-
তা ম্যাডাম! অবশেষে আসলেন? আমি তো ভাবলাম আপনি আজকে রান্নাঘরেই পুরো রাত পার করে দিবেন।”
দরজার সামনে বুকে দুহাত গুজে দাড়িয়ে আছে আবরার। তার সামনে মাথা নিচু করে লজ্জায় হাঁসফাঁস করছে ইন্তিহা। কেন যে এতো দেরি করতে গেলো তখন। এখন বোঝো ঠেলা! কিছুক্ষন ধরে আবরারের থেকে কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে ইন্তিহা হালকা চোখ তুলে তাকাতেই আবরার এক ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো ওর দিকে। ইন্তিহা এবার আর না পেরে মুখে ওড়না চেপে মুখ লুকালো।মানে কি এসবের? লোকটা তো ভারী বজ্জাত! ইচ্ছা করে জ্বালাতন করছে দেখো। আবরার আর ঘাটালো না মেয়েটাকে। দরজার সামনে থেকে খানিকটা সরে গিয়ে জায়গা করে দিলো ওকে। ইন্তিহা চোখমুখ খিঁচে রুমে ঢুকে গেলো তৎক্ষণাৎ। আর কোনদিকে তাকানোর ফুরসতই নেই যেন তার। ওকে অমন কাঁথা মুড়ি দিতে দেখে আর চুপ থাকতে পারলো না আবরার।
“এই এই দম আটকে যাবে তো। কি করছোটা কি?”
এদিকে ইন্তিহা যেন পণ করে রেখেছে আজকে যাই হয়ে যাক না কেন, কোনো কথাই সে বলবে না। আর না তো মুখ দেখাবে অসভ্য লোকটাকে। যেই ভাবা সেই কাজ। একদম মরার মতো পড়ে রইলো ও। বিন্দুমাত্র নড়চড় নাই।এদিকে আবরার ওর কাণ্ড দেখে হাসবে নাকি রাগ করবে বুঝতে পারছে না।ও নিজেকে সংযত রাখলো।এই রাত বিরেতে উচ্চস্বরে হেসে কি নিজের মান ইজ্জত খোয়াবে নাকি। প্রায় আধঘণ্টা ধরে ইন্তিহার কোনো সাড়াশব্দ নেই। তবে আবরার ঠিকই বুঝতে পারছে ঘুমায় নি মেয়েটা। ও একটু ফিসফিসিয়ে বললো,
“ নিঃশ্বাস নিও কিন্তু। মরে টরে গেলে পরে অকালে বিধবা হয়ে যাবো আমি! “
বলেই মুচকি মুচকি হাসতে থাকে। এদিকে ইন্তিহা কাঁথাটা আরো বেশি করে টেনে নেয়। যা দেখে হাসির মাত্রা আরও গাঢ় হয় ছেলেটার।
পরদিন সকাল সকাল ট্রেনে উঠে যায় ওরা। ইন্তিহাদের বাড়িতে যেতে প্রায় ৫ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। চাইলে মাইক্রো ভাড়া করে যেতে পারতো, তবে ইন্তিহার আবার গাড়িতে মোশন সিকনেস এর সমস্যা হয়। আসার সময়ই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল ও। তাই যাওয়ার সময় আবরার আর রিস্ক নিতে চায় নি। ট্রেন এর টিকিট কেটে নিয়েছে। যদিও এতো দ্রুত পাওয়া যায় না, বেশ কাঠখড় পোহাতে হয়েছে। তাইতো লোকাল বগীতে পড়েছে সিট। ইন্তিহা উশখুশ করছে খুব।জিবনে প্রথমবার ট্রেনে উঠেছে কিনা! আবরার আশ্বাস দিচ্ছে ওকে। ট্রেনে একদমই সমস্যা হবে না বলে বোঝাচ্ছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দেয়। নিজের বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে ইন্তিহা। কতো আবেগের, কতো স্মৃতির সে বাড়ি। শৈশব থেকে এই পর্যন্ত কতোশত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়িতে, লাইব্রেরি বারান্দায়। হুট করে একটা খুব প্রয়োজনীয় কথা মনে পড়ে গেলো ইন্তিহার। সেই নিল নোটবুকটার কথা। এতোসব কিছুর মধ্যে তো প্রায় ভুলেই বসেছলো সেসব। ভুলবে না’ই বা কেন? যার জন্য এতো আয়োজন সেই মানুষটাই যদি কাছাকাছি থাকে, মনে থাকে নাকি এতোকিছুর কথা?নিকাবের আড়ালেই একটুকরো হাসি ফুটে উঠলো মেয়েটার মুখে। চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস টেনে নিলো। সবকিছু এতো সুন্দর কেন? পৃথিবী এতো রঙ্গিন কেন? জীবন এতো পূর্ণতার কেন? এতোগুলো বছরের বিরহ, বিষাদ, সবকিছুই যেন আজ তুচ্ছ মনে হতে লাগলো। পাশে থাকা শুভ্র পুরুষটির উপস্থিতিই যেন সুখ সুখ অনুভূতি দিতে লাগলো। পাশ ফিরে তাকালো মেয়েটা। বহু আকাঙ্ক্ষিত পুরুষটি ব্যাস্ত আছে বইয়ের পাতায়। তবে প্রেয়সীর তাকানো নজর এড়ায় নি তার। তড়িঘড়ি ব্যাস্ত হয়ে পড়লো মানুষটা।
“কি হয়েছে? খারাপ লাগছে? মাথা ঘুরাচ্ছে?”
ভারী অবাক হলো ইন্তিহা। এতো চিন্তিত হওয়ার কি হলো। তাই বলে কি একটু তাকানোও যাবে না নাকি। ও মাথা নেড়ে জানায় ঠিক আছে, কিছু হয়নি।তবুও নিশ্চিন্ত হতে পারে না ছেলেটা।
“ খাবে কিছু? বাসা থেকে তো তেমন কিছুই খেয়ে আসলে না। এখন কিছু কিনে নিই?”
“ লাগবে না তো। ঠিক আছি আমি। এভাবে বাইরে কিছু খাওয়ার অভ্যাস নেই আমার। আপনি পড়ুন তো।”
ইন্তিহার কথায় পুনরায় বইয়ে মনোযোগ দেয় সে। তবে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না তা। একটু পর বই রেখে দেয়। ট্রেন থেকে বাইরের দৃশ্য যেন ছবির মতো লাগছে। বোধহয় গ্রামবাংলাকে সবচেয়ে কাছ থেকে, সবচেয়ে নান্দনিকভাবে ট্রেনের ছোট্ট জানালা থেকেই দেখা যায়। মাঠের পর মাঠ, কৃষিজমি, আরও সব মনোমুগ্ধকর দৃশ্য,প্রতিটা চিত্রই যেন কতো নিখুঁত হাতে আঁকা।এমন নিখুঁত হাতে তো একজনই আঁকতে পারেন। দিতে পারেন সে ছবিতে নতুন জীবন। তিনি শুধু আঁকেনই না, সময়ের পরিক্রমায় তাদের বেড়ে ওঠা, মরা থেকে বাঁচা, ধূসর থেকে সবুজ সবই নিয়ন্ত্রন করেন গভীর মমতায়, যতটা মততা নিয়ে মা তার ক্রন্দনরত সন্তানকে বুকে টেনে নেয়, যতটা মমতা নিয়ে চাঁদ পৃথিবীতে মায়া ছড়ায়, তারচেয়েও বেশি।
বিশাল লম্বা এক জার্নি শেষ করে ওরা অবশেষে পৌছায় আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। পা মাড়ায় পুরাতন সে বিশাল জমিদার বাড়ির আঙ্গিনা।ওদের আগমনের সাথে সাথেই বাড়ির সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে বাড়ির নতুন জামাইয়ের খাতিরযত্ন করতে। কোথাও যেন কমতি না থাকে একদমই। আবরার অসহায় চাহনি নিয়ে তাকায় ইন্তিহার পানে। এতোসব কিছু ও খাবে কিভাবে? আর সবাই এমন করছে যেন মনে হচ্ছে আবরারই দুনিয়ায় নতুন বিয়ে করেছে, এর আগে কেউ নতুন জামাই ই হয়নি। ওর কাছে এমনই মনে হচ্ছে। ইন্তিহা মনে মনে শয়তানি হাসি দেয়।ভাবে, একদম উচিত শিক্ষা হয়েছে, এমনই হওয়া উচিত। কথায় কথায় লজ্জা দেয়া লোকদের এমনই হয়। মনে মনে অদৃশ্য ভেংচি কাটে সে। আবরার যতবারই ওর দিকে তাকাচ্ছে, ও অন্যদিকে তাকিয়ে থাকার ভান করছে। আর মনে মনে পেট ফাটা হাসিতে গুমরে যাচ্ছে।শেষে লোকটার করুন চাহনির কাছে হার না মেনে আর পারে না। খাবার টেবিল থেকে এবারের মতো বেঁচে ফিরে বেচারা।
বিকেলে সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছিলো বৈঠকখানায়। আড্ডার মূলবিন্দু হলো আবরার। ছোট্ট ছোট্ট শ্যালক শ্যালিকা তো আছেই, মাথা খারাপ করে দেয়ার জন্য বেচারার। ইন্তিহা অবশ্য এসবের ধারে কাছেও নেই। সেই দুপুরে খেয়ে দেয়ে নিজের রুমে যে গিয়ে ঢুকেছে, আর কেউ দুচোখে দেখে নি ওকে। অত মানুষের ভিড়ে বসে থেকেও আবরারের মন পড়ে আছে দোতলার কর্নারের রুমটার দিকেই। চোখ বারবার সেদিকেই যাচ্ছে ঘুরেফিরে। এই মুহূর্তে এখান থেকে উঠে যাওয়ার সুযোগ নাই বিন্দুমাত্র। মনে মনে বিরক্ত হচ্ছে সে খুব।ইন্তিহার প্রতি অভিমানও হচ্ছে খানিকটা। স্বামীকে এভাবে বসিয়ে রেখে চলে গেলো কিভাবে নিষ্ঠুর মেয়েটা।
নিজের ভাবনা দেখে নিজেরই হাসি পাচ্ছে ওর। কিসব অপরিণত চিন্তা করছে।বিয়ে করে কি চিন্তাভাবনা সবারই এমন হয়ে যায় নাকি।ভাবতে ভাবতেই ঠোঁটের কোনে সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠে লোকটার। ইন্তিহার ভাবনা অনুযায়ী হৃদয় কেড়ে নেয়া হাসি।
–
–
–
২৫ সেপ্টেম্বর,২০২৩“লোকটাকে আমি ভুলতে পারছি না কিছুতেই।সেদিনের পর আর দেখিনি স্বপ্নে, তবে ভুলতে পারছি না একটুও। আমি খেতে, ঘুমাতে, পড়তে পারি না। সারাক্ষন মাথায় শুধু একটাই ছবি, একটাই চেহারা। আচ্ছা, লোকটাও কি তবে আমাকে স্বপ্নে দেখেছে? আচ্ছা, উনি কি জাদু-টাদু যানে নাকি?নইলে কথা নেই, বার্তা নেই, হুট করে এক অচেনা মেয়ের স্বপ্নে চলে এলো! আর শুধু কি তাই? সে তো এতেও ক্ষান্ত থাকেনি,সোজা এসে মেয়েটার মস্তিস্কে ঢুকে পড়েছে। কুট কুট করে খেয়ে নিচ্ছে সব চিন্তাশক্তি! এত্ত অসহ্য লাগে না, মনে হয় লোকটাকে সামনে পেলে আস্ত চিবিয়ে খেতাম! “
চাপা হাসিতে মুখ লাল হয়ে যায় ইন্তিহার। কিসব লিখতো না তখন।প্রথম প্রথম প্রেমে পড়ার অনুভূতিগুলো ছিলো একেবারে যাচ্ছেতাই রকমের সুন্দর! লোকটাকে নিয়ে হাবিজাবি আজগুবি কতো কিছুই না লিখতো মেয়েটা।এখন তো এসব পড়লে নিজেরই লজ্জায় নাক কাটা যায়।ইসস, আবরার যদি ভুল করেও এই ডায়েরি পড়ে ফেলে, তখন তো ইন্তিহার বেঁচে থাকার আর কোনো পথ থাকবে না। মাটির নিচে দশ হাত গর্ত খুঁড়ে ঢুকে পড়তে হবে না? নাহ, কিছুতেই এই লোকের হাতে পড়তে দেয়া যাবে না এটা। এমনিতেই লোকটা যেই পরিমান ঠোঁটকাটা বাব্বাহ, পরে দেখা যাবে এইটা নিয়ে কথায় কথায়ই খোঁচাবে ও’কে। ডায়েরি নিয়ে দ্রুত বারান্দা থেকে রুমে চলে আসে ইন্তিহা। উদ্দেশ্য ড্রয়ারে তালাবন্দী করা এটাকে। তবে এবারেও বুঝি শেষ রক্ষা হলো না বেচারির। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে পড়ে গেলো ধরা। তাও আবার যার তার হাতে না,স্বয়ং আবরার সোহরাব মুনতাসির, ওরফে ইন্তিহা জান্নাতের অতীতের স্বপ্ন পুরুষ, আর বর্তমানের স্বামী!
“ তোমার হাতে কি ওটা দেখি তো?”
(চলবে)তোমার আকাশ আমার মেঘ
পর্ব-৭
-তিতা ফুল5 Comments -
Friends
Mashuk Hossain
@mashukhossain
Noyontara
@bablee
Sazia Islam Mim
@saziaislammim
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Redowan Hussain
@redowanhussain
নৈশান
@noishan
Hashem Molla
@hashemmolla
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
mithila jannat
@mithilajannat

গল্পের সাথেই আছি বন্ধু, কলম চলুক অবিরত!