Profile Photo

মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুকOffline

  • nazmul26
  • বিয়ের পর সম্পর্কের অবনতি বা ভাঙনের জন্য দায়ী কে?
    কুরআন-হাদিস, ইসলামী পারিবারিক নীতি, শ্বশুর-শাশুড়ির অধিকার, সামাজিক রীতিনীতি ও বাংলাদেশের বাস্তবতার আলোকে
    পর্ব:০১
    বিয়ের পর কেন বদলে যায় সম্পর্ক?

    একটি ছেলে, দুটি পরিবার ও প্রত্যাশার সংঘাত

    মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক

    একটি ছেলে যখন জন্মায়, তখন তার পৃথিবীর প্রথম ঠিকানা হয় বাবা-মা। মায়ের কোল, বাবার হাত, ভাই-বোনের সঙ্গ—এই ছোট্ট পৃথিবীতেই তার শৈশব কাটে। বাবা-মা তাকে মানুষ করার জন্য কত রাত জেগেছেন, কত স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন, কত অভাব গোপন করেছেন—তার হিসাব হয়তো সন্তান কখনো পুরোপুরি জানতেও পারে না।

    তারপর একদিন সেই ছেলের বিয়ে হয়।

    বাড়িতে আসে একজন নতুন মানুষ। সে শুধু একজন স্ত্রী নয়; সে একজন নতুন পরিবারের সদস্য। ছেলেটির জীবনে যুক্ত হয় নতুন ভালোবাসা, নতুন দায়িত্ব, নতুন স্বপ্ন এবং নতুন বাস্তবতা।

    কিন্তু এখানেই অনেক পরিবারের গল্প বদলে যেতে শুরু করে।

    মায়ের মনে প্রশ্ন জাগে—‘আমার ছেলে কি আর আগের মতো আছে?’

    বাবা ভাবেন—‘আগে তো সব কথা আমাকে বলত, এখন স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে।’

    ভাই-বোন ভাবে—‘বউ আসার পর ভাইটা আমাদের থেকে দূরে চলে গেল।’

    স্ত্রী ভাবে—‘বিয়ের পরও কি আমার স্বামী তার পরিবারের কাছে আগের মতোই থাকবে, নাকি আমাদের নিজেদের সংসারের জন্য আলাদা সীমারেখা তৈরি হবে?’

    শ্বশুর-শাশুড়ির মনে প্রশ্ন আসে—‘মেয়েটি কি আমাদের মেয়ের মতো হবে?’

    অন্যদিকে ছেলেটি দাঁড়িয়ে থাকে মাঝখানে—এক পাশে জন্মদাতা বাবা-মা, অন্য পাশে জীবনসঙ্গী; এক পাশে ভাই-বোনের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, অন্য পাশে নতুন সংসারের দায়িত্ব।

    এই পরিবর্তনকে যদি ভালোভাবে বোঝা না যায়, তাহলে ভালোবাসার জায়গায় জন্ম নেয় অভিমান, অভিমানের জায়গায় সন্দেহ, আর সন্দেহের জায়গায় তৈরি হয় দূরত্ব।

    তাই প্রশ্ন হলো—বিয়ের পর সম্পর্ক কি সত্যিই বদলে যায়, নাকি সম্পর্কের প্রতি মানুষের প্রত্যাশাই বদলে যায়?

    —

    বিয়ে সম্পর্কের সমাপ্তি নয়, সম্পর্কের নতুন বিন্যাস

    বিয়ে মানুষের পুরোনো সম্পর্কগুলো মুছে দেয় না। বরং জীবনে একটি নতুন সম্পর্ক যুক্ত করে।

    একজন ছেলে বিয়ের আগে যেমন বাবা-মায়ের সন্তান, বিয়ের পরও সে তাদের সন্তান। কিন্তু একই সঙ্গে সে একজন স্বামীও। তার ওপর নতুন কিছু দায়িত্ব আসে।

    ইসলাম বিয়েকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কুরআন স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার সম্পর্ক হিসেবে উল্লেখ করেছে।

    আল্লাহ বলেন, তিনি মানুষের জন্য তাদের মধ্য থেকেই জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তারা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করে; আর তাদের মধ্যে স্থাপন করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।

    —সূরা আর-রূম, ৩০:২১

    অর্থাৎ স্ত্রী জীবনে আসা মানে ছেলে বাবা-মাকে ত্যাগ করবে—এমন ধারণা ইসলামী নয়। আবার বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসার অর্থ স্ত্রীকে অবহেলা করা—এটিও ইসলামের শিক্ষা নয়।

    এখানে মূলনীতি হলো—সম্পর্কের পরিবর্তন নয়, দায়িত্বের ভারসাম্য।

    —

    বাবা-মায়ের কাছে যে ছেলে ছিল ‘শুধুই আমাদের’

    বাবা-মায়ের জন্য সন্তান কখনো বড় হয় না। সন্তানের বয়স চল্লিশ হলেও মায়ের চোখে সে অনেক সময় সেই ছোট্ট ছেলেটিই থাকে।

    বিয়ের আগে মা হয়তো ছেলের খাবার নিয়ে ভাবতেন, বাবা তার চাকরি বা ব্যবসা নিয়ে পরামর্শ দিতেন, ভাই-বোন তার সঙ্গে অবাধে সময় কাটাত।

    বিয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু বিষয় পরিবর্তিত হয়।

    এখন ছেলেকে স্ত্রীর পছন্দ-অপছন্দ বিবেচনা করতে হয়। কোথায় থাকবে, কীভাবে সংসার চালাবে, কীভাবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করবে—এসব সিদ্ধান্তে স্ত্রীও অংশীদার।

    কিন্তু এই পরিবর্তনকে অনেক সময় বাবা-মা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেন।

    ‘আগে তো আমাদের কথা শুনত।’

    ‘এখন সবকিছু বউকে জিজ্ঞেস করে।’

    ‘আগে আমাদের জন্য টাকা রাখত।’

    ‘এখন সব টাকা সংসারে খরচ করে।’

    এখানে একটি বিষয় বোঝা জরুরি—ছেলের দায়িত্ব বেড়েছে; ভালোবাসা কমেছে—এমনটি অপরিহার্য নয়।

    —

    ‘ছেলের কাছে টাকা নেই’—কথাটি বিশ্বাস করতে না পারার যন্ত্রণা

    বাংলাদেশের অনেক পরিবারে বিয়ের পর অর্থনৈতিক প্রত্যাশা সম্পর্কের অন্যতম বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়।

    বাবা-মা ভাবেন—

    ‘ছেলে উপার্জন করে, নিশ্চয়ই টাকা আছে।’

    ছেলে যখন বলে—

    ‘এ মাসে হাতে টাকা নেই।’

    তখন উত্তর আসে—

    ‘বউয়ের জন্য টাকা আছে, আমাদের জন্য নেই!’

    এই একটি বাক্য কখনো কখনো ছেলের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করে।

    কারণ একজন মানুষের উপার্জন থাকলেই তার হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকবে—এ ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

    বিয়ের পর তার বাসাভাড়া থাকতে পারে, বাজার খরচ থাকতে পারে, চিকিৎসা ব্যয় থাকতে পারে, সন্তানের শিক্ষা থাকতে পারে, ঋণ থাকতে পারে, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের প্রয়োজন থাকতে পারে।

    অন্যদিকে বাবা-মায়েরও বাস্তব প্রয়োজন থাকতে পারে।

    তাই সমাধান হলো না—‘বাবা-মা চাইবেন না’ কিংবা ‘ছেলে সবকিছু দেবে।’

    সমাধান হলো—সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব, আর বাস্তবতা অনুযায়ী প্রত্যাশা।

    কুরআন বলে—

    «‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।’»

    —সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৬

    সন্তানের সামর্থ্য বিবেচনা না করে প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়া যেমন সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বাবা-মায়ের প্রয়োজন উপেক্ষা করাও অন্যায়।

    —

    ‘এখন শ্বশুর-শাশুড়িই তোমার বাবা-মা!’

    বিয়ের পর আরেকটি ভুল ধারণা তৈরি হয়।

    ছেলে যদি স্ত্রীর বাবা-মাকে সম্মান করে, তাদের খোঁজ নেয় বা প্রয়োজনে সাহায্য করে, তখন নিজের বাবা-মায়ের কেউ কেউ মনে করতে পারেন—

    ‘এখন তো শ্বশুর-শাশুড়িই তোমার বাবা-মা হয়ে গেছে!’

    এখানেও সমস্যাটি আসলে ভালোবাসাকে প্রতিযোগিতায় পরিণত করা।

    একজন ছেলে তার বাবা-মাকে ভালোবাসবে। একই সঙ্গে স্ত্রীর বাবা-মাকেও সম্মান করবে। দুটো সম্পর্কের প্রকৃতি এক নয়, অধিকারও এক নয়; কিন্তু সম্মান প্রদর্শনের জন্য কাউকে অপমান করার দরকার নেই।

    বরং একজন বিবাহিত পুরুষের পরিণত আচরণ হলো—

    নিজের বাবা-মায়ের মর্যাদা রক্ষা করা এবং স্ত্রীর বাবা-মাকেও সম্মান করা।

    —

    শ্বশুর-শাশুড়ির প্রত্যাশা এবং পুত্রবধূর বাস্তবতা

    বাংলাদেশের সামাজিক সংস্কৃতিতে অনেক পরিবারে বিয়ের পর পুত্রবধূকে ঘরের বহু দায়িত্ব গ্রহণ করতে প্রত্যাশা করা হয়।

    ‘বউ এসেছে, এখন সংসারটা সামলাবে।’

    ‘শাশুড়ির কথা শুনবে।’

    ‘সব আত্মীয়কে আপন করে নেবে।’

    ‘বাড়ির সব রীতি মানবে।’

    এর কিছু অংশ পারস্পরিক সহযোগিতা ও সৌজন্যের মধ্যে পড়তে পারে। কিন্তু সামাজিক রীতি আর শরিয়তের বাধ্যতামূলক বিধান এক বিষয় নয়।

    একটি মেয়ের বিয়ে হয়েছে বলে তার ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা, মতামত এবং ব্যক্তিগত পরিসর শেষ হয়ে যায় না।

    একইভাবে পুত্রবধূ শ্বশুর-শাশুড়িকে সম্মান করবে—এটিও পারিবারিক সৌন্দর্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

    এখানে দরকার কর্তৃত্ব নয়, সম্পর্ক; দাবি নয়, সহযোগিতা।

    শ্বশুর-শাশুড়ি যদি পুত্রবধূকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করেন, আর পুত্রবধূ যদি তাদের নিজের বাবা-মায়ের মতো সম্মান করেন, তাহলে একটি বাড়ি কেবল বসবাসের স্থান থাকে না—তা হয়ে ওঠে একটি পরিবার।

    —

    ‘সব দোষ ভাবির’—একটি বিপজ্জনক সামাজিক প্রবণতা

    ভাইয়ের বিয়ের পর কিছু পরিবারে একটি অদ্ভুত মানসিকতা দেখা যায়।

    আগে ভাই-বোনের মধ্যে যে বিষয় নিয়ে কখনো সমস্যা হতো না, বিয়ের পর সেই একই বিষয়ের ব্যাখ্যা হয়—

    ‘ভাবির কারণে।’

    ভাই ফোন কম করেছে—ভাবির কারণে।

    ভাই টাকা দিতে পারেনি—ভাবির কারণে।

    ভাই আলাদা থাকতে চায়—ভাবির কারণে।

    ভাই নিজের সংসারের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে চায়—ভাবির কারণে।

    কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব অভিযোগ সত্যও হতে পারে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে একই ব্যাখ্যা দাঁড় করানো ন্যায়সংগত নয়।

    কুরআন সতর্ক করে—

    «‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান পাপ।’»

    —সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২

    একই আয়াতে অন্যের গোপনীয়তা অনুসন্ধান এবং গিবত থেকেও নিষেধ করা হয়েছে।

    রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সন্দেহ, পারস্পরিক হিংসা ও একে অপরের দোষ অনুসন্ধান থেকে সতর্ক করেছেন।

    অতএব কোনো মানুষের ভুল থাকলে নির্দিষ্ট আচরণ নিয়ে কথা বলা উচিত; মানুষটিকে সামগ্রিকভাবে ‘খারাপ’ বানিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

    —

    ছেলে কি বিয়ের পর ভাই-বোনকে ভুলে যাবে?

    না।

    কিন্তু আগের মতো প্রতিদিন সময় দেওয়া হয়তো সম্ভব হবে না।

    এটি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    বিয়ের আগে একজন ভাইয়ের ওপর নিজের পরিবার ছাড়া অনেক কম দায়িত্ব থাকতে পারে। বিয়ের পর তার নতুন সংসার, স্ত্রী, সন্তান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হয়।

    তাই সম্পর্কের রূপ পরিবর্তিত হতে পারে; সম্পর্কের মূল্য নয়।

    ভাই-বোনের উচিত নয়—

    ‘আগে যেমন ছিলে, এখনো তেমন থাকতে হবে।’

    বরং বলা উচিত—

    ‘তোমার নতুন সংসার আছে; আমরা সেটা বুঝি। তবে আমাদের সম্পর্কটাও যেন ভালো থাকে।’

    এমন একটি বাক্য অনেক সম্পর্ক বাঁচিয়ে দিতে পারে।

    —

    সামাজিক রীতিনীতি কখন বিষ হয়ে ওঠে?

    আমাদের সমাজে কিছু প্রচলিত কথা আছে—

    ‘বিয়ের পর মেয়ে আর নিজের বাড়ির নয়।’

    ‘বউকে শ্বশুরবাড়ির সব কথা মানতে হবে।’

    ‘ছেলে বিয়ে করলে বউ-ই সব নিয়ন্ত্রণ করে।’

    ‘ছেলের উপার্জন মানেই বাবা-মায়ের টাকা।’

    ‘ভাবি এলে ভাই আর ভাই-বোনের থাকে না।’

    ‘শাশুড়ির কথা না শুনলে বউ ভালো নয়।’

    ‘বউয়ের কথা শুনলে ছেলে মায়ের অবাধ্য।’

    এসব বাক্যের প্রত্যেকটির পেছনে কোনো না কোনো সামাজিক অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। কিন্তু এগুলোকে সার্বজনীন সত্য বানিয়ে ফেললে বিপদ হয়।

    ইসলামে কোনো সামাজিক রীতি গ্রহণযোগ্য কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেখতে হবে—তা শরিয়তের স্পষ্ট বিধানের বিরোধী কি না, কারও অধিকার নষ্ট করছে কি না, জুলুম বা অন্যায় সৃষ্টি করছে কি না।

    ‘আমাদের সমাজে এভাবেই চলে’—এটি কোনো অন্যায়কে ন্যায়ে পরিণত করে না।

    —

    সম্পর্ক ভাঙার আগে শুরু হয় ‘তুলনা’

    সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় মানুষ নয়—তুলনা।

    ‘তোমার ভাই তো তার বাবা-মাকে এত টাকা দেয়।’

    ‘অমুকের বউ তো শাশুড়ির এত সেবা করে।’

    ‘অমুকের ছেলে তো প্রতি মাসে মা-বাবাকে টাকা দেয়।’

    ‘অমুকের মেয়ে বিয়ের পরও বাবা-মাকে এত দেখে।’

    তুলনা মানুষের মধ্যে কৃতজ্ঞতা বাড়ায় না; বরং অনেক সময় অপূর্ণতার অনুভূতি বাড়ায়।

    প্রত্যেক পরিবারের আর্থিক অবস্থা আলাদা। প্রত্যেক মানুষের সামর্থ্য আলাদা। প্রত্যেক সংসারের পরিস্থিতি আলাদা।

    তাই অন্যের সংসারকে মাপকাঠি বানিয়ে নিজের পরিবারের সম্পর্ক বিচার করা উচিত নয়।

    —

    ভালোবাসার সঙ্গে সীমারেখাও দরকার

    ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে উৎসাহ দিয়েছে। কিন্তু আত্মীয়তার অর্থ এই নয় যে প্রত্যেকে অন্যের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করবে।

    একজন বিবাহিত দম্পতির কিছু ব্যক্তিগত বিষয় থাকবে।

    তাদের আর্থিক পরিকল্পনা থাকতে পারে।

    তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকতে পারে।

    তাদের পারিবারিক সিদ্ধান্ত থাকতে পারে।

    তাদের ব্যক্তিগত মতপার্থক্য থাকতে পারে।

    এসব প্রতিটি বিষয় বাবা-মা, ভাই-বোন, শ্বশুর-শাশুড়ি বা অন্য আত্মীয়দের জানানো প্রয়োজন নেই।

    আবার বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত বিষয়ও ছেলের স্ত্রীর কাছে অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রকাশ করা উচিত নয়।

    সীমারেখা সম্পর্ককে দূরে সরায় না; অনেক সময় সীমারেখাই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে।

    —

    তাহলে বিয়ের পর সম্পর্কের অবনতি শুরু হয় কোথা থেকে?

    প্রায়ই শুরু হয় একটি ছোট প্রত্যাশা থেকে।

    বাবা ভাবলেন—‘ছেলে আগের মতোই থাকবে।’

    মা ভাবলেন—‘ছেলে আমার কথাই আগে শুনবে।’

    ভাই ভাবল—‘ভাই আমাদের জন্য আগের মতো সময় দেবে।’

    বোন ভাবল—‘ভাবি এলেও কিছু বদলাবে না।’

    স্ত্রী ভাবল—‘স্বামী তার সব সিদ্ধান্ত আমার সঙ্গে নেবে।’

    শ্বশুর-শাশুড়ি ভাবলেন—‘বউ আমাদের ঘরের সব নিয়ম মেনে চলবে।’

    কিন্তু বাস্তব জীবন সবার প্রত্যাশামতো চলে না।

    তারপর প্রত্যাশা পূরণ না হলে আসে অভিমান।

    অভিমান থেকে অভিযোগ।

    অভিযোগ থেকে সন্দেহ।

    সন্দেহ থেকে কানকথা।

    কানকথা থেকে পক্ষপাত।

    পক্ষপাত থেকে সংঘাত।

    আর সংঘাত থেকে দূরত্ব।

    অবশেষে একদিন কেউ বলে—

    ‘বিয়ের পর ছেলেটা বদলে গেছে।’

    কিন্তু হয়তো ছেলেটি একদিনে বদলায়নি। বদলে গেছে তার দায়িত্ব। আর সেই পরিবর্তনকে বোঝার মতো মানসিক প্রস্তুতি পরিবারটির ছিল না।

    —

    কে দায়ী?

    এই প্রশ্নের উত্তর এই প্রথম পর্বে চূড়ান্তভাবে দেওয়া যায় না।

    কারণ প্রত্যেক পরিবারের গল্প আলাদা।

    কোথাও বাবা-মায়ের অতিরিক্ত প্রত্যাশা সমস্যা।

    কোথাও ছেলের অবহেলা।

    কোথাও স্ত্রীর অযৌক্তিক দাবি।

    কোথাও শ্বশুর-শাশুড়ির অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ।

    কোথাও ভাই-বোনের ভাবির প্রতি বিরূপ মনোভাব।

    আবার কোথাও সবাই মিলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না।

    তাই প্রথমেই কাউকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়।

    বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—

    আমার প্রত্যাশা কি ন্যায়সংগত?

    আমি কি অন্যের সামর্থ্য বুঝছি?

    আমি কি প্রমাণ ছাড়া সন্দেহ করছি?

    আমি কি অন্যের সংসারের সীমারেখা সম্মান করছি?

    আমি কি আমার অধিকার চাইতে গিয়ে অন্যের অধিকার নষ্ট করছি?

    একটি পরিবার বাঁচানোর প্রথম সূত্র:

    রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—

    «‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে, তার ভাইয়ের জন্যও তা পছন্দ করে।’»

    —সহিহ বুখারি, ১৩; সহিহ মুসলিম, ৪৫

    এই নীতিকে পারিবারিক জীবনে প্রয়োগ করলে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে।

    মা যেমন চান ছেলে তাকে সম্মান করুক, তেমনি ছেলের স্ত্রীও চান স্বামী তাকে সম্মান করুক।

    বাবা যেমন চান ছেলে তার আর্থিক সীমাবদ্ধতা বুঝুক, তেমনি স্ত্রীও চান স্বামী তার সীমাবদ্ধতা বুঝুক।

    ভাই যেমন চান তার বোন তাকে ভালোবাসুক, তেমনি বোনও চান ভাই তার নতুন সংসারকে সম্মান করুক।

    শ্বশুর-শাশুড়ি যেমন চান পুত্রবধূ তাদের সম্মান করুক, তেমনি পুত্রবধূও চান তারা তার মর্যাদা রক্ষা করুন।

    সম্পর্কের সৌন্দর্য এখানেই—আমি শুধু আমার অধিকার দেখব না; অন্যের অধিকারও দেখব।

    —

    শেষ কথা

    বিয়ে কোনো ছেলে-মেয়েকে তাদের অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন করে না। বিয়ে তাদের জীবনে একটি নতুন অধ্যায় খুলে দেয়।

    একজন ছেলে একই সঙ্গে সন্তান এবং স্বামী হতে পারে।

    একজন মেয়ে একই সঙ্গে স্ত্রী এবং কন্যা হতে পারে।

    একজন বাবা একই সঙ্গে বাবা এবং শ্বশুর হতে পারেন।

    একজন মা একই সঙ্গে মা এবং শাশুড়ি হতে পারেন।

    একজন ভাই একই সঙ্গে ভাই এবং দেবর/ভাশুর হতে পারে।

    সম্পর্কের এই বহুমাত্রিক বাস্তবতা বুঝতে না পারলেই সমস্যা।

    বিয়ের পর প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—

    ‘সে এখন কার?’

    বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—

    ‘সে এখন কার প্রতি কী দায়িত্ব বহন করে?’

    বাবা-মায়ের ভালোবাসা যেন ছেলের জন্য শিকল না হয়।

    স্ত্রীর ভালোবাসা যেন স্বামীর জন্য বিচ্ছিন্নতার কারণ না হয়।

    ভাই-বোনের ভালোবাসা যেন ভাইয়ের নতুন সংসারের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেয়।

    শ্বশুর-শাশুড়ির স্নেহ যেন পুত্রবধূর ওপর কর্তৃত্বে পরিণত না হয়।

    আর ছেলের ন্যায়বোধ যেন কোনো পক্ষকে খুশি করার জন্য অন্য পক্ষের অধিকার নষ্ট না করে।

    বিয়ের পর মানুষ বদলায় না—দায়িত্ব বদলে যায়।
    সম্পর্ক শেষ হয় না—সম্পর্কের বিন্যাস বদলে যায়।
    ভালোবাসা কমে না—ভালোবাসাকে নতুনভাবে বণ্টন করতে হয়।

    যে পরিবার এই সত্যটি বুঝতে পারে, সেখানে নতুন বউ আসে নতুন আনন্দ নিয়ে; নতুন জামাই আসে নতুন সম্পর্ক নিয়ে; ছেলে নিজের সংসার গড়েও বাবা-মায়ের সন্তান থাকে; ভাই নিজের ঘর করেও ভাই-বোনের ভাই থাকে।

    আর যে পরিবার এই সত্যটি বুঝতে পারে না, সেখানে ছোট্ট একটি অভিমানও একদিন বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়।

    পরের পর্ব:

    ‘ছেলের কাছে টাকা নেই—এ কথা কীভাবে বিশ্বাস করি?’

    বাবা-মায়ের আর্থিক প্রত্যাশা, ছেলের বাস্তব সামর্থ্য এবং বিয়ের পর অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ
    চলবে……………………….

Friends

Profile Photo
ইস্রা
@israteasha
Profile Photo
এম.এ.আর. তালহা
@talhaofficial-prime607gmail-com
Profile Photo
Tahin Bhuiyan Chayapothik
@tahinbhuiyanchayapothik
Profile Photo
Kanej-Roksana
@kanej-roksana
Profile Photo
AdabenTatali
@adabentatali
Profile Photo
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
Skip to toolbar