Profile Photo

তিতা ফুলOffline

  • nadia1
  • Profile picture of তিতা ফুল

    তিতা ফুল

    • 1 month ago

    “ স্বামীর জন্য খুব চিন্তা হচ্ছিলো বুঝি বউ?”

    গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠস্বরে চমকে পেছনে ফিরে ইন্তিহা। আবরারকে এভাবে আশা করেনি একদমই সে। এই লোকটা এমন কেন? হুটহাট এমনভাবে এসে দাঁড়াবে না, কবে যেন ভয় পেয়েই পটল তুলে মেয়েটা।খানিক রাগ লাগছে বৈ কি। তবে ওর কিছু বলার আগেই পুনরায় শব্দের ঝংকার তুলে অধৈর্য পুরুষটি।

    “ এভাবেই দাড় করিয়ে রাখবে নাকি সারারাত? স্বামী তোমার ভিজে এসেছে বৃষ্টির ঝাপটায়, কোথায় তোয়ালে এনে মাথা মুছে দিবে, কি কি সেবা করা দরকার সেসব করবে, তা না করে আরো চেয়ে চেয়ে দেখছো? আসলে আমার প্রতি একটুখানি দয়া মায়াও নেই তোমার। স্বামী সেবা করে যে…”

    “ অভিনয়টা কি আপনি একটু কম করে করতে পারেন না? মানে সবকিছুতেই অমন নাটক না করলে কি হয় না?”

    ইন্তিহার কথায় অবাক নেত্রে চায় ছেলেটা। বউ তার দুঃখও বুঝে না। ওর কষ্টের কথাগুলো কিনা নাটক মনে হচ্ছে তার কাছে? নাহ, বউটাও শেষ পর্যন্ত পর হয়ে গেলো! দুঃখের আর সীমা রইলো না ছেলেটার।মুখটাকে অসম্ভব গোবেচারির মতো করে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো হয়তো সে, তবে ইন্তিহার সতর্কবানীতে চুপসে যায় পুরোপুরি।

    “ এই এই একদম কোনো নাটক করবেন না। আমি তোয়ালে, জামাকাপড় বের করে দিচ্ছি, দ্রুত আসুন।যতোসব অভিনয়!”

    মুখে মেকি রাগ দেখিয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে রুমে চলে গেলেও মনে মনে হাসি আটকে রাখতে পারে না মেয়েটা। এই কয়দিনে এটুকু অন্তত বুঝে গেছে সে, লোকটা যেমন পাজি, তেমন অভিনয়ে সেরা। কথায় কথায় কৌতুক করতে জুড়ি মেলা ভার যেন তার। চাইলেও মুচকি হাসি আটকাতে পারে না সে। কোনরকমে মুখটাকে স্বাভাবিক করে জামাকাপড় এগিয়ে দেয় লোকটাকে।

    সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টির মাত্রা বাড়তে থাকে বাইরে। সাথে বাড়ির পেছন দিকের বাগানে গাছ গুলো বাতাসে যেন শো শো শব্দ তুলে অনবরত। কানে তালা লেগে যাওয়ার মতো শব্দ। বিদ্যুৎ চলে গেছে বহু আগেই। ঘরে মোমবাতির আলোয় মৃদু মায়াবী পরিবেশ। ইতিমধ্যে নিচের ঘরে মায়ের কাছে গেছে কাঁথা আনতে গেছে ইন্তিহা। আবরার বসে বসে বই পড়ছে। কাল বিকেলে লাইব্রেরী থেকে ইন্তিহার আনা বইগুলোই এখন জায়গা করে নিয়েছে বিছানার উপর।
    এরই মধ্যে ইন্তিহা চলে আসে কাঁথা নিয়ে। আবরারকে বই পড়ায় ব্যাস্ত দেখে ও আর কিছু বলে না । সাইড ব্যাগটা নিয়ে চলে যায় টেবিলের কাছটায়। ওবাড়িতে যাওয়ার পর আবরারের থেকে পাওয়া চিঠিটা যত্ন করে রেখে দিয়েছিল ব্যাগের মধ্যে। সেটা বের করে নীল নোটবুকটায় রেখে দেয়, যা সে লাইব্রেরী বারান্দায় পেয়েছিলো সেদিন। নোটবুকটা পুরোটা একেবারেই ফাঁকা। লিখা হয়নি কিছুই। শুধু এই পর্যন্ত আবরারের থেকে পাওয়া সব চিরকুটগুলো ঠাই পেয়েছে সেথায়। কাল তো ওবাড়িতে চলে যেতে হবে, যা যা প্রয়োজনীয় আছে, নিয়ে নেয়া দরকার। লাগেজ খুলে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নিয়ে নিতে থাকলো সে। বই পড়ার বাহানায় কেউ একজন যে তার প্রতিটা কাজ খুব আগ্রহের সাথে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে কি বিন্দুমাত্র ভাবার সময় আছে তার?

    পরদিন সকালে বেরুনোর কথা থাকলেও ইন্তিহার আবদারের কাছে হার মানে আবরার। রাতের ট্রেন ভ্রমনের খুব শখ কিনা মেয়েটার। আসার সময় তো সেভাবে বলার মতো পরিস্থিতি ছিলো না, এখন দিনে দিনে ওদের মধ্যে সম্পর্কটা স্বাভাবিক হচ্ছে কিনা। মাগরিবের নামাজ পড়েই বেড়িয়ে পড়ে ওরা। কাল রাতভর বৃষ্টি থাকলেও আজ আকাশ সম্পূর্ণ পরিস্কার। চিকন একফালি চাঁদের সাথে জোনাকির মতো কালো আকাশ ভরা তারার হাট।ট্রেনের জানালা পুরোপুরি খুললে প্রচণ্ড শব্দের জন্য কানে তালা লেগে যায়।তবে এমন হৃদয় জুড়ানো বাতাস তো উপেক্ষা করা যায় না। জানালার কিছু অংশ খুলে রাখা হয়েছে। বরাবরের মতোই ইন্তিহা বসেছে জানালার পাশে, আর আবরার ওর পাশে!

    “কিছু খাবে?”

    আবরারের কথায় ধ্যান ভাঙ্গে ইন্তিহার। বাইরের প্রকৃতি দেখতে ব্যাস্ত ছিলো সে।

    “বাসা থেকে খেয়ে এলাম তো। এখন আবার কি খাবো?”

    “তো? প্রায় ২ ঘণ্টা হয়ে গেছে, সেই খাবার আছে নাকি এখনো? তাছাড়া যেটুকু খেয়েছো তুমি, পাখির খাবার।”

    তো আপনার মতো রাক্ষস নাকি আমি? কথাটা মনে মনে আওড়ালেও মুখে বলতে পারে না সে। সবসময় ওর খাওয়া নিয়েই পড়ে থাকে লোকটা।ইচ্ছে না হলে খাবে কিভাবে মেয়েটা? জোর করে খেয়ে পেট খারাপ করবে নাকি? ওকে অমন বিড়বিড় করতে দেখে ঠোট চেপে হাসে ছেলেটা, যা স্থায়ী হয় মাত্র কয়েক সেকেন্ড।

    “ বাহ, মনে মনে আমাকে বকা দেয়াও শিখে গেছো দেখছি। ভালোই উন্নতি হচ্ছে তোমার।”

    আবরারের কথায় হতবাক হয়ে যায় ইন্তিহা। পাল্টা কিছু বলার মতো খুজে পায় না সে।ওর অমন অবাক চাহনি দেখে জোরপূর্বক হাসি আটকে নিচু গলায় বলে উঠে ছেলেটা,

    ‘’আমাকে কি আজকে একটু বেশিই সুন্দর লাগছে? না মানে, এমনভাবে তাকালে লজ্জা পাই তো!”

    বলেই মুখের কাছে হাত নিয়ে লজ্জার ভান ধরে লোকটা। এদিকে ইন্তিহা এবার যেন অবাকের চরমে পৌছায়।লোকটা এমন ঠোঁটকাটা কবে হলো? নাকি আগে থেকেই এমন সে? ভেবে পায় না মেয়েটা। আবরার হয়তো আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো, তবে ইন্তিহার কথায় থেমে যায় এবার।

    “পানি খাবো!”

    হাসি আর আটকে রাখতে পারে না ছেলেটা।ওকে অমন মুচকি মুচকি হাসতে দেখে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে লজ্জায় লাল হয় সে।নিকাবের আড়ালে তা চোখে পড়ে না ছেলেটার। পানির বোতলের মুখ খুলে ওর দিকে এগিয়ে দেয় সেটা।

    “আর খাবে?”

    “না।”

    “ঝালমুড়ি খাবে?”
    “না।”

    “টক কিছু?”

    “আমি খাবো না কিছুই।চুপ থাকুন না আপনি।”

    এ পর্যায়ে এসে চুপ করে যায় আবরার। কিছুক্ষন কোনো কথা বলে না। ইন্তিহা ওর এমন চুপ হয়ে যাওয়া দেখে অপরাধবোধে ভুগে খানিক। ও তো সেভাবে বলতে চায় নি, লোকটা কি ওর কথায় মন খারাপ করলো? নিজে থেকে কি বলে শুরু করবে বুঝতে পারে না সে।তবুও একটু ভেবে বলে,

    “আপনি কি রাগ করলেন?”

    “রাগ করবো কেন আমি? আশ্চর্য!”

    ওর কথার ধরণে খারাপ লাগে মেয়েটার। কি এমন বললো ও, যে এমন করতে হবে? হুট করে কান্না পায় খুব তার।এই কয়দিনে অচেনা লোকটাকে কতোটা আপন ভেবে ফেললে, তার সামান্য আচরনে চোখে পানি চলে আসে! মাথা নিচু করে কান্না আটকায় সে।

    “কে জানি কালকে ‘আমার স্বামী’ বলে বলে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছিলো! যদিও আমি খুব লজ্জাশীল পুরুষ,লোকের সামনে বউ বউ বলি না।শুধু তার কারনে মানুষের সামনে মান সম্মান আমার ধুলোয় মিশে গেলো! কি সর্বনাশটাই না হলো আমার!”

    তড়াক করে মাথা তুলে ইন্তিহা। বোকার মতো চেয়ে থাকে পাশে বসা পাজি লোকটার দিকে। ও কিনা এতক্ষন মনে মনে দুঃখ পাচ্ছিল এই লোকটার জন্য? যে কথায় কথায় অভিনয়ে ওস্তাদ! রাগে শরীর জ্বলে উঠে ওর। প্রতিজ্ঞা করে,এখন থেকে এই লোকটা যত প্রশ্নই করুক না কেন, কোন কথাই বলবে না সে। একটা শব্দও না!
    –
    –
    –

    গতকাল সারা রাতের জার্নি শেষে বাসায় ফিরতে প্রায় ভোর হয়ে যায়। দুজনেই খুব ক্লান্ত থাকায় ফজরের নামাজ পড়ে যে ঘুমিয়েছে, উঠতে উঠতে বেলা প্রায় এগারোটা বেজে যায়। ইন্তিহা উঠে তড়িঘড়ি রান্নাঘরের দিকে যায়।যত যাই হোক, নতুন বউ হয়ে এতো বেলা করে ঘুমানোটা একদমই সোভা পায় না। রান্নাঘরে ওর বড় দুই জা আর শাশুড়ি ছিল। ও গিয়ে দাঁড়ানো মাত্রই বড় জা, রাবেয়ার কথায় স্থির হয়ে যায়।

    “ আরে আরে তোমার আবার কষ্ট করে আসার কি দরকার ছিলো? আরেকটু ঘুমিয়ে নাও!এগারোটা বাজে মাত্র,সকাল হয়েছে নাকি এখনো?”

    উনার ঠেশ মারা কথায় বেজায় বিরক্ত হন আসমা বেগম। তরকারিতে খানিক লবন ছিটিয়ে এসে দাঁড়ান রাবেয়ার সামনে।

    “ কাল সারারাত জার্নি করে এসেছে ছেলেমেয়ে দুটো। এখনো খায়ও নি কিছু। তুমি কি তোমার ঠেশ মারা কথা থামাবে না?আমি যেন ইন্তিহাকে আর কিছু বলতে না শুনি!’
    তারপর ইন্তিহার দিকে ফিরে বললেন,

    “ ওর কথায় মন খারাপ করো না। ও একটু এমনই, এভাবেই কথা বলে। তুমি যাও, গোসল করে নাও। আর আবরারকে নিয়ে খাবার খেতে এসো।যাও।”

    শাশুড়ির কথায় সায় জানিয়ে মাথা নিচু করে চুপচাপ রান্নাঘর ত্যাগ করে ইন্তিহা। বারবার ঢোক গিলে কান্না আটকানোর চেষ্টা করতে থাকে সে। এমন কেন হচ্ছে তার? মানুষের সামান্য কথায়ই এমন হলে কিকরে হবে? এসব তো শুনতেই হয় খানিক, সবারই শুনতে হয়। এভাবে কান্না করলে হবে? আলগোছে ওড়নার কোনায় চোখের পানিটুকু মুছে ফেলে সে। তবে চারপাশে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া মেয়েটা হয়তো খেয়াল করে নি, দূর থেকে বাজপাখির নজরে তাকিয়ে থাকা পুরুষটির জ্বলন্ত চোখদুটো!

    রুমের দরজায় আসতেই মুখোমুখি হয় আবরারের।

    “কে কি বলেছে তোমায়?”

    (চলবে)

    তোমার আকাশ আমার মেঘ
    পর্ব-১০
    -তিতা ফুল

    4
    8 Comments
    • দাম্পত্য জীবনের খুনসুটি আর মান-অভিমানের চমৎকার এই বয়ানটি পড়ার সময় ইন্তিহা ও আবরারের মিষ্টি সম্পর্কের টানাপোড়েনগুলো খুব জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে, তাই আপনার লেখনীর এই সাবলীল ভঙ্গি ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ সত্যিই মুগ্ধ করার মতো।

    • শাশুড়ির চরিত্রটা এত মমতাময়ী! পড়ে ভালো লাগলো।

    • দাম্পত্যের লুকোচুরি মিষ্টি প্রেম, হালকা অভিমান আর বাইরের জগতের কঠিন বাস্তবতার এক অনবদ্য মিশেল এই চমৎকার গল্পাংশটি। একদিকে আবরারের নাটকীয় আচরণ ও ইন্তিহার ভেতরে গড়ে ওঠা গভীর অনুভূতির সুবিন্যস্ত রূপ, আর অন্যদিকে পরিবারের সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে পাঠককে সম্পর্কের গভীরতার এক দারুণ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

      • অনেক ধন্যবাদ পাশে থাকার জন্য। আপনাদের গঠনমূলক মন্তব্যগুলো আমাকে লিখার অনুপ্রেরনা দেয়।

    • PASTED

      ঠাট্টার আড়ালেও লুকিয়ে থাকে যত্ন, সেই তো আসল ভালোবাসার ভাষা…..🤍

    • তিতা ফুল, লেখাটা পড়তে পড়তে একদম হারিয়ে গিয়েছিলাম, বিশেষ করে আবরারের ‘আমাকে কি আজকে একটু বেশিই সুন্দর লাগছে?’—এই অংশটা পড়ে তো হাসিই আটকাতে পারলাম না। আপনার বর্ণনা ভঙ্গিটা এত চমৎকার যে মনে হচ্ছিল সিনেমার দৃশ্য চোখের সামনে দেখছি। ইন্তিহার মতো এমন শান্ত আর আবরারের মতো পাজি চরিত্রের কেমিস্ট্রিটা আপনি দারুণ ফুটিয়ে তুলেছেন। পরের পর্বে আবরার কি তার স্ত্রীর ওপর আসা কথার জবাবটা ঠিকঠাক দিতে পারবে বলে মনে করেন?

Friends

Profile Photo
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Profile Photo
Redowan Hussain
@redowanhussain
Profile Photo
নৈশান
@noishan
Profile Photo
Hashem Molla
@hashemmolla
Profile Photo
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
Profile Photo
mithila jannat
@mithilajannat
Profile Photo
Sk Sagor
@sksagor
Profile Photo
Md. Ashraful Alam
@md-ashrafulalam
Profile Photo
Fazilatun Nesa
@fazilatun-nesa
Skip to toolbar