Profile Photo

মোঃ রুবায়েত রহমান রাফিOffline

  • “শিকড়ের ভেতর রুদ্রের ক্ষতচিহ্ন যদি অগ্নি হয়, তবে সেই আগুন এখন আর পোড়ায় না পোড়াতে পোড়াতে প্রদীপ হয়ে ওঠে। আমি সেই প্রদীপের শিখায় দেখছি এক অদ্ভুত দৃশ্য: গাছ পুড়ে যায়, কিন্তু তার ছাইয়ের ভেতর লুকিয়ে থাকে আরেক বনের বীজ।”

    “রূপকথার শেষ পঙ্ক্তিতে লেখা থাকে ‘তারা সুখে-দুঃখে বাস করে’।

    কিন্তু গাছের রূপকথা সেরকম নয় ,গাছের রূপকথায় লেখা থাকে ‘তারা শিকড়ের ভেতর অমৃত জমিয়ে রাখে, যাতে কোনো এক ভয়ংকর খরায় বাঁচতে পারে হারিয়ে যাওয়া জাতি।’

    আমি কী সেই অমৃতের সন্ধান করছি?হয়তো তুমিও সেই অমৃতের একটি ফোঁটা।

    পদ্মা যখন শুকোয়, তখন তার বুকে চর জাগে।
    চরে জন্ম নেয় কাশবন, আর কাশফুল উড়ে যায় শহরের দিকে।

    নদী চিরকাল প্রবাহ চায়, কিন্তু চর চায় থিতু হতে আমার ভেতরেও তেমনি এক দ্বন্দ্ব চলে কোনো অংশ প্রবাহ হয়ে সব ভাসিয়ে নিতে চায়,আর কোনো অংশ চর হয়ে গাছের মতো দাঁড়াতে চায়।

    উপড়ে যাওয়া গাছের নাম হয় ‘পতিত’।
    কিন্তু পতিত গাছেরাও এক ইতিহাস লেখে যে ইতিহাস দাঁড়িয়ে থাকা গাছেরা জানে না।

    উপড়ে যাওয়া গাছের নাম হয় ‘পতিত’।

    কিন্তু পতিত গাছেরাও এক ইতিহাস লেখে যে ইতিহাস দাঁড়িয়ে থাকা গাছেরা জানে না।

    আমি আজ দেখলাম, শহর ছুঁয়ে যাওয়া পথের কিনারে, এক পরিত্যক্ত চরের ধারে একটা সালগাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে। কালকের ঝড়ে পড়েছিল নাকি, নাকি মানুষ কেটেছে কেউ জানে না।

    বৈশাখ এলেই মনে পড়ে সেই কালবৈশাখীর কথা, “বৈশাখের ঝড়ে যেদিন আমগাছটা উপড়ে গেল, সেদিন আমি ভেবেছিলাম শুধু একটি গাছ চলে গেল।

    আজ জানি—সেই ঝড়ের রেশ ধরে আমি লিখছি ‘পাঁচা’র গল্প। এখন বুঝি—সেদিন শুধু গাছ পড়েনি, আমারও কিছু শিকড় ছিঁড়ে গিয়েছিল।

    গাছটা এখন শুয়ে আছে, তার শিকড় আকাশের দিকে তুলে ধরা। শিকড়ের ভেতর এখন ধুলো জমছে, আর গাছের বুকে যে ক্ষতচিহ্ন ছিল, তা এখন আর লুকোতে পারে না।

    আমি সেই গাছের পাশে দাঁড়িয়ে ভাবলাম তোমাকে হারানোর পর আমিও তো এমন শুয়ে আছি। উপড়ে ফেলা গাছের মতো, শিকড় উল্টো করে, মাটি ছেড়ে। বিরহের প্রথম দিনে আমি ভেবেছিলাম, এটা একটা ক্ষত।

    দ্বিতীয় দিনে ভেবেছিলাম, এটা একটা অভিশাপ। কিন্তু আজ, এই উপড়ে পড়া সালগাছের সামনে দাঁড়িয়ে বুঝলাম—বিরহ একটা পাঁচা।

    যেদিন তুমি চলে গেলে, সেদিন আমার সব শিকড় ছিঁড়ে গিয়েছিল।

    আমি তখনও দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি উপড়ে যেতে শুরু করেছিলাম এখন আমি এই গাছের মতো—আমার সবুজ নেই, আমার ছায়া নেই, শুধু শিকড়গুলো বাতাসে দুলছে, যেন বলছে, ‘আমরা মাটি চাই।’

    কিন্তু গাছের মহত্ত্ব কোথায়?
    উপড়ে পড়া সালগাছটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তার এক ডালে এখনও বাবুই পাখির বাসা আছে।

    বাসাটা ফাঁকা, কিন্তু পড়ে যায়নি গাছ উপড়ে গেছে, অথচ বাসাটা ধরে রেখেছে।

    আমি বুঝলাম ,
    গাছের মহত্ত্ব এই যে, উপড়ে যাওয়ার পরও সে অন্যকে আশ্রয় দেওয়ার ভান করে না, কিন্তু দেয়।

    তার ডাল ভাঙেনি, শিকড় উল্টো হলেও বাসাটা পড়তে দেয়নি। তেমনি আমার মহত্ত্ব কোথায়?

    আমি শিকড় উল্টো করে রেখেছি, কিন্তু তোমার বাসাটা বুকে ধরে রেখেছি।

    একটা সময় ভাবতাম, গাছের মহত্ত্ব তার দাঁড়িয়ে থাকায়। আজ জানলাম,গাছের আসল মহত্ত্ব তার পড়ে থাকাতেও।

    কারণ পড়ে থাকা গাছ শেখায় কীভাবে ভাঙার ভেতরও অটুট থাকা যায়।

    শেখায় কীভাবে শিকড় উল্টো হলেও মাটি খোঁজা যায়।
    আর শেখায় যে বাসা কেউ বুনে গেছে, সে বাসা রক্ষা করা দাঁড়িয়ে থাকার চেয়েও বড় কাজ। আমি এখন উপড়ে পড়া সালগাছ।

    আমার সব পাতা ঝরে গেছে, ছায়া নেই, ফুল নেই, ফল নেই।

    শুধু শিকড়গুলো হাতছানি দেয় আকাশের দিকে। তুমি ভাবতে পারো, আমি শেষ।

    কিন্তু না,
    আমার বুকে এখনও বাবুইয়ের বাসা আছে, আর সেই বাসার ভেতর হয়তো একদিন আবার ডিম পাড়বে কোনো পাখি।

    তখন আমি জানব, উপড়ে যাওয়ার পরও আমি মরেনি।

    আমি শুধু নতুন করে শুয়ে পড়েছি যাতে অন্য কেউ আমার বুকে উড়তে শেখে।

    বিরহের এই দীর্ঘ রাতটা আমার শিকড়গুলোকে শিখিয়েছে মাটি ছাড়াও বেঁচে থাকা যায়। আলো ছাড়াও বেঁচে থাকা যায়।

    কিন্তু আশ্রয় দেওয়ার সংকল্প ছাড়া বেঁচে থাকা যায় না। গাছের মহত্ত্ব তার সবুজে নয়, তার দেওয়ার মন্ত্রে।

    আর আমি সেই মন্ত্রের দীক্ষা নিয়েছি উপড়ে যাওয়ার পর।

    এখন আমি শুধু শুয়ে থাকা একটা গাছ। কিন্তু আমার ছায়া নেই বটে, কিন্তু তুমি যদি ফিরে এসো, তবু আমি বলব ‘এসো, আমার বুকে বসো।

    পাতা নেই, কিন্তু শিকড় দিয়ে ছাতা বানিয়ে দেব। ফুল নেই, কিন্তু ক্ষতচিহ্ন দিয়ে রঙ ছড়িয়ে দেব।’

    গাছের মহত্ত্ব শেষ হয় না তার পতনে, গাছের মহত্ত্ব শুরু হয় তার পতনের পরের দেওয়া—যে দেওয়া হিসেবের বাইরে, হিসেবের উর্ধ্বে। আমি এখন সেই দেওয়ার দীক্ষায় আছি।

    তুমি এসো বা না এসো, আমি শিখে গেছি—উপড়ে ফেলা গাছও একদিন বনে পরিণত হতে পারে, যদি সে নিজের শিকড়ের ভেতর অমৃত জমিয়ে রাখতে জানে। আর আমার শিকড়ের ভেতর এখন শুধু অমৃত নয়, আছে রুদ্রের ক্ষতচিহ্ন, আছে বাবুইয়ের ফাঁকা বাসা, আছে তোমার চোখ রাঙানির স্মৃতি।

    সেই সব মিলিয়ে আমি এখন উপড়ে পড়া এক বিরাট সাল, যে শুয়ে শুয়েও শেখাচ্ছে ‘পাঁচা মানে শেষ নয়, পাঁচা মানে নতুন করে শিকড় বেরোনোর পাঠ।

    আম গাছতলায় তোমারে ডাকি সজনী, দুপুর গড়ায় বেলা পার হয়। টুপ কইরা পড়ে কাঁচা আম পইড়া— তুই পড়োস না রে, মোর কোলের ভিতর! বাতাস বলে, আসবে না সজনী, ও পলাতক অ-প্রেমিকা। এই ফলের মৌসুম আমার কাছে শুধু একটাই শিক্ষা দেয়—যত মিষ্টি, তত কাঁটায় জড়ানো। যেমন কাঁঠাল, যেমন আমের আঁটি, যেমন জামের রঙ। তেমনই ভালোবাসা।

    তুই এসেছিলি একটা মৌসুমের জন্য, চলে গেলে আরেক মৌসুমে। আর আমি এখন শুধু মৌসুম গুনি কবে আসবে সেটা, যে ফিরবে না।

    ক্যাকটাসটা সবার চেয়ে অদ্ভুত! তুমি চলে যাওয়ার পর আমি ওকে জল দেইনি মনে হয়।

    সে কুঁকড়ে গেছে, শিকড় শুকিয়ে মাটি ফাটিয়ে বেরিয়ে এসেছে। তার গায়ে এখনও কাঁটা, কিন্তু একেবারে প্রান্তে একটি ছোট ফুলের মুকুল।

    ক্যাকটাস জানে—পানি না পেলেও ফুল ফোটাতে হয়, কারণ সে মরুভূমির সন্তান।

    আমিও যেন তেমন তোমার জল না পেয়েও একদিন হয়তো ফুটবো অনেক দেরিতে, কিন্তু ফুটবো |

    আমি যদি জল হতাম, তবে তোমার চোখের পাতায় শুয়ে থাকতাম।” আমি জল হইনি। আমি গাছ হয়েছি।

    তবুও তোমার চোখের পাতায় শুয়ে থাকার চেষ্টা করি। আমার পাতা ঝরে পড়ে তোমার স্মৃতির ওপর, পাতা সিক্ত হয় শিশিরে সেই শিশির কি তোমার চোখের জল নয়?

    আমি এখন আর শুধু গাছ নই আমি জল খাওয়া শিকড়।

    আমি অগ্নি-স্নাত ক্ষত,আমি বৃষ্টির জন্য মুখ তুলে থাকা পৃথিবী। তুমি যদি এসো, এসো জল হয়ে। এসো বৃষ্টি হয়ে। এসো আমার শিকড় ভেজাতে।

    আমি জানি,
    তুমি এলে আমার ভেতরের সেই পুড়ে যাওয়া বীজ একদিন তোমার নামে ডাকবে।
    আর তখন রুদ্রের ক্ষতচিহ্ন হবে না—হবে অঙ্কুরের প্রথম সবুজ।

    —পতনের পর যে গাছ বনে পরিণত হতে শেখে |

    শিকড়ের ভেতর রুদ্রের ক্ষতচিহ্ন

    কলমে: মোঃ রুবায়েত রহমান রাফি |

    4
    2 Comments
Skip to toolbar