-
বৃষ্টির ধারাগুলো যেন রাতের শহরটাকে ধুয়ে মুছে অচেনা করে দিয়েছিল।
কালো আর্মার্ড এসইউভিটা সদর দপ্তরের ভূগর্ভস্থ গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে আসতেই পেছনে ধাতব দরজাটা শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল। গাড়ির ভেতরে কেউ কথা বলছিল না।
শুধু ইঞ্জিনের গর্জন আর রেডিওর ক্ষীণ স্ট্যাটিক শব্দ।
স্টিয়ারিংয়ে জাহিদ। পাশে বসে আরিয়ান। পেছনের সিটে ড্রাভি তার রাইফেল পরীক্ষা করছিল।
তাসনিম তাদের সঙ্গে নেই। সে সদর দপ্তরের সাব-লেভেল ৩-এর অপারেশন্স রুম থেকে পুরো মিশন পরিচালনা করবে।
হঠাৎ হেডসেটে তার কণ্ঠ ভেসে এল—
“আরিয়ান, শুনতে পাচ্ছ?”
“ক্লিয়ার।”
“আমাদের একটা সমস্যা হয়েছে।”
আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কী ধরনের?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতার পর তাসনিম বলল, “তোমাদের গাড়ির সিগন্যাল আমি পাচ্ছি না।”
জাহিদ সঙ্গে সঙ্গে স্পিড কমিয়ে দিল।
“মানে?”
“মানে কেউ তোমাদের সিগন্যাল জ্যাম করছে। কিন্তু এটা সাধারণ জ্যামার নয়।”
আরিয়ান জানালার বাইরে তাকাল।
বৃষ্টির পর্দার ওপারে রাস্তার দুপাশ অন্ধকার। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকে গাছপালা আর পরিত্যক্ত ভবনগুলো দেখা যাচ্ছে।
“কতটা দূর?”
“বাঙ্কার থেকে প্রায় তেইশ কিলোমিটার।”
“কেউ আমাদের ট্র্যাক করছে?”
তাসনিম এবার নিচু গলায় বলল—
“না। তার থেকেও খারাপ। কেউ আমাদের রাস্তা বদলাতে বাধ্য করছে।”
আরিয়ান ম্যাপের দিকে তাকাল।
“ব্যাখ্যা করো।”
“তোমাদের সামনে যে রাস্তা আছে, সেটাই একমাত্র সক্রিয় রুট হিসেবে দেখাচ্ছে। কিন্তু আমি স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখতে পাচ্ছি, রাস্তার দুটো ব্রিজ দশ মিনিট আগে ধ্বংস হয়েছে।”
জাহিদ ব্রেক চাপল।
গাড়ি কাদার ওপর সামান্য পিছলে থেমে গেল।
ড্রাভি সামনে ঝুঁকে তাকাল।
“তাহলে আমরা যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি সেটা—”
“ভুয়া,” আরিয়ান বাকিটা শেষ করল।
ঠিক তখনই সামনে বিদ্যুতের ঝলকানি।
আর সেই আলোয় তারা দেখল—
রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো সিডান।
সেই একই গাড়ি।
যেটার লাইভ ফ্রেম তাসনিম কিছুক্ষণ আগে ধরেছিল।
জাহিদ ধীরে ধীরে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল।
ড্রাভি রাইফেল তুলে জানালার পাশে অবস্থান নিল।
“লোকগুলো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে,” সে ফিসফিস করে বলল।
আরিয়ান হাত তুলে সবাইকে থামার সংকেত দিল।
“আলো নিভিয়ে দাও।”
চারপাশ আবার অন্ধকারে ডুবে গেল।
কয়েক মুহূর্ত পর সিডানের দরজা খুলল।
একজন মানুষ বেরিয়ে এল।
তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই।
সে শুধু রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর হেডলাইটের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল—
“আরিয়ান!”
আরিয়ানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সে লোকটাকে চিনতে পারছে না।
কিন্তু লোকটি তার নাম জানে।
“আমি জানি তুমি কোথায় যাচ্ছ!”
কোনো উত্তর এল না।
লোকটি আবার বলল—
“তোমরা যদি বাঙ্কারে যাও, ড. সাইমন মারা যাবে।”
ড্রাভি ট্রিগারে আঙুল রাখল।
“গুলি করব?”
“না।”
আরিয়ান দরজা খুলে গাড়ি থেকে নামল।
জাহিদ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “তুমি একা যাচ্ছ?”
“ও আমার নাম জানে। দেখি আর কী জানে।”
আরিয়ান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।
লোকটি স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
আরিয়ান দশ ফুট দূরে থামল।
“তুমি কে?”
লোকটি মৃদু হাসল।
“যে মানুষটা তোমাদের বাঁচাতে এসেছে।”
“নাম।”
“ড. এলিয়াস ভার্ন।”
আরিয়ানের চোখ সরু হয়ে গেল।
নামটা তার পরিচিত।
প্রজেক্ট ৭০৭-এর পুরনো নথিতে এই নাম সে দেখেছিল।
ড. এলিয়াস ভার্ন ছিলেন ড. সাইমনের সহকারী।
কিন্তু—
তিনিও ১৯৫১ সালের অগ্নিকাণ্ডে মারা গিয়েছিলেন।
আরিয়ান এক পা পিছিয়ে গেল।
“তুমি… মারা গিয়েছিলে।”
লোকটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“ঠিক যেমন সাইমন মারা গিয়েছিল।”
তারপর সে নিজের কোটের ভেতর থেকে একটা পুরনো ছবি বের করল।
ছবিটা আরিয়ানের হাতে তুলে দিয়ে বলল—
“এটা দেখো।”
ছবিতে দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
ড. সাইমন ক্লার্ক।
আর ড. এলিয়াস ভার্ন।
পেছনে একটি বিশাল লোহার দরজা।
দরজার ওপর লেখা—
707 — HUMAN CONTINUITY DIVISION
আরিয়ান ছবিটা উল্টে দিল।
পেছনে হাতে লেখা—
“মানুষকে বাঁচানোর জন্য আমরা সময়কে হত্যা করেছি।”
তার নিচে একটা তারিখ।
১৭ অক্টোবর, ১৯৫১।
আরিয়ান ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
“প্রজেক্ট ৭০৭ আসলে কী?”
ড. ভার্ন কোনো উত্তর দিলেন না।
তিনি শুধু বললেন—
“তোমাদের হাতে তিন ঘণ্টা নেই।”
আরিয়ানের চোখে বিস্ময়।
“মানে?”
“বাঙ্কারের কাউন্টডাউনটা মিথ্যা।”
“তাহলে?”
“আসল কাউন্টডাউন শুরু হয়েছে তোমরা সদর দপ্তর থেকে বের হওয়ার পর।”
হেডসেটে হঠাৎ তাসনিমের চিৎকার শোনা গেল—
“আরিয়ান!”
“বল!”
“আমি এখনই একটা এনক্রিপ্টেড ফাইল ডিক্রিপ্ট করেছি!”
তার কণ্ঠ কাঁপছিল।
“প্রজেক্ট ৭০৭ কোনো গবেষণা প্রকল্প নয়।”
আরিয়ান স্থির হয়ে গেল।
তাসনিম বলল—
“এটা একটা টাইম-রিটেনশন প্রোগ্রাম।”
ড্রাভি অবাক হয়ে বলল, “টাইম… কী?”
তাসনিম দ্রুত ব্যাখ্যা করল—
“১৯৫১ সালে সাইমন আর ভার্ন এমন একটা প্রযুক্তি তৈরি করেছিল যা মানুষের কোষের বার্ধক্য থামিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সেটা শুধু শরীরের ওপর কাজ করত না।”
আরিয়ান বলল, “তাহলে?”
“স্মৃতির ওপরও।”
চারপাশ যেন হঠাৎ আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।
ড. ভার্ন ধীরে ধীরে বললেন—
“প্রজেক্ট ৭০৭ মানুষের শরীরকে বুড়ো হওয়া থেকে আটকায়। কিন্তু তার বিনিময়ে একটা জিনিস কেড়ে নেয়।”
“কী?”
“সময়ের অনুভূতি।”
আরিয়ান কিছু বলার আগেই দূরে একটা বিস্ফোরণ হলো।
আকাশ লাল হয়ে উঠল।
জাহিদ দৌড়ে গাড়ির কাছে ফিরে গেল।
“সবাই নিচু হও!”
দ্বিতীয় বিস্ফোরণটা আরও কাছে হলো।
সিডানের পেছন থেকে আগুন ছিটকে উঠল।
ড. ভার্ন মাটিতে পড়ে গেলেন।
ড্রাভি পাল্টা গুলি চালাতে শুরু করল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে একের পর এক গুলির শব্দ ভেসে আসছে।
“কভার!”
জাহিদ চিৎকার করল।
আরিয়ান ড. ভার্নকে টেনে গাড়ির আড়ালে নিয়ে এল।
“কারা আমাদের ওপর হামলা করছে?”
ভার্ন শ্বাস নিতে নিতে বললেন—
“যাদের তুমি শত্রু ভাবছ… তারা আসলে তোমাদেরই লোক।”
আরিয়ান থমকে গেল।
“ব্যুরো?”
ভার্ন মাথা নাড়লেন।
“তোমাদের ব্যুরোর জন্মই হয়েছিল প্রজেক্ট ৭০৭-এর পর।”
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
হঠাৎ তাসনিমের কণ্ঠ আবার ভেসে এল।
এবার তার গলায় আতঙ্ক স্পষ্ট।
“আরিয়ান… আমি একটা নাম পেয়েছি।”
“কার?”
“প্রজেক্ট ৭০৭-এর বর্তমান অ্যাডমিনিস্ট্রেটর।”
“নাম বলো।”
তাসনিম কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকল।
তারপর খুব ধীরে বলল—
“ডিরেক্টর ব্র্যানসন।”
আরিয়ানের চোখ স্থির হয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার পকেটের সিকিউর কমিউনিকেটর বেজে উঠল।
স্ক্রিনে একটি ইনকামিং কল।
DIRECTOR BRANSON
আরিয়ান কলটা রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল—
“আরিয়ান, মিশন বাতিল করো।”
আরিয়ান কিছু বলল না।
ব্র্যানসন আবার বললেন—
“ড. ভার্নকে আমাদের হাতে তুলে দাও।”
“কেন?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর ব্র্যানসনের কণ্ঠ বদলে গেল।
“কারণ তুমি যাকে উদ্ধার করতে যাচ্ছ, সে ড. সাইমন ক্লার্ক নয়।”
আরিয়ানের শরীরের সমস্ত রক্ত যেন জমে গেল।
“তাহলে কে?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল—
“সাইমনের শরীরে থাকা মানুষটা হলো ৭০৭-এর প্রথম সফল প্রতিলিপি।”
কল কেটে গেল।
আর ঠিক তখনই—
ড. ভার্ন আরিয়ানের কানে ফিসফিস করে বললেন,
“ও তোমাকে সত্যিটা বলেনি।”
আরিয়ান তাকাল।
“কোন সত্য?”
ভার্নের চোখে আতঙ্ক।
“সাইমন একবারই মরেছিল।”
দূরে বাঙ্কারের দিক থেকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ হলো।
তারপর তাসনিমের কণ্ঠ—
“আরিয়ান… কাউন্টডাউন শেষ হয়ে গেছে।”
“কী?”
“বাঙ্কার ধ্বংস হয়নি।”
“তাহলে?”
তাসনিম কাঁপা গলায় বলল—
“বাঙ্কারের দরজা খুলে গেছে।”
আরিয়ান আকাশের দিকে তাকাল।
বৃষ্টির মধ্যে দূরের পাহাড়ের ওপর একটা ক্ষীণ নীল আলো জ্বলতে শুরু করেছে।
ড. ভার্ন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
“এবার সে বেরিয়ে আসবে।”
“কে?”
ভার্ন শুধু বললেন—
“প্রথম সাইমন।”
5 Comments
হ্যাঁ বা না শব্দ দুটি সবচেয়ে পুরনো এবং ছোট। কিন্তু এ কথা দুটো বলতেই সবচেয়ে বেশি ভাবতে হয়।
পীথাগোরাস
Friends
Joy Iqbal
@joyiqbal
Subani News
@subaninews
ম পানা উল্যাহ্
@panaullah63gmail-com
Najir Hossain
@najirhossain
khokon du
@khokondu
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান (কবি মিজান পঞ্চায়েত/ কবি মিজান বিএসসি)
@mohammedmizanurrahman
sordar alom
@sordaralom
মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক
@nazmul26
Burhan Ferdoushi
@burhanferdoushi


“মানুষকে বাঁচানোর জন্য আমরা সময়কে হত্যা করেছি”—লাইনটা অসাধারণ!