Profile Photo

mueheb samnunOffline

  • muehebsamnun
  • Profile picture of mueheb samnun

    mueheb samnun

    • 2 months, 1 week ago

    আজিমপুর গোরস্থানের সোঁদা মাটির গন্ধটা শাফিনের রক্তে মিশে আছে।

    ​তার জন্মের তিন মাস পরই একটা এক্সিডেন্টে বাবা মা দুজনেই চলে যান। শাফিনের শৈশবের পুরোটা আর কৈশরের অর্ধেক টা কাটে তার বিধবা দাদির সাথে। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই শাফিন প্রতি শুক্রবার বাবার কবরের পাশে এসে দাঁড়াত। দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় দাদিও পরপারে চলে গেলেন। জীবনের একমাত্র আশ্রয়টুকু হারিয়ে শাফিন বুঝেছিল, যাকে সে ভালোবেসে আকড়ে ধরতে চায়, সে-ই বুঝি এই নিঃসঙ্গ পৃথিবী ছেড়ে পালিয়ে যায়। তবু দাদির রেখে যাওয়া সামান্য সঞ্চয় আর বাবার পেনশনের টাকায় টেনেটুনে পড়ালেখা শেষ করে একটা সাধারণ চাকরি জোগাড় করেছিল সে।

    ​যৌবনের নি:সঙ্গতায় জীবন তাকে একটাই উপহার দিয়েছিল—তুবা। তুবাকে ঘিরেই শাফিনের বেঁচে থাকার সবটুকু আলো জমা হয়েছিল। চাকরীটা স্থায়ী হওয়ার পর শাফিন আর তুবা মিলে একটা ছোট্ট ছিমছাম সংসার শুরু করল। কিন্তু, সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে হাসপাতালের হিমশীতল ঘরে তুবা যখন শাফিনের হাত ছেড়ে দিল, চারপাশের সব আলো এক লহমায় নিভে গেল।

    হতভাগ্য শাফিনের মনে পড়ে গেল কৈশরের এক শুক্রবারের কথা। বাবার কবরের পাশে গিয়ে সে দেখেছিল, অন্য এক অচেনা মানুষের লাশ তার বাবার কবরে ঢুকে যাচ্ছে। গোরস্থানের লোকটা সহজ গলায় বলেছিল, “টাকা দিয়ে তো জমি কেনা নাই। তাই, পুরনো কবরে নতুন লাশ উঠবে। এটাই নিয়ম।”

    ​তুবাকে মাটি দিতে পারলেও, তুবার জন্য কবরের জমি কেনার সামর্থ নেই শাফিনের। কিন্তু কোনো এক দিন কাফনে মোড়ানো এই নিথর দেহটার ওপর আরেকটা অচেনা মানুষের লাশ শুইয়ে দেওয়া হবে—ভাবতেই শাফিনের সারা শরীর গুলিয়ে উঠল। সে তুবাকে মাটি দেবে না। ঘর থেকে বের হতে দেবে না।

    ​শুক্ল পক্ষের রাতের দ্বিতীয় প্রহর চলছে । রূপালি জোছনার ঢেউ জানালা দিয়ে ঢুকে সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়। ঘরের এক কোণে শাফিন তুবার লাশের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে অপ্রকৃতিস্থের মত কাদছে। ঘরজুড়ে কর্পূরের গন্ধ।

    ​হঠাৎ বাতাসে হালকা গোলাপ জলের সুবাস ভেসে এল। ঘরের এক কোণে আলো আধারির মহাজাগতিক আলোয় শাফিন দেখতে পেল বিয়ের লাল শাড়ি পরা তুবা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্রের বাতাসের মত মায়াবী তার মুখ। চোখে হালকা কাজল। ঠোটে লেগে আছে অপার্থিব মৃদু হাসি।

    ​তুবা খুব শান্ত, পরম মমতায় হিম শীতল ঠান্ডা হাতে শাফিনের গাল দুটো স্পর্শ করল। কন্ঠে অদ্ভুত মায়া নিয়ে বলল – “শাফিন… মাটির নিচে তো শুধু আমার এই প্রাণহীন শরীরটা যাবে। ওটা একটা জড় বস্তু ছাড়া আর কিছুই না। একটু পর পচে গলে মাটির সাথে মিশে যাবে। আত্মা তো অমর। সত্যি বলতে, আমি তো এক মুহূর্তের জন্যও তোমার পাশ থেকে সরিনি।”

    ​তুবা আলতো করে হেসে বলল, – “ওই মাটিটুকুর জন্য অনর্থক কেন কষ্ট পাচ্ছ? প্রাণহীন জড়বস্তু শরীরটাকে বিদায় দাও, চিন্তা কর না, আমি সবসময়ই তোমার সাথে আছি।”

    ​হতবিহবল শাফিন তুবার দিকে তাকিয়ে রইলো।
    হ্যা, তুবা কখনই শাফিন কে ছেড়ে যাবে না।

    ​পরদিন ভোরে আজিমপুরের ভিজে মাটিতে শাফিন নিজ হাতে তুবা নামের মায়াটুকুকে শুইয়ে দিল। চারপাশ নিঃশব্দ, কিন্তু শাফিনের বুকের ভেতরটা আজ আর খালি মনে হচ্ছে না।

    সামনুন হোসেন মুইহেব

    3
    4 Comments
    • আপনার লেখাটা পড়ে একদম অন্যরকম একটা অনুভুতি হলো, বিশেষ করে “প্রাণহীন জড়বস্তু শরীরটাকে বিদায় দাও, চিন্তা কর না, আমি সবসময়ই তোমার সাথে আছি”—এই কথাগুলো খুব আবেগী ছিল; আচ্ছা শাফিনের কি এরপর থেকে আর একা লাগে না?

    • শাফিনের একাকীত্বের বিষাদ আর প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার যে মায়াময় মুহূর্ত আপনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা হৃদয় ছুঁয়ে যায় এবং চাইলে আপনি পরবর্তী লেখাতে চরিত্রটির মানসিক পরিবর্তনের দিকটি আরেকটু বিস্তারিত করে তুলে ধরতে পারেন, তবে আপনার এই সুন্দর লেখনী নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে পাঠককে আরও মুগ্ধ করুক।

    • অদ্ভুত সুন্দর। বাস্তবতা আর পরাবাস্তবতার সুন্দর মিশেল। আবার শাফিন একজন নাগরিক ক্যারেকটার … সব মিলে অন্যরকম লাগল। শুভেচ্ছা নিন …!

      • এত সুন্দর মন্তব্য করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। এভাবে উৎসাহ দিয়ে যদি পাশে থাকেন, তাহলে আমি আরও বেশি লিখব।

Skip to toolbar