-
চড়ুই মামা//
ছেলেবালায় আমরা ছোট্ট একটা পাহাড়ি শহরে থাকতাম। শহরটার নাম চন্দ্রঘোনা। পাহাড়ের গায়ে গায়ে সুন্দর পিচঢলা পথ; চুড়ায় চুড়ায় বাংলো-বাড়ি; আর লম্বা ট্রেইল জুড়ে বিশাল কলোনি। এখানেই চাঁদের মতো বাঁক নিয়ে সমতলের দিকে ছুটে গেছে খরশ্রোতা কর্নফুলি।
এমন শান্ত, গম্ভির শহর পৃথিবীর কোথাও দেখি নাই। এই শহরে পাবলিক বাস বা রিক্সা চলে না। সকাল বেলায় দলবেঁধে হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতাম। আমাদের সঙ্গে পথ চলতো পেপার ও রেওয়ান মিলের হাজারো শ্রমিক।
ছোট্ট শহরটায় সবাই সবাইকে চিনতাম, আর আনন্দ করতাম ভূবনহারা। আমরা যখন সেভেন/ এইটে পড়ি, এখানে নতুন একটা পরিবার দেখি; ওদের এক ছেলে, এক মেয়ে—আমাদের বয়সি। কিংবা ওরা হয়তো ডর্মেটরিতে থাকতো—আগে চোখে পড়ে নাই।
আমরা যখন স্কুলে যেতাম, ওরা বাসার বাউন্ডারি ওয়ালের উপর পা ঝুলিয়ে বসে থেকে তুত-ফল খেতো। ওরা ভিষণ ফর্সা আর সোনালি চুলের। আমরা উৎসুক হয়ে জানতে চাই—তোমরা স্কুলে যাও না?
ওরা বলে—না। আমরা বাসায় পাপার কাছে পড়ি।
কি পড়?
ইংরেজি, বাংলা দুটোই; অংকও শিখি।
তোমাদের বই আছে?
পাপার কাছে দুইটা বই আছে—ওল্ড টেস্টামেন্ট আর অরিজিন অফ স্পিসেস। বাকি পড়া পাপা শিখায়।
বাসায় ফিরে ওদের সম্পর্কে জানতে চাই। মা বলে—ও; ইলারুস সাহেবের বাচ্চাদের কথা বলতেছিস? ইলারুস সাহেব নামকরা ক্যামিস্ট। ওরাতো এংলো; ইংল্যান্ড থেকে এসে এদেশে থেকে গেছে। ওদের বাড়ি ফিরিঙ্গি বাজারে। আমি হাসতে হাসতে বলি—মা জানো, ওরা দাঁত মাজে না!
মা হাসে—মাজে। ওদের দাঁত হলদেটে।
অল্প দিনেই ওদের সাথে ভাব হয়ে যায়। রিকি খুব চাল্লু। ডেসি শান্ত টাইপের মেয়ে; মায়ের সাথে আখক্ষেতে কাজ করে। ওদের বাবা মাথায় হ্যাট পড়ে; ঠোটে চুরুট ঝুলে থাকে। টিনের ছোট্ট বোতল থেকে চুকচুক করে মদ খায়। ওদের মা নানা রকম কেক বানাতে জানে। আমরা গেলে হাঁক ছেড়ে বলে—মারিয়া, বাচ্চাদে কেক খেতে দাও; কয়েকটা স্টবেরিও দিয়ো। আমাদেরকে বলে—হাই বেবিস, কল থেকে পা ধুয়ে ঘরে ঢুকো।
আমরা তখন মোটেই বেবি নই; ক্লাস এইটে উঠে গেছি। স্টবেরিগুলো পকেটে নিয়ে রিকির সাথে বেরিয়ে পড়ি। ডেসি যখন ‘হাই’ বলে হলুদ দাঁত বের করে জানতে চায়—তোমরা কি সিতা-পাহাড়ে যাচ্ছো?—আমাদের মন ভরে যার; আর প্যান্টের ভিতরে নুনুটা তিড়িং করে লাফিয়ে ওঠে। আখক্ষেত থেকে ওদের মা বলে—তোমরা পাহাড়ের বেশি ভিতরে ঢুকবে না; পথ হারিয়ে ফেলবে…। রিকি বলে—দোন্ট ওরি, মারিয়া; আই এম এনাফ এডাল্ট।
আমরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি—মাকে তোমরা নাম ধরে ডাকো?
হ্যাঁ। প্রতিটি মানুষ আলাদা ব্যক্তিত্ব; পাপাকে ইলারুস বলে ডাকি।
যেতে যেতে কয়েকটা বন-মোরগ দেখি। রিকি পকেট থেকে গুলতি বের করে এক-মারে একটা মোরগ ফেলে দিয়ে বলে—যাও, যাও; খপ করে ধরে ফেলো।
অন্য মোরগগুলো উড়ে যায়। আহতটাকে ধরে এনে বলি—তোমার হাতে এতো এইম!
রিকি যে পাহাড়ের এতোকিছু চেনে, বুনো গাছ, লতা পাতা, পাখ-পাখালির নাম—অবাক হয়ে যাই। রিকি বলে—ছুটির দিনে ছোটবেলা থেকে আমরা ফুল-ফ্যামিলি ট্রেকিং করি; তোমরা যাওনি কখনো?
রিকির সাথে বনে ঘুরার নেশা হয়ে গেছিলো আমাদের। ও-ই আমাদের চড়ুই মামার কাছে নিয়ে যায়। কোনো এক ছুটির দুপুরে আমরা মিথিঙ্গা ছড়ি পেরিয়ে সিতা-পাহাড়ের ট্রেইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা টিলার উপর উঠে আসি। তাকিয়ে দেখি, চারদিকে গিরিসৃঙ্গ! কর্নফুলি যেনো বনোমধ্যে লুকিয়ে থাকা রূপালি সরু চাঁদ। চন্দ্রঘনা শহরটাকে বহুদূরের অচেনা লোকালয় মনে হয়। আমরা প্রানভরে শ্বাস নিয়ে বলে উঠি—আহা, ওহো; কি সুন্দর! কি নির্মল নীলাকাশ; কি সবুজ, কি গম্ভির…!6 Comments
Friends
MD.Mazharul Islam Ripon
@md-mazharulislamripon
Tanjina Talukder
@tanjinatalukder
Zakir Hossan
@zakirhossan
Mikdad Hossain
@mikdadhossain
সামিরা হিমু
@himu56
Md Al Maun
@mdalmaun
Mst. Hena Parvin
@mst-henaparvin
Mohammad Rahman
@mohammadrahman
Rakib Hossain mahadi
@rakibhossainmahadi



চন্দ্রঘোনার বর্ণনা পড়তে পড়তে চোখের সামনে একের পর এক জীবন্ত ছবি ফুটে উঠল… রিকি আর ডেসির পরিবারের অদ্ভুত সরলতা আর স্বাধীনতার… এই আলোয় নিজের ছেলেবেলাটাও একটু উঁকি দিয়ে গেল… 💙