-
ফুলে ফুলে সজ্জিত বড় রুমটায় খাটের একপাশে গুটিসুটি করে বসে আছে ইন্তিহা। সারা দিনের না খাওয়া আর অতিরিক্ত চিন্তার কারণে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় প্রায় আধ ঘণ্টা পর জ্ঞান ফেরে তার। এই বাড়িতে আসার পর যা একটুখানি খেয়েছে, তবুও শরীরের ক্লান্তিতে আর বসে থাকা যেন অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
আবরারদের বাড়িটা ওদের মতো অমন বিশাল আর পুরনো ধাঁচের না। আবার আধুনিকও না ততটা। কেমন যেন মাঝামাঝি, গোছানো। চারদিকে তাকালেই বোঝা যায়, বাড়ির মানুষগুলো সবকিছুতে খুব যত্নশীল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজায় টোকা পড়ল। আবরার এসেছে নিশ্চয়ই! ইন্তিহা আরেকটু গুটিয়ে বসল। আড়চোখে তাকাতেই নজরে পড়ল সেই শুভ্র মানবটিকে।
পাঁচ বছর আগে কোন এক শ্রাবণের মেঘলা দিনে যার আগমন ঘটেছিল হৃদয়নীড়ে। লাইব্রেরির সেই বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় চুল থেকে বৃষ্টির পানি ঝাড়ার দৃশ্যই ব্যাকুল করেছিল হৃদয়। স্বপ্ন ছিল। আর সেই অদ্ভুত স্বপ্নের রেশ ধরেই অপেক্ষার প্রহর গুনে কাটিয়ে দিয়েছে মেয়েটা। একটু একটু করে হৃদপিণ্ডের বিশাল একটা জায়গা জুড়ে আধিপত্য বিস্তার করে নিয়েছে লোকটা।
এতসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, এতসব হৃদয়ের আহাজারি ওর মনকে স্পর্শ করতে পারেনি বিন্দুমাত্র। আর যার জন্য এত আয়োজন, বিষাদের কবিতা রচনা আর চঞ্চলা এই হরিণীর নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া — সে কি আদৌ জানে সেসব? বদ্ধ দরজায় হেলান দিয়ে ভয়ঙ্কর চাহনি নিয়ে চেয়ে থাকা পাষাণ পুরুষটি যদি জানত সেসব, নির্বাক হয়ে যেত না? হারিয়ে ফেলত না কথা বলার সামর্থ্য?
আবরার এগিয়ে এসে খাটের অন্য পাশে বসল। অনেকটা দূরত্ব রেখে। নরম স্বরে সালাম দিল।
“আসসালামু আলাইকুম।”
ইন্তিহা মাথা নিচু রেখেই জবাব দিল, “ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”
কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো ছেলেটা। ড্রয়ার থেকে কয়েকটা টাকার বান্ডিল বের করে আনল। ওর সামনে রাখল সেগুলো।
“ মোহরানার পুরোটা আছে এখানে। তোমার যখন যেখানে খুশি খরচ করতে পারো। আর কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে বলবে নির্দ্বিধায়। “
ইন্তিহা মাথা নেড়ে সায় জানাল। হাত বাড়িয়ে টাকাটা ধরল না, ওভাবেই পড়ে রইল।
আবরার একটু থেমে বলল,
“এখন যাও, অজু করে আসো।”আগে থেকে অজু ছিল ওর। তবুও আবরারের কথায় পুনরায় অজু করে আসলো।একসাথে দুই রাকআত শোকরানা নামাজ পড়লো।
নামাজ শেষে অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
নীরবতা ভাঙল আবরারই। জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল —
“ছাদে যাবে? যদিও আমাদের এই বাড়িটা তোমাদের মতো অত সুন্দর না, জানি!”
ইন্তিহা মুখ তুলল। প্রথমবার চোখাচোখি হলো লোকটার সাথে। সাথে সাথেই চোখ নামিয়ে ফেলল মেয়েটা। খুব আস্তে করে বলল, “সুন্দর তো।”
আবরার হাসল একটু। প্রথমবার।
“চলো তবে?”
বলে সে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু ইন্তিহার দিকে হাত বাড়ালো না। নিঃশব্দে দুজন চলতে লাগলো সিঁড়ি বেয়ে। যেন কতো বছরের চেনাজানা তাদের।সন্ধ্যা থেকেই হালকা বাতাস ছিল আজ। এখন বাতাসের তোপ বেড়েছে বহুগুন।বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাড়িয়ে আছে আবরার। একটু পাশেই তার নিলাঞ্জনা। বাতাসে ছেলেটার সামনের দিকের চুলগুলো উড়ছে প্রচুর। চোখমুখে আছড়ে পড়ছে বারবার। ইন্তিহার বেহায়া চোখদুটো সেদিকেই আঁটকে যাচ্ছে অনবরত।অনেকক্ষণ যাবত দুজনের কারো মুখেই কোন কথা নেই। শুধু নিস্তব্দ প্রহরে বাতাসের ঠাণ্ডা শব্দ। নিস্তব্দতা ভেঙ্গে আবরারই প্রথমে কথা বলল।
“ তুমি কি আগে থেকেই এমন?”
চমকে উঠে ফিরে তাকাল ইন্তিহা। আবছা আলোয় ভীষণ নজরকাড়া পুরুষটি চেয়ে আছে সম্মুখপানে।
“কেমন?”
“এইযে, এতো কম কথা বলো।এটা কি সবসময়ই?”
অন্য দিকে ফিরে দৃষ্টি আড়াল করার চেষ্টা চালাল মেয়েটা। কিছুক্ষন চুপ থেকে নিজে থেকেই বলল,
“এমন কেন মনে হলো আপনার?”
শব্দহীন হাসল ছেলেটা। হৃদয় তোলপাড় করা হাসি। কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকলে প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতো হাসি। চোখ সরিয়ে নিলো ইন্তিহা। চেয়ে থাকা যে ভীষণ দায়!
“ বিয়ের আগে আমাকে দেখো নি তুমি !”
ইন্তিহার হৃদপিণ্ড যেন বিনা সতর্কবার্তায় ধক করে উঠলো। জোরপূর্বক ঢোক গিলল সে।দেখেনি! সত্যিই কি তাই? তাহলে পাঁচ বছরের অপেক্ষা, বিষাদের ডায়েরি, আর লাইব্রেরি বারান্দার সেসব স্মৃতি কি অকারন? রাত জেগে কতোশত বিষাদের আলাপন,গুচ্ছ গুচ্ছ অনুভূতির তীব্র সে দহন, সবই কি তবে অর্থহীন? আচ্ছা, লোকটা কি তবে পাষাণ? নইলে তো এমন প্রশ্ন করতে পারার কথা না। তার কি কোন ধারণা আছে সেসব ব্যাপারে? সে কি একটুও বুঝতে পারে না চোখের ভাষা?
“আপনি কিভাবে জানলেন?”
আবরার তখনও সামনের দিকে তাকিয়ে। রেলিংয়ের উপরের হাতটিতে পাঞ্জাবির হাতা গুটানো।
“সেদিন চোখ উঠাও নি একবারের জন্যেও। তাকাও নি আমার দিকে !”
ফের ঢোক গিলল ইন্তিহা।চোখের কোনে পানি জমতে শুরু করেছে তার। অসহ্য অনুভূতি। চুল ঠিক করার বাহানায় চোখের কোনে সদ্য জমতে যাওয়া নোনাপানির আভাসটুকু মুছে ফেললো অতি সন্তপর্ণে। আবরার এগিয়ে এলো ওর দিকে। মেহেদী পরা হাত দুটি নিজের দুহাতের মাঝে নিয়ে নিলো অনুমতিবিহীন। ওর হাতে নিজের নামের অস্তিত্ব দেখে প্রশান্ত হলো বক্ষ। অচেনা অনুভূতির টানাপোড়নে সিক্ত হলো হৃদয়। ইন্তিহা কিছু বলল না, নাতো সরিয়ে নিলো হাতখানা।
“সুন্দর!”
শিহরিত হলো মেয়েটা। এ কেমন প্রশংসাবাক্য? অন্তর কেঁপে উঠে তো! কোনমতে নিজেকে সামলে প্রশ্ন ছুড়ল পাল্টা।
“কি?”
“তুমি!”
ধক করে উঠলো বক্ষপিঞ্জর। দাড়িয়ে থাকার শক্তি যেন ফুরিয়ে আসছে ক্রমশ।অস্বাভাবিক কাঁপুনি লক্ষ করে ছেড়ে দিলো প্রেয়সীর হাত দুখানা। তবে ততোক্ষণে ইন্তিহার নজর আটকেছে ছেলেটার হাতের দিকে। পাঞ্জাবীর হাতা উঠানো থাকায় স্পষ্ট হয়েছে কনুই পর্যন্ত। তবে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে তার হাতে কোন প্রকার দাগ নেই। ইন্তিহার এখনো স্পষ্ট মনে আছে আবরারের হাতের কাটা দাগটার কথা। দ্বিতীয়বার তো এই দাগের কারনেই চিনতে পেরেছিল তাকে। সব ঠিকঠাক থাকলে তো হাতের উল্টোপিঠে কাটা দাগটিও থাকার কথা। ইন্তিহা বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছিলো ওর হাতের দিকে। কিন্তু কোন দাগ নজরে আসেনি। অস্থির হয়ে উঠলো মেয়েটা। আবরারই যে ওর স্বপ্নে দেখা সেই পুরুষ, এতে তো কোন সন্দেহ নেই। তবে হাতের সেই কাটাদাগটা নেই কেন? তবে কি স্বপ্নেই ভুল দেখেছিলো সে? কিন্তু এমনতো হওয়ার কথা না। হাজারো ভাবনায় জর্জরিত মেয়েটার ধ্যান ভাঙ্গে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির পানিতে। ঠাণ্ডা হাওয়ার মাঝে ঝিরঝির বৃষ্টির ফোঁটারা একত্রিত হয়ে দেহমন জুড়িয়ে দেয়া পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইছে যেন। চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস টেনে নিলো ইন্তিহা। প্রকৃতির কানে কানেও যেন রটে গেছে আনন্দ বার্তা। স্বপ্নে দেখা সে ভীষণ শুভ্র পুরুষটি যে আজ আর কোন রূপকথা নয়, নয়তো কেবলই ওর কল্পনার অংশ। শ্রাবণের মেঘডাকা রাতের আকাশের মতোই বাস্তব সে। সুরভিত পুষ্পের মতো তার উপস্থিতি।আজ চিৎকার করে সবাইকে ভীষণ বলতে ইচ্ছে করছে তার,’ শুনছো আকাশ, শুনছো মেঘ? বিষাদময় অপেক্ষার শেষ প্রহরে পেয়ে গেছি তারে আমি। আমার সে অপেক্ষাগুলো বৃথা ছিল না একদমই। বৃথা ছিল না সেসব পাগলামিগুলো। সে আজ আমার, একান্তই আমার। আমার শুদ্ধ পুরুষ।’
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাতাস বাড়তে থাকলো। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গাঢ় থেকে গাঢ়তর হতে থাকলো। খোলা আকাশের নিচে দাড়িয়ে থাকা দায় হয়ে পড়লো যেন।
“ ভেতরে চলো।অসময়ের বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর চলে আসতে পারে তোমার।”
আবরারের কথায় দ্বিমত করলো না সে। ধীরগতিতে হেঁটে চলে এলো সিঁড়ির দিকটায়। আর কয়েক কদম পেরুলেই সিঁড়ির ধাপ। তবে সেদিকে পা বাড়ানোর আগেই থেমে গেলো লোকটার করা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নে।
“আমার হাতে কি কিছু খুঁজছিলে তুমি?”তোমার আকাশ আমার মেঘ
পর্ব-৪
-তিতা ফুল(আপনাদের মন্তব্য না পেলে পরের পর্ব আর এখানে দিচ্ছি না)
আমার লেখাগুলো দ্রুত পেতে ফেসবুক পেজটি ফলো করতে পারেন—8 Comments-
-
আপনার চমৎকার এই লেখনীতে চরিত্রগুলোর নীরব কথোপকথন এবং মেঘলা আকাশের নিচে তাদের মধ্যকার আবেগঘন মুহূর্তগুলো খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। ঘটনার ঘনঘটা এবং ইন্তিহার মনের অব্যক্ত অনুভূতিগুলো আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারেন, যা পাঠকের আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দেবে।
-
খুব সুন্দর সাবলীল বর্ণনা। ঠিক যেরকম হবার কথা ইমোশন, সেরকম ভাবেই প্রকাশিত। ভালো লাগল খুব। এছাড়াও, ফেসবুকে আপনার গল্পের লিংল্কটাও দিতে পারেন। এখানে সম্ভবত লিংক সরাসরি আসবে না, তবে একাউন্টের নাম দিলে পাঠক / পাঠিকা খুঁজে নিতে পারবে মনে হয়। আর এখানে এই মঞ্চে তো আপনার লেখা দিবেনই আশা করি সবসময়। আপনার এই লেখার ঘটনা পরম্পরা কোন দিকে যায় সেটা দেখার জন্য বেশ আগ্রহ হচ্ছে।
-
আপনার এই গল্পের “শুনছো আকাশ, শুনছো মেঘ? বিষাদময় অপেক্ষার শেষ প্রহরে পেয়ে গেছি তারে আমি” লাইনটি আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেল। ইন্তিহার মনের না বলা কথাগুলো খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন, বিশেষ করে হাতের কাটা দাগ নিয়ে তার সেই দ্বিধা খুব দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। আপনার লেখাটি পড়ার সময় মনে হচ্ছিল যেন কোনো এক রোমান্টিক নাটক দেখছি, পরবর্তী পর্বের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
-
Friends
Mashuk Hossain
@mashukhossain
Noyontara
@bablee
Sazia Islam Mim
@saziaislammim
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Redowan Hussain
@redowanhussain
নৈশান
@noishan
Hashem Molla
@hashemmolla
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
mithila jannat
@mithilajannat

ইন্তিহার মত আমাদের স্বপ্নগুলো যে কবে সত্যি হবে কে জানে? পরের পর্বের অপেক্ষায় থাকবো কিন্তু মঞ্চবন্ধু, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা নেবেন!