-
“আমার হৃদয়রাজ্যের রানি!
শুনো, কাল রাতে ব্রেসলেটটা দিতে মনে ছিলো না একদমই। অতোসব কথাবার্তার ভিড়ে ভুলেই গিয়েছিলাম। পড়ে নিও এটা। প্রথম উপহার, আমার পক্ষ থেকে। আর শুনো, হৃদয়ের দরজা আমি খুলে দিয়েছি বহু আগেই। তোমার আগমনের অপেক্ষায়।
ইতি,
তোমার শুভ্র পুরুষ!”শ্বাস যেন আটকে এলো মেয়েটার। ধপ করে বিছানায় বসে পড়লো সে। এ কেমন চিঠি! লোকটার কি মায়াদয়া নেই একটুখানি? এমন সব চিঠি লিখে কেউ? পড়ে অ্যাটাক ফেটাক করে বসলে? সে আবার পড়লো চিঠিটা। আরেকবার পড়লো। বারবার পড়লো। মুখস্ত হয়ে যাওয়ার পরেও পড়লো। প্রথমবার, এই প্রথমবার লোকটার কথা ভাবতেই লজ্জা লাগছে তার। অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে হৃদয় গহীনে। তবে কি ও আরও একবার প্রেমে পড়লো লোকটার? সেবার তো স্বপ্নে দেখে পড়েছিল, এবার বাস্তবে! মাথা দুদিকে নাড়ালো সে।কি সব ভাবে না। আবরার জানতে পারলে মান সম্মান থাকবে কিছু? নাহ, এসব ভাবা যাবে না একদম। ও মুখভঙ্গি স্বাভাবিক করে উঠে দাঁড়ালো। চিঠির খামটা খুব যত্ন করে সাইড ব্যাগে রেখে দিলো। ব্রাসলেটটা পড়লো হাতে। আসলেই সুন্দর লাগছে। আবরারের কথা অনুযায়ী শুধু সুন্দর! আয়নায় নিজেকে দেখে অবাক হলো মেয়েটা। ঠিক কতদিন পর ও আজ এভাবে নিজে নিজেই হাসছে। লজ্জায় লাল হচ্ছে। এর মধ্যেই লিমা নামের মেয়েটা ওর রুমে প্রবেশ করলো।বয়স আর কতো, ৭/৮ হবে হয়তো। ওর মেঝ জা খাদিজার একমাত্র মেয়ে ও। খুব মিষ্টি। ইন্তিহাকে ছোট আম্মু বলে ডাকে।
“ছোট আম্মু, তোমাদের মেহমান এসেছে।তোমার আম্মু তোমাকে ড্রয়িংরুমে যেতে বলেছে।”
মায়ের কথা শুনে মন খারাপ হয়ে গেলো মেয়েটার। তবে বাইরে যাওয়া যাবে না কোনোমতেই । আবরারের আদেশ যে! ও বরং লিমাকে বললো তাদেরকে রুমে নিয়ে আসতে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ওর শাশুড়ি মেহমানদের নিয়ে ওর রুমে চলে এলেন। হালকা কথাবার্তা বলার পর উনাদের এখানে রেখে চলে গেলেন তিনি।
“ তোমাকে আমি সেখানে যেতে বলেছিলাম। তুমি উল্টো আমাকে রুমে আসতে বলে পাঠালে কেন? রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে আমাদের এখানে নিয়ে আসলে কি হতো? ‘’
মায়ের থেকে এমন কথা আশা করেনি মেয়েটা। নাহয় ও যায়ই নি সেখানে। এতে কি এমন হয়েছে, বুঝে আসে না তার।
“উনি নিষেধ করেছেন রুম থেকে বের হতে।”ইন্তিহার কথায় যেন স্তব্দ হয়ে গেলেন তিনি। মেয়েটা তার কথার উত্তর দেয়া শিখছে তবে।
“উনিটা কে?”
“আবরার”
আবারও অবাক হলেন তিনি। আজকে যেন উনার অবাক হওয়ার দিন।
“তোর লজ্জা করে না, স্বামীর নাম মুখে নিচ্ছিস যে?”
ভারী অবাক হলো ইন্তিহা। তিনিই তো নাম জানতে চাইলেন। তবে এখন আবার নাম নেয়াতে দোষের কি হলো, আশ্চর্য! ও আর কোন কথা বললো না। ওদের মা মেয়ের ফিসফিসানি দেখে ওর বড় জা আবার রসিয়ে রসিয়ে বলে উঠলেন,“ তা আন্টি, মা মেয়ে মিলে সলাপরামর্শ করা হচ্ছে বুঝি? জোরে বলুন না, আমরাও একটু শুনি?”
বেশ হেসে হেসেই কথা বলছিলেন তিনি, যেন কথাটা সেভাবে ধরা না যায়। তবে ইন্তিহা ভাবছে অন্য কিছু। খুব বেশি না হলেও এটুকু অন্তত বুঝতে পেরেছে সে, বড় ভাবীর কথাবার্তা তেমন সুবিধাজনক না।সবার হাবভাবেও সেটা স্পষ্ট। ও ভাবছে, ড্রয়িংরুমে ওর মাকে আবার তিনি কিছু বলেছেন কিনা, নইলে এমন রেগে কথা বলবেন কেন তিনি? হুট করেই এসে রেগে গেলেন যেন।“আমাদের বাড়িতে কিন্তু নতুন বউদের প্রথম দিনে রান্নাবান্না করার নিয়ম আছে।তা পারো তো কিছু নাকি? শিখে এসেছ তো বাপের বাড়ি থেকে?”
এবার যেন সীমা ছাড়িয়ে গেলেন তিনি। এক্ষুনি না থামালে মেহমানদের সামনে আজ মান সম্মান কিছু অবশিষ্ট রাখবেন না। খাদিজা উঠে শাশুড়িকে ডেকে নিয়ে আসলেন। তিনি আপাতত সামলে নিলেন পরিস্থিতি।সন্ধার দিকে মেহমানরা সবাই বিদায় নিয়ে চলে যান। ওদের যত আত্মীয় ছিল তারাও চলে গেছেন কিছুক্ষন আগেই। বাড়িতে এখন পুরুষ মানুষ নেই। আবরার উনাদের এগিয়ে দিতে গেছে।এদিকে শাশুড়ির শত বারন সত্ত্বেও রান্নাঘরে গেলো ইন্তিহা। রাতের খাবার তৈরি করা হচ্ছিলো তখন। রান্নাঘরে গেলেও চুলার কাছে যেতে দেননি তিনি ইন্তিহাকে। তবুও জোর করে মেঝ জায়ের হাত থেকে চাকুটা নিয়ে সালাদ কাটতে বসলো মেয়েটা।রান্নাবান্নার পাশাপাশি টুকটাক হাসাহাসির পর্বও চলছে। শাশুড়ি সামনে থাকায় অবশ্য ইন্তিহাকে তেমন একটা লজ্জার মুখে পড়তে হয়নি ভাবীদের কথার বাহানায়। সন্ধ্যার জন্য নাস্তা বানানো শেষ। এখন পুরুষ সদস্যরা এলেই সেগুলো নিয়ে যাওয়া হবে ড্রয়িংরুমে।হাতের কাজটুকু শেষ করে ইন্তিহা মাত্রই হাত ধুতে নিচ্ছিল, এমন সময় বাসার কলিং বেলটা বেজে উঠলো শব্দ করে। ইন্তিহার হাত থেমে গেলো তৎক্ষণাৎ। ছোট্ট রাফি দৌড়ে এলো রান্নাঘরে।
“ছোট আব্বু এসেছে। দাদু, ছোট আব্বু তোমাকে ডেকেছে।”
আসমা বেগম তড়িঘড়ি ছুটলেন ড্রয়িংরুমের দিকে। কে যানে আসতে না আসতেই কি দরকার পড়লো ছেলেটার।তিনি ফিরলেন প্রায় ১০ মিনিট পর। সন্ধার নাস্তাগুলো ড্রয়িংরুমে নিয়ে যেতে লাগলেন। সাথে ইন্তিহাকে ড্রয়িংরুমের দিকে না যাওয়ার জন্য কড়া নির্দেশ দিতে ভুললেন না। ছেলের আদেশ কিনা!রাতের খাবারের পর্ব শেষ হয়েছে বহু আগেই। ইন্তিহার সাথে ওর শাশুড়ি, জা’য়েরাও ভেতরের রুমেই খেয়ে নিয়েছে আজ। অবশ্য এর আগে সবাই ড্রয়িংরুমে একসাথেই খেতো। কিন্তু আজ থেকে নিয়ম বদলে গেছে। ইন্তিহা দেখা করে না ভাসুরদের সাথে। তাই এই ব্যাবস্থা। কিছু মানুষের বাড়তি কথা যে ঝড় তুলেনি এমন না। তবে আবরারের শান্ত কিছু বাক্যই যথেষ্ট ছিল সেসব থামিয়ে দেয়ার জন্য।আগামীকাল আবরার আর ইন্তিহা ওবাড়িতে যাওয়ার কথা। তাই সবাই মিলে রান্নাঘরে পিঠাপুলির আয়োজন করছে। নিয়ম বলে কথা। ইন্তিহা প্রথমে অবাক হয়েছে খুব। ও তো শুনেছে মেয়েদের বাড়ি থেকে এসব কিছু পাঠাতে হয়, এখানে আবার ভিন্ন নিয়ম নাকি! যাহোক মনে মনে স্বস্তির শ্বাস ছাড়লো মেয়েটা। অন্তত এই বাহানায় আজকে রুমে যাবে দেরি করে। লোকটা ঘুমিয়ে গেলেই হয়। তখন চুপি চুপি গিয়ে মটকা মেরে পড়ে থাকা যাবে। লোকটার মুখোমুখি তো হতে হবে না অন্তত। ইস! ভাবলেই তো লজ্জায় মূর্ছা যাচ্ছে সে। সামনে যাবে কিভাবে তাহলে। একদমই পারবে না। এই লোকটাও না, কিসব চিঠি দেয়! কাজের ফাকে হাতের ব্রেসলেটটার দিকে নজর গেলো ওর। হুট করেই একটা ব্যাপার খেলে গেলো মাথায়। হাতে ব্রেসলেট দেখলেই তো লোকটা বুঝে যাবে যে ও চিঠিটা পরেছে। তখন? কি হবে তখন ! লজ্জায় তাকাবে কিভাবে মেয়েটা?
“একা একা কার কথা ভেবে অমন মুচকি হাসছেন শুনি?বাবাহ, চোখ মুখ তো দেখি লাল হয়ে গেছে, ব্যাপার কি হুম হুম?”
জা’দের এমন টিটকারিমুলক কথাবার্তায় কান দিয়ে উষ্ণ ধোঁয়া বেরুতে লাগলো মেয়েটার। এমনিতেই চিন্তায় মরে যাচ্ছে, তারউপর আবার এসব, মানা যায়?
“কালকে তো সকাল সকাল বেরুতে হবে তোমাদের, এখনো জেগে আছো কেনো তুমি? যাও, গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।”
শাশুড়ির কথায় ভড়কে যায় মেয়েটা। হেসেও কি পাপ করে ফেললো নাকি।এখন তো সবাই মিলে রীতিমতো পিছনে লেগে গেছে।
“ একটু পর যাবো আম্মু, আরেকটু থাকি? এই কয়টা পিঠা শেষ করে নিই।”ওর কথায় সবাই মুচকি মুচকি হাসে। শাশুড়ি সামনে থাকায় আর তেমন কিছু বলা হয় না। আসমা বেগমও বুঝতে পারেন পুত্রবধূর অজুহাতের কারন। নিজেও তো একসময় এমন সময় পার করে এসেছেন। পুত্রবধুর আড়ালে সূক্ষ্ম হাসেন তিনিও।তবে ইন্তিহাকে বলেন না আর কিছু।
সময় পেরোতে থাকে ধীরে ধীরে। এক ঘণ্টা দুই ঘণ্টা করে রাত প্রায় একটা বেজে যায়।ইন্তিহা সবার সাথে গল্পগুজবে মত্ত হয়ে ভুলে থাকে সময়ের হিসাব। এদিকের কাজও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আসমা বেগম এবার আর কোন কথা শুনলেন না। ঠেলেঠূলে জোর করে রুমে পাঠিয়ে দিলেন ওকে।তবে রুমের সামনে এসে থমকে দাঁড়ালো সে।ভয়ে বুক কাঁপছে তার। লোকটা যদি জেগে থাকে এখন অবধি? যদি জিজ্ঞেস করে, ‘রুমে আসতে এতো দেরি করলে কেন?’ কি উত্তর দিবে সে? রেগে যাবে নাতো আবার। হাজারো ভাবনায় জর্জরিত মেয়েটা সাহস সঞ্চার করে দরজার হাতলে হাত রাখলো এবার। তবে ওর খোলার আগেই দরজা খুলে গেলো ওপাশ থেকে।
(চলবে)তোমার আকাশ আমার মেঘ
পর্ব-৬
-তিতা ফুল(ফেসবুকে আরো ২-৩ পর্ব বেশি আছে। আমার পেজটি চাইলে ফলো করতে পারেন। ধন্যবাদ)
7 Comments-
-
আপনার এই সুন্দর লেখায় হৃদয়ের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো খুব চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে, বিশেষ করে যখন লিখেছেন, “প্রথমবার, এই প্রথমবার লোকটার কথা ভাবতেই লজ্জা লাগছে তার।” গল্পের চরিত্রের দ্বিধা ও আবহে মিশে থাকা মিষ্টি আবেগগুলো পাঠককে খুব সহজে আপন করে নেয়। সামনে আরও অনেক সুন্দর ও নতুন অভিজ্ঞতার গল্প আপনি উপহার দেবেন এই কামনায় আপনার লেখনী সচল থাকুক।
-
-
Friends
Mashuk Hossain
@mashukhossain
Noyontara
@bablee
Sazia Islam Mim
@saziaislammim
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Redowan Hussain
@redowanhussain
নৈশান
@noishan
Hashem Molla
@hashemmolla
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
mithila jannat
@mithilajannat

বাহ! বেশ সাজানো সংসার ইন্তিহার কিন্তু প্রিয় মানুষটাকে এত ভয় পাচ্ছে কেন ?