-
“শেষ দেখা”
– পি কে সরকার
মশারির মধ্যে সবিতার লাশ। প্রতিবেশী, আত্মীয় পরিজন শেষ দেখা দেখতে আসছে। একে একে আসছে মাতম করছ আর একটু পরে পাশে সরে গিয়ে স্মৃতিচারণ করছে।
সুন্দর সাজানো গোছানো সংসার সান আর সবিতার। দুই কন্যা আর এক পুত্র সন্তান নিয়ে সুখের সংসার।
রামচন্দ্রপুর গ্রামখানি ছবির মত সুন্দর। সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিম বঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর এপারে বাংলাদেশের দিনাজপুর। এই গ্রামেই সবিতার সুখের স্বর্গ।
হঠাৎ শনির সাড়ে সাতি তার সুখের স্বর্গে। তাই লোকে বলে জমিই যম বেঁচে কর কম। বেশি দিন সুখ সবিতার কপালে সইলো না।
জমি সংক্রান্ত জটিলতায় জীবন বিষিয়ে উঠলো। পিছে পরা সম্প্রদায়ের হওয়ার কারণে পেরে উঠছিল না। দূর্বলের দিকে সবলের কুদৃষ্টি সৃষ্টি লগ্ন থেকেই চলমান। হায়েনার কুদৃষ্টি পড়ে বেঁচে থাকার অবলম্বন আবাদি জমির উপর। দিন কাঁটে ভয়ে ভয়ে কখন জানি অনিষ্ট হয়?
সবিতার আত্মচিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে আসলো। কি হয়েছে? সে কেঁদেই চলেছে। কিছুই বলতে পারছে না। শুধু বলে চলেছে আমি এখন কি করব? এই ছোট ছোট সন্তানদের কিভাবে বড় করব?
পাশ থেকে কে যেনো বলে উঠলো, তার স্বামীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ বলছে তাকে গুম করা হয়েছে। কেউ বলছে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু আসলে কি হয়েছে কেউ সঠিক বলতে পারছে না।
বড় মেয়ে তনু ছোট ভাই বোনদের বুকে জড়িয়ে ফুঁপিয় ফুঁপিয়ে উঠছে। সানা আর দিপেন কিছুই বোঝছে না। মা দিদি কাঁদছে তাই তারাও কাঁদছে।
একটা সময় চোখের অশ্রু শুকিয়ে আছে। কিন্তু সান আর ফিরে না। অনেক কষ্টে দিন কাঁটতেছে তাদের। মেয়ে হয়েও সে অন্যের জমিতে ঘাম ঝরায় অর্থের বিনিময়ে। ছোট ছোট মুখে খাবার দিতে হবে যে। কিন্তু পুরুষ শাসিত সমাজ মেয়েদের সঠিক পারিশ্রমিক
দেয় না। দুষ্কৃতিকারীরা কিছু দিন পরে জামিনে বেরিয়ে এসে বুক ফুলিয়ে চলে। সবিতা কাউকে আর দায়ি করে না। যেখানে প্রকৃতিই গরীবদের ছাড় দেয়না সেখানে মানুষের কাছে আশা করা বোকামি ছাড়া আর কি! ঝড়ে সবার আগে গরীবের কুঁড়েঘর উড়ে।
অনেক কষ্টে ছেলে মেয়েদের বড় করলো। মেয়ে দু’টির বিয়ে দিয়ে নিজেকে আরো একা একা লাগছে। একটা সময় ছেলেও বিয়ে করে ঘরে বউ আনলো। সবিতা এখন ছেলে বউয়ের চোখের বালি। জীর্ণ শীর্ণ দেহ আর আগের মত ঘাম ঝরাতে পারেনা। নিজে না খেয়ে যে ছেলেকে খাওয়ালো, বড় করলো, বিয়ে দিল, তাদের কাছে এখন সে আবর্জনা। সে আর ভাবতেও পারে না, কেনো মরণও হয় না! কি সুখ এ বেঁচে থাকাতে!
এতটুকু পেট কতটুকু খায়! তবু না খাটলে খাওয়া হয় না। কুঁজো তনু খানি অন্যের ধান কাটানোর কাজে ব্যস্ত। একটু পর পর বসছে। আবার কাটছে, আবার বসছে।
কাকিমা, এই শরীরে কাজে আসছেন কেনো? কি করমু বাপু? পেটে যে খায় গা।
আমি আর কিছু বলার সাহস পেলাম না।
নিজেই ঠিক ঠাক চলতে পারে না। তবু নাতিকে কোলে করে চলে। অল্প সময় পর পর বসে পড়ে। চোখে না বলা অনেক কথা।
তবু কেনো এই বেঁচে থাকা!
একটু শান্তির আশায় ছোট মেয়ের বাড়ি যায়। শরীরে কোনো জোর বল পায়নে। হারানো স্বামীর পথে চেয়ে আজও বুকটা হাহাকার করে উঠে। কোথা গেলে পাবো তারে? শেষ দেখা দেখে মরতে চাই। এ আশা কি পূরণ হবে? নির্বাক সবিতা মনে মনে হাজারো প্রশ্ন করে গগন পানে চেয়ে।
প্রভাত সময়ে দিপেনের মোবাইলটা বেজেই যাচ্ছে। কিন্তু কেউ তুলছে না। সানার স্বামী ফোন করেই যাচ্ছে। অগত্যা প্রতিবেশীর মোবাইলে কল দিল।
এপাশ থেকে কানু বলে, ” হ্যালো, এত সকাল সকাল তোমার কল। বাবা জামাই, কোনো সমস্যা।”
ওপাশ থেকে সানার স্বামী বলে, ” কাকা, মা আর নেই বলেই। হু হু করে কেঁদে উঠলো।” সে আর কিছুই বলতে পারলো না। কানু কাকাও তার কান্না চেপে রাখতে পালো না।
সবিতাকে আজ চির শান্তির নিদ্রায় পেয়েছে। আর পেট খেতে চাইবে না। স্বামীর জন্য মন হাহাকার করবেনা।8 Comments
পি কে সরকার
“পি.কে. সরকার — শব্দের ভেতর মানবতা ও সমাজের গভীরতম সত্য খুঁজে চলা এক সমকালীন বাংলা লেখক।”
Friends
মোঃ মাহফুজুর রহমান
@nnxnsnmfkfkkgmail-com
মো: নাজমুল আখতার
@faith
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
Kazi Fahim hossin
@fahim6542
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নাদিম হোসাইন
@nadim-hossain
Latifur-rahman-Pramanik
@latifur-rahman-pramanik
afrida-jahar
@afrida-jahar
আমীর হামজা (লাম)
@amit



অপূর্ব