Profile Photo

তিতা ফুলOffline

  • nadia1
  • Profile picture of তিতা ফুল

    তিতা ফুল

    • 3 weeks, 3 days ago

    “ মেয়েটা বুদ্ধিমতী, তবে বেয়াদব। আমরা আসার সময় সালামও দিলো না!”

    ঠিক এই কথাটাই বলা হয়েছিলো আমার ব্যাপারে। আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না, যারা বিদায়ের সময় পাত্রীর কাছ থেকে সালাম না পেয়ে পেছনে গিবত করতে পারে, তারা পরবর্তীতে কি করবে?

    যাই হোক, কথা আর আগায়নি সেখানে। আমার আর চিন্তার কারন ছিল না। তবে দিনে দিনে তাদের পছন্দ, পাত্র নির্বাচন দেখে আমি কথা বলার ভাষা হারালাম। তারা ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতাও দেখছে না পাত্রের। শুধু টাকা পয়সা আছে কিনা সেসব গুনছে। হয়তো বিয়ের পর আমাকে যেন কোনভাবে আর্থিক সাপোর্ট না দিতে হয়, সেটাই চাইতো!

    আমিও চাইতাম না এমন জায়গায় আমার বিয়ে হোক, যেখানে আমার বাবা মা কে সারাদিন এটা ওটা দিতেই হবে। তবে মানসিক শান্তিটুকু যেন মিলে। মানুষটা যেন আমায় বুঝে। ব্যাস, এটুকুই ছিল চাওয়া আমার। তবে সে চাওয়াও বোধহয় অপরাধ ছিল।

    দিনে দিনে আমি আরো ভেঙ্গে পড়ি। কেউ জানতোও না আমার ভেতরে কি চলে। কিভাবেই বা জানবে? মানুষের সামনে আমি শক্ত থাকতাম। বুঝতে দিতাম না, তাদের কথা আমায় কতোটা পুড়ায়।

    ভেবেছিলাম পাত্র দেখার সময়টায় বুঝি পরিবার খুব যত্ন করে, আরো বেশি ভালোবাসে। এখন দেখি তারা আগের থেকে আরও বেশি যত্ন করে আঘাত দিয়ে কথা বলে। ভাগ্যিস আমি কালো নই! নইলে তো দুনিয়াটা আরও বেশি কঠিন হতো আমার জন্য।

    “ সারাদিন রুম একটার মধ্যেই পড়ে থাকে। কাজ কাম কিছুই করে না। এটারে নিবে কে? পরে দেখা যাবে নিয়ে দুইদিনও রাখবে না। ফিরিয়ে দিয়ে যাবে।”

    আমি কালো হলে হয়তো এর সাথে আরও একটা কথা জুড়ে যেতো।

    “ রূপও তো নাই, যে মানুষ পছন্দ করবে। এমন কালিকে বিয়ে করবে কে?”

    কালো না হলেও যে খুব ভালো আছি, এমনটাও না। ফর্সা হওয়ার গুনাগুণও কিন্তু কম না। ভালো খারাপ সবাই চায়। অহরহ প্রস্তাব আসে বিয়ের। সবাই নিজেকে প্রচণ্ড ভালো, সৎ দাবী করে। ভয়ে থাকি, কখন কার সাথে জোর করে ধরে বিয়ে দিয়ে দেয়। অবশ্য ছেলের যদি কারি কারি টাকা থাকে, সেক্ষেত্রে অসম্ভব কিছু না।

    দিনে দিনে আমি বাস্তবতা বুঝতে শিখি। নিজের পছন্দের লেভেল কমিয়ে আনি আরও। কাল্পনিক সব চিন্তা ভাবনা বাদ দেই, যেসব তারা গেঁথে দিয়েছিল আমার মাথায়। মিথ্যা আশা দেয়া লোকগুলো সব ঘৃণার তালিকায় যুক্ত হতে থাকে নিজের অজান্তেই। তাদের বদলে যাওয়া রূপ দেখে খারাপ লাগে না এখন আর। বরং হাসি পায়। নিজের বোকামির প্রতি রাগ লাগে। কেন আমি তাদের সব কথাকে সিরিয়াস ভাবে নিচ্ছিলাম? কেন এতোটা বিশ্বাসের সাথে পান করেছিলাম মিথ্যা আশার বিষ!

    চারপাশের মানুষগুলো এখন আর মেডিকেলের কথা তুলে না। চান্স না পাওয়ায় কথা শুনায় না। তবে তাদের জন্য যে এখন আমি বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছি, সেসব মনে করিয়ে দেয়। আমার বিয়ে কেন হচ্ছে না এখনো, কেন এতো ভালো ভালো পাত্র( টাকাওয়ালা) আমি রিজেক্ট করে দিচ্ছি!
    “ তোকে ঘরে রেখে শুধু আমাদের ক্ষতি ছাড়া লাভ কিছুই হচ্ছে না। না করিস ঘরের কোন কাজ, না পেরেছিস পড়াশুনা করে কিছু করতে।তোকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারলেই বাঁচি এখন।”

    এসব শুনে প্রথম প্রথম আমার খুব খারাপ লাগতো। কান্না পেতো খুব। তারা কি আমাকে এখনি এতো পর ভাবছে? আমি কি তাদের ঘরের কেউ না? শুধু বিয়ের বয়স হয়েছে বলে এই বাড়িতে সব অধিকার কি আমি হারিয়ে ফেললাম? অন্য কারো উপর আমার দায়িত্ব চাপানোর আগেই তারা ছেড়ে দিয়েছে তা?

    টিউশন করাতাম কিছু। তবে নিজের পড়াশুনার খরচটুকু আর কারো থেকে নিতে চাইতাম না। তাই সেই টাকা জমিয়ে রাখতাম। কখন প্রয়োজন পড়ে কে জানে। কার কাছে চাইবো তখন? কেউ তো আমাকে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তে ভর্তি করতে চায় নি। পড়াশুনা একেবারে বন্ধ করে দেয়ার চাইতে অন্তত এক জায়গায় ভর্তি হয়ে থাকা ভালো মনে করেছিলাম। তাই ভর্তি হওয়া। এখন কি আমার পড়াশুনার খরচ তারা টানবে নাকি? আশ্চর্য!

    আমি আসলে প্রাকটিসিং মুসলিম। চেষ্টা করি ফরজ বিধানগুলো পূর্ণভাবে মেনে চলার। ইসলামে ১৪ জন পুরুষ বাদে আর কারো সাথে দেখা করা জায়েজ নাই, আমি পরিপূর্ণ রুপে মেনে চলতাম তা। পরিবার থেকে যে বাঁধার সম্মুখীন হইনি কখনো এমনটাও না, তবে সময়ের সাথে তারা মেনে নিতে থাকে এসব। ছোট থেকেই জেদি ছিলাম কিনা ভীষণ!

    বিয়ের ক্ষেত্রে তাই আমার প্রথম প্রায়োরিটি ছিল একজন দ্বীনদার, মুত্তাকী কেউ। যে কিনা আমাকে পর্দার ব্যাপারে নিষেধ তো করবেই না, বরং নিজেই আমার পর্দার প্রতি সচেতন থাকবে। হোক না অসুন্দর কিংবা টাকা পয়সা একটু কম। স্বাভাবিক বেঁচে থাকার জন্য যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু থাকলেই চলবে।

    কিছুদিন পরপরই প্রস্তাব আসতো। বড় ব্যবসায়ী, ৫ তালা ১০ তালা বাড়ি, তবে পর্দা মানে তারা বুঝে বোরকা পড়ে বাইরে যাওয়া, এটুকুই! দেখতে আসার ক্ষেত্রে পাত্রের বাবা, ভাই, বন্ধু-বান্ধব সবাই আসুক, এগুলো সাধারন ব্যাপার সেপার। মাথা ঘামানোর মতো কিছু না।
    সমাজে নানা মতবাদের মানুষ থাকতেই পারে, অস্বাভাবিক কিছু না। তারা হয়তো সেভাবেই জানে, এতে আমার কোন কিছু যায় আসতো না। তবে বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস তখনই বেরুতো, যখন দেখতাম আমার পরিবারও তাদের মতবাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করতো। আমাকে বুঝাতো, যুগ এখন এভাবেই চলে। মানিয়ে নিতে হবে আমাকে। যেখানে তারা জানতো আমি কিভাবে চলি, কেমন ধারনা পোষণ করি।

    হিদায়াত জিনিসটা কেবলই আল্লাহ প্রদত্ত। আল্লাহ না চাইলে কেউ কখনো হিদায়াত প্রাপ্ত হতে পারে না। অথচ তারা আমাকে বলতো, বিয়ের পর আমি নাকি তাকে ঠিক করে নিবো! এত নিখুঁত ভাবে সবকিছু মিলবে না কখনো। অথচ ছেলের যদি টাকাপয়সা তেমন না থাকে, তখন তারাই আবার আর কিছু না দেখেই না করে দেয় সেখানে। এ কেমন দ্বিমুখী নীতি তাদের, আমার বুঝে আসে না।

    আমি অবশ্য একেবারেই যে কোন কাজ করতাম না ঘরের, এমনও নয়। টুকটাক চেষ্টা করতাম। তবে সকালে ফজর পড়ে ঘুমানোর একটা বদ অভ্যাস ছিল। পড়াশুনা ছিল না বলে এই অভ্যাস আর কাটানোর চেষ্টা করিনি। এই কারণেও কথা কম শুনতে হয় নি। যৌথ পরিবার হওয়ার দরুন কিছু মানুষ এমনই ছিল, যারা কিনা আমার মায়ের জেদ আমার উপর ঝাড়ত। আমাকে অপমান অপদস্থ করে পৈচাসিক আনন্দ পেত যেন। আমি আবার কথার পিঠে কথা বলতে পারতাম না, অপর মানুষটার খারাপ লাগে যদি! আর বলার সুযোগও থাকতো না, হেসে হেসে বলতো যে!

    আর্ট করার জিনিসগুলো তখনও আমার টেবিলে পড়ে থাকতো। কিন্তু ততদিনে শখটা আর অবশিষ্ট নেই। রং তুলি হাতে নেই না বহুদিন হয়, রং গুলো হয়তো নষ্টও হয়ে গেছে। মানসিক শান্তিটুকু থাকলেও অবশ্য হতো, সেটাও যে নেই এখন আর। আমার আগের আর্ট গুলো দেখি আর ভাবী, এতো সুন্দর কাজ কিনা আমি করতাম একসময়! কোথায় গেলো আমার সেই প্রতিভাগুলো? লেখালেখি আমার নেশা ছিল একপ্রকারের। অষ্টম শ্রেণী থেকেই লিখতাম আমি। তবে কলেজে উঠে পড়ার এতো চাপ ছিল যে, লেখার সময়টুকুই আর পাইনি। এখন কলম ধরলেও আগের মতো চোখের পলকে খাতা ভরে উঠে না। ভাবতে ভাবতেই সময় চলে যায়, একসময় খাতা কলম জায়গা মতো রেখে দেই। সারাদিন সাদা খাতা আর কলম হাতে নিয়ে বসে থাকলে তো আর চলবে না।

    আসলে ছোট থেকে অনেক কিছুতেই আগ্রহ ছিল আমার। যেমন বই পড়া। ক্লাস ফোর থেকেই বই পড়ার প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। তবে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তে হতো। পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য কোন বই আমার হাতে দেখলে বলা হতো,

    “ এসব কি পড়ছো তুমি? বয়স হয়েছে এসব বই পড়ার? যাও, স্কুলের বই পড়ো।”

    গল্প পড়ার প্রতি আগ্রহ ছিল আমার। তাই গল্প আছে এমন যে বই পেতাম গোগ্রাসে গিলতাম। আমার উপযুক্ত কিনা তা বুঝতাম না। কেউ তো বলতোও না। বলবে কি, পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য কোন বই পড়তে দেখলেই তো ধমক দেয়া হতো।

    ক্লাস ফাইভে থাকতেই একাদশ দ্বাদশ শ্রেণীর লালসালু উপন্নাস পুরোটা পড়ে ফেলেছিলাম। এর আগে পরেছিলাম নবম দশম শ্রেণীর কাকতাড়ুয়া উপন্যাসটি। এছাড়া বাড়িতে বড় যারা আমার থেকে উপরের ক্লাসে পড়তো, ওদের বাংলা বইয়ের সব গল্পই মোটামুটি পড়া হয়ে গিয়েছিলো। কারো কাছে একটা গল্পের বই দেখলে সেটার প্রতি লোভ জন্মাতো প্রচুর। সুযোগ পেলে লুকিয়ে পড়ে ফেলতাম।

    এখন অবশ্য কেউ আর কিছু বলে না। সংগ্রহে অনেক বই আছে আমার। দেখলেই শান্তি লাগে মনে।ছোটদের আমি বই পড়তে দেই সেখান থেকে।তবে এখনকার বাচ্চারা বই পড়তে চায় না। সারাক্ষন ফোন নিয়েই পড়ে থাকে, বই পড়বে কখন?

    নিজের শখ, স্বপ্ন সবকিছু যেই পড়াশুনার জন্য বিসর্জন দিলাম, সেই পড়াশুনা দিয়েও তো কিছু করতে পারলাম না। লুজার আমাকে বলবে না তো কাকে বলবে? যে নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল দিয়ে আঘাত করে!

    সেদিন সন্ধ্যায় এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে গেলো। উনারা আমাকে ডেকে নিয়ে একটা ছেলের ছবি দেখালেন।

    (চলবে)

    -কবুলের আগে
    পর্ব- ২
    -তিতা ফুল

    4
    8 Comments
    • তিতা ফুল, আপনি আপনার জীবনের কঠিন কিছু সত্য খুব সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন, বিশেষ করে “নিজের পছন্দের লেভেল কমিয়ে আনি আরও” এই অংশটি মানুষের মনের অসহায়ত্বকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নিজের বিশ্বাস ধরে রাখার চেষ্টা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য, আপনি এভাবেই লেখনী চালিয়ে যান।

    • মেডিকেলে চান্স না পাওয়ার পর পরিবারের কথার ধরন বদলে যাওয়াটা পড়ে খুব খারাপ লাগলো😥😥

    • আপনার লেখাটা পড়ে মনের ভেতর খুব খারাপ লাগা কাজ করছে, বিশেষ করে এই লাইনটি খুব গভীর ছিল— “কেন আমি তাদের সব কথাকে সিরিয়াস ভাবে নিচ্ছিলাম? কেন এতোটা বিশ্বাসের সাথে পান করেছিলাম মিথ্যা আশার বিষ!”। পরিবার ও সমাজের এই দ্বিমুখী আচরণ যে কতটা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করতে পারে, তা আপনার লেখায় খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। সামনের পর্বগুলোর অপেক্ষায় রইলাম, আপনি অনেক সাবলীলভাবে নিজের কথাগুলো গুছিয়ে লিখেছেন।

    • স্বপ্নের বিসর্জনেও পাওয়া যায় না প্রকৃত শান্তি শুধু বদলে যায় প্রত্যাশার মাপকাঠি…..🤍🖤

Friends

Profile Photo
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Profile Photo
Redowan Hussain
@redowanhussain
Profile Photo
নৈশান
@noishan
Profile Photo
Hashem Molla
@hashemmolla
Profile Photo
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
Profile Photo
mithila jannat
@mithilajannat
Profile Photo
Sk Sagor
@sksagor
Profile Photo
Md. Ashraful Alam
@md-ashrafulalam
Profile Photo
Fazilatun Nesa
@fazilatun-nesa
Skip to toolbar