Profile Photo

Masfi KOffline

  • Masfi-Mohammad
  • Profile picture of Masfi K

    Masfi K

    3 weeks, 4 days ago

    সত্যজিৎ রায় একবার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, অনেক সময় নাকি নিজেকে বেশ একা মনে হয়। তার কাজ এবং মানুষ—আশেপাশে সব আছে, তবু কিছু একটা নেই; এমন কিছু, যেটা ছাড়া অস্তিত্বে টান লাগে। একাকিত্ব নিয়ে বলেছেন কিশোর কুমারও। মৃত্যুর আগে একাকিত্ব জেঁকে ধরেছিল তাকে। শোনা যেত, একাকিত্ব কাটাতে তিনি নাকি গাছের সঙ্গে কথা বলতেন। রবীন্দ্রনাথ থেকে Dante —একাকিত্বের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল পৃথিবীর বহু মহীরুহেরই।
    আপনারও তো একা লাগে, লাগে না? সত্যজিৎ রায়, কিশোর কুমার কিংবা আপনার—একটা বিষয় স্পষ্ট। একাকিত্ব নামের বিশালী দৈত্যের সঙ্গে লড়াই করে কেউই ঠিক সুবিধা করে উঠতে পারেনি। আর এই একাকিত্ববোধ এতটাই মারাত্মক যে, মানসিক জটিলতা থেকে মৃত্যু-কেন্দ্রিক চিন্তা—কোনো কিছুই এর হাত থেকে রেহাই পায়নি।
    সেখান থেকেই প্রশ্ন—এই একাকিত্ব আসলে কী? যারা হারুকি মুরাকামির Norwegian Wood পড়েছেন, তারা হয়তো একাকিত্বের এই জটিলতা ধরতে পারবেন। মানুষ যখন তার আশেপাশে মানুষের অভাব বোধ করে, এবং এই অভাবজনিত কারণে সে কষ্ট পায়, তখন তাকে একাকিত্ব বলে।
    আবার আরেকটু অন্যভাবে বললে, যেহেতু মানুষ অনুভূতি-সর্বস্ব প্রাণী, সেহেতু একাকিত্ব মানুষের এমন একটি অনুভূতি, যেখানে সে চিন্তা করে—সে একা। সে অনুভব করে, তাকে বুঝতে পারার কেউ নেই।
    সেখান থেকেই আসে আইসোলেশন—সবার থেকে দূরত্ব। এরকম সময় সে এমন কাউকে চায়, যে তাকে বুঝবে, তার অনুভূতিকে ভ্যালিডিটি দেবে। এরকম মানুষ যখন সে পেয়ে যায়, তখন সেই মানুষটিকে ধরে রাখার জন্য সে মরিয়া হয়ে ওঠে। আর এই মানুষটি কোনোদিন তার জীবন থেকে চলে গেলে, সে আবার একাকিত্বে ভোগা শুরু করে।
    একাকিত্ব থেকে জন্ম নেয় অদ্ভুত এক টার্ম—ইমোশনাল ব্ল্যাক হোল। ইমোশনাল ব্ল্যাক হোল মূলত হিউম্যান ইমোশনের এমন এক স্টেট, যেখানে ইমোশনাল এনার্জি কোনো কারণ ছাড়াই খরচ হতে থাকে। আর এই এনার্জি শুধু খরচই হয়, ফিরে আর আসে না।
    হুমায়ূন আহমেদ যদিও বলেছিলেন, “প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না।” কিন্তু ইমোশনাল ব্ল্যাক হোলে আটকে পড়া মানুষের ক্ষেত্রে অনুভূতি শূন্য হয়ে যাওয়াটাই যেন প্রকৃতির বিধান।
    এই মানুষেরা যে ইচ্ছে করে ইমোশনাল আইসোলেশনে থাকে, তা নয়। মূলত তারা তাদের আশেপাশের ইমোশনগুলোকে অ্যাড্রেস করতে পারে না বলেই ধীরে ধীরে সবকিছু থেকে গুটিয়ে নিতে থাকে।
    ইমোশনাল ব্ল্যাক হোলের পেছনে নানা কারণ বা প্রভাবক থাকতে পারে। তবে মূলত প্রধান কারণ দুটি—এক্সটার্নাল ফ্যাক্টর এবং ইনার কনফ্লিক্ট।
    এক্সটার্নাল ফ্যাক্টর নিয়ে কথা বলতে গেলে, প্রথমেই আসবে আমাদের আশেপাশের টক্সিক সিচুয়েশন।
    একটা রিলেশনশিপ, যেখানে একজনই সবকিছু পেয়ে যাচ্ছে, একজনই ডমিনেট করছে, সম্পর্কের অপর পাশে থাকা মানুষটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না—এরকম ক্ষেত্রে যে মানুষটি শুধু দিয়েই যাচ্ছে, সে একটা সময় এসে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে।
    একটা ইমব্যালেন্স তৈরি হয়। প্রথমদিকে এই ইমব্যালেন্স খুব বেশি জটিল না থাকলেও, সময় যত গড়ায়, বিষয়টি মারাত্মক আকার ধারণ করে।

    বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যারা সময়-অসময় শুধু নিয়েই যায়, রাখে না ন্যূনতম খোঁজ—তারা অন্য প্রান্তে একটা শূন্যতা তৈরি করে।
    এরপর আসে অফিস কালচার। স্বার্থপর সহকর্মী কিংবা ডমিনেটিং বস—এরাও এক্সটার্নাল ফ্যাক্টর হিসেবে ভূমিকা রাখে। এসবের যারা ভুক্তভোগী, তারা তাদের ইমোশনগুলো প্রপারভাবে এক্সপ্রেস করতে পারে না। ফলে ভেতরে একটা ঘাটতি তৈরি হয়। সেখান থেকেই আসে একাকিত্ব। রেজাল্ট—ইমোশনাল ব্ল্যাক হোল।

    দ্বিতীয় কারণ—ইনার কনফ্লিক্ট। ইনার কনফ্লিক্ট নিয়ে কথা বলতে গেলে তিনটি উপাদানের নাম আসবে—ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স, ইমোশনাল ট্রমা এবং নেগেটিভ থিংকিং। প্রথমেই ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্স।
    যে সকল মানুষ সবসময় নিজেদের নিয়ে অস্বস্তিতে ভোগেন, লো সেলফ-এস্টিম নিয়ে যারা প্রতিদিনই লড়াই করছেন, সেলফ-ডাউট ছায়ার মতো ঘিরে রেখেছে যাদের—তারা সবসময় অন্যের কাছ থেকে সেলফ-ভ্যালিডেশন চান। এই ভ্যালিডেশন মূলত তাদের ভেতরের ইমোশনাল ভ্যাকুয়ামকে ভরাট করার কাজ করে। আর যতই অ্যাটেনশন বা ভালোবাসা তারা পাক না কেন, তাদের এই শূন্যস্থান কখনোই পূরণ হয় না। ফলাফল—ইমোশনাল ব্ল্যাক হোল। ইমোশনাল ব্ল্যাক হোলের আরেকটি প্রধান উপাদান—ইমোশনাল ট্রমা।
    জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, “কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?” যদিও বেদনা জাগাতে কেউই ভালোবাসে না, তবুও নানাভাবে এই বেদনার মুখোমুখি হতেই হয়।
    যে মানুষ হারিয়েছেন প্রিয়জন, ছোটবেলাতেই মুখোমুখি হয়েছেন বাজে পরিস্থিতির, কিংবা যার জীবনে বিশ্বাসঘাতকতা, ক্ষতি অথবা অবহেলার মতো পরিস্থিতি এসেছে বারবার—তার ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই কিছু শূন্যতা তৈরি হয়। যে শূন্যতা সারাজীবন থেকে যায়।
    লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট—নেগেটিভ থিংকিং। ইমোশনাল ব্ল্যাক হোলের আরেকটি কারণ অতিরিক্ত নেগেটিভ থিংকিং। যেসব মানুষ সবকিছু নিয়ে ভয় পায় এবং নেগেটিভ চিন্তা করে, তারা একটা অদ্ভুত লুপে আটকা পড়ে। রাইনার মারিয়া রিলকে বলেছিলেন, “Our deepest fears are like dragons.” এই ভয় এবং নেগেটিভ থিংকিংয়ের ড্রাগন মানুষগুলোকে আটকে রাখে ইমোশনাল ব্ল্যাক হোলের অন্ধকার চক্রে।

    তবে আশার কথাও আছে। চাইলেই এই ইমোশনাল ব্ল্যাক হোল থেকে বের হওয়া সম্ভব। যতই মনে হোক না কেন, এই লুপ থেকে আর বের হওয়া যাবে না—যদি কিছু সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে খুব সহজেই এই দানবের সঙ্গে সংঘাত এড়ানো যায়। সেজন্য প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে, আপনি ইমোশনাল ব্ল্যাক হোলে আছেন এবং আপনি এখান থেকে বের হতে যাচ্ছেন। এরপর আপনাকে প্রথম যেদিকে নজর দিতে হবে, সেটি হচ্ছে আপনার আশপাশ। যে চাকরি আপনি করছেন, যাদের সঙ্গে মিশছেন—তারা কতটুকু আপনার ইমোশনকে পজিটিভলি কিংবা নেগেটিভলি প্রভাবিত করছে,
    সেটা বের করুন। আপনি আসলে কতটুকু একাকিত্ববোধ করছেন, সেটা নিয়ে ভাবুন। আর এই একাকিত্ববোধ কীভাবে দূর করা যায়, সেটার পরিকল্পনার পেছনে সময় দিন। নিজেকে প্রায়োরিটি দিন। অফিসে বসের এক্সপেক্টেশন থাকবে, পরিবারের অনেক দায়িত্ব থাকবে, ফ্রেন্ড সার্কেলে টক্সিক মানুষও থাকবে। কিন্তু সেসব করতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলার রিস্ক নেবেন কিনা—সেই সিদ্ধান্ত একান্তই আপনার। মেন্টাল হেলথ ভালো রাখার জন্য যা যা দরকার, তা করতে হবে নিজেকেই। সবার সঙ্গে একটা হেলদি বাউন্ডারি যদি আপনি মেইনটেইন করতে পারেন, তাহলে লাভটা কার? উত্তর—নিজের। নিজেকে সময় দিন। এমন না যে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোথাও ঘুরতে যেতে হবে। বরং মানুষের মাঝেই থেকে ছোট ছোট অ্যাক্টিভিটিতে নিজেকে প্রায়োরিটি দিন।
    মেডিটেশন, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা, কিংবা প্রতিদিনের রুটিন থেকে কিছুটা বিরতি—যা করলে মন শান্ত হয়, দিনের রুটিনে থাকুক সেসব। নিজের ভেতরের নেগেটিভ থটকে চ্যালেঞ্জ করাও হতে পারে এই মনস্টারের সঙ্গে যুদ্ধ করার আরেকটি অস্ত্র।
    বলা হয়, মাথায় কোনো নেগেটিভ থট এলে সেটিকে পজিটিভ থট দিয়ে বাইপাস করে দিতে হয়। যদিও এটা একদিনে আয়ত্ত হয় না, তবে নিয়মিত চেষ্টা করলে এটি আর মাথায় চড়ে বসতে পারবে না। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) কিংবা মাইন্ডফুলনেস প্র্যাকটিসের মাধ্যমে অনেকে নেগেটিভ থটের ইমপ্যাক্ট কমানোর চেষ্টা করেন। এটাও ভালো কাজ করে। এক্ষেত্রে ভালো একটি প্র্যাকটিসের নাম অ্যাপ্রিসিয়েশন। জীবনের ছোট-বড় পজিটিভ সবকিছুকে অ্যাপ্রিসিয়েট করা, সেগুলোকে সচেতনভাবে লক্ষ্য করার অভ্যাস—এর মাধ্যমেও চাইলে ইমোশনাল ব্ল্যাক হোল থেকে বের হয়ে আসা যায়।
    ক্রিস্টোফার নোলানের Dunkirk সিনেমার বিখ্যাত লাইনটা বোধহয় মনে আছে আমাদের সবারই—”Time. Defiance. Survival. Victory.” ইমোশনাল ব্ল্যাক হোলের সঙ্গে যারা লড়াই করছেন, তাদের প্রধান লড়াই মূলত এটাই—মেলানকোলির সমুদ্রে ডুবে না গিয়ে টিকে থাকার লড়াই। নিজের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে, সেগুলোকে ঠিকঠাক পথে বের করার লড়াই।

    এটা যারা করতে পারে, তারাই মূলত এই লড়াইয়ের বিজয়ী। আর এদের জন্যই হারুকি মুরাকামি তার জনপ্রিয় উপন্যাস Kafka on the Shore-এ বলেছিলেন—”যখন ঝড় থামবে, তখন তোমার মনে থাকবে না যে কীভাবে তুমি এই ঝড়ের মধ্য দিয়ে লড়াই করেছ। তুমি এটাও হয়তো নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না যে ঝড় আসলেই থেমেছে কিনা। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় একটা জিনিস নিশ্চিতভাবেই হবে—যখন তুমি ঝড় সামলে ফিরে আসবে, তখন তুমি আর আগের মানুষটি থাকবে না। এই ঝড় মূলত পাল্টে দেবে তোমাকেই।”

    ইমোশনাল ব্ল্যাক হোলের সঙ্গে যারা লড়াই করছেন, তাদের যুদ্ধটা দ্রুত শেষ হোক—সেটাই মূলত চাওয়া। আলো এসে কাটিয়ে দিক সব আধার। জীবনের এই সংক্ষিপ্ত সময়টুকু খেলায়, ভালোবাসায়, আর বেঁচে থাকার আনন্দে কেটে যাক সবার।

    4
    4 Comments
    • মানসিক স্বাস্থ্যের আলোচনাকে সহজ ও মানবিক করে তোলার একটি প্রশংসনীয় প্রয়াস।

    • মুরাকামির একটা বই কিনেছি কদিন আগে, আপনার লেখাটা পড়ে বইটার প্রতি আগ্রহ আরও তীব্র হলো। আর সত্যজিৎ রায় তো আমার জন্য এক অন্যরকম আবেগের নাম। এমন সুন্দর বিশ্লেষণধর্মী লেখাটা পড়তে পেরে খুব ভালো লাগলো বন্ধু! শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন !

      • @drako তাদের লেখানি গুলি আসলেই অনেক আবেগ আর অনুভূতির, আশা করি সময় করে মুরাকামির বইটি পড়ে শেষ করবেন, ধন্যবাদ

Masfi

Skip to toolbar