-
দুই ইঞ্চির দর্শন
গ্রামে গল্পের চেয়ে দ্রুত ছড়ায় আর কিছু নেই। বিশেষ করে শিকারের গল্প। কে কবে নদীতে কত বড় মাছ ধরল, কে বনে গিয়ে কত বড় সাপ মেরেছে, কে কুকুরকে বাঘ ভেবে পালিয়েছে—এসব গল্প গ্রামে বংশপরম্পরায় চলে।
আমাদের গল্পের নায়ক মফিজ মিয়া। নামটা শুনে মনে হতে পারে তিনি সাদাসিধে মানুষ। হ্যাঁ, তিনি সাদাসিধে-ই, কিন্তু তার একটা বিশেষ গুণ আছে—গল্প বড় করা। গ্রামের মানুষ তাকে মজা করে ডাকে—“মফিজ মাইক্রোস্কোপ”। কারণ তিনি যেকোনো জিনিসকে বড় করে দেখাতে পারদর্শী।
কিন্তু সবচেয়ে বিখ্যাত গল্প হলো—ভাল্লুক শিকার।
ঘটনাটা ঘটেছিল এক শীতে। গ্রামের এক পাগলা হাটে গিয়ে তিনি নাকি একটি ভাল্লুকের মুখোমুখি হন। আসলে সেটা ছিল একটা শুকনো গাছের কাণ্ড, যেটা একটু বাঁকা হয়ে দাঁড়ানো ছিল। তবে হাটে ফিরে তিনি সবাইকে বললেন—
“আজ বনে এক ভয়ংকর ভাল্লুকের সামনে পড়েছিলাম। দাঁত দেখিয়ে গর্জন করছিল। আমি একা, হাতে শুধু বাঁশের লাঠি, সাহস করে এক আঘাত করতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল!”
শুরুটা এখানেই।
প্রথমবার গল্প বললেন ছোট ভাইকে। ভাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া, ভাল্লুকটা কত বড় ছিল?”
মফিজ মিয়া হাত দুটো ছড়িয়ে বললেন,
“এমন! পাঁচ ফুট লম্বা!”
ভাই ছুটে গিয়ে অন্যদের বলল।
পরদিন মফিজ মিয়া যখন চায়ের দোকানে গল্পটা বললেন, তখন ভাল্লুকটা হঠাৎ সাত ফুট হয়ে গেল।
“ওমা, স্যার, আস্ত একটা ট্রাকের মতো বড় ভাল্লুক!”
তৃতীয় দিন, বাজারে ধান বেচতে গিয়ে গল্প করলেন। এবার ভাল্লুকের উচ্চতা দশ ফুট ছাড়াল। মানুষজন হাঁ করে শুনছে। একজন তো বলেই ফেলল—
“ভাই, এই ভাল্লুক বোধহয় সার্কাস থেকে পালিয়েছে!”
এভাবেই ভাল্লুক প্রতিদিন বাড়তে লাগল।
ছোট ছেলে রুবেল স্কুলে গিয়ে শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তরে বলেই ফেলল—
“স্যার, পৃথিবীর মধ্যে দ্রুত যেটা বাড়ে, সেটা হলো আমার বাবার শিকার করা ভাল্লুক।”
শ্রেণিকক্ষ ফেটে পড়ল হাসিতে। শিক্ষক অবাক হয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে রুবেল খোলাখুলি জানাল,
“আমার বাবা প্রথমে বলেছিলেন ভাল্লুকটা পাঁচ ফুট। কিন্তু প্রতিবার যখন নতুন কারও কাছে গল্প করেন, তখন সেটা দু’ইঞ্চি করে বেড়ে যায়। এখন মনে হয় বিশ ফুটের মতো হয়ে গেছে।”
শিক্ষক হেসে গড়িয়ে পড়লেন। কিন্তু গল্প থামল না। গ্রামে রটল—“মফিজ মিয়া বিশ ফুটের ভাল্লুক মেরেছেন।”
পাশের গ্রামের লোকেরা এসে খোঁজ নিতে লাগল। কিশোরেরা টর্চ নিয়ে রাতে বনে ঢুকল—“হয়তো ওই ভাল্লুকের পরিবার কোথাও আছে।”
অবস্থা এমন হলো যে, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান একদিন এসে ঘোষণা দিলেন—
“এত বড় ভাল্লুক মারার জন্য মফিজ মিয়াকে আমরা সংবর্ধনা দেবো।”
গ্রামমাঠে মঞ্চ বানানো হলো। মফিজ মিয়া সাদা পাঞ্জাবি পরে হাজির। চারদিকে লোক, মাইকে ঘোষণা—
“আজ আমরা গর্বিত! আমাদের গ্রামের বীর পুরুষ মফিজ মিয়া বিশ ফুটের ভাল্লুক শিকার করেছেন!”
তখন পাশের বাড়ির কাকা, যিনি আসল ঘটনা জানতেন, দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বললেন—
“ভাইরে, ভাল্লুক কই? যে গাছটারে তুমি লাঠি দিয়ে ঠেলছিলা, সেটাই তো ওইদিন শুকনা গাছের গুড়ি!”
মাঠ ফেটে পড়ল হাসিতে। মফিজ মিয়ার মুখ লাল হয়ে গেল। কিন্তু তিনি হার মানলেন না। মাইকে উঠে বললেন—
“ভাইসব, সত্যি কথা কি জানেন? ভাল্লুকটা আসলে গাছই ছিল। কিন্তু আমি গাছটাকে যখন ভাল্লুক ভেবেছিলাম, তখন সেটা আমার কাছে ভাল্লুকই ছিল। আর ভয়কে জয় করার যে সাহস দেখাইছি, সেটাই আসল গৌরব।”
লোকজন করতালি দিল। কারণ মিথ্যা হোক আর সত্য হোক, তার গল্পে সবাই আনন্দ পেয়েছে।
তারপর থেকে গ্রামে একটা নতুন প্রবাদ চালু হলো—
“গল্পের ভাল্লুক গাছে জন্মায়, কিন্তু হাসিতে সবার মন ভরে।”
রুবেলও গর্ব করে বন্ধুদের বলে—
“আমার বাবা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভাল্লুক শিকারি। প্রতিদিন তার শিকারের গল্প শুনলে ভাল্লুকটা আরও লম্বা হয়, আর আমরা আরও বেশি হাসি।”
এভাবেই এক শুকনা গাছের কাণ্ড থেকে শুরু হওয়া গল্প হয়ে উঠল গ্রামের আনন্দের উৎস। ভাল্লুকের আয়তন যেমন প্রতিদিন বাড়তে লাগল, তেমনি হাসির ভাণ্ডারও বড় হতে লাগল।3 Comments
Friends
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
Firoz Ahmed
@firozahmed1
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
ভাস্কর
@vaskarchou
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নোমান খালভী
@nomankhalovi
Niaz Aziz Dip
@niazdip
Meghdipe (মেঘদ্বীপ)
@meghdipe


“আমি গাছটাকে যখন ভাল্লুক ভেবেছিলাম, তখন সেটা আমার কাছে ভাল্লুকই ছিল। আর ভয়কে জয় করার যে সাহস দেখাইছি, সেটাই আসল গৌরব।” …………………অসাধারন একটা সংলাপ। মনের অজান্তেই ঠোটের কোনে মুচকি হাসি এসে গেলো।