-
“ আপনি কোনোদিন ছেড়ে যাবেন না আমাকে।”
“ যাবো না!”
“ ভুল বুঝবেন না কখনো।”
“ বুঝবো না!”
“ ওয়াদা করুন?”
“করলাম। শান্ত হও এবার।”
ইন্তিহা তবুও শান্ত হতে পারে না। আবরার ওর মাথাটা নিজের বুকে চেপে বসে আছে। হোটেলে এসে পৌঁছেছে আধ ঘণ্টাও হয়নি এখনো। তখন ট্রেনের মধ্যে কিছু একটা হয়েছে মেয়েটার। তার পর থেকে এমন অস্বাভাবিক আচরন করছে। জিজ্ঞেস করলেও বলে না কিছু। আবরারও আর জোর করে না তেমন। আগে শান্ত করা দরকার।
হোটেলের বারান্দা থেকে চমৎকার দেখা যায় বাইরের প্রকৃতি। সাদা মেঘের ভেলা যেনো শীতল করে দেয় চারপাশ। নীল সাদার মিশেলে অপূর্ব পরিবেশ।
দিনের মধ্যভাগ এখন। দুপুরের খাবার দিয়ে গেছে কিছুক্ষন আগেই।
ইন্তিহাকে শান্ত করে কোনোমতে নিজ হাতে কয়েক লোকমা খাইয়ে দিলো ছেলেটা। আপাতত বিশ্রাম নিক নাহয়।এর মধ্যে সেও খেয়ে নিলো। ইন্তিহা ঘুমিয়ে পড়েছে বুঝতে পেরে রুম থেকে বেরিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু কাজ সেরে নিলো। তখন মেয়েটার অমন অবস্থায় ফুরসত পায়নি সেভাবে। রুমে আসতে আসতে আসরের সময় হয়ে গেলো প্রায়। পাশে মসজিদে নামাজটা পড়ে নিতে পারতো চাইলে, তবে রুমে একা মেয়েটাকে রেখে মন টানে নি মোটেও। রুমে এসে দেখে ইন্তিহা নেই বিছানায়। বারান্দার দিকে এগিয়ে আসতেই দেখা গেলো তাকে।“ শরীর কেমন এখন?”
“ ভালো, আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?”
“ এদিকেই, কিছু কাজ ছিল সেগুলো শেষ করলাম। টুকটাক প্রয়োজনীয় কিছু কিনে আনলাম। সমস্যা হয়েছিলো কোন?”
“না, এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।”
“ ভেতরে আসো।”
“ এখানে থাকি আরেকটূ?”
আবরার কিছু বলে না।বিনাবাক্যে পাশে থাকা বেতের চেয়ারে বসে পড়ে। ইন্তিহাকে বসতে ইশারা করলে সেও বসে পাশে।আবরার ওর খোলা চুলগুলো বেঁধে দেয়ার চেষ্টা করতে লাগে।
“ কি হয়েছিলো তখন? এমন করছিলে কেন?”ইন্তিহা বলে না কিছু। মাথা এলিয়ে দেয় লোকটার কাঁধে। সবচেয়ে ভরসাযোগ্য স্থানটায়। কিভাবে বলবে অদ্ভুত কথাটা? হুট করে নিজের প্রতি বিতৃষ্ণা কাজ করতে লাগলো যেন। আবরার ওর জীবনে আসা প্রথম পুরুষ, প্রথম আবেগ। সামান্য একটা হাতের কাঁটা দাগ দিয়ে কি আর বিচার করা যায় তা? চোখ বন্ধ করে রাখে সে।
“ নামাজটা পড়ে নাও আগে।”
“পড়েছি।”
“ বসো তবে। আমি পড়ে নিই।”
“ আচ্ছা।”
নামাজ পড়ে বাইরে একটু ঘুরতে যেতে চাইলেও ইন্তিহার মাথাব্যথার কথা চিন্তা করে আর যাওয়া হয় না। কাল সকালেই নাহয় যাওয়া যাবে।
রাতে খাওয়াদাওয়া শেষ করে বারান্দায় বসে ছিলো দুজন। এমন সময় আবরারের ফোনটা শব্দ তুলে বেজে উঠে। রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে আসা কান্নার শব্দে থমকে যায়।“ কি হয়েছে ভাবি? সবাই ঠিক আছে তো? আপনি কান্না করছেন কেন?”
“……..”
“এখন কি অবস্থা? কোথায় আছেন ?”
“……..”
“ আচ্ছা, আমরা ইমারজেন্সিতে রওনা দিচ্ছি।”
ফোন কেটে যেতেই ইন্তিহা অস্থির হয়ে উঠে কি হয়েছে জানার জন্য। খুব একটা ভালো কিছু যে হয়নি, এই ব্যাপারটা তো নিশ্চিত!
“ কি হয়েছে?”
“ আম্মু এক্সিডেন্ট করেছে। হসপিটালে আছে সবাই।”
ইন্তিহা বাক্রুদ্ধ হয়ে যায়। এমন কিছুর জন্য প্রস্তুত ছিল না হয়তো। চোখ ঝাপসা হয়ে আসে তার।
“ এখন কি অবস্থা?”
“ বেশি ভালো না। যেতে হবে আমাদের।আমি দেখছি কি ব্যাবস্থা করা যায়।”
আবরার উঠে যেতে নিলে ইন্তিহা ওর হাত ধরে। পেছন ফেরে না ছেলেটা। ইন্তিহা সামনে আসে লোকটার। চোখ লুকাতে চেয়েও পারে না সে। ইন্তিহার কাছে ধরা দিতে বাধ্য হয়। চোখ টলমল করছে তার। ইন্তিহা হাত ধরে লোকটার।
“আপনি ভেঙ্গে পড়লে হবে? আম্মু ঠিক হয়ে যাবেন, ইনশাআল্লাহ। “
আবরার বলতে পারে না কিছু। শুধু মাথা নেড়ে সায় জানায়। টলমলে অশ্রুটুকু গড়াতে দেয় না সহজে। ছেলে মানুষের আবার কাঁদতে আছে নাকি!
রাতেই বাসে করে রওনা দেয় ঢাকার উদ্দেশে। ইন্তিহার অসুবিধা হয়েছিলো খুব, তবে এমন সময় ট্রেনের টিকিট পাওয়াও তো অসম্ভব ব্যাপার। আবরার ছিল প্রচণ্ড অস্থিরতার মধ্যে। একদিকে মায়ের এক্সিডেন্ট, অন্যদিকে স্ত্রীর এমন অবস্থা।
শেষ রাতের দিকে ওরা ঢাকায় পৌছায়। বাসায় না গিয়ে সরাসরি হসপিটালেই চলে যায়। আইসিইউ তে রাখা হয়েছে আসমা বেগম কে।হসপিটালের সব কাজ শেষ করে রেখেছে বড় দুই ভাই মিলে।
“আম্মুর কি অবস্থা এখন, আপু?”
ইন্তিহার প্রশ্নে খাদিজা কান্না ধরে রাখতে পারে না। ওকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে সে। বিয়ের পরপরই ওর আপন মা মারা যায়। আসমা বেগম শাশুড়ি নয়, ওর আপন মায়ের মতোই স্নেহ করতেন, আগলে রাখতেন। একটু বেশিই ভালোবাসতেন খাদিজাকে। ইন্তিহার চোখ ভিজে উঠে। গলায় দলা পাকায় কষ্টের ঢেউ। আবরারের কথা মনে পড়তেই অস্থির হয়ে উঠে মন। লোকটা ঠিক আছে তো? খারাপ কিছু শুনলে ঠিক রাখতে পারবেন তো নিজেকে?
এমন সব প্রশ্ন ঠিক থাকতে দেয় না মেয়েটাকে। তৃষ্ণার্ত চোখদুটো খুজতে থাকে স্বামী নামক মানুষটার অস্তিত্ব।সকাল প্রায় দশটার দিকে দেখা পায় আবরারের। নামাজ পড়ে দৌড়াদৌড়ির মধ্যেই ছিল সে। হসপিটালে কতো কিছু নিয়ে পেরেশানি করতে হয়। ইন্তিহা বসে ছিলো জা’দের সাথে। আবরারের উপস্থিতিতে উঠে দাড়ায় সে।
“ শরীর কেমন এখন তোমার?”
ইন্তিহা হয়তো কিছু বলতে যাচ্ছিলো লোকটাকে। কিছু খেয়েছে কিনা এখনো, বা এমন কিছু। অথচ এতকিছুর মাঝেও লোকটা ওর শারীরিক অবস্থা কেমন সেটা চিন্তা করছে! ইন্তিহা মাথা নেড়ে ভালো বুঝায়।
“ বাড়িতে চলে যাও ভাবির সাথে। এখানে আর কতক্ষন থাকবে? তোমারও তো শরীর ভালো নেই।”
“ আপনি থাকবেন না এখানে?”
“হ্যাঁ, থাকতে হবে।”
“তাহলে আমিও থাকবো।”
ওর কথায় আবরার স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষন। মেয়েটা কি পরিস্থিতি বুঝতে পারছে না?
“ অযথা জেদ করো না। যা বলছি শোনো। আমি এখানে…”
“ আম্মুর অবস্থা ভালো না হওয়া পর্যন্ত আমি এখানেই থাকবো!”
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ছেলেটা। এমনিতেই আসমা বেগমের অবস্থা তেমন একটা ভালো না। রক্ত লেগেছে ৭ ব্যাগের বেশি। বয়স্ক মানুষ হওয়ায় অল্পতেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। সেখানে গুরুতর এক্সিডেন্টে রক্ত গিয়েছে প্রচুর। একসাথে এতো রক্ত শরীরে দেয়াও যায় না।
বাইরে থেকে শক্ত দেখালেও ভেতরে ভেতরে আবরারও ভয় পাচ্ছে প্রচুর। ডাক্তার বলেছেন রোগীকে বাঁচানোর সম্ভাবনা একেবারেই কম। এতো সহজে অবশ্য বিশ্বাস হয়না ব্যাপারটা। মাত্র একদিনের ব্যাবধানে এতোকিছু হয়ে যাবে কল্পনাতেও আসে নি কারো।ইন্তিহা আবরারের ডান হাত ধরে আলতো করে।
“ খেয়েছেন আপনি কিছু?”
কিভাবে খাবো আমি? মা’কে জীবন মরনের দোলাচলে রেখে খেতে পারবো কিছু? গলা দিয়ে নামবে খাবার? বলতে চাইলেও বলা হয়না। নির্লিপ্ত আবরারের চাহনি দেখে কথা বাড়ায় না ইন্তিহা।
‘’কিছু খেয়ে নিন আগে। অল্প করে হলেও। “
“ পরে খাবো। তুমি অস্থির হয়ো না তো!”
“ এখনি খাবেন। আপনি অসুস্থ হয়ে পড়লে বাকিদের কি হবে? “
আবরার বলে না কিছু। ইন্তিহার হাত ধরে রেখেই পাশে থাকা বেঞ্চিতে বসে পড়ে সে। ইন্তিহা ওর কাঁধে হাত রাখে। ভরসা দেয়, সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।
জোর করে একটা কলা আর বিস্কিট খাইয়ে দেয় ইন্তিহা।পানিটাও খায়নি তখনো। এরমধ্যেই খবর আসে আইসিইউ রুম থেকে।আসমা বেগম দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমিয়েছেন অপর দুনিয়ার পথে। ফেলে গেছেন এতিম করে তিন ছেলে আর তিন মেয়েকে। কাঁপতে থাকা আবরারের হাত দুটো ঠেকে বেঞ্চের হাতলে। সমস্ত ভাষা হারায় সান্ত্বনা বাক্যগুলোর। ওরাও যে বড্ড অসহায় আজ!
তোমার আকাশ আমার মেঘ
পর্ব-১৫
তিতা ফুল8 Comments-
-
প্রিয় লেখক, আপনার এই রচনায় ইন্তিহা ও আবরারের মধ্যকার পারস্পরিক নির্ভরতা এবং টানাপোড়েনের মুহূর্তগুলো খুব গভীর ও হৃদয়স্পর্শী হয়ে ফুটে উঠেছে। আপনারা যারা এই প্ল্যাটফর্মে লিখছেন, তাদের প্রত্যেকের লেখার প্রতি একটু সদয় নজর রেখে নিয়মিত লাইক ও কমেন্টের মাধ্যমে একে অপরকে উৎসাহিত করলে আমাদের এই বাগানটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।
-
Friends
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Redowan Hussain
@redowanhussain
নৈশান
@noishan
Hashem Molla
@hashemmolla
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
mithila jannat
@mithilajannat
Sk Sagor
@sksagor
Md. Ashraful Alam
@md-ashrafulalam
Fazilatun Nesa
@fazilatun-nesa



তিতা ফুল, গল্পটা পড়ে বুকটা একদম ভার হয়ে গেল। এমন কঠিন সময়েও আবরারের পাশে ইন্তিহার এই অটুট ভরসা আর মমতা দেখে খুব মায়া লাগছে। হসপিটালের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে ইন্তিহার কি খুব কষ্ট হচ্ছিল?