-
আমার মায়ের প্রথম স্কুল যাত্রা
আমার আদরের মেয়ে রওশন আসাদ প্রিয়ন্তী আজ (০৬ মার্চ ২০২২ ইং, রবিবার) প্রথম স্কুলে গেলো। প্রথম স্কুলে গমন এতটা সুন্দর, সহজ, সাবলিল হবে আমি ভাবিনি। আমি যখন প্রথম স্কুলে যাই তখন আমরা স্বর্ণঘোষ গ্রামে দাদার বাড়িতে থাকি। আমার মা আমাকে নিয়ে ধানুকা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যায়য়ে গিয়ে রেখে আসেন। আমাকে স্কুলে রেখে বাড়ি চলে আসার কিছুক্ষণ পরে পিছন দিকে তাকিয়ে দেখে আমি তার পিছু পিছু আসছি। অগত্যা আর কী করা? দাড়িয়ে থেকে প্রথম দিন আমাকে সাথে নিয়েই বাড়ি ফিরেছিলেন মা। স্কুলে আমার মন টিকবে কি, আমার মায়েরও হয়তো আমাকে রেখে এসে ভালো লাগছিলো না, তা না হলে মা কেন বার বার পিছু ফিরে ফিরে দেখবে? এভাবে কত দিন যে আমাকে রেখে এসে কিছুদূর যাওয়ার পরে পিছু ফিরে তাকিয়ে দেখেছে আমি চলে এসেছি, আবার গিয়ে স্কুলে দিয়ে এসেছে, আবার চলে এসেছি। সেই দিনগুলো আজো মনে পরে। চলে এসে এসে বার বার ফিরে গিয়ে গিয়ে আজ আমি আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর (এলএল.এম) ডিগ্রি নিয়ে আইন পেশায় যুক্ত আছি যার সকল কৃতিত্ব মহান আল্লাহ তায়ালার পরে আমার মা-বাবার।
করোনা অতিমারি জীবনের সকল হিসাব নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। গতবছর ২০২১ সালে রওশন আসাদ প্রিয়ন্তীকে আমার শৈশবের দ্বিতীয় বিদ্যাপিঠ তুলসার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যা বর্তমানে তুলাসার সরকারী মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণীতে ভর্তি করিয়েছিলাম। ভর্তি করেছি আমি একাই গিয়ে। একদিনের জন্যও স্কুলে যেতে হয়নি প্রিয়ন্তীর। মাঝে একদিন ম্যাডামের কাছ থেকে ওর বইপত্র নিয়ে এসেছি আমি নিজেই। তাও ম্যাডামের বাসা থেকে, স্কুল থেকে নয়।
সবাইকে অটো পাস দেয়া হয়েছে সেবছর। আমার কন্যাও অটোপাস করে শিশু শ্রেণী থেকে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস চলে গেলেও কন্যার স্কুলে যাওয়া হয়নি। শিশু পূর্ব থেকে প্রথম শ্রেণীর পড়াশুনা বাড়িতেই করতো। কন্যার মা যেহেতু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন মানুষ গড়ার কারিগর। তাই মায়ের কাছেই এতদিন যাবৎ পড়াশুনা করে আসছে প্রিয়ন্তী।
করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে স্কুল খুলে দেয়ার ঘোষণায় আজ মেয়েকে প্রথম স্কুলে নিয়ে গেলাম আমি। কথা ছিলো মেয়ের মা মেয়েকে প্রথম দিন স্কুলে দিয়ে আসবে এবং স্কুলের বিষয়াদি জেনে আসবে। কিন্তু তারও যে স্কুল খুলেছে। অগত্যা আমাকেই নিয়ে যেতে হলো। মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যেতে হবে তাই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে একদম রেডি হয়ে গেলাম। আমার আগেই মেয়ের মা ও মেয়ে রেডি। কয়েকদিন আগেই মেয়ের জন্য নতুন স্কুল ব্যাগ, পানির পট, পেন্সিল বক্স, খাতা ইত্যাদি সরঞ্জামাদি কিনে এনেছে তার মা। সব গুছিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে পাশেই তার ফুপিদের বাড়িতে গেলাম। মেয়ে প্রথমেই তার বড় ভাই রজিবুল ইসলাম শানকে সালাম করলো। বড় ভাই তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একশত টাকা উপহার দিলো। এর পর তার বড় ফুপি, বড় ফুপা, ছোট ফুপিকে ছালাম করে দোয়া নিলো। সবাই একশত টাকার নোট দিয়ে দোয়া করে বিদায় দিলো। মেয়েকে নিয়ে স্কুলে গিয়েই আমার বন্ধু স্কুলের শিক্ষক শাহ আলম এর সাথে, প্রধান শিক্ষকের সাথে পরিচয় করিয়ে প্রিয়ন্তীর ফুপু কনিকা ম্যাডামের হাতে তুলে দিলাম। কনিকা ম্যাডাম প্রিয়ন্তীকে স্কুলের দোতলায় দক্ষিণ কর্ণারের কক্ষে বসিয়ে দিয়ে আসতে বললো। আমি প্রিয়ন্তীকে দোতলায় তার রুমে ঢুকিয়ে পশ্চিম দিকের একটি বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে বাইরে এসে অপেক্ষা করলাম ওর প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। কিছুক্ষণ পরে দেখলাম, না, কোন প্রতিক্রিয়া নাই। সে স্কুলকে ভালোভাবেই নিয়েছে। আমি প্রিয়ন্তীকে শ্রেণীকক্ষের বাইরে ডেকে এনে আবার কিছু কথা বলে ভিতরে দিয়ে দিলাম। ম্যাডামরা চলে এসেছে। আমি চলে আসলাম আমার চেম্বারে। চেম্বারে এসে কাজ করলেও মন ছিলো স্কুলের দিকে। কি করে, কেমন করে, কান্না করবে কিনা এই নিয়ে চিন্তায় ছিলাম যেমনটা আমার মা ভাবতো আর বার বার পিছন ফিরে তাকাতো। বারোটার দিকে স্কুল থেকে ফোন এলো। স্কুলের সেলিম স্যার ফোন করে আমাকে জানালো স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, মেয়ে টিচার্স রুমে অপেক্ষা করছে। আমি দ্রুত মোটরবাইক টান দিয়ে চলে গেলাম স্কুলে। আমাকে দেখে মেয়ে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলো। এক হাতে মেয়ে আরেক হাতে স্কুল ব্যাগ নিয়ে বাইরে আসতেই স্কুল মাঠের খেলনার দিকে তার নজর পরলো। আমাকে বললো, বাবা আমি খেলবো। তাকিয়ে দেখি একেকটা খেলনায় চড়ার জন্য বাচ্চারা লাইন দিয়ে দাড়িয়ে আছে। রাইডে উঠতে ওর অপেক্ষা করতে হবে অন্তত আধাঘন্টা। তার উপর বাচ্চারা হুরোহুরি করছে। আমি মেয়েকে বললাম, আজ না মা, আরেকদিন উঠবে। মেয়ে আমার কথায় সায় দিয়ে রওয়ানা দিলো। জিজ্ঞেস করলাম, কিছু খেয়েছো। বললো, কনিকা ম্যাডাম বিস্কুট দিয়েছিলো তা খেয়ে পানি খেয়েছি। কনিকা ম্যাডাম আমার মামাতো বোন হয়, তাই ফুপি তার দায়িত্ব ঠিকিই পালন করেছে, ভাতিজিকে বিস্কিট খাইয়েছে। আমি বললাম, এখন কিছু খাবে মা? বললো, ফুচকা খাবো। আমি বললোম, ঠিক আছে, আজকে প্রথম দিন তাই খাও, এসব খাবার ভালো না, প্রতিদিন খাওয়া যাবে না। মেয়ে তাতেই রাজি হলো। ওকে ফুচকা খাইয়ে বাসায় দিয়ে আসলাম।
বাসায় যেতে যেতে সে স্কুলের নানান গল্প করলো আমার সাথে। নতুন একজন বান্ধবী জুটে গেছে তার। নামটা মনে নেই, কাল আবার জিজ্ঞেস করবে। ম্যাডামরা বাংলা, গণিত, পরিবেশ পরিচিতিসহ বিভিন্ন বিষয় পড়িয়েছে, লিখিয়েছে, গল্প বলিয়েছে। সে সবই পেরেছে। ম্যাডামরা তাকে গুড দিয়েছে জানালো আমাকে। তার মুখে আনন্দের ঝিলিক। প্রথম দিন স্কুলে গেলেও তার মধ্যে কোন জড়তা নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেমন লাগলো স্কুল? সে বললো, আমার খুব ভালো লেগেছে বাবা। মেয়ের ভালো লাগায় আমারও ভালো লেগেছে। বাবার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মেয়ের স্কুল ব্যাগ কাধে নিয়ে চলার আনন্দ উপভোগ করলাম। আমারও যে অনেক ভালো লেগেছে মা। তুমি মানবিক মানুষ হলেই শ্রম স্বার্থক হবে।8 Comments
Friends
Foyzur Khan
@foyzur-khan
Humayun Kabir Surjo
@humayunkabir-surjo
Sajid Raiyan ( সাজিদ রাইয়ান)
@sajid07
Shohag arnob
@shohagarnobgmail-com
আব্দুল মজিদ মারুফ
@abdulmojid
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
এড: সাজেদুল হক টুটুল
@sazedul
নিশাত আনজুম
@nishathunzom
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib



অভিনন্দন !