Profile Photo

উত্তম কুমারOffline

  • uttamkumarpaul75
  • Profile picture of উত্তম কুমার

    উত্তম কুমার

    2 hours, 12 minutes ago

    তারুন্যঃ
    —–
    বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে তারুণ্য কেবল একটি বয়ঃসন্ধিক্ষণ বা জীবনের একটি বিশেষ পর্যায় নয়; তারুণ্য হলো অদম্য শক্তি, রূপান্তরের সবচেয়ে বড় কারিগর এবং পরিবর্তনের এক জীবন্ত স্পন্দন। যে সমাজে তারুণ্য সজাগ, সে সমাজ কখনো স্থবির হতে পারে না। তরুণদের ধমনীতে যে উষ্ণ রক্ত প্রবাহিত হয়, তা কেবল ব্যক্তির অহংকার নয়, বরং তা একটি সমগ্র জাতির স্বপ্ন বাস্তবায়নের মূল চালিকাশক্তি। আজকের এই জটিল, বহুমুখী ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে দাঁড়িয়ে তারুণ্যের কর্তব্য ও দায়বদ্ধতা অনুধাবন করা এবং তা বাস্তবে রূপ দেওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
    একটি জাতির আত্মিক ও বস্তুগত উন্নতির ভিত্তি রচিত হয় তার তরুণ প্রজন্মের মনন এবং কর্মের মধ্য দিয়ে। বর্তমান সমাজে তারুণ্যের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক উৎকর্ষ অর্জন। আধুনিকতার নামে অন্ধ অনুকরণ এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের যে ঘূর্ণাবর্ত আজ চারদিকে দেখা যাচ্ছে, তা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হবে। চরিত্র, সততা, এবং মানবিক মূল্যবোধের বুনিয়াদ শক্ত না হলে কোনো জাতির পক্ষেই স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়। তরুণদের বুঝতে হবে যে, মেধা বা প্রযুক্তির উৎকর্ষ তখনই সার্থক হয়, যখন তার সাথে যুক্ত হয় নৈতিকতার আলো। মাদকাসক্তিকর স্রোত, সাইবার বুলিং, অসততা কিংবা হঠকারিতা থেকে নিজেদের দূরে রেখে একটি সুস্থ মন ও শরীর গঠন করাই হলো আজকের দিনে তারুণ্যের প্রথম দায়িত্ব।
    আত্মশুদ্ধির পাশাপাশি তারুণ্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হলো জ্ঞানার্জন ও প্রযুক্তির সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করা। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গতানুগতিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করা জরুরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানের নিত্যনতুন উদ্ভাবনগুলোকে আয়ত্ত করে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সামর্থ্য অর্জন করতে হবে। তবে এই জ্ঞানার্জন কেবল নিজের ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়; এর লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাজের অবহেলিত মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। গ্রামের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় প্রযুক্তির সুফল পৌঁছে দেওয়া এবং ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে তরুণরাই হতে পারে সবচেয়ে বড় পথপ্রদর্শক।
    বর্তমান সমাজের আরেকটি বড় অভিশাপ হলো অসহিষ্ণুতা, মেরুকরণ এবং বিভেদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে মতের অমিল হলেই তৈরি হচ্ছে হিংসাত্মক মনোভাব। এই সংকট উত্তরণে তারুণ্যের দায়বদ্ধতা হলো সমাজে সম্প্রীতি, সহনশীলতা এবং ঐক্যের সেতু নির্মাণ করা। তরুণদের মন হতে হবে উদার, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র কিংবা অর্থনৈতিক বৈষম্যের কোনো স্থান থাকবে না। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান জানানোর সংস্কৃতি গড়ে তোলার দায়িত্ব এই প্রজন্মের কাঁধেই বর্তায়। যখন একজন তরুণ সাম্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়, তখন সে কেবল একটি অন্যায় প্রতিহত করে না, বরং একটি মানবিক সমাজ গঠনের পথকে সুগম করে।
    পরিবেশগত সংকট আজ মানবজাতির অস্তিত্বের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন। জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক দূষণ এবং নির্বিচারে প্রকৃতি ধ্বংসের কারণে আমাদের পৃথিবী আজ বিপন্ন। এই মহাবিপদ থেকে ধরিত্রীকে রক্ষা করার দায়িত্ব প্রধানত তারুণ্যের। বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা, প্লাস্টিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি এবং টেকসই জীবনযাপনের মডেল সমাজেমধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তরুণরা রাখতে পারে ঐতিহাসিক ভূমিকা। শুধু স্লোগান বা প্রতিবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে, নিজের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবেশবান্ধব উপায়গুলো বেছে নেওয়া আজ প্রতিটি তরুণের নৈতিক কর্তব্য।
    সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলতে গেলে রক্তদান, স্বেচ্ছাসেবা এবং মানবকল্যাণমূলক কাজের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। দেশের যেকোনো দুর্দিনে হোক তা প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মহামারী তারুণ্যের ভূমিকা সবসময়ই প্রশংসনীয়। কোভিডের দিনগুলোতে কিংবা সাম্প্রতিককালের নানা সংকটে তরুণরাই প্রমাণ করেছে যে, তারা জীবন বাজি রেখে মানুষের পাশে দাঁড়াতে জানে। এই সেবামূলক মনোভাবকে কেবল জরুরি মুহূর্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি স্থায়ী সামাজিক অভ্যাসে রূপ দিতে হবে। বয়স্কদের সেবা করা, পথশিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করা কিংবা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এই নিরন্তর সংগ্রামই তারুণ্যের আসল সৌন্দর্য।
    তবে এই সমস্ত কর্তব্য ও দায়বদ্ধতার সফল রূপায়ণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় যুবসমাজের একাংশের হতাশা এবং লক্ষ্যহীনতা। বেকারত্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক চাপের কারণে আজ অনেক তরুণ হতাশার চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র ও সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে এই তরুণদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং তাদের মেধা বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু একই সাথে তরুণদেরও এটি মনে রাখতে হবে যে, প্রতিকূলতাকে জয় করার নামই তো তারুণ্য। ঝড়-ঝাপটা যতই আসুক না কেন, নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে সামনে এগিয়ে চলার অদম্য জেদই একজন তরুণকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।
    ইতিহাস সাক্ষী আছে, যুগে যুগে বড় বড় পরিবর্তন এসেছে তরুণদের হাত ধরেই। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন সবখানেই নেতৃত্ব দিয়েছে এদেশের তরুণরা। আজকের প্রজন্মও তার ব্যতিক্রম নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন কার্যক্রমে তরুণদের যে সততা, সাহসিকতা এবং দূরদর্শিতা দেখা গেছে, তা পুরো পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। তারা প্রমাণ করেছে যে, এদেশের তারুণ্য কেবল নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনেই বিশ্বাসী নয়, তারা সমগ্র জাতির ভাগ্য বদল করার ক্ষমতা রাখে।
    পরিশেষে বলা যায়, তারুণ্য কোনো বয়সের সীমা নয়, এটি একটি চিরন্তন মানসিকতা যাতে থাকে স্বপ্ন দেখার সাহস এবং তা বাস্তবায়ন করার জেদ। বর্তমান সমাজের সকল অন্ধকার দূর করে একটি মানবিক, বৈষম্যহীন এবং উন্নত সমাজ গড়তে হলে তরুণদের তাদের ওপর অর্পিত কর্তব্য ও দায়বদ্ধতা আন্তরিকতার সাথে পালন করতে হবে। প্রতিটি তরুণের হৃদয় হোক দেশপ্রেমে সমৃদ্ধ, মন হোক উদার এবং হাত হোক কর্মমুখর। যখন এদেশের প্রতিটি তরুণ নিজের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে সমাজের কল্যাণে ব্রতী হবে, তখনই রচিত হবে এক সোনালী ভবিষ্যতের মহাকাব্য, যা স্পর্শ করবে প্রতিটি মানুষের হৃদয়।

    2
    2 Comments
    • স্বাগত জানাই এমন সুন্দর গঠনমূলক ভাবনাগুলোকে। “মেধা বা প্রযুক্তির উৎকর্ষ তখনই সার্থক হয়, যখন তার সাথে যুক্ত হয় নৈতিকতার আলো” এই পর্যবেক্ষণটা বেশ ভালো লাগলো লেখকপ্রিয়! কারণ এটা শুধু দক্ষতা অর্জনের কথা বলে না, বরং সেই দক্ষতার নৈতিক ভিত্তির গুরুত্বও তুলে ধরে। প্রযুক্তি ও নৈতিকতার এই সমন্বয়ের ধারণাটা আধুনিক তরুণ প্রজন্মের জন্য খুবেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে, তরুণদের ওপর শুধু প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং তাদের জন্য উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

    • ইতিবাচক লেখা। আপনার মঙ্গল কামনা করছি।

Friends

Profile Photo
Mahiya Islam
@mahiyaislam
Profile Photo
ALAMGIR'S BANGLA CHANNEL
@alamgirsbanglachannel
Profile Photo
মেঘ
@megh
Profile Photo
Fatema-Kasem
@fatema-kasem
Profile Photo
AdabenTatali
@adabentatali
Profile Photo
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
Profile Photo
Prithula Zaman
@prithula
Skip to toolbar