Profile Photo

Md. Azizur RahmanOffline

  • azizur
  • Profile picture of Md. Azizur Rahman

    Md. Azizur Rahman

    4 years, 7 months ago

    আক্ষেপ!
    মোঃ আজিজুর রহমান

    মনিরের মা খুব অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে নেয়া দরকার। মনির তার মায়ের সাথে গ্রামে থাকে। তাদের গ্রামটা টাঙ্গাইল শহর থেকে দশ-বার কিলোমিটার দূরে। আজকের যোগাযোগ ব্যবস্থার মত তখনকার দিনের যোগাযোগ ব্যবস্থা ততটা উন্নত ছিলনা। সে খুব অস্থির, মাকে কিভাবে সদর হাসপাতালে নিয়ে যাবে? গ্রামের রাস্তাটা মাটির। পরিবহন ব্যবস্থা বলতে গরুর গাড়ি। তার নিজের কোন গরুর গাড়ি নেই। গ্রামের মোড়ল সাহেবের গরুর গাড়ি আছে। মোড়লের কাছ থেকে গরুর গাড়ি নিয়ে, তিনজন বন্ধু মিলে মনির তার মাকে হাসপাতালে ভর্তি করায়।

    মরিয়ম বেগমের বয়স হয়েছে ৫০ বছর। মরিয়ম বেগমের বয়স ১৪ হলে, তার বাবা তাকে বিয়ে দেয়। বিয়ের বছর তিন পরে মনিরের জন্ম হয়। মনিরের বয়স পাঁচ বছর হলে, ওর বাবা কালা জ্বরে মারা যায়। মরিয়ম বেগম আর বিয়ে করেনি। মনিরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন। চাষবাস করে চলে যায় ওদের সংসার। মনিরের বাবার মৃত্যুর পর লোকজন দিয়ে মরিয়ম বেগম জমিতে চাষ-বাস করতেন। অধিক পরিশ্রমের ফলে মনিরের মা বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন। গ্রামের একজন হোমিও ডাক্তার আছেন তিনি চিকিৎসা করেন মরিয়ম বেগমের। হোমিও ডাক্তার বলেন, মনিরের মা তোমাকে বড় ডাক্তার দেখাতে হবে। আমার ওষুধে কাজ হবে বলে মনে হয় না।

    মরিয়ম বেগম অভাব কি তা সে হাড়ে হাড়ে জানে। ধান ও হাঁস-মুরগি বেঁচে যা আয় হয় তা দিয়ে তার সংসার চলে। অভাব-অনটনের মধ্যে থেকেও অনেক কষ্টে কিছু চাষের জমি কেনেন। যাতে ছেলের জীবনে অভাব না আসে। মরিয়ম বেগম নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দের দিকে কখনও খেয়াল করেনি। যেভাবে পেরেছেন সেভাবেই টাকা জমিয়েছেন। নিজের অসুস্থতার জন্যও ডাক্তার পর্যন্ত দেখাচ্ছেন না। টাকা খরচ হবে বলে। মনির প্রায় বলে মা চল তোমাকে সদর হাসপাতালের বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। মরিয়ম বেগম বলেন, না থাক খোকা। এখনওতো চলাফেরা করতে পারছি। ওতোটা কষ্ট হচ্ছে না। মনিরের লেখা পড়া করা হয়নি। গ্রামে কোন স্কুল ছিলনা সে সময়। মায়ের সাথে চাষের কাজ করেছে।

    মরিয়ম বেগম একপ্রকার জোর করে ছেলের বিয়ে দিয়ে দেন। ছেলের ঘরে নাতি-পুতি দেখতে চান। মনির মায়ের অনুরোধ রাখতে বিয়ে করেন। বিয়ের পর মনিরের মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। আজ পাঁচ দিন, মনির তার মাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। মিরয়ম বেগমের অবস্থার কোন উন্নতি নেয়। হাসপাতালের বাইরের বারান্দায় শুয়ে আছেন মরিয়ম বেগম। পাশে বসা একমাত্র ছেলে মনির। ডাক্তার আসেন সকালে একবার। রাতে আসে মাঝে মধ্যে। ডাক্তার কিছু ধরতে পারছেনা। মায়ের ওষুধ-পত্র কিনতে আর খাওয়া-দাওয়ায় পয়সা যা ছিল তা শেষ হয়েগেছে মনিরের। মনিরের টাকা দরকার। টাকা পাবে কোথায়? টাকার জন্য বাড়িতে যেতে হবে।

    মনির টাকা আনার জন্য মাকে সকালে খাওয়ানোর পর বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। বাড়িতে যাবার জন্য একমাত্র ভরসা দুইখানা পা। কোন যানবাহন নেই। বার কিলোমিটার হেঁটে মনির বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। একেতো রাত জাগা তারপর বার কিলোমিটার পথ হেঁটে বাড়ি আসা। দুপুরের দিকে বাসায় এসে টাকার জন্য ছোটাছুটি করে। টাকা জোগাড় করতে করতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে যায় মনিরের। ক্লান্ত শরীল আর চলতে চায় না। একদিকে ক্লান্ত শরীল অন্য দিকে রাত হয়ে গেছে হাসপাতালে যাবার জন্য হাঁটা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেয়। তাই মনির রাতে গ্রামেই থেকে যায়। মনে করে খুব ভোরে উঠে রওনা দেবে। মায়ের কাছে দুপুর ও রাতের জন্য পাউরুটি ও কলা আছে। যা মা খেয়ে থাকতে পারবে।

    মরিয়ম বেগম মারা যায় দুপুরের দিকে। তার কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে পাশের একজন ডাক্তারকে খবর দিলে ডাক্তার রোগী দেখে বলে মারা গেছে। মৃত মানুষকে সবাই ভয় পাই। কেউ কাছে থাকতে চায়না। অন্য রোগীর লোকজন বলে, এখানে লাশ রাখা যাবে না। বাধ্য হয়েই মৃতের শরীরটা বারান্দার বাইরে বের করে দেয় হাসপাতালের লোকজন। রাতে খোলা আকাশে নিজে ফাঁকা জায়গায় লাশ পেয়ে যায় একদল শিয়াল। শিয়ালগুলো মহা-উৎসবে মৃতের শরীর ছিন্ন-ভিন্ন করে ফেলে। মনির সকালে এসে দেখে তার মায়ের শাড়ির টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মনির চিকিৎকার করে কেঁদে ওঠে। বলে মা, আমি বাড়িতে রাতে না থাকলে তোমার এমন অবস্থা হতো না। মা, মাগো আমি তোমার কুলাঙ্গার সন্তান। মরার সময় না তোমার পাশে থাকতে পারলাম আর না পারলাম তোমার মাটি দিতে। এ একটি আক্ষেপ করে গেছে মনির, সারা জীবন মাকে মাটি না দিতে পারার জন্য।

    6
    5 Comments
Skip to toolbar