Profile Photo

onindomuhibOffline

  • onindomuhib
  • Profile picture of onindomuhib

    onindomuhib

    3 years, 10 months ago

    আমরা যারা এই গাঁয়ে বেড়ে উঠেছি, তাদের সকলের কাছেই এই তেঁতুলবাগান রুপকথার রাজ্যের মতোই। তেঁতুলবাগানের সরু পথ ধরে কত-শত দিন শুধু হেঁটে বেরিয়েছি। কত বর্ষার জল, চৈত্র-বৈশাখের দুপুরে, শ্রাবণের বিকেলে, কত-শত বসন্তে এই তেঁতুলতলায়, বাঁশবনে, মন্ডল গাছের নিচে , আম-কাঠালের গাছের তলায় আমাদের ছেলেবেলা কেটে গিয়েছে! সেই ছেলেবেলা যে কেবল স্মৃতি আর স্বপ্ন হয়ে বেঁচে আছে। এমন অপূর্ব শৈশব কারো হয়? আমার জানা নেই। বুনো ডুমুর গাছের তলায় টুনটুনি পাখির বাসা ছিলো একসময়, সেই ছেলেবেলায় দেখেছি। ডুমুর গাছে ফল পেকে পঁচে উঠতো। আমরা কখনো ধরবার সাহস করিনি, কে যেন বলেছিলো ডুমুর ফল খেলে মানুষ পাগল হয়ে যায়। সেই ডুমুর গাছ পর্যন্ত এখন পৌঁছানো যায় না, কত আগাছা, ঝোপঝাড় বেড়ে উঠেছি সেইদিকে। কত সাপের আড্ডা!
    ডুমুর গাছের ওইদিকে প্রাচীরের ওপারে পুরনো একটি কুয়া, সেই ছেলেবেলায় দেখেছি তা পরিত্যক্ত। আজ এতগুলো বছর পর সেই কুয়ায় হয়তো অশ্বত্থ কিংবা বট গাছ বেড়ে উঠেছে, সেইদিকে যাবার পথ নেই। কত-শত বছর সেখানে মানুষের পায়ের চিহ্ন পড়েনি? সেই কুয়ার চারপাশে আরও ঘনবন। অতশত গাছের নাম জানিনে, তবে বেশ মনে পড়ে সেসব । তেঁতুলবাগানের দক্ষিণেও বড় ঘনবন হয়ে গিয়েছে, সেখানে কিসব মোটা মোটা লতা গাছ বেয়ে নেমে এসেছে, দূর থেকে দেখলে মনে হবে অজগর গাছের ডাল বেয়ে ভূতলে নামছে।
    সেই ছেলেবেলায় দেখে এসেছি কে যেনো এইখানে বাড়ি বানাবে বলে ইট পাথর গেঁথে গেল, অথচ আজ বিশ বছর পরেও সেখানে কেউ হাত দেয়নি। এইটুকু যা অবশিষ্ট, ফেলে আসা জীবনের তেঁতুল বাগানের সঙ্গে মিলে যায়, বাকি সব বদলে গিয়েছে। পথের উপর ঝোপঝাড়ে ভর্তি হয়ে গিয়েছে, সবুজ ঘাস ঝোপের আড়ালে পড়েছে, শুকনো পাতা, মরে পড়ে থাকা ডাল, পথের সকল চিহ্ন মুছে ফেলেছে।
    মধ্যাহ্নে কিংবা প্রদোষকালে তেঁতুলবাগানে যাওয়ার নিয়ম ছিলো না, কেউ যেতো না। সেই সময় নাকি অশরীরীর আনাগোনা বেড়ে যেতো, পাকা তেঁতুল, মন্ডলের লোভে আমরা সেই ভয় মাঝে মাঝেই ভুলে যেতাম। তবে একজন পাহারাদার ঠিক করে। একদল কিংবা কয়েকজন তেঁতুল কুড়াবে আর অন্য একজন পথের ধারে দাঁড়িয়ে দেখবে কোন ভূত আসছে কি না? যেন সবাই ছুটে পালাতে পারে, ছেলেমানুষী ভাবনা আরকি। রাত্রি দ্বিপ্রহরে সত্যিই হয়তো সেখানে আমাদের পরিচিতি জগতের বাহিরের কিছু ঘটতো, কেউ যেতো না সেখানে। রাতদুপুরে কেউ হয়তো ভুল ক্রমে সে তেঁতুলতলার পথ ধরে হেঁটে গেল, তাকে কে যেন চড় মেরে বসে। পরেরদিন গ্রাম জুড়ে সেই কথা সবার মুখে মুখে, “শুনেছো নাকি? কাল তো রঞ্জুকে ধরে চড় মেরে গাল লাল করে দিল। ঘাড় ধরে নাকি আছাড় মারতে গিয়েছিলো, অল্পের জন্য বেঁচে গেল।” তখন সবাই নিজ অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে গল্প বের করে, পরের কয়েকদিন গ্রামে তেঁতুলবাগানের গল্প বলে কেটে যায়। গ্রামের অনেকেই বলে রাতদুপুরে সেখানে কিসের যেন আড্ডা হয়, পুরনো প্রাচীরের উপরে নাকি অশরীরীরা মিটিংয়ে বসতো।
    এতোসব গল্প আর ভয়ের কোন কিছুই কাজ করতো না একটি ব্যাক্তির উপর, গ্রামের সবাই তাকে কিকু বলে ডাকতো। একবারে বদ্ধ উন্মাদ নয়, আবার সুস্থও নয়। সেই প্রায় পুরনো সেই বাড়ির সিঁড়ির উপর ঘুমিয়ে পড়তো, বুনো ডুমুর ফল খেত। পথের উপর বসে প্রাকৃতিক কাজ সাড়তো। তেঁতুলবাগানের পাশে বাড়ি ছিল শক্তি ঘোষের। কিকুর সাথে দিনের বেলায় হয়তো কোন কারণে তার সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে, তাতেই কাজ হয়ে গেল। রাতদুপুরে সেই বাগানে দাঁড়িয়ে ইট ছুঁড়ে মারবে টিনের চালের উপর, ছাপার অক্ষরে লেখার অতীত ভাষায় গালমন্দ করবে। পরেরদিন তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়,“ গতরাতে এতো ইটপাটকেল কেন ছুঁড়ে মেরেছিস, বল দেখি?
    তোর জন্য রাতে ঘুমোবার একটু জো নেই, আর গালমন্দ করিস কেন হ্যাঁ?”
    সেই প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন শুনে এমন ভাব করবে যেন সে এইমাত্র আকাশ থেকে পড়েছে! তখন দিব্যি সুস্থ মনে হয় মানুষটাকে, এতো নিখুঁত অভিনয় সুস্থ মস্তিষ্ক ছাড়া কারো হয়? আমি তো জানিনা অন্তত।
    রাতের বেলায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। কিকু সমানে ইট ছুঁড়ে মারছে আর মা-বাপ ধরে গাল দিচ্ছে। পরেরদিন আবার সে নির্বিকার, যেনো কিছুই ঘটেনি এমন ভঙ্গিতে বিড়ি টানছে। পাঁচ টাকা, দশ টাকার জন্যে আবার এর, ওর কাছে হাত পাতছে। সেই টাকা দিয়ে শক্তি ঘোষের দোকানে বসে চা খাচ্ছে, বিড়ি কিনছে, শক্তির সাথে নানান বিষয়ে আলাপ জুড়ে দিচ্ছে কিন্তু রাতের বেলায়?
    শক্তি ঘোষ নিজেই বেশ অদ্ভুত প্রকৃতির ছিল, কখনো তাকে হাসতে দেখিনি। গ্রামের অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি, সবার মুখে একই কথা, কেউ দেখেনি তাকে হাসতে। আমি অন্তত দশবারো বছর তাকে ওইরকম দেখেছি; ছোটখাটো শরীর, ছোট মাথা অথচ গলার স্বর আর মুখটি ভীষণ গম্ভীর। প্রয়োজনের বাহিরে সে নাকি নিজ বাবা-মা’য়ের সাথেও কথা বলেনি, এই কথা বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হয় না।

    তেঁতুলবাগান গ্রামের একবারে পশ্চিম দিকে, নামে তেঁতুলবাগান হলেও জঙ্গল বললেই তা যথার্থ হয়। সেই বাঁশবন, বুনো ডুমুর, বেলগাছ, বড় বড় শিমুলগাছ, আকাশ ছোঁয়া প্রকান্ড বটগাছের ডাল, কষাড় ঝোপ, মটরলতার ঝোপ, ভটি, সেঁউতি লতার জঙ্গল, এমন নিভৃত, নিরালা পরিবেশ বহুদূর কল্পনা জগতের মতো মনে হয়। সেইখানে শক্তি ঘোষের বাড়ি, আমাদের শিশুমনে তার গভীর ছাপ রেখেছিলো। গ্রামের অন্য সকলে যখন পথের ধারে গ্রামের মধ্যে বাড়ি করবার জন্যে উঠে পেড়ে লাগে, তখন শক্তি বাপের ভিটা বেচে সেই জঙ্গলে খালের পাড়ে বাড়ি করে বসলো, এই ঘটনায় সবাই ভেবে বসলো তার মাথা খারাপ হয়েছে। অথচ আজ এতো বছর পর টের পাই শক্তি ঘোষ ছিল নিঃসঙ্গ প্রিয় মানুষ। গাছপালা, গহীন অরণ্য, সবুজ বনভূমির সাথে ছিলো নিবিড় সম্পর্ক। এইসব প্রায় ত্রিশ পয়ত্রিশ বছরের আগের কথা, শক্তি ঘোষ তখন থেকে সেখানেই পড়ে আছে। এইসব তো ছেলেবেলার স্মৃতিকথা, মাঝখানে গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছি প্রায় বারো বছর। মাঝে মাঝে শুধু দিন কতক গিয়ে থেকেছি। গতবছর শীতের ছুটিতে পুরনো বন্ধুর নিমন্ত্রণে গাঁয়ে গেলাম, বন্ধুর বাড়িতেই উঠতে হলো কারণ ততদিনে আমাদের বাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিনত হয়েছে। জানালা খুলে পড়েছে, দরজা নেই, কেউ হয়তো খুলে নিয়ে গিয়েছে। ঘরের ভিতর ঘাসবন, হাঁটুসমান মাটি, ঝোপঝাড়, কত-শত সাপখোপের আড্ডা। বাড়ির পিছনে বড় বড় অশ্বত্থ গাছ বেড়ে উঠেছে। উঠোনের উপর আজুলি, বড়ই গাছ বড় হয়ে উঠোন ঢেকে ফেলেছে।
    শীতের মৌসুম আমার এমনিতেই বড় প্রিয় তার উপর এমন সময়ে গ্রামে এসে দারুণ লাগছে, আমাদের এই গ্রামের চারদিকে ঘন বন-জঙ্গল, পিটুল গাছ, তেঁতুলগাছ, শতশত বাঁশঝাড়, সেগুনবাগিচা, বহু পুরনো আম-কাঠালের বাগান। গ্রামের পূর্বদিকে ভাঙা মন্দির, সেই পথ ধরে সেগুন বাগিচা, এরপর একেবারে পুকুরপাড় ধরে হেঁটে গেলে পুরনো জমিদার বাড়ি, তেঁতুলবাগান আরও পশ্চিমের গভীর জঙ্গলে। সবখানে কুয়াশা নেমেছে বেশ, পথঘাটে, পুকুরে গাছে-গাছে, ঝোপেঝাড়ে।
    মনে হয় হাঁটতে হাঁটতে মেঘের উপর কোন রুপকথার দেশে চলে এসেছি। সেই ভাঙা মন্দির, জমিদার বাড়ি কুয়াশায় ঢেকে ফেলেছে। পুরনো আম-কাঠালের বাগানের তলায় কুয়াশা নেমেছে। শিমুল, সেগুনগাছের মাথায় কুয়াশা ভর করে আছে, এমন কুয়াশায় ভর করেছে যে আকাশ চোখে পড়ে না। আমি জমিদার বাড়ির গেটের সামনের সেগুন গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিলাম, সেগুনগাছের বড় বড় পাতায় কুয়াশা জমে আছে। সেই গাছের পাতার আড়ালে আকাশ কোথাও হারিয়ে গেছে, আমি তা অবাক হয়ে দেখেছি।
    পথের ধারে একটি কাঠগোলাপের গাছ থেকে কাঠ গোলাপের সৌরভ ভেসে আসছে, এমন সময়ে কুয়াশার ভেদ করে কে যেন সামনে এসে দাঁড়াল। ময়লা কালো চাদর দিয়ে কপাল, মুখ সম্পূর্ণ ঢেকে রেখেছে। আমায় বললো,
    “কে মুহিব নাকি? কোনদিন এলি ভাই?” আমি গলার স্বর শুনে মানুষটিকে চিনলাম, কিকু।
    – “আরে কিকু ভাই যে, তা কোত্থেকে এলে এই ভোরবেলায়? নামাজ পড়েছো নাকি, মসজিদে তো দেখিনি?”
    কিকু সেই কথার উত্তর করলো না, নতুন প্রসঙ্গ টেনে বললো, “কি শীত পড়েছে দেখো দেখি, ঠান্ডায় কি কষ্টই না করছি। গ্রামশুদ্ধ মানুষের কাছে একটি শীতের জামা চাইয়া অস্থির হয়ছি, বদমায়েশের দল একটি ছেঁড়া তেনা পর্যন্ত দিলো না, …. বাচ্চারা।”
    -“তোমার এমন ব্যবহারের জন্যে কেউ তোমায় কিচ্ছু দিতে চায় না, আগে ভালো ব্যবহার করতে শিখো বুঝলে?”
    কিকু ক্ষেপে গেল, অল্পতেই ক্ষেপে যাওয়া তার পুরনো রোগ। তুমি থেকে সে এইবার তুই সম্বোধন করে বলা শুরু করলো,“ তুই নিজে ভালো নাকি, হ্যাঁঁ? মাইনষের গাছের কত ফল চুরি কইরা বাড়িত নিয়া গেলি, আমার মনে নাই বুঝি। চোর জানি কোনহানকার।”
    আমি হেসে পেয়ে গেল, কিকু বদলায়নি একটুও। মানিব্যাগ খুলে একটি নোট এগিয়ে দিলাম, ”শীতের কাপড় কিনে নিও, শীতে আর কষ্ট করতে হবে না”, বলেই বাড়ির পথে হাঁটা ধরলাম। সম্ভবত কিকুর মন গলে গেল। পেছন থেকে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো, “কয়দিন থাকবিরে মুহিব? আজ দুপুর বেলায় তেঁতুল নিয়া যামুনে, পাকা তেঁতুল, মনে পড়ে সেই তেঁতুলবাগানের কথা?”
    আমি বললাম, “সে এনো, ভুলিনি কিছুই।”
    দুপুরে সে আর আসেনি, জানতাম আসবে না। কিকু কথার রাখার লোক নয়, তবুও অপেক্ষা করেছিলাম কেন যেন। এরপর তার খোঁজ নেই, পনেরো বিশ দিন এইভাবেই কেটে গেল। তার পর একদিন হঠাৎ দেখলাম পুকুর পাড় ধরে মন্দিরের দিকে হেঁটে যাচ্ছে, সারাপথে ওপাড়ার কবিরাজকে মা-বাপ ধরে গালি দিচ্ছিলো। কবিরাজ বেচারা গ্রামের সম্মানিত মানুষ, পুকুরে গোসল করতে নেমেছিলো। পুকুরভর্তি ছোটছোট ছেলে মেয়ে, অন্যসব বয়সের মানুষ। বেচারা লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেছে, গালমন্দ শুনে বেচারা পানিতে লম্বা-লম্বা ডুব লাগাচ্ছে। ওইদিকে কিকু আরও এক কাঠি সরস, ডুব শেষে উঠতেই গালমন্দ শুরু করছে আবার ডুব দিতেই গালমন্দ বন্ধ করে অপেক্ষা করছে। হাসির রোল পড়ে গেল চারদিকে, ছোটছোট ছেলেমেয়ে সব হাত-পা ছুঁড়ে হাসাহাসি করছে। এমন কান্ডে না হেসে থাকা যায় না, আমি নিজেও মুখটিপে হাসছিলাম। কিকু যে শুধু গালমন্দ করে বেড়াতো তা নয়। কারো হয়তো সন্তান হবে, অবস্থা ভালো নয়। রাতদুপুর কেউ নেই, কিকু সঙ্গে করে সদর পর্যন্ত যাবে। কারো বাছুর হারিয়ে গেছে, সারাগ্রাম তন্নতন্ন করেও খোঁজ পাওয়া যায়নি ,কিকু তা এনে দেবে।
    আর যদি গ্রামে কারো বিয়ে ঠিক হয় তো কথাই নেই। ভূতের মতো খাটবে, কাঠ কেটে আনবে, উঠানে পর্দা টানিয়ে দিবে। সারাক্ষণ একে, ওকে ধমকাধমকি করবে, নিজ দায়িত্বে সবকাজের তদারকিতে লেগে যাবে। এই ছিল আমাদের কিকু।

    আরও চার বছর কেটে গেল, শহুরে জীবনে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছি। ঘরে-বাহিরে, বাসা, অফিস করে জীবন অসহনীয় হয়ে পড়েছে। আবার ছুটে গেলাম গ্রামে। বর্ষাকাল তখন, একঘেয়ে বৃষ্টি হচ্ছে সারাদিন। গ্রামের বন-জঙ্গল কেটে মানুষ ঘর তোলা শুরু করেছে, পাকা রাস্তা হয়েছে। পুরনো মসজিদ ভেঙে নতুন মসজিদ তৈরি করা হচ্ছে, জমিদার বাড়িতে পুরনো রঙ মুছে নতুন রঙ করা হয়েছে। আমার এইবার ভালো লাগলো না, চিরচেনা শৈশবের সেই গ্রাম হারিয়ে যেতে দেখে মন ভেঙে গেল। এইবার গেলে হয়তো ফিরে আসা হবে না, যার জন্য ফিরে আসা সেসব তো আর থাকছে না। আমাদের পুরনো বাড়ি দেখতে গিয়েছি একদিন দুপুরবেলায়, মাথার উপর অপূর্ব নীল আকাশ, আকাশপথে মেঘেদের মেলা। অন্যসব দিনে এমন মেঘ তন্নতন্ন করে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমার মনে হলো আকাশের কোন গোপন পথ হঠাৎ উন্মোচিত হয়ে গেছে। উঠানে জঙ্গলের মাঝে এইদিক, সেইদিক হাঁটছি হঠাৎ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমে এলো। সাদা আকাশ কালো মেঘে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে, বাড়ির পিছনের বড় বড় অশ্বত্থ গাছের মাথার উপর সে কী মেঘ! আমি ভেবে পেলাম না, এমন রৌদ্রজ্বল দিনে কী করে এমন বৃষ্টি নেমে এলো? বর্ষাকাল বোধহয় একেই বলে।
    আমি ভাঙা ঘরের নিচে আশ্রয় নিতে দাঁড়ালাম, ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির শব্দ শুনছিলাম। সেই বৃষ্টির শব্দে আমায় নিয়ে গেল ফেলে আসা জীবনে, ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল ভীষণ। এইতো সেই ঘর যেখানে সন্ধ্যার অন্ধকারে প্রদীপ জ্বালিয়ে আমরা পড়তে বসতাম, অ, অা শব্দে সন্ধ্যার আকাশ ভারি হয়ে যেতো। বাবা উঠানে চেয়ার পেতে বাতাস গায়ে লাগাতেন, মাঝে মাঝে দু’একজন বাবার বন্ধু এসে গল্প জুড়তেন। আমরা পড়ার ভান করে সেইদিকে কান পেতে থাকতাম। মা রান্না ঘরে রাতের খাবার তৈরি করছেন, উনুনের আগুন মুখ লাল হয়ে উঠতো।
    বৃষ্টির দিনে এই উঠানে কত গড়াগড়ি খেয়েছি, ফুটবল খেলেছি। বাড়ির পিছনের বাগানে জোনাকি, পিকু, সেতু, মিলি, মন্টু, মিলে কত লুকোচুরি খেলেছি, আহা। সেসব স্মৃতি আজ মনের গভীরে লুকোচুরি খেলছে আমায় নিয়ে।

    ছুটি শেষ হয়ে এসেছে, আর অল্প ক’দিন থাকবো। এমন সময়ে একদিন খবর এলো তেঁতুলবাগানে কার লাশ পাওয়া গেছে, বহুবছর আগেও একবার এমন লাশ পাওয়া গিয়েছিলো। গ্রামের মানুষ বলছে ভূতে মেরেছে, আবার কেউ বলছে হয়তো শত্রুতা বশত কেউ মেরে দিয়ে গেল। বৃষ্টির জল মাথায় করে দেখতে গেলাম, ততক্ষণে তেঁতুলবাগানের চিরচেনা শূন্যতা মানুষ পূর্ণ করে ফেলেছে। খবর পেয়ে পুলিশ ছুটে এসেছে। পুলিশ ভীড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, সব বয়সের লোক ভীড় করে আছে। কেউ কেউ বাচ্চা কোলে করে ঘটনা কী ঘটেছে দেখতে এসেছে। তেঁতুল বাগানের সেই পুরনো বাড়ির সিঁড়ির উপরে লাশ, ভীড় ঠেলে দেখতে গেলাম। যা দেখলাম তাতে মনে হলো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। আর কেউ নয়, কিকু মরে পড়ে আছে। উপরের সারির দাঁত দুটি ভাঙা, নাক থেকে রক্ত বের হচ্ছে তখনো। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে, মুখের চারিপাশে একদল মাছি ঘুরঘুর করছে। আমি গভীর শোক অনুভব করলাম। মাথা ধরে গেল, এমন একটি দিন আসবে কল্পনায় ভাবতে পারিনি। চারদিকে চেয়ে দেখলাম কোন কান্নার শব্দ নেই, কোন মলিন মুখ নেই। সবার মুখে শুধু কৌতূহল, অথচ মৃত্যু মানেই যে কান্না, শোক, দুঃখী-দুঃখী মানুষের চেহারা, হাহাকার, প্রিয়জনদের আর্তনাদ। একজনের বেলায় এক নিয়ম আরেকজনের বেলায় অন্য নিয়ম কেনো? এইবার যতদিন ছিলাম কিকুর সাথে দেখা হয়নি, গত বছর বর্ষায় যখন এসেছিলাম তখন দেখেছি শুধু। পুকুরপাড়ে শাপলা তুলছিলো, আমায় দেখে হেসে বললো,“ তুই দেখি বুইড়া হইয়া গেলি, চুল সাদা হয়ছে। কত ছোট তোরে দেখলাম? আমাগোরে দেখ, এখনো জোয়ান আছি।”
    সত্যিই মনে হয় কিকুর বয়স বাড়েনি। চুল পাকেনি, শরীর আগে যা ছিলো এখনো তাই আছে।
    শুধু মুখের চামড়ায় একটু যা ভাঁজ পড়েছে। আমি বললাম, “এইসব রাখো, কিছু খেয়েছে? দুপুরবেলায় এস তবে জোনাকিদের বাড়ি, আমি ওখানেই উঠেছি।”
    -“দেহি, সময় হইলে যাইতে পারি, আমার তো আবার মেলা কাম।”
    -“ তোমার আবার কিসের কাজ, যতসব বাজে বকুনি। যেও, আমি চললাম।”
    -ওই বুইড়া বেডা, তৈঁতুল খাবি, তেঁতুল?
    – “তা এনো।”
    কিকুর হয়তে ধারণা হয়েছিল তেঁতুল আমার প্রিয় খাদ্য, সেই ছোট বেলায় দেখেছিলো যে। অথচ তেঁতুল এখন মুখে দিতে পারি না, মুখ থেকে ফিরে আসে। আজ কিকু নেই, বহুদূর চেনা জগতের বাহির চলে গেছে। কে এমন হৃদয়হীন, এত নিষ্ঠুর হলো যে কিকুকে মারতে হাঁত কাপলো না?
    কিকুর কেউ নেই, কেউ চোখের জল ফেলছে না ভেবে ভীষণ মন খারাপ হলো। আর থাকা যায় না, আমি ফিরে আসছি, হঠাৎ ভীড়ের মধ্যে শক্তি ঘোষকে দেখতে পেলাম। এমন কিছু দেখলাম যাতে মন কিছুটা শান্ত হলো। শক্তি ঘোষের সেই গম্ভীর, শুকনো মুখে জল দেখতে পেলাম। কান্নার কোন শব্দ নেই, একদৃষ্টিতে দূর থেকে কিকুর লাশে দিকে চেয়ে সে কাঁদছে। কাঁদবে না কেন, কিকুর মত করে শক্তি ঘোষ সে নিজেও যে বেশ একা ছিলো। এই বন-জঙ্গলে, গাছপালার মাঝে কিকুই যে তার একমাত্র সঙ্গী। দু’জন নিজেদের নিঃসঙ্গতার সঙ্গী, নিরবতার সঙ্গী। বিশ, পঁচিশ ধরে সুখে, দুঃখে, হাসি, কান্নাই কিকুই যে ছিলো, আর কেউ নয়। তেঁতুলবাগানের গাছের ডালে হাওয়া লেগে কেঁপে উঠছে, বৃষ্টি আবার নেমে এলো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নেমে হল, আমি ফিরে এলাম।

    আরও ছয়, সাত বছর কেটে গেল, আর গ্রামে যাওয়া হয়নি আমার। মাঝখানে খবর পেয়েছি তেঁতুলবাগানের জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করা হচ্ছে, পুরনো সেই বাড়িতে কাজ শুরু হয়েছে নতুন করে। শক্তি ঘোষ মারা গেছে। এক সন্ধ্যেবেলায় হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে মরে পড়েছিলো, অন্তত দু’দিন মৃত অবস্থায় ওইভাবেই ছিলো। তারপর হাসান মাঝি কী করে দেখতে পেয়ে গ্রামে খবর পৌঁছায়। পুরনো আমলের সেই সেগুনবাগিচার গাছগুলো কেটে বিক্রি করা হয়ে গেছে, গ্রাম জুড়ে বড় বড় দালান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। আমি গ্রামে যাওয়ার ব্যাপারে আর আগ্রহ বোধ করিনি, কেন যাব? ছেলেবেলার সেই গ্রাম তো আর নেই, আর সেই তেঁতুলনবাগান, আম-কাঠালের ঘনবন, মন্ডল গাছের তলা? সেসব তো কেবল কল্পনা মনে হয় আমার। কি হবে সেখানে গিয়ে? যেখানে কিকু নেই, শক্তি ঘোষ নেই। ছায়াঘেরা নিবিড় সেই বনরাজির মাঝে সেই গ্রাম নেই, আমার সেই ছেলেবেলা নেই। মাঝে মাঝে কিকুর হাসিমুখটি মনে পড়লে ভীষণ কষ্ট হয়, মনে হয় সবকিছু সত্যিই আজ যেন রুপকথা!

    –রুপকথা।

    5
    3 Comments

Friends

Profile Photo
Drako Shajib
@drako
Profile Photo
Akash-Talukder-Akash
@akash-talukder-akash
Profile Photo
ইভান
@ivan
Profile Photo
Halima-Moly
@halima-moly
Profile Photo
Sumon Hawlader
@sumontoulot
Profile Photo
Anjuman-Ara-Ankhi
@anjuman-ara-ankhi
Profile Photo
Mohammad-Mamun-Hossen
@mohammad-mamun-hossen
Skip to toolbar