঠাৎ কি মনে করে পকেট থেকে হারমোনিকাটা বের করে আনমনেই একটা সুর তুললাম: মাঝে মাঝে তব দেখা পাই,চিরদিন কেন পাই না…
    হঠাৎ আমার চোখ পড়লো রাস্তায় ত্রিধার উপর।
    আমার খুশি তখন দেখে কে?
    অমনি উঠে বেরোতে যাব, মনে হলো ওর পিছন পিছন বেরিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না!
    আবার বসে পড়লাম।তবে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারলাম না।বেরিয়ে গেলাম।

    গিয়ে দেখি ত্রিধা পুকুরঘাটের সিঁড়িতে চুপচাপ বসে আছে।আর কেউ নেই।পিছন থেকে ডাক দেওয়ার সাহস হচ্ছে না।যেই ডাক দিতে যাব,অমনি ত্রিধা পিছনে তাকালো।আমাকে দেখে হাসি দিয়ে বললো,“কেমন আছো?”
    “ ভালো।আপনি?”
    “হ্যাঁ,ভালোই।তুমি বলেই ডাকতে পারো।”
    কি বলবো বুঝতে না পেরে বললাম,“আচ্ছা।আজ একাই? মৌমিতা আসেনি?”
    “ওর টিউশন আছে?”
    “কদিন আসোনি কেন?” বলেই বুঝলাম এটা বলতে হতো না।
    ত্রিধা খানিকটা ভ্রু কুঁচকালো।
    তারপর বললো,“নদীর পাড়ে যাবে?”
    “একা? মানে…”
    “কেন একা যেতে ভয় পাও নাকি?”
    “না, মানে মৌমিতাও নেই। তুমি একা…”
    “একা কেন? তুমিও তো আছো?”
    আমি বুঝতে পারছিলাম না কি বলবো!
    ত্রিধাই বললো,“যাবে?”
    “চলো। সাইকেলটা নিয়ে আসছি। তুমি তো চিনোই।তুমি যাও,আমি আসছি।”
    “তুমি সাইকেল নিয়ে আসো।আমি এখানেই থাকি।”
    “না তাহলে হেঁটেই যাই।”
    এই মেয়েটা বুঝতে চায়ছে না কেন?মানুষ না জানি কি মনে করে!
    আমার ভাগ্য ভালো, সেদিন মানুষের তেমন একটা সাক্ষাৎ পাইনি।
    নদীর পাড়ে বসে ছিলাম আমি আর ত্রিধা।আমার কেমন যেন একটু লাগছিল।হঠাৎ ত্রিধা বললো,“একটা গান গাই?”
    বললাম,“গাও।”
    ও গাইতে শুরু করলো,“ আমার পরাণ যাহা চায়, তুমি তাই,তুমি তাই গো…”
    মনে হলো আমি যেন স্বপ্নে আছি।দেবী সরস্বতী আমার সামনে বসে গান গাইছেন!কি সুন্দর গানের গলা!আমি সম্মোহিত হয়ে ওর দিকে চেয়ে রইলাম।
    গান শেষ করতেই বললাম, “ কি সুন্দর গাইলে!”
    “ থ্যাঙ্কস!এবার তুমি গাও তো একটা।”
    “আমি ওসব পারি না।”
    “ গাও না দেখি?”
    “আমি হারমোনিকা পারি, বাজাই?”
    ত্রিধা উৎসাহিত হয়ে বললো,“বাজাও তো দেখি।”
    আমি পকেট থেকে হারমোনিকাটা বের করে,তাতে সুর তুললাম : ওহে কি করিলে বলো পাইবো তোমারে,রাখিব আঁখিতে আঁখিতে…

    ৫.
    ত্রিধা প্রায়দিনই আসতো।আমরা নদীর পাড়ে যেতাম,বসতাম,গল্প করতাম,গান গাইতাম,আমি হারমোনিকা বাজাতাম।ত্রিধারও এই জায়গাটা বেশ ভালো লাগে।ভালো লাগারই কথা,যেখানে নিজের সাথে সময় কাটানো যায় নিশ্চিন্তে,নিরবে,কেউ বিরক্ত করে না,কোলাহল নেই।সেই জায়গা ভালো লাগবেই না বা কেন?

    ত্রিধা এখন ওর মামাবাড়িতেই থাকবে।এখানের একটা ভার্সিটিতে অ্যাডমিশন নিয়েছে।আর বড় কথা হচ্ছে, আমি ওর ভার্সিটির সিনিয়র। এর থেকে আমার জন্য আর খুশির খবর কি হতে পারে?যদিও কেন আমি খুশি হচ্ছি জানিনা!ত্রিধা আমাকে এখনও কোনো উত্তর দেয়নি।তবে আমরা অনেক ভালো বন্ধু। এটাই বা মন্দ কি?এর জন্যে হলেও খুশি হওয়া যেতেই পারে।
    ও ফার্স্ট ইয়ার আর আমি ফাইনাল ইয়ার!

    একদিন নদীর পাড়ে বসে ছিলাম আমরা।আমি আর ত্রিধা। ঠিক সন্ধ্যা নামবে নামবে। চারদিকটা এত অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল!আমি ঘাসের উপর শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।আর ত্রিধা নদীর দিকে মুখ ফিরে বসে ছিল।দুজনেই চুপচাপ।হালকা হাওয়া বইছে।কি ভালো লাগছিল!যেন সারাজীবন এখানে এভাবেই কাটিয়ে দিতে পারবো।
    হঠাৎ ত্রিধা বললো,“একটা কথা বলি?”
    “বলো।” শুয়ে থেকেই বললাম।
    একটু চুপ থেকে তারপর বললো,”আসলে তোমাকেও আমার খুব ভালো লাগে…”
    এই কথা শুনে আমি যেন আকাশে উড়াল দিলাম!আমি যেন একটা স্বপ্নে আছি!আমি উঠে বসে ওর দিকে তাকালাম। ও এখনও নদীর দিকে মুখ ফিরেই বসে আছে। আমার হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে!
    “প্রথমবার যখন পুজোতে তোমাকে দেখেছি তখন থেকেই। আমিও কিন্তু তোমাকে চোখের এক কোণ দিয়েই দেখতাম!যেভাবে তুমি আমাকে দেখতে!তাই হয়ত তুমিও লক্ষ্য করো নি।” এবার আমার দিকে তাকিয়ে একটা ছোট্ট হাসি দিলো।আমি ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি।
    বললাম,“মজা করছো?”
    ত্রিধা কিছু বলেনি।
    ও মজা করেনি।সত্যি বলছিলো।আমি ওই প্রশ্নটা করেছি ঠিকই,কিন্তু আমিও জানি ও সত্যি বলছিলো।ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি সেটা বুঝতে পেরেছি।আমি অবাক হবো, নাকি আমার খুশি হওয়া উচিত?বুঝতে পারছিলাম না।আমার সব চিন্তা-ভাবনা যেন লোপ পেয়ে যাচ্ছে। আমার ভিতরে কেমন যেন একটা অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হচ্ছিল।
    আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে অজান্তেই একটা হাসি দিলাম।

    সেদিনের পর থেকে আমরা কেউ কোনোদিন একে-অপরকে সরাসরি না বললেও জানতাম, আমরা দুজনই দুজনকে অনেক বেশি ভালোবাসি।সবসময় কি আর মুখে বলার প্রয়োজন হয়?
    দিনগুলো এভাবে বেশ ভালোই কাটছে!

    তার প্রায় অনেকদিন পর…
    নদীর পাড়ে বসে ছিলাম আমরা।নদীর পাড়টা আমাদের দুজনেরই খুব প্রিয় একটা জায়গা। মন ভালো থাকলেও এখানে এসে বসে থাকি, মন খারাপ থাকলেও এখানে এসে বসে থাকি।
    ত্রিধা গান গাইছিলো: হে সখা,মম হৃদয়ে রহ,সংসারে সব কাজে ধ্যানে-জ্ঞানে হৃদয়ে রহ…
    ত্রিধা রবীন্দ্রসংগীত গাইলে ইচ্ছে করে শুধু শুনেই যেতে।
    গান শেষে ত্রিধা বললো,“আচ্ছা সবসময় তো হারমোনিকা বাজাও,আজকে একটা গানই গাও না?”
    “গাইবো?”
    “গাও।”
    একটু ইতস্তত করে গাইতে শুরু করলাম: এই তো হেথায়,কুঞ্জ ছায়ায়,মিষ্টি মধুর মোহে…
    “ভালোই তো গাও।কিশোর কুমার ভালো লাগে?”
    “ওরকম কিছুনা।যখন যেটা ভালো লাগে।”আমি বললাম,“আচ্ছা, ত্রিধা তোমাকে বলেছিলাম না জবটার কথা?ওটা কনফার্ম হয়ে গেছে।”
    ত্রিধার মুখে একটা হাসি ফুটে উঠলো।বললো,“কংগ্রেটস!ট্রিট কবে দিচ্ছো?”
    আমি হাসলাম।
    কিছুক্ষণ চুপ থেকে ও বললো,“আমারও তো ফাইনাল ইয়ার।এবার মনে হয় আমাদের পরিবারকে জানানো উচিত।”কথাটা বেশ গম্ভীরভাবেই বললো।
    আমি ও কিসের কথা বলছে জেনেও নিশ্চিত হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলাম,“কি জানানো উচিত?”
    এবার একটু রেগে বললো,“ন্যাকামো করো না।সিরিয়াসলি বলছি।”

    পরিবারকে জানানো চাট্টিখানি কথা তো নয়!কিন্তু বলাও প্রয়োজন।প্রায় একমাস পর অনেকখানি সাহস জুগিয়ে কথাটা মাকে বললাম।মা আমাকে কিছু বলেনি।এতে আমার ভয় দ্বিগুণ হয়ে গেলো! মা বাবাকে জানালো। বাবা আমাকে ডেকে বললো,“তোর মা কি বলছে রে?”
    কিছু বললাম না।
    “নিরবতা সম্মতির লক্ষণ।তারমানে ঠিকই বলছে।” আমি চুপ।মাও চুপ।
    “তা সে তো ভালো কথা,এতদিন বলিসনি কেন?”
    বাবা বলে কি!
    “আমাদেরকে আর তোর জন্য কষ্ট করে মেয়ে খুঁজতে হবে না।আর যে মেয়েটার কথা বললি,সে তো বিধূবাবুর ভাগনি।ওকে তোর মাও চিনে। তোর মারও পছন্দ মেয়েটাকে।আমাকে সেদিনও বলছিলো বিধূবাবুর সঙ্গে কথা বলার জন্য।”

    কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে গেলো।কিন্তু বিয়ে এখন না।ত্রিধার পড়াশোনা শেষ হলে মানে এবার ফাইনালটা দেওয়ার পর।আমরা ভেবেছিলাম হয়ত আমাদের পরিবার মানবে না।কিন্তু এমন কিছুই হলো না। দুজনের পরিবারই খুব খুশি।
    মাঝে মাঝে আমরা একটু বেশিই ভেবে নিই!
    আমি এখনো কিছুই বিশ্বাস করতে পারছি না!এমনটা সত্যিই হচ্ছে?
    সবই কেমন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে! আসলে আমরা বেশিরভাগ সময়ই দুঃখের মধ্যে থাকি তো,হঠাৎ করে সুখ এলে ঠিক বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না!

    ৬.
    ত্রিধার কনভোকেশন সেরেমনি হয়ে গেলো।ও বেশ খুশি ছিল সেদিন। হঠাৎ করে সন্ধ্যেবেলায় কল করে বললো মৌমিতাদের বাসায় যাওয়ার জন্য। ছাদে আড্ডা দেয়া যাবে।আমারও কোনো কাজ ছিল না।আর এমনিতেও মাঝে কদিন ত্রিধার সাথে দেখা হয়নি।তাই যাওয়াই যায়।আর এখন তো ওদের বাসায় যাওয়াতে কোনো বাধা নেই।

    আমিও ছাদে উঠলাম আর অমনি লোডশেডিং!যাক ভালোই হয়েছে।আকাশে তারাগুলো ভালো করে দেখা যাবে।
    ত্রিধা একটু বিরক্ত হয়ে বললো,“আহা!তুমি এলে অমনি লোডশেডিং!”
    “সেসব বাদ দাও।তোমার শরীর এখনো ভালো হয়নি?গলাটা কেমন লাগছে?ডাক্তার দেখাওনি?”
    “দেখিয়েছি।এমনি ঠান্ডা লেগেছে হয়তো।কমে যাবে।”
    “বেশ কদিন ধরেই তো শরীর খারাপ।এখনো কমেনি!কাল আরেকজন ডাক্তারকে দেখাবো।কাল সকালে এসে আমি নিয়ে যাবো তোমাকে।”
    হঠাৎ মৌমিতা বলে উঠলো,“দেখলি দিভাই তোর কত খেয়াল রাখে?”
    মেয়েটা বেশি পাকা।
    সেদিন ত্রিধা গান গাইতে পারেনি।গলাটা অনেক খারাপ ছিল।আর দেখে মনে হলো শরীরটাও। বেশ কদিন ধরেই ওর শরীরটা খারাপ যাচ্ছে। ও-ই জানে কি ডাক্তার দেখালো।এখনো কাশিই কমেনি!

    ডাক্তার দেখানোর সময় জানতে পারলাম,ত্রিধার বেশ কদিন ধরেই কাশির সাথে রক্তও যাচ্ছে! আমাকে আগে বলেনি!
    ডাক্তার কয়েকটা টেস্ট করিয়ে কিছু মেডিসিন দিলেন।কয়েকদিন ওকে একটু ভালো লাগছিল।অন্তত আমরা তাই ভেবেছিলাম।

    এর মধ্যে আমাদের আশীর্বাদ হয়ে গেলো।বিয়ের তারিখও পাকা করা হলো।
    কিন্তু হঠাৎ করে ত্রিধা আবার অনেক অসুস্থ হয়ে পড়লো।কয়েকদিনের মধ্যেই ও অনেক দূর্বল হয়ে পড়লো।আবার কাশির সাথে রক্ত যাওয়া শুরু হলো।
    এবার ডাক্তার দেখানোর পর, তিনি কিছু টেস্ট করাতে বললেন।সেগুলোর রিপোর্ট দেখে তিনি কি মনে করে একজন অনকোলজিস্ট বীরেন সমাদ্দারকে সাজেস্ট করলেন!
    আমার কেন জানি একটু ভয় হচ্ছিল।

    ডক্টর বীরেনকে দেখানোর পর তিনি বায়োপসি করানোর জন্যে বললেন।তিনি কিছু একটা সন্দেহ করছেন!এবার আমি ঘাবড়ে গেলাম।ত্রিধাও ভয় পাচ্ছে।আমি ওকে বোঝাতে লাগলাম : এগুলো এমনি জাস্ট নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য স্ক্রিনিং করে ডায়ােগনোসিস করা হবে।ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
    বাড়ির সবাইও দুশ্চিন্তা করতে লাগলো।আমি আর কত বোঝাবো?

    বায়োপসির রিপোর্ট এলো।
    আমি আর ত্রিধা ডক্টর বীরেনের সামনে বসে।তিনি খুব গম্ভীরভাবে রিপোর্ট দেখছেন।ত্রিধা আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে।ও ভয় পাচ্ছে।
    “আপনাদেরকে শক্ত থাকতে হবে।যা বলছি ভালো করে শুনুন।”ডক্টর বীরেন আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন।আমার খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে।টের পেলাম ত্রিধার হাত কাঁপছে।
    তিনি বললেন,“যেটা সন্দেহ করছিলাম…”
    ত্রিধার লাঙ্কস ক্যান্সার!লাস্ট স্টেজ!
    আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।আমার শরীর কাঁপা শুরু করলো।কিভাবে কি হয়ে গেলো?আমি ত্রিধাকে কিভাবে সামলাবো?

    ত্রিধা খুব ভেঙে পড়েছে। ওর শরীরও দিনে দিনে খারাপের দিকে যাচ্ছে। ট্রিটমেন্ট শুরু হয়েছে।নিয়মিত কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি নিতে হচ্ছে।

    যে বাড়িগুলোতে কদিন আগেও সবাই কত খুশি ছিল!ত্রিধা আর আমি কত খুশি ছিলাম।বাড়িগুলো এখন বিষন্নতায় ছেয়ে গেছে।অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না! কদিন বাদেই বিয়ে।সবাই কত আনন্দে থাকার কথা।বাড়িতে হৈ-হুল্লোড় হওয়ার কথা। হঠাৎ করে কি থেকে কি হয়ে গেলো। আমাদের জীবনটা এমনভাবে বদলে যাওয়ার তো কথা ছিল না!

    ৭.
    থেরাপি নেওয়ার জন্যে ত্রিধার চুল পড়ে যাচ্ছিল।তাছাড়া শরীরের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।বরং শরীর আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে!ত্রিধার দিকে তাকানো যায় না!কেমন ত্রিধা কেমন হয়ে যাচ্ছে আমার চোখের সামনে।ওর কষ্ট আমি আর সহ্য করতে পারছি না!ওর দিকে তাকানোর সাহস আমার নেই।

    ডক্টর বীরেন বললেন,“দেখুন… আমরা এখানে যেগুলো করার —কেমো, রেডিও সবই করছি। কিন্তু… রোগটা একটু অ্যাডভান্সড স্টেজে চলে গেছে।”একটু থেমে বললেন,“আপনারা চাইলে… একটা সেকেন্ড ওপিনিয়নের জন্য বাইরে,যেমন Singapore যেতে পারেন। ওখানে কিছু স্পেশালাইজড সেন্টার আছে।যেখানে অ্যাডভান্সড ট্রিটমেন্টগুলো আরও স্ট্রাকচারডভাবে করা হয়।”
    আমি ঠিক করেছি, ত্রিধাকে নিয়ে সিঙ্গাপুর যাবো।
    যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। ভিসার জন্য এপ্লাই করেছি। সিঙ্গাপুরের একটা হসপিটালের টিমের সাথে কথা হয়েছে, ওরা কেসটা রিভিউ করছে।সবমিলিয়ে তাতে কদিন সময় লাগবে।
    এর মধ্যেই আমাদের বিয়ের দিনটা এসে গেল।আমি চাইছিলাম কোনোরকম নিয়ম রক্ষা করে বিয়েটা হয়ে যাক।ত্রিধাকে খুশি দেখতে চাই আমি।একটুও যদি খুশি হয়!

    সেদিন ত্রিধা জেদ ধরলো নদীর পাড়ে যাওয়ার জন্য। ও অসুস্থ হওয়ার পর থেকে ওখানে আর তেমন যাওয়া হয়নি।হয়তো আমি কখনো কখনো যেতাম,মনটা বেশি খারাপ থাকলে।ত্রিধা যায়নি।
    ত্রিধা আমার কাঁধে মাথা রেখে বসে ছিল।হঠাৎ মাথা তুলে বললো,“তুমি আমাকে বিয়ে করো না,আমি হয়ত আর বাঁচবো না।’’
    “কিসব বলছো!কদিন পরেই তো সিঙ্গাপুর যাচ্ছি।ওখানের বেস্ট বেস্ট ডাক্তাররা তোমার কেসটা দেখবে।তুমি ভালো হয়ে ফিরবে।”
    “তুমি এখনও এই চুলপড়া,অসুন্দর একটা মেয়েকে বিয়ে করবে?”
    দেখলাম ওর চোখ ভিজে এলো।
    আমার চোখও ঝাপসা হয়ে আসছে।কোনোরকম সামলে নিয়ে বললাম,“কই চুল পড়েছে?আগের মতোই তো কি সুন্দর চুল।আর তোমার মতো সুন্দর একটা মেয়েকে বিয়ে করবো না কেন?এমন ভাগ্য কজনের হয় বলো আমার মতো?আমি কখনো ভেবেছিলাম তোমাকে আমি বিয়েও করতে পারবো?”
    ও কিছু বললো না।আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো।
    তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। আমি আর ওকে বারণ করিনি কাঁদতে। কাঁদলে ওর মনটা একটু হলেও হালকা হবে।
    আমিও আর চোখের জল আটকে রাখতে পারিনি।

    তার কিছুক্ষণ পর আমি ওকে বললাম,“ত্রিধা আজকে একটা গান গাইবে না?গাইতে পারবে?”
    একটু চুপ থেকে ও গাইতে শুরু করলো : যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,আমি বাইবো না,আমি বাইবো না মোর কেয়াতরী এই ঘাটে গো…
    দেখলাম ওর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।গাইতেও ওর কষ্ট হচ্ছে। একটু থেমে থেমে আস্তে আস্তে গাইছে।
    “ত্রিধা কাঁদছো কেন তুমি? কি হয়েছে তোমার আজকে?আচ্ছা আর গান গাইতে হবে না।”
    “গানটা গেয়ে নিই প্লিয।” চোখ মুছে বললো ও।
    এর আগে আমি আর কোনোদিন ত্রিধাকে এমনভাবে কাঁদতে দেখিনি । আমিও নিজেকে সামলে রাখতে পারছিলাম না।

    ৮.
    বিয়ের আগের দিন রাতে হঠাৎ কলের রিং এ ঘুম ভেঙে গেল। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি মৌমিতার ৩ টা মিসড-কল।চোখটা হঠাৎ লেগে গেছিল তাই হয়তো বুঝতে পারিনি।কিন্তু এত রাতে কি হলো?
    অমনি বাবা আমার ঘরে এলো।
    “মৌমিতা কল করেছিল।” বাবা বললো।
    “হ্যা,আমি ধরার আগে কেটে গেল।কি হয়েছে?”
    “ত্রিধার শরীরটা খারাপ।”
    কথাটা কানে আসতেই কেন জানি না, ভেতরটা কেমন অস্বস্তিকর ভয়ে ছেয়ে গেল।

    বাবা-মাকে নিয়ে ওদের বাসায় গেলাম।ত্রিধার ঘরে ঢুকতেই দেখলাম সবাই কেমন গম্ভীর হয়ে বসে আছে।ঘরটা নিস্তব্ধ।
    আমি বিছানায় ত্রিধার কাছে গিয়ে বসলাম।ও চোখ বুজে ছিল,চোখ খুলে আমার দিকে তাকালো।আমার দিকে তাকাতেই ওর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।ও হয়তো কথা বলতে চায়ছিল,পারছিল না।
    আমার চোখ দিয়েও আমার অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
    আমি ওর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম,“তুমি ঠিক হয়ে যাবে ত্রিধা,তোমার কিচ্ছু হবেনা।” মনে মনে মা দূর্গাকে ডাকছিলাম,“মা… তুমি ত্রিধাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যেও না।”
    কিন্তু সেই রাতে মা দূর্গা আমার কথা শুনলেন না।

    ত্রিধা হঠাৎ করে আর কাঁদছে না।নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।ত্রিধার চোখের শেষ অশ্রুবিন্দুটি ওর গাল বেয়ে আমার হাতের ওপরে পড়লো।
    এখন আর কোনো কষ্ট হচ্ছে না ওর।ত্রিধা আর কিছু বলবে না কখনো।
    আমি ত্রিধার চোখে হাত বুলিয়ে দিলাম। আমার ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে কাঁদতে। কিন্তু পারছিলাম না!আমি পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে ওর মুখটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।ত্রিধাকে যেন সেই রাতে আগের চেয়ে আরো বেশি সুন্দর লাগছিল!চেহারায় কি উজ্জ্বলতা!আরো আলোকিত লাগছিল ওর চেহারা!আমার ভিতরটা যেন ধুমরে-মুচরে যাচ্ছে।কি হয়ে গেলো?
    সেই নিস্তব্ধ ঘরটাতে কান্নার রোল পড়ে গেল।

    সেই রাতে ত্রিধার খুব কষ্ট হচ্ছিল। সেই দৃশ্যটা এখনও মনে ভেসে উঠলে, আমার চোখ দিয়ে আমার অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়ে।
    কেমন করে কি হয়ে গেলো!কদিনের ভিতর আমাদের জীবনটা এমনভাবে বদলে যাবে,কে ভেবেছিল?ত্রিধা কি ভেবেছিল?
    আমার একেকসময় ইচ্ছে করে চিৎকার করে ঈশ্বরকে জিগ্যেস করি,কেন ত্রিধাকে এই কঠিন রোগ দিয়ে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিলেন?

    আমি এখনও এই নদীর পাড়ে এসে বসি।একাই এসে বসে থাকি। এখন আর ত্রিধা আসে না,গান গায় না,গল্প করে না,হাসে না।
    যখন সন্ধ্যা নামে, অন্ধকারে যখন তারাগুলো ফুটে উঠে একটা একটা করে,সেগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয় ত্রিধা বুঝি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে,আমার সাথে গল্প করছে।
    কে জানতো আমাদের জীবনেও যে এভাবে সন্ধ্যা নেমে আসবে?
    একটা কথা আমি প্রথম প্রথম বরাবরই ভাবতাম,ওকে পেয়ে গেলে কেমন হতো? কিন্তু ওকে পেয়ে হারাতে হবে,এটা কখনো ভাবিনি।
    এত তাড়াতাড়ি চলে গেলে ত্রিধা?
    এই কথাগুলো ভেবে ভেবে আমার চোখের কোণে জল জমে।
    এই চোখের কোণ দিয়েই আমি ত্রিধাকে প্রথম প্রথম দেখতাম।

    ~ অনিক বিশ্বাস

    3
    2 Comments
    • নিদারুণ এক জীবনবোধের গল্প! আমরা চাইলেই সব পাই না, আর পেলেও কত দ্রুত হারিয়ে ফেলি!

    • সত্যিই হৃদয় ভেঙে দেয়, আবার একই সাথে অদ্ভুত শান্তিও দেয়
      ভালোবাসার সরলতা, সময়ের নিষ্ঠুরতা আর স্মৃতির স্থায়িত্ব

Skip to toolbar