-
প্রিয় তুহিন,
আজ তোমার বড় ছেলের রেজাল্ট দিয়েছে।
যেদিন থেকে রেজাল্টের তারিখ ঘোষণা করেছে, সেদিন থেকেই আমি অসুস্থ হয়ে গেছি।বারবার শুধু মনে হচ্ছিলো , তুমি থাকলে আমার এমন দুঃশ্চিতা হতো না।
তুমি থাকলে রেহান ঠিক মতো পড়াশোনা করতো।
তুমি থাকলে আমাকে সাহস দিতে। অসুস্থ
হবো নাই বা কেন বল?তার পুরো এইচএসসি জার্নিতে সে একনাগারে ১৫ মিনিট ও পড়াশোনা করে নাই। এইচএসসি ভর্তির ৬/৭ মাস পরে একদিন এসে বলে কি জানো?- সে কলেজ পরিবর্তন করবে।
আমার মাথা গেলো গরম হয়ে, বললাম- আমি বাসায় এসে যেন দেখি, তুমি সব বই পত্র তোমার রুমের বাহিরে রেখে দিয়েছো। তোমাকে আর পড়াশোনা করতে হবে না। যেহেতু পড়াশোনা করবে না, তাই ১৮ বছর পর্যন্ত আমি তোমার খরচ দিবো।এরপর নিজের পথ নিজে বেছে নিবে।
অফিস থেকে এসে দেখি বই পত্র ঘরেই আছে, এই প্রসঙ্গে আর কখনো কথা বলি নাই।
এরপর ১ম বর্ষ থেকে ২য় বর্ষে উঠার আগে এমন বিতিকিচ্ছিরি রেজাল্ট করলো এবং সে রেজাল্ট ও আমাকে জানায় নাই।কলেজ থেকে ওর শিক্ষক ফোন দিয়ে জানালো। বাসায় এসে লুব্ধক , মাহিন সহ ওর সাথে মিটিং এ বসলাম। জানতে চাইলাম এমন রেজাল্ট এর পরে ওর বক্তব্য কি?উত্তর দিলো- সাইন্স বুঝি না/ ভালো লাগে না, সাইন্স নিয়ে পড়বো না। (গাধার গাধা! সাইন্স ছাড়া কিছু হয় রে!
আর আমি তো রেহানকে সাইন্স নিতে বলি নাই, নিজের ইচ্ছায় নাচতে নাচতে নিয়েছে।
আমি সারাজীবন সাইন্স নিয়ে পড়াশোনা করেছি, তবু্ও ওকে ভুলেও বলি নাই সাইন্স নিতে।আমি ওমন মা নই যে, জোর করে চাপিয়ে দিবো)লুব্ধক , মাহিন উত্তর দিলো- ওতো ১ম বর্ষের পড়াই শেষ করতে পারে নাই, কিভাবে ২য় বর্ষে র পড়া পড়বে? ওকে আবার রেজিষ্ট্রেশন করে আর্টস এ ভর্তি করে দেও।
লুব্ধককে বললাম- ওর শিক্ষকের সাথে কথা বল।
উনি বললেন- নাহ্, এটা করার দরকার নাই ও পারবে। ওর যেকোনো প্রয়োজন এ আমি ওর পাশে আছি।আমি চির কৃতজ্ঞ ওনার কাছে, এভাবে আমার ছেলেকে সাহস দেওয়ার জন্য।তোমার ছেলেও বললো- সে পারবে। যথারীতি ২/১ দিন পড়লো, তারপর আবার যেই লাউ সেই কদু।
তাছাড়া সারাবছর ধরে কলেজে চলে মারামারি। আমি অফিসে বসে সংবাদ পাই, প্রচন্ড মারামারি হচ্ছে কলেজে।
অশান্তি , অশান্তি।তোমার ছেলেতো তোমার কাছ থেকে ২৩ টা জিন পেয়েছে , আর আমার কাছ থেকে ২৩ টা। কিন্তু আমার জিন গুলোর কোন বৈশিষ্ট্য তোমার ছেলের মধ্যে নেই, তোমার সব বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেড়ে উঠছে সে।
তাই কোথাও মারামারি গন্ডগোল হলে সে ছুটে যায় সাহায্যকারী হিসেবে। বলতে পারো পুরো কলেজ জীবন কেটেছে আহত বন্ধুদের নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করে।
পরীক্ষা সামনে আর সে গভীর রাতে ছুটছে অপরিচিত কাউকে রক্ত দিতে।যেহেতু আমি রাতে একা যেতে দিবো না, তাই সাথে করে আমাকেও নিয়ে গেছে।
পরীক্ষা যত এগিয়ে আসতে থাকলো আমার ভয় তত বাড়তে থাকলো। বাসায় রেখে যাই, কিন্তু বাসায় থাকে না।
ওর পড়াশোনার ধরন দেখলে , অসুস্থ মানুষও সুস্থ হয়ে দুই চার ঘা লাগিয়ে দিয়ে আবার বিছানায় যেয়ে শুয়ে পরবে।কিন্তু আমি তোমার পুত্রকে কিছু ই বলি নাই, নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছিলাম।
অবশেষে পরীক্ষার দিন চলে আসলো।প্রতিটি পরীক্ষায় আমি নিয়ে যেতাম, সারা রাস্তা আল্লাহকে ডাকতে ডাকতে। আর উনি বিনদাস ভাবে যেত। ওর বন্ধুরা ওকে দেখে বলতো – কি রে, তোর টেনশন হচ্ছে না!? ও বলতো- কিসের টেনশন(একদম তোমার মতো করে বলতো)?
প্রিয় তুহিন,
পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় শুধু একটা কথাই তোমার ছেলেকে বলেছিলাম, বরাবরের মতো – পরীক্ষার খাতা সাদা জমা দেও কোন সমস্যা নেই, কিন্তু কোন অনৈতিক পন্থা অনুসরণ করবেনা। তোমার ফেল করাটা আমি গ্রহণ করবো, কিন্তু অনৈতিক ভাবে ভালো রেজাল্টকে নয়।
এমন কিছু করবে না, যেন নিজের কাছেই সারাজীবন ছোট হয়ে যাও।প্রিয় তুহিন,
বাবা ছাড়া এই বয়সের একজন ছেলেকে সঠিকভাবে মানুষ করা যে, কত কঠিন, সেটা আমি প্রতি নিয়ত অনুভব করছি।
আমার টাকা পয়সা নেই, আমার মাথার উপর তুমি নেই, বাবা-মা , শশুড় -শাশুড়ী কেউ নেই।
ওদেরকে শাসন করা, আদর করার জন্যও কেউ নেই, এই বয়সে যেটা খুব জরুরী।
আল্লাহ এর মধ্যে ই ভালো কিছু রেখেছেন আমাদের জন্য,আমার বিশ্বাস।
অবশেষে আজ রেজাল্ট এর দিন।অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাসায় থাকলাম।কারণ যত সাহসী ই হোক না কেন এই সময়ে বাবা- মাকে পাশে থাকা জরুরী।
তাই আমিই মা, আমিই বাবা হয়ে ওর পাশে থাকলাম।
আলহামদুলিল্লাহ তোমার ছেলে পাস করেছে।
আলহামদুলিল্লাহ। সে A+ পায় নি, A পেয়েছে।
এটাই আমার কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি।
গতকাল ভেবেছিলাম তোমার ছেলেকে বলবো-I accept you, as you are. Unconditionally I love you my dear Rehan.
মুখে না বললেও , বহুবার মনে মনে বলেছি।
আল্লাহ আমার সন্তানদেরকে আমার চক্ষু শীতলকারী করুন, আমিন।
আজ এই মুহূর্তে আমি এবং তোমার ছেলে (যদিও প্রকাশ করে না) তোমাকে প্রচন্ডভাবে অনুভব করছি।
আল্লাহ তোমাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুণ , আমিন।ইতি
তোমার হেনা
১৬/১০/২৫2 Comments
Friends
naznin shamim
@nazninshamim
Md Mofiz
@mdmofiz
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
wajibad
@wajibad
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
সুবহা জাহান
@subhajahan
Intisar Jabed
@intisarjabed
মেঘ
@megh
রোদেলা শিশির
@rodelashishir


একটি মর্মস্পর্শী চিঠি।