-
ক্রিবিণি
হাসনাত সৌরভ
====================কাকের কর্কশ কণ্ঠস্বর পাখিটির চরিত্রকে ভুল ব্যাখ্যা করে। নইলে এই জুবুথুবু ঠান্ডায় ডানায় ডানা ছুঁইয়ে একে অন্যের শরীরকে উষ্ণতা বিনিময় করত না হয়তো। আম্মিও তো সারাদিন খসখসে গলায় আব্বুকে গালাগাল করে। তা বলে কী আম্মি ভালোবাসে না? ভালো না বাসলে যে আব্বু চার সন্তান আর বিবি ছেড়ে বুড়ো বয়সে একটা বাচ্চা মেয়েকে নিকাহ্ করেছে, তার জন্য আম্মি মাছের সব থেকে বড় পিসটা তুলে রেখে দিতে পারত! আব্বুর নতুন বউ তো আফরোজার-ই বয়সী। চাঁদপুর স্টেশনের ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে বসে দু’টি কাকের আচরণ দেখে আফরোজা মনে মনে আম্মি আব্বুর কথাই ভাবছে। প্রান্তিক রেল স্টেশন। ট্রেনের বিলম্বিত গমনাগমন। আফরোজার কাছে ঘড়ি নেই। তবে এক এক করে তিনটে ট্রেন চলে যাওয়ায় হিসেব বলছে ৪-৫ ঘণ্টা কেটে গেছে। কিন্তু এখনও রাফি এলো না। বলেছিল দু-এক ঘণ্টা দেরি হতে পারে। কাজ জমে আছে অনেক। তবে সে আসবেই। আম্মির ঘুম ভাঙার আগেই সে বেরিয়ে এসেছে মহল্লা থেকে। কয়েকটা সালোয়ারের সঙ্গে আম্মির একটা শাড়িও না বলে নিয়ে এসেছে। শাড়ি পরে কদমবুশি করলে রাফির আম্মির মন গলতে পারে। এদিকে দুপুর হতে চলেছে। খিদেয় আফরোজার শরীরটা দুমড়ে আসছে। খানিক দূরে একটা চায়ের দোকান। বিস্কুট কেক। কিন্তু চায়ের দোকানের মালিকের ওই লোকটা সেই সকাল থেকে বসে আছে। নজর আফরোজার দিকে। চাহনি আফরোজার চেনা। এমন চাহনি তার মহল্লার অলিগলিতে মেলে। আফরোজা পেটে প্লাস্টিকের ব্যাগটা চেপে ধরল। চোখে রাফির আসার পথ…
“কই যাবে মামণি?” কখন যেন উঠে এসেছে লোকটা। আফরোজার সামনে। –“আমি রেলপুলিশের লোক। সব আমাদের চোখে পড়ে। কী কেস?” –“এক বন্ধু আসবে।” –“অ, তা নাম কী বন্ধুর?” –“রাফি আনজুম, ইন্স্যুরেন্সে কাজ করে।” লোকটা দাড়ি খামচায়। –“কোথায় বাড়ি বলো তো? চেনা চেনা লাগছে।” –“মধুরোড়।” লোকটা প্রগলভ হল। –“ও হো, আমাদের মধুরোড়ের রফিক? সে তোমার বন্ধু? তা মানে ইয়ে, কেমন বন্ধু?” নির্বিকার আফরোজার সামনে লোকটার পরের প্রশ্ন — “রাফির সঙ্গে কোথায় যাবে মামণি?… বিয়ে টিয়ে করবে নাকি? ঘর থেকে পালিয়ে এসেছ নাকি?”
আফরোজার বুক ঢিপঢিপ করে। রাফির কথা না রাখলে তাকে ঘরে ফিরে যেতে হবে। আম্মি এতক্ষণে সব বুঝে গেছে। ফিরে গেলে চুলের মুঠি ধরে দরজায় ঠুকে দেবে। রাগ বাড়ছে। রাফি না এলে যে বাবলা গাছের নিচে বসে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেখানেই ওকে দাফন করবে। আলি এসব কাজে ওস্তাদ। আলি তাকে দুসরা বিবি করে ঘরে তুলতে চায়।
চাঁদপুর স্টেশন থেকে নেমে রেললাইন ধরে বলাখালের দিকে একশো মিটার হাঁটলেই বাঁদিকে ময়লার স্তুপের ভেতর দিয়ে পায়ে চলা অত্যন্ত সরু একটা রাস্তা একেঁবেঁকে ঢুকে গেছে দর্জিপাড়া। ছোট ছোট প্লাস্টিক ঘেরা খুপরিগুলোর গায়ে গায়ে মাথা তুলে পরপর দাঁড়িয়ে পড়েছে ইটের পাকা বাড়ি। নতুন, প্লাস্টারহীন পাঁচ ইঞ্চির গাঁথুনির এই বাড়িগুলো অশক্ত, ভঙ্গুর। এরকমই একটি বাড়ির দশ ফুট বাই বারো ফুটের এক একটা ঘরে তিনটে করে সেলাই মেশিন। মাথা নিচু করে একমনে ব্যাগ সেলাই করছে রাফি। ঠান্ডা। খুব ইচ্ছে করছে একটা বিড়ি ধরাতে। সময় কম। দুপুরের আগেই স্টেশনে পৌঁছে যাবে বলেছিল আফরোজাকে। ম্যানেজার আরও দু’শোটা ব্যাগ দিয়ে গেছে। ফিনিশিং স্টিচ হবে। এই সময় খুব সতর্ক হয়ে কাজ করতে হয়। ফাইনাল ডেলিভারিতে যেন কোনও ডিফেক্টেড পিস না যায়, আলাদা করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। কিন্তু রাফি তাড়াহুড়ো করছে। সেলাই মেশিনে তার হাত-পা ঝড়ের বেগে ছুটছে। আজ যখন রাফির আসল পরিচয় আফরোজা জানবে কী প্রতিক্রিয়া হবে তার! বুকটা চুপসে যাচ্ছে। প্রথমদিন আফরোজার সাথে দেখা করতে রাফি সুন্দর একখানা শার্ট প্যান্ট পরেছিল। মালিকের ছেলে শহরে গেলে এইরকম পোশাক পরে। রাফিরও ইচ্ছে হয় সুন্দর পোষাক পরে চামড়ার ব্যাগ হাতে অফিস যেতে…
“আর কতক্ষণ বসবে গো? চলো তোমায় মধুরোড় দিয়ে আসি। রফিকের বাড়ি আমি চিনি। কত্তবার গিসি।”
লোকটার অভিসন্ধি আফরোজা বুঝেছে, কিন্তু চুপ করে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই তার। আপাতত ঘরে ফেরার কথা আফরোজা ভাবতে পারছে না। পাশেই দর্জিপাড়ায় দিলরুবার বাপের ঘর। আকবরের সাথে ঝগড়া করে সে এখন দর্জিপাড়ায় উঠেছে।
আফরোজা ওঠার জন্য উশখুশ করছে লক্ষ করে লোকটি বলল, “কী মামণি, যাবে? এই সামনেই বাস রাস্তা। চলো দিয়ে আসি। সন্ধে হয়ে গেলে কিন্তু বাস পাবে না।” — “আমি মধুরোড় যাব না। আপনি যান।” আফরোজা দর্জিপাড়ার দিকে হাঁটতে লাগল।
কয়েক পা এগোতেই… রেললাইন ধরে ও কে? রাফি না? বড় করে শ্বাস নিল। ওর খিদে, ক্লান্তি এখন আর নেই।
রাস্তায় দু’জন বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। রাফির মনের মধ্যে ঝড়। আফরোজার শান্ত দৃষ্টি। খানিক পর রাফি মাটি থেকে একটি পাথর কুড়িয়ে দু’হাতে সেটিকে ঘষটে ঘষতে বলে, “আমি ক্লাস ফোর অবধি পড়েছি। দর্জির কাজ করি। এটা ছাড়া আর কোনও মিথ্যে কথা বলিনি। আল্লার কসম্।”
আফরোজার পা টলে গেল। আঘাত। এত বড় মিথ্যে কথাটা যে বলেছে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল কিচ্ছুক্ষণ। এই একটাই মিথ্যে…?
এই স্তব্ধতা হাজারটা কাঠ পিঁপড়ে হয়ে রাফির সারা শরীরে বাইতে শুরু করেছে। রাফির হাত কাঁপছে। গাল বেয়ে নোনাজল। আফরোজা রাফির মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ওর গা ঘেঁষে দাঁড়াল। সন্ধে নামছে। শীতের রাতে বাস চলাচল বেশিক্ষণ হয় না।
তবে শেষ বাসটা ওরা পেয়ে যাবে নিশ্চিত।
@হাসনাতের হস্তাক্ষর
9 Comments-
@ovimanimon ধন্যবাদ ও ভালোবাসা
Friends
ফরহাদ আহমেদ
@forhad2004
সাব্বির হোসেন।
@shadowhunter3d
তাজুল ইসলাম তন্ময়
@tazulumgmail-com
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
জিকরুল ইসলাম
@zikrul
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
অসীম রহমান
@ashim_rahman
Prithula Zaman
@prithula



আপনার গদ্য সুন্দর, প্রানবন্ত; সবসময় উপভোগ করি।