-
৮.
একা একা এই পথে
মোঃ রুবায়েত রহমান রাফিনীলু জানালার পাশে বসে ছিল।
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল।
তার হাতে একটা পুরোনো ডায়েরি।
ডায়েরির একটা পাতায় লেখা
দুঃখী কবি আরিফ।
নীলু কিছুক্ষণ নামটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল।
মানুষ কিছু মানুষকে ভুলে যায় না।
শুধু কথা বলা বন্ধ করে দেয়।নীলুর নিজের জীবনটা তখন খুব একটা গোছানো ছিল না।
বাড়িতে প্রায়ই বাবা-মায়ের মধ্যে ঝামেলা হতো,কখনও ছোট কোনো বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি, কখনও আবার দিনের পর দিন দুজনের মধ্যে কথা বন্ধ।
নীলু মাঝখানে পড়ে যেত।
কাকে বোঝাবে, আর কাকে শান্ত করবে সে বুঝতে পারত না।
অনেক রাত পর্যন্ত পাশের ঘর থেকে বাবা-মায়ের কথা কাটাকাটির শব্দ আসত।
নীলু তখন চুপচাপ নিজের ঘরে বসে থাকত।
সামনে বই খোলা থাকত পাশে sketchbook কিন্তু পড়ায় মন বসত না।
সেদিন রাতেও বাড়ির পরিবেশটা অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ ছিল।
নীলু sketchbook খুলে বসেছিল পেন্সিলটা হাতে, কিন্তু একটা রেখাও টানা হয়নি।
হঠাৎ পাশের ঘর থেকে মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল
সবকিছুর জন্য আমাকে দোষ দিও না।
বাবার গলা আরও কঠিন।
আমি কি বলেছি সবকিছুর জন্য তুমি দায়ী?তাহলে প্রতিবার একই কথা কেন বলো? কথাগুলো ধীরে ধীরে তর্কে পরিণত হলো।
নীলু পেন্সিলটা নামিয়ে রাখল।
সে জানত, এখনই কিছু একটা হবে।
এই সংসারটা তুমি কখনও বুঝতে চাওনি।
মায়ের গলা কেঁপে উঠল।
আমি বুঝিনি? এত বছর ধরে সবকিছু সামলে আসছি আমি |
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,সামলাতে যদি এত কষ্ট হয়, তাহলে আর কতদিন?
কথাটা শুনে নীলুর বুকটা ধক করে উঠল।
হঠাৎ একটা শব্দ হলো।
সম্ভবত টেবিলের ওপর রাখা কোনো জিনিস পড়ে গেছে।
নীলু আর ঘরে বসে থাকতে পারল না।
সে দরজা খুলে বাইরে এল।
দুজনেই চুপ হয়ে গেল।
মা চোখ মুছছিলেন।
বাবা জানালার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
নীলু কিছুক্ষণ দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
তোমরা আবার শুরু করেছ?
তার গলায় রাগ ছিল না।
ছিল শুধু ক্লান্তি।
মা কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন।
বাবাও কোনো উত্তর দিলেন না।
নীলু ধীরে ধীরে বলল
তোমরা যদি একে অপরের সঙ্গে থাকতে না পারো, তাহলে অন্তত আমার সামনে এসব কোরো না।
কথাটা বলেই সে নিজের ঘরে ফিরে এল।
দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর পাশের ঘর আবার নীরব হয়ে গেল।
কিন্তু সেই নীরবতাটাও নীলুর কাছে শান্তি মনে হলো না।
সে আবার sketchbook খুলল।
পাতার ওপর অজান্তেই একটা ঘর আঁকল।
ঘরের মাঝখানে একটা দেয়াল।
দুই পাশে দুটো মানুষ।
আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছোট মেয়ে।
নীলু অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে পেন্সিলটা নামিয়ে বলল আমি আর কতদিন মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকব?
সেই রাতেই নীলু ঠিক করেছিল,নিজের জীবনের এই অশান্তির কথা সে আরিফকে বলবে না।
কারণ আরিফ যদি জানতে পারে, সে নিশ্চয়ই তার পাশে দাঁড়াতে চাইবে।
আর নীলু সেটা চায়নি।
সে চায়নি তার নিজের ভাঙাচোরা সংসারের ভারটা আরিফের কাঁধেও গিয়ে পড়ুক।
আরিফকে সে নিজের জীবনের অন্ধকারে টেনে আনতে চায়নি।
তাই পরদিন থেকেই তার দূরত্বটা আরও স্পষ্ট হয়ে গেল।
পরের কয়েক সপ্তাহ নীলুকে প্রায়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে দেখা যেত।
চারুকলার ছাত্রী নীলু।
জানালার পাশের টেবিলটা যেন তার নিজের হয়ে গিয়েছিল।
সামনে Art History-এর বই, পাশে sketchbook।
কখনও পড়ত, কখনও হঠাৎ পেন্সিল হাতে নিয়ে কিছু আঁকত।
বই আর আঁকার মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখত।
যতক্ষণ লাইব্রেরিতে থাকে, ততক্ষণ অন্তত বাড়ির ঝামেলাগুলো ভুলে থাকা যায়।
এক বিকেলে আরিফ লাইব্রেরিতে ঢুকল।
দূর থেকেই নীলুকে দেখতে পেল।
জানালার পাশে বসে একটা পুরোনো ছবির স্কেচ করছে।
আরিফ কাছে গিয়ে বলল
কী আঁকছিস?নীলু মাথা না তুলেই বলল
জানি না।
জানি না মানে?
নীলু এবার হেসে তাকাল।
সব ছবি আঁকার আগে জানতে হয় নাকি?
আরিফও হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর সে বলল তুই ইদানীং এত চুপচাপ থাকিস কেন?
নীলুর মুখের হাসিটা থেমে গেল সে sketchbook বন্ধ করে বলল এমনিই |
বাড়িতে কোনো সমস্যা?
নীলু কয়েক সেকেন্ড আরিফের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর চোখ নামিয়ে বলল
সব বাড়িতেই তো কিছু না কিছু সমস্যা থাকে।
আরিফ আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
সে বুঝতে পারল, নীলু কথা বলতে চাইছে না।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর নীলু নিজেই বলল
আরিফ, তুই একটা কাজ কর।
কী?
তুই তোর পড়াশোনা আর কবিতা নিয়ে থাক।
আরিফ অবাক হয়ে তাকাল।
হঠাৎ এসব বলছিস কেন?
নীলু মৃদু হেসে বলল কারণ তোর সামনে অনেক সুন্দর একটা জীবন পড়ে আছে |
আর তুই?
নীলু জানালার বাইরে তাকাল।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কাঁচ বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছিল।
সে খুব আস্তে বলল
আমার জীবনটা একটু অন্যরকম।আরিফ কথাটার মানে বুঝতে পারল না।
শুধু দেখল, নীলু আবার sketchbook খুলেছে।
পাতায় একটা গাছ আঁকা।
গাছটার একটা ডাল ভাঙা।
আরিফ ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল ডালটা ভাঙা কেন?
নীলু পেন্সিল থামিয়ে বলল
সবকিছু কি সবসময় ঠিকঠাক থাকে?
আরিফ চুপ করে গেল।
নীলু আবার আঁকতে শুরু করল।
কিন্তু এবার তার চোখের সামনে ছবিটা ছিল না।
ছিল তার নিজের পরিবার।
নিজের ভবিষ্যৎ।
আরিফকে নিয়ে তার মনের কথাগুলো।
আরিফ চলে যাওয়ার পর নীলু অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল—
তুই ভালো থাকিস, আরিফ।
আমার জন্য তোর জীবনটা যেন থেমে না যায়।
সেদিনের পর নীলু আরও সচেতনভাবে আরিফকে এড়িয়ে চলতে লাগল।
কখনও দূর থেকে দেখলে অন্যদিকে চলে যেত।
কখনও আরিফ ডাকলেও থামত না।
আরিফ ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করল
নীলু ইচ্ছে করেই তাকে দূরে রাখছে।
কিন্তু সে জানত না কেন।
আর নীলু জানত
কারণটা আরিফকে বললে হয়তো সে আরও বেশি করে তার পাশে দাঁড়াতে চাইবে।
আর নীলু সেটা চায়নি।
সে চেয়েছিল আরিফ একদিন তাকে ভুলে যাক।
নিজের জীবনটা নিজের মতো করে গড়ে তুলুক।
কবিতা লিখুক।
স্বপ্ন দেখুক।
ভালো থাকুক।
নীলুর জীবনে সে জায়গা না পেলেও আরিফ যেন নিজের জীবনে হারিয়ে না যায়।
সেদিন রাতে ডায়েরির শেষ পাতায় নীলু লিখেছিল
সব ভালোবাসার শেষ কাছে পাওয়া নয়।
একটু থেমে আবার লিখেছিল
কিছু ভালোবাসা দূরে সরে গিয়েও বেঁচে থাকে।
পরদিন লাইব্রেরির সামনে আরিফ নীলুকে দেখে ডাকল
নীলু!
নীলু থামল না।
শুধু একবার পেছনে তাকাল।
আরিফের চোখের দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নিল।
সে হাঁটতে থাকল।
আরিফ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
নীলু জানত, পেছনে তাকালে হয়তো আরিফের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করবে।
তাই সে আর পেছনে তাকাল না।
তার চোখে তখন পানি জমে উঠেছিল।
তবুও সে হাঁটতে থাকল।
কারণ সে বিশ্বাস করেছিল
কখনও কখনও কাউকে ভালো রাখতে হলে, তার কাছ থেকেই দূরে সরে যেতে হয়।
3 Comments-
আপনার এই চমৎকার সৃষ্টিতে নীলুর নিঃসঙ্গতা আর নীরব বেদনার ছবি যেভাবে ফুটে উঠেছে তা হৃদয় ছুঁয়ে যায়, বিশেষ করে নীলুর এঁকে রাখা ভাঙা গাছটির মতো রূপক ব্যবহার করার বিষয়টি দারুণ একটি অপশন হতে পারে। আপনার এই আবেগী কথামালা পড়ে হুমায়ূন আহমেদের গল্পের সেই চিরচেনা বিষণ্ণতার কথা মনে পড়ে গেল, তাই আপনি আরও অনেক সুন্দর গল্প উপহার দেওয়ার জন্য এভাবেই লেখা চালিয়ে যাবেন বলে একান্ত প্রত্যাশা রইল।
Friends
Moin Uddin
@moinuddin1
মোস্তফা কামাল সাকি
@mostofakamal
উত্তম কুমার
@uttamkumarpaul75
তিতা ফুল
@nadia1
মুনতাছির আহমেদ
@moontasirahmed
Pulock Sheth
@pulocksheth
Shahadat Hossain Bhuiyan
@shahadathossainbhuiyan
Kaoser Ahmed
@kaoserahmed
Nayan Monir
@nayanmonir


ভালো রাখতে গিয়ে দূরে সরে যাওয়া নীলুর নীরবতাই হয়ে উঠল ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন আত্মত্যাগ……🖤