মেশিন থামলো

মেশিন থামলো
ই এম ফরস্টার
প্রথম প্রকাশ Oxford and Cambridge Review, November 1909
ভাষান্তর ও অলঙ্করণ: সৌরভ রায়
১ হাওয়া-জাহাজ
কল্পনা করুন তো দেখি, একটা ছোট কামরা, ছয়কোনা, মৌচাকের খোপের মত। সেই ঘরের আলো কোনো জানলা দিয়েও আসে না, কোনো বাতি থেকেও না, তবু নরম এক আলোয় সেই ঘর টইটম্বুর। ঘরের কোথাও হাওয়া আসা-যাওয়ার জন্য এক চিলতে ফাঁক নেই, কিন্তু ঘর গুমোট না, তাজা হাওয়াদার। কোথাও কোনো বাদ্যযন্ত্র নেই, কিন্তু যেই মুহুর্তে আমার ধ্যানচক্ষু খুললো, মধুর সুরের গমকে সারা ঘর থরথর করছে। ঘরের মাঝখানে একটি আরামকেদারা আর তার পাশে একটা রিডিং ডেস্ক – বাকি ঘর আসবাববিহীন। আরামকেদারায় উপবিষ্ট জবুথবু এক দেহ – পাঁচ ফুটি এক নারী, তাঁর মুখ ছাতাপড়ার মত সাদা। এই কুঠুরির মালকিন তিনিই।
ইলেক্ট্রিক ঘণ্টি বেজে ওঠে ।
সুইচে মালকিনের আঙ্গুলের চাপ পড়ে, সুরেলা গান থেমে যায়।
“দেখি তাহলে কে এলো”, ভাবেন তিনি আর চেয়ার চালু করেন। চেয়ারটিও, গানের মতই যন্ত্রচালিত। চেয়ার তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায় কামরার অপরপ্রান্তে। ঘণ্টি সেখানে তারস্বরে বেজেই চলেছে।
“কে?” গলার বিরক্তি গোপন না করেই বললেন তিনি। গান শুনতে বসে বার বার ব্যাঘাত। যে কেউ হতে পারে বেল বাজনদার , তাঁর পরিচিত কয়েক হাজার জনের মধ্যে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষের সামাজিকতার অবিশ্বাস্য অগ্রগতি ঘটেছে।
কিন্তু যখন তিনি রিসিভারে কান পাতলেন, তাঁর সাদাটে মুখে হাসি ফুটল, বলে উঠলেন :
“বেশ বেশ। কথা বলা যাবে, আমি ‘আলাদা’-য় আসছি। আগামী পাঁচ মিনিটে জরুরি কিছু ঘটবে না বলেই মনে হচ্ছে – কুনো, তোমায় আমি পুরো পাঁচ পাঁচটা মিনিট দেবো। কিন্তু তার পরেই আমার লেকচার দেবার টাইম – ‘অস্ট্রেলিয়ান যুগের সঙ্গীত’”।
‘আলাদা’ বোতাম টিপতেই, আর তাঁর সাথে বাকি কারোর যোগাযোগ করার উপায় রইলো না। আলোতে মৃদু চাপ দিতেই পুরো কামরা আঁধারে ডুবে গেলো। “তাড়াতাড়ি!” তাঁর গলায় বিরক্তি ফিরে এলো, “তাড়াতাড়ি করো, কুনো; অন্ধকারে বসে আছি মিছিমিছি।”
কিন্তু তাঁর হাতের গোল প্লেট আরও পাক্কা পনেরো সেকেন্ড অন্ধকার রইলো, তারপর তাতে ধীরে ধীরে আলো ফুটতে লাগলো। প্রথমে আবছা আকাশীর ঝলক, ধীরে ধীরে বেগনে আভা, শেষমেশ তাঁর প্রবাসী ছেলের ছবি ফুটলো তাতে । পৃথিবীর অন্যপ্রান্তে বসেও মাকে দেখতে পাচ্ছে সে। “কুনো, কি ঢিলে তুমি।”
অপ্রস্তুত হাসি ফুটল তার মুখে।
“আমার সত্যি সত্যি মনে হয় ঢিমে হয়ে থাকতেই তোমার ভালো লাগে।”
“মা আগেও আমি অনেকবার কল করেছি তোমায়, সবসময় তোমাকে ‘ব্যস্ত’ বা ‘’আলাদা’ পাই। আমার একটা বিশেষ কথা আছে।”
“কি কথা সোনা? বলে ফেল বাবু তাড়াতাড়ি। তুমি কথাটা তো বাতাসপোস্টে লিখেই পাঠাতে পারতে?”
“কিন্তু আমি নিজের মুখে তোমায় এ কথাটা বলতে চাই। আমি চাই-”
“কি?”
“আমি চাই তুমি আমার কাছে এসো। দেখতে ইচ্ছে করছে তোমায়।”
ভাশ্তি নীল প্লেটে ছেলের মুখের দিকে চাইলেন।
“কিন্তু দেখতে পাচ্ছি তো তোমায়! আর কি চাই তোমার?” বলে উঠলেন তিনি।
“না, মেশিনের মধ্যে দিয়ে দেখতে চাই না তোমায়! এই বিরক্তিকর মেশিনের ভেতর দিয়ে কথা বলতে চাই না আমি। ”কুনো বললো।
“এই চুপ, চুপ! মেশিনের নামে কিছু বলতে নেই।” ওর মা চমকে উঠলেন।
“কেন, বলতে নেই কেন?”
“একদমই বলতে নেই।”
“এমন বলছ যেন ভগবান নিজে হাতে মেশিন গড়েছেন,” ছেলের গলা চড়ছে। “তোমার মন খারাপ লাগলে তুমি তো মেশিনের কাছে জানাও। মানুষ গড়েছে মেশিন, ভুলে যেও না। মহামানব তারা, কিন্তু মানুষই। মেশিন অনেক কিছু, কিন্তু সব না। এই প্লেটে আমি তোমার মত কিছু দেখি, কিন্তু তোমাকে দেখি না। এই টেলিফোনে তোমার গলার মত কিছু শুনি, কিন্তু তোমাকে পাই না। তাই আমি চাই যে তুমি এসো। এসো, আমরা মুখোমুখি বসে আমাদের মনের কথা বলি।”
উত্তর এলো, গিয়ে দেখা করার মত সময় খরচ করার সামর্থ্য নেই তাঁর।
“হাওয়া-জাহাজে আমার কাছে আসতে দু’ দিনেরও কম লাগে, মা!”
“হাওয়া-জাহাজ একদম পছন্দ করি না। ”
“কেন?”
“বিচ্ছিরি খয়েরি জমি আর সাগর দেখতে হয় প্রথমে, আর অন্ধকার হ’লে তারা। আমার মাথা কাজ করে না হাওয়া-জাহাজে। ”
“আর আমার মাথা আর কোথাও এত ভালো চলে না।”
“যেমন?”
ছেলে খানিক থমকে গেলো।
“ঐ যে চারটে তারা চৌকোনা মত, আর তার মাঝ দিয়ে এক সারিতে তিনটে তারা, সেটা থেকে আরও তিনটে তারা ঝুলছে, চেনো তো সেটা? ”
“না চিনি না । তারা আমার পছন্দ না। কী মাথায় আসে তোমার সেটা দেখে? শুনি ; কি সেটা ।”
“আমার মাথায় এলো সেটা যেন একটা মানুষ।”
“তার মানে?”
“চারটে বড় তারা পুরুষটার কাঁধ আর হাঁটু। একসারে তিনটে তারা প্রাচীন কোমরবন্ধের মত। তা থেকে ঝুলছে তিন তারার তরোয়াল। ”
“তরোয়াল কি জিনিস ? ”
“পুরুষরা আগে তরোয়াল নিয়ে ঘুরে বেড়াতো, পশু আর অন্য পুরুষদের মারতে। ”
“হুম। তোমার ভাবনাটা তেমন কিছু দরের না, কিন্তু নতুন তো বটেই। প্রথম কখন এলো তোমার মাথায়?”
“হাওয়া জাহাজেই —” হঠাৎ গলার স্বর থেমে গেলো ওর, মায়ের মনে ভেসে উঠল ছেলের মুখের মলিন ছবি। কিন্তু সেই ছবি মেশিনের ছবির সাথে নাও মিলতে পারে, আবেগের খুঁটিনাটি দূরসঞ্চার করা মেশিনের দায় নয়। মোটামুটি মানুষের একটা ধারণা দেয় সে – গোটাগুটি না হলেও ততটুকুই যাতে কাজ চলে যায়, ভাশ্তি ভাবলো। মানুষে মানুষে মিলনের যে আচাভুয়া ফুলকে এক সেকেলে তত্ত্ব সম্মান করতো, সেই ফুলকে পায়ে দলে মেশিন একদিকে ঠিকই করেছে। কারণ আসল আঙ্গুর ফলকে টক বলে অগ্রাহ্য না করলে মোটামুটি ভালো নকল আঙ্গুর বানানো যায় না। আচাভুয়া ফুলের ভুলভুলাইয়া ছেড়ে মানবজাতি “মোটামুটি ভালো”কে বহু বহু বছর আগেই মেনে নিয়েছে।
“সত্যি বলতে কি,” কুনো বলে চলল, “আমি ঐ তারাগুলোকে আরেকবার দেখতে চাই। খুব অদ্ভুত। কিন্তু হাওয়া-জাহাজ থেকে না। পৃথিবীর মাটি থেকে দেখতে চাই, হাজার হাজার বছর আগে আমাদের পূর্ব পুরুষরা যেমন দেখতো। আমি একবার মাটিতে নেমে দেখতে চাই।”
আবার চমকে উঠলেন তিনি।
“মা, তুমিও কিন্তু আসবে আমার সাথে। পৃথিবীর মাটিতে নামার বিপদ কি কি তুমি বলতে থাকবে আমায় কানের গোড়ায় । ”
“না, অসুবিধা কিছু নেই তেমন। ” উদ্যত জবাব গিলে ফেলে বললেন তিনি। “কিন্তু সুবিধাও কিছু নাই। পৃথিবীর মাটিতে শুধু ধুলোকাদা, সুবিধা কিছুমাত্র না। ঐ ধুলোকাদায় কোন প্রাণ বেঁচে নেই, আর রেস্পিরেটর দিয়ে শ্বাস না নিলে তোমার প্রাণও থাকবে না। বাইরের বাতাসের ঠান্ডায় বাঁচা অসম্ভব।”
“জানি তো মা; আমি সবভাবে সাবধান হয়েই যাবো। ”
“তা ছাড়াও…”
“কি?”
মা খুব সাবধানে কথা বাছলেন। ছেলে রাগলে চন্ডী, তাকে সাবধানে নিরস্ত করতে হবে।
“আমাদের আধুনিক যুগের আদর্শের বিরোধ হবে এতে। ” গুছিয়ে কেটে কেটে বললেন তিনি।
“মানে মেশিনের সাথে বিরোধ হবে এতে, এই বলতে চাও তো?”
“সেটা ছাড়াও —”
নীল প্লেট থেকে ছেলের মুখ মিলিয়ে গেলো।
“কুনো!”
এবার সে ‘আলাদা’ হ’ল।
এক লহমার জন্য ভাশ্তি-র নিজেকে খুব একা লাগলো।
কিন্তু পুরো আলো জ্বালাতেই, তাঁর ঝলমলে সুসজ্জিত, বোতামখচিত ঘর তাঁর মনকেমনকে মিলিয়ে দিলো। সবদিকে শুধু বোতাম আর সুইচ আর বোতাম – গান গেয়ে দিয়ে যাওয়ার, খাবার আনানোর, জামাকাপড়ের। গরমজলে চানের বোতাম টিপলে মেঝে ফাঁক হয়ে (নকল) মার্বেলের বাথটাব উঠে আসে, তাতে টলটলে, উষ্ণ, গন্ধহীন এক তরল। আবার ঠান্ডাজলে চানের বোতাম আছে। সাহিত্য তয়েরের সুইচও মজুত।
আর আছে বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রাখার বোতাম। তাই ঐ ঘর শূণ্য হলেও সারা পৃথিবীর যা কিছু তাঁর প্রিয়, সব কিছুর সাথেই তাঁর যোগাযোগ ছিল। ভাশ্তি তার পরেই ‘আলাদা’ বোতাম টিপে দিলেন। জমে থাকা শেষ তিন মিনিট বাঁধ ভেঙে ঘরের ভেতর আছড়ে পড়লো যেন। সারা ঘর নকল ঘণ্টির আওয়াজে ভরে উঠলো, কথা-নলচের কিচমিচ আওয়াজ ছড়িয়ে পড়লো। নতুন খাবার কেমন? তিনি কি সুপারিশ করেন এই খাবার? তাঁর মাথায় কি নতুন কোন ভাবনা এসেছে? তিনি কি অন্যদের মাথায় আসা নতুন ভাবনাগুলো শুনবেন? তিনি কি শিগগিরি তাঁর পাবলিক নার্সারি যাওয়ার তারিখ বুক করবেন? কি সেই তারিখ? ডি ডি এম এম ওয়াই ওয়াই ওয়াই ওয়াই ওয়াই…
বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তর তিনি বেশ বিরক্তভাবেই দিলেন — বয়েস বাড়ছে। তিনি বললেন নতুন খাবার খুবই বাজে। তাঁর এত কাজ জমেছে যে পাবলিক নার্সারি ‘যাওয়া’ হয়নি। তাঁর নিজের মাথায় নতুন কোন ভাবনা আসেনি কিন্তু তিনি একটু আগে শুনলেন যে ওপরে চারটে আর মাঝে তিনটে তারা নাকি পুরুষমানুষের মত দেখতে : খুব একটা দরের ভাবনা নয় সেটা। তারপর তিনি খবরিদের সুইচ বন্ধ করে দিলেন, কারণ তাঁর ‘অস্ট্রেলিয়ান যুগের সঙ্গীত’ ভাষণ দেবার সময় হয়ে এসেছিলো।
ঘেঁষাঘেঁষি-ঠাসাঠাসি গণসমাবেশ বহু আগেই উঠে গেছে; ভাশ্তি আর তার শ্রোতারা কেউই নিজের নিজের কামরা ছেড়ে নড়েননি। নিজের কেদারায় বসে তিনি বললেন, নিজের নিজের কেদারায় বসে তারা শুনলো, মোটামুটি ভালোভাবেই, দেখলো, মোটামুটি ভালোভাবেই শুনলো। মঙ্গোলিয়ান-পূর্ব যুগের সঙ্গীত নিয়ে একটা রসিকতা করে তিনি কথা শুরু করলেন, আর তারপর চৈনিক বিজয়-পরবর্তী কালে গানের যে স্ফূর্তি হয়েছিলো, তার বিবরণ দিলেন। আই-সান-সো আর ব্রিসবেন স্কুলের পদ্ধতি যতই সেকেলে আর গোঁড়া মনে হোক না কেন, তিনি মনে করেন (তিনি বললেন) যে আজকের সঙ্গীতজ্ঞরা তা থেকে অনেক কিছুই শিখতে পারেন: তাঁদের মধ্যে কিন্তু অনেককিছুই নতুন ছিল; আর সর্বোপরি ছিল নতুন ভাবনা।
তাঁর বক্তৃতা ছিল দশ মিনিটের ; সবার ভালোই লাগলো; উপসংহারে তিনি আর তাঁর শ্রোতারা সমুদ্র নিয়ে আরেকটি ভাষণ শুনতে চলে গেলেন; সমুদ্র থেকে অনেক নতুন ভাবনা আসে; বক্তা রেস্পিরেটর পরে এই কিছুদিন আগেই সমুদ্র দেখে এসেছেন। সব মিটলে, তিনি খাবার ডাকলেন, অনেক বন্ধুর সাথে কথা বললেন, চান করলেন, আরও খানিক কথা বললেন, আর তারপর বিছানা ডাকিয়ে আনলেন।
বিছানা তাঁর পছন্দ হ’ল না। ছোট বিছানা চান তিনি, এটা অনেক বড়। অনুযোগ করে লাভ নেই। সারা পৃথিবীতে বিছানার মাপ একই, বদলাতে গেলে মেশিনকেই নিজের ভেতর অনেক কিছু বদলাতে হবে। ভাশ্তি শেষমেশ ‘আলাদা’তে গেলেন – যেতেই হ’ত, কারণ মাটির নিচে না-রাত-না-দিন – তারপর গতবারের বিছানা ডাকার পর থেকে এই পর্যন্ত যা যা হয়েছে সব গুনতে লাগলেন। নতুন ভাবনা? একটাও না। নতুন ঘটনা — কুনোর নিমন্ত্রণ কি ঘটনার মধ্যে পড়ে ?
বিছানার পাশের ছোট্ট রিডিং ডেস্কে, জঞ্জাল যুগের একটিমাত্র অবশেষ — বই। বুক অফ দা মেশিন। যা যা সম্ভাব্য ঘটনা ঘটতে পারে, সব মোকাবিলা করার এক ম্যানুয়াল। গরম লাগলে, শীত লাগলে, অম্বল ভাব আসলে, হাজির-জবাব না হ’লে, এই বই অগতির গতি, বলে দেবে কোন বোতাম টিপতে হবে। সেন্ট্রাল কমিটির পাবলিকেশন। হাল আমলের কেতায়, দারুণ জমকালো বাঁধাই।
বিছানায় উঠে বসে, সশ্রদ্ধভাবে হাতে তুলে নিলেন সেই বই। হালকা আলোয় ভরা ঘরে এদিক ওদিক দেখলেন, যেন কেউ দেখে ফেলবে তাঁকে। তারপর আধো শরমে, আধো পুলকে, বই ঠোঁটে ছুঁইয়ে তিনি গুনগুনিয়ে উঠলেন, “ও মেশিন! ও মেশিন!”
তিনবার চুমু খেলেন তিনি, তিনবার মাথা ঝোঁকালেন, তিনবার পেলেন সার্বিক সমর্পণের মহানন্দ।
সেবা সমাপনে ১৩৬৭ পাতা খুললেন তিনি। তাঁর দক্ষিণ গোলার্ধ-দ্বীপের পাতাল থেকে তাঁর ছেলের উত্তর গোলার্ধ-দ্বীপের পাতাল পর্যন্ত ফেরি করা হাওয়া-জাহাজের টাইমটেবিল আছে তাতে।
মনে মনে বললেন, “না, সময় নেই আমার।”
কামরা আঁধার করে ঘুমালেন তিনি; জেগে আবার কামরা আলো করলেন; খেতে খেতে নতুন ভাবনা ভাগ করলেন বন্ধুদের সাথে, গান শুনলেন আর ভাষণ শুনলেন; কামরা আঁধার করে ঘুমালেন তিনি। তাঁর উর্ধ্ব, অধঃ, আরও আট দিকে, মেশিন তার অনন্ত গুঞ্জন গেয়ে চললো ; তাঁর কান জন্মান্ধ সেই গুঞ্জনের কাছে, কারণ সেই গুঞ্জন কানে নিয়েই জন্মেছেন তিনি। পৃথিবী তাঁকে বয়ে নিয়ে গুনগুনিয়ে আহ্নিক গতিতে চললো, কখনো গায়েবী সূর্যের সামনে দিয়ে, কখনো অদৃশ্য তারাদের সামনে দিয়ে। জেগে আবার কামরা আলো করলেন তিনি।
“কুনো!”
“তুমি সশরীরে না এলে তোমার সাথে কোনো কথা নেই।”কুনো উত্তর দিলো।
“গতবার কথা হওয়ার পর তুমি কি পৃথিবীর মাটিতে উঠেছিলে?”
তার ছবি মিলিয়ে গেলো।
আবার বই খুলতে হ’লো। উদ্বেগ বেড়ে গেলো, চেয়ারে আধশোয়া হয়ে বুকের ধুকধুকি গুনতে থাকলেন। যেন তাঁর দাঁত, চুল আবার সব পড়ে গেছে এক লহমায়, এমন ভাব হ’ল। তারপর চেয়ারকে চালিত করে নিয়ে গেলেন দেওয়ালের দিকে, অচেনা বোতাম টিপলেন একটা। দেওয়াল ধীরে ধীরে দু’ভাগে ভাগ হ’লো। তার ভেতর দিয়ে একটা সুড়ঙ্গ দেখা গেলো, একটা বাঁকের পর তার গন্তব্য আর দেখা যায় না। নিজের ছেলেকে দেখতে যেতে হবে তাঁর, পথ শুরু এখানেই।
পথের যোগাযোগ ব্যবস্থার সব খুঁটিনাটিই তাঁর জানা। অজানা রহস্য তাতে কিছুই নেই। একটা গাড়ি ডেকে নিতে হ’বে, টানেল দিয়ে সেই গাড়ি তাঁকে উড়িয়ে নিয়ে যাবে লিফটে, সেই লিফট সংযুক্ত হাওয়া-জাহাজ স্টেশনের সাথে: মহাবিশ্ব জুড়ে মেশিন প্রতিষ্ঠা হবার বহু বহু বছর আগে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হয়েছিলো। মেশিন-পূর্ববর্তী সভ্যতা সম্পর্কে তাঁর যথেষ্ট পড়াশুনা অবশ্যই আছে। মেশিনের আগের এই সভ্যতা ছিলো উল্টো-বুঝের সভ্যতা, মানুষের কাছে জিনিসকে না এনে জিনিসের কাছে মানুষকে নিয়ে যেত। সেই আজব যুগে, হাওয়া বদলাতে মানুষ তাজা হাওয়ার দেশে যেত, সেই হাওয়াকে বোতাম টিপে ঘরে না এনে ! কিন্তু তবুও – সুড়ঙ্গ দেখে ভয়ই লাগছিল : তাঁর শেষ সন্তান জন্মের পর সুড়ঙ্গ আবার এই দেখছেন। সুড়ঙ্গের বাঁক – ঠিক যেন গতবারের মত না; আলো ঝলমল – কিন্তু সদ্য শোনা এক ভাষণে যেমন বলা হ’ল ঠিক তেমন যেন না। ভাশ্তির মনে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আতঙ্ক চড়াও হ’ল। ঘরের ভেতর দিকে গুটিয়ে ঢুকে গেলেন তিনি, দেওয়াল আবার বন্ধ হয়ে গেলো।
“কুনো, তোমার কাছে আসতে পারছি না আমি। শরীর ভালো নেই আমার।”
তৎক্ষণাৎ কামরার সিলিং থেকে বিপুল এক যান্ত্রিক জিনিস ঝাঁপিয়ে পড়লো তাঁর ওপর, বুকের ওপর থার্মোমিটার চাপলো, কপালে জলপট্টি। অসহায় বন্দী হয়ে শুয়ে রইলেন তিনি।
কুনো ডাক্তারকে তার করেছিলো।
তাহ’লে মেশিনের মধ্যে দিয়ে আবেগও সবেগে চলাচল করে।
ভাশ্তির মুখে ডাক্তার ওষুধের দূরসঞ্চার করলেন, তিনি ঢোঁক গিলতেই সেই বিপুল যন্ত্র গুটিয়ে মিলিয়ে গেলো সিলিং-এর জঠরে। কুনোর কণ্ঠস্বর জিজ্ঞেস করলো এখন কেমন লাগছে।
“ভালো।” তারপরেই বিরক্তির সুরে: “কিন্তু তুমি আমার এখানে চলে আসতে পারছো না কেন?”
“কারণ আমার এখান থেকে যাওয়ার উপায় নেই।”
“কেন?”
“যেকোনো মুহুর্তে এখানে বিরাট কিছু একটা ঘটতে পারে।”
“পৃথিবীর মাটিতে কি উঠেছিলে এর মধ্যে?”
“না।”
“তাহ’লে ঘটার কী আছে?”
“মেশিনের মধ্যে এসব কথা তোমায় বলতে চাই না।”
তিনি নিজের রোজনামচায় ফিরে গেলেন।
কিন্তু তাঁর মনে পড়তে লাগল কুনোর জন্মের কথা, শিশুবেলার কথা, পাবলিক নার্সারিতে তাকে ছেড়ে আসার কথা, সেখানে তাকে ভিজিট করতে যাওয়ার কথা, বড় হয়ে তার ভিজিট করতে আসার কথা… কিন্তু মেশিনের নিয়মাবলী অনুসারে যখন পৃথিবীর অন্য গোলার্ধে তার কামরা বরাদ্দ হয়, তখন ভিজিট পাকাপাকি ভাবে থেমে যায়।
বুক অফ দা মেশিন-এর নিয়মত্যনুসারে “সন্তানজননকারকগণের দায়িত্ব স্থগিত হয় সন্তানদের জন্মদানমুহুর্তেই। P.422327483.” সঠিক, কিন্তু কুনোর ব্যাপার একটু বিশেষ — সত্যি বলতে, তাঁর সব সন্তানই বিশেষ রকম — আর ও যদি এতটাই চায় মা-কে, সাহস করে তাঁর চলে যাওয়াই উচিত। আর “যেকোনো মুহুর্তে এখানে বিরাট কিছু একটা ঘটতে পারে।” এর মানে কি? খুব সম্ভব তাঁর খেয়ালি ছেলের আরেক খেয়াল, কিন্তু যেতে তো হবেই মনে হয়। আবার সেই অচেনা বোতাম টেপা, আবার দেয়াল দু’ভাগ হল, সেই সর্পিল টানেল আবার সুদূরে বিলীন। বইটি বুকে চেপে, বেটাল না হয়ে উঠে তিনি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালেন, গাড়ি ডাকতে। তাঁর কামরার দেয়াল তাঁকে বাইরে রেখে আবার বন্ধ হয়ে গেল: উত্তর গোলার্ধে তাঁর যাত্রা হ’ল শুরু।
খুবই নির্ঝঞ্ঝাট সেই সফর, অবশ্যই। গাড়ি নিজের দরজা খুলে এগিয়ে এলো, ভেতরে তাঁর কামরার আরামকেদারার একটি হুবহু নকল। লিফট এলে তাঁর ইঙ্গিতে কেদারা থামলো, টাল সামলে লিফটে উঠলেন তিনি। বহু বহু মাস বাদে আরেকটি জীবন্ত প্রাণীর মুখ দেখলেন তিনি, লিফটে তাঁর সহযাত্রী। বেড়াতে খুব কম লোকই যায় আজকাল, কারণ বিজ্ঞানের অবিশ্বাস্য প্রগতির আশীর্বাদে পৃথিবীর সব জায়গা হুবহু এক। মেশিন-পূর্ব সভ্যতা দ্রুতগতি যাত্রা নিয়ে কতই না আশাবাদী ছিলো, নিজে থেকেই তা তামাদি হয়ে গেলো। পিকিং গিয়ে লাভ কি? তা তো অবিকল শ্রুষবেরী। আর একবার পিকিং চলে গেলে শ্রুষবেরী ফিরে এসে আদৌ কোনও লাভ হবে কি? মানুষ দেহকে চালনা করে অস্থির করে না আর; সব অস্থিরতা এখন তার মনে।
হাওয়া-জাহাজ কিন্তু বিগত যুগের অবশেষ। রেখে দেওয়া হয়েছে কারণ বাতিল করলে খরচা আর ঝঞ্ঝাট অনেক বাড়ত। এখন মানুষের দরকারের চেয়ে হাওয়া-জাহাজের জোগান অনেকগুণে বেশি। একের পর এক ঝাঁক বেঁধে তারা রাই বা ক্রাইস্টচার্চের (পুরনো যুগের নামগুলোই নিচ্ছি) ভমিটারির ব্যদিত মুখ থেকে ভেসে ওঠে আর দক্ষিণের হাওয়া-জাহাজঘাটে নামে, খালি। আর ফিরেও আসে, খালি। এত চমৎকার সেই ব্যবস্থা, এত সুচারুভাবে তারা আবহাওয়ার নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত, যে আকাশে ভেসেও তারা আকাশচারী না।
খোদ আকাশে আবহাওয়া যেমনই থাক, হাওয়াজাহাজ গতায়াতের আকাশরুটজুড়ে ক্যালাইডোস্কোপের মত বিরাট জটিল নকশাকাটা থাকে। সেই নকশা চক্রবৎ বদলায়। ভাশ্তির হাওয়া-জাহাজের জানলায় এই সূর্যাস্ত তো এই সূর্যোদয়। কিন্তু রেইমস-এর ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় এই জাহাজ হেলসিংফোর্স আর ব্রাজিলস রুটের হাওয়া-জাহাজের দেখা পায়। আর প্রতি তৃতীয়বার আল্পস পেরোনোর সময় তাঁর ঠিক পিছে পিছে পালেরমো-গামী হাওয়াজাহাজের ঝাঁক আসে। রাত-দিন, ঝড়-বাদল, জোয়ার-ভূমিকম্প, মানুষকে কিছুই আর রুখতে পারে না। সে লেভিয়াথানের মুখে লাগাম পরিয়েছে । প্রকৃতিভক্ত প্রকৃতিপূজক সব প্রাচীন সাহিত্য তার কাছে এখন শিশুর প্রলাপের মত মিছে মনে হয়।
কিন্তু যখন ভাশ্তির চোখে পড়লো খোলা হাওয়ার চাবকানিতে কলঙ্কময় জাহাজের বিশাল বপু, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আতঙ্ক তাঁর ওপর আবার চড়াও হ’ল। আসল হাওয়া-জাহাজ সিনেমাটোফোটে-তে দেখা হাওয়া-জাহাজের মত না। তাতে গন্ধ আছে – খুব চড়া বা খারাপ না হ’লেও সেই গন্ধের ওঠানামা আছে , আর চোখ বুজে থাকলে আরও ভালভাবে বোঝা যায় যে ঘ্রাণসীমার আওতায় নতুন কারা ঢুকছে কিংবা বেরোচ্ছে। লিফট থেকে নেমে পায়ে হেঁটে হাওয়াজাহাজে ঢোকা পর্যন্ত অপরিচিত মানুষের নজরবন্দী থাকতে হ’ল । তাঁর সামনের লোকটির হাত থেকে আবার বইটি পড়ে গেলো। তেমন কিছু বড় ঘটনা নয়, কিন্তু সবাই মনে মনে আলোড়িত হ’ল। নিজের ঘরের মেঝেতে পড়লে, মেঝে নিজে থেকেই উঁচু হয়ে বইটি তুলে দিত। কিন্তু জাহাজে ওঠার প্যাসেজে সে সুবিধা নেই, তাই সেই পবিত্র বই নিস্পন্দ হয়ে পড়ে রইলো। এই আচমকা বিভ্রাটে লোকটির পিছনের সবাইকে থামতে হ’ল। এদিকে সেই লোকটি বইটা না তুলে, নিজের দু’ বাহুর পেশী টিপে দেখতে শুরু করলো। এই অঘটন কি তার পেশীর দুর্বলতা জনিত? শেষমেশ লাইনের পেছনের একজন তাঁর গণকন্ঠস্বর ব্যবহার করে বলতে বাধ্য হ’লেন: “আমাদের দেরি হয়ে যাবে।” পুরো দল হুড়মুড় করে জাহাজে উঠে পড়লো, ভাশ্তির পায়ের নিচে পড়ে বইয়ের পাতা দলেমুচড়ে গেলো।
জাহাজের ভেতরে ঢুকে তাঁর উদ্বেগ আরও বাড়লো। ভেতরের ব্যবস্থাপাতি সেকেলে, অমার্জিত। তারপর তাঁকে আবার এক জন মহিলা এটেনডেন্টও দেওয়া হ’ল, যাত্রাকালীন সব আর্জি তাঁর কাছেই পেশ করতে হবে। জাহাজের কেবিনে কেবিনে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ঘুরন্ত প্ল্যাটফর্ম ছিল কিন্তু সেখান থেকে নেমে কেবিন অব্দি হেঁটেই যেতে হ’ল। সব কেবিন সমান ভালো না, সেরা কেবিন তাঁকে দেওয়া হয়নি। এটেনডেন্ট নিশ্চয়ই ইচ্ছা করে বদমায়েশি করেছে, রাগে ভাশ্তির সারা গা কেঁপে উঠলো। কাঁচের ভাল্ভ বন্ধ হয়ে গেছে, ফিরে যাওয়ার পথ বন্ধ।
বন্ধ কাঁচের মধ্যে দিয়ে দেখলেন, তাঁর লিফট নিঃশব্দ পিস্টনের মত ওঠানামা করছে – ফাঁকা । তাঁর পায়ের নিচে সারে সারে কাঁচের টালির তলের নিচে তলায় তলায় থাকে থাকে সাজানো কামরা, ঠিক তাঁর কামরার মত, পাতাল থেকে আরও আরও নিচে, প্রতিটি কামরায় একজন মানুষ বসে খাচ্ছে, ঘুমোচ্ছে বা নতুন ভাবনা তৈরি করছে। এই অর্বুদ অর্বুদ কামরার মহামৌচাকের মধ্যে কোথাও তাঁর নিজের কামরা লুকিয়ে আছে। ভাশ্তির বুক ভয়ে কেঁপে উঠলো।
“ও মেশিন!” জপতে জপতে বই বুকে জড়ালেন তিনি, বুকটা জুড়োলো খানিক। তারপর দিবাস্বপ্নের মত সব স্বচ্ছতা মিলিয়ে গেল সব তল থেকে, অনচ্ছতায় হারিয়ে গেলো কামরার দরজা, লিফট, মেঝেয় পড়ে থাকা বই বাঁদিকে গড়িয়ে হারিয়ে গেলো, কাঁচের টালির সারি যেন বেনোজলের ঘূর্ণির মত আলগা হয়ে আছড়ে পড়লো, একটু ঝাঁকুনি, আর এক লহমায় হাওয়া-জাহাজ সুড়ঙ্গ ছেড়ে উষ্ণমন্ডলের সাগরের জলের তলা থেকে সিধে আকাশে চেগে উঠলো, খাড়াখাড়ি ।
তখন রাত। এক পলকের জন্য সুমাত্রার তটরেখা দেখা গেলো। ঢেউয়ের ফসফরাসি পাড়ওয়ালা তটে লাইটহাউসের চুড়ো, নেহাত বেদরকারে সামুদ্রিক আঁধারকে আলো দিয়ে ফালাফালা করে চলেছে। তারপর অন্ধকারকে ছেদ করার জন্য শুধু তারাদের সূচাগ্র আলোই সম্বল। তারার মালা ভাশ্তির আগে পিছে দুলতে দুলে একবার এ জানলায় আরেকবার ও জানলায়, জাহাজ দুলছে না দুনিয়া দুলছে বোঝা দায়। সাফ হাওয়ার রাতে তারারা যেন জোনাকির ঝাঁক – কখনও জানালার বাইরে, কখনও ভেতরে। তারা নিজেরা অগণন আলোকছিদ্র হয়ে প্রহরারত, মহাবিশ্বের অতলকৃষ্ণ অন্ধকারকে মানুষের চোখের কৃষ্ণ গহ্বরে মিশতে দিচ্ছে না। কিন্তু সাথে সাথে তারা বিষিয়ে দিচ্ছে মানুষের চোখের বিশ্রান্তি।
“আমরা কি এভাবে অন্ধকারে থাকবো?” যাত্রীরা বিরক্ত হয়ে ডাকাডাকি জুড়লো। এতক্ষণ হাত গুটিয়ে বসে থাকার পর এটেনডেন্ট আলো চালিয়ে, নরম ধাতুর পর্দা নামিয়ে দিলো। যে যুগে তৈরি এই হাওয়া জাহাজ, তখন মানুষ প্রকৃতির সবটুকু প্রত্যক্ষ দেখতে ভালবাসত, তাই এত জানলা আর ঘুলঘুলির ছড়াছড়ি। এই যুগের মার্জিত মানুষের এতে অস্বস্তি হওয়াই স্বাভাবিক। ভাশ্তির কেবিনের পর্দার একটা খুঁতের ফাঁক দিয়ে একলা এক তারার চোরা আলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে লাগলো। তারপর এক অচেনা আভা তাঁকে পুরোপুরি জাগিয়ে দিলো। ভোর হয়েছে।
যত ত্বরিতে জাহাজ পশ্চিমে ছুটেছে, পৃথিবী পূর্বে ঘুরেছে তার চেয়েও দ্রুত, আর ভাশ্তিদের আবার টেনে এনেছে সূর্যের দিকে। বিজ্ঞান রাতকে দীর্ঘতর করার চেষ্টায় অল্পই সফল হয়েছে। আর পৃথিবীর আহ্নিক গতি প্রশমিত করার জন্য তৈরি বৈপ্লবিক যন্ত্রতন্ত্র নিজে থেকেই অস্ত গেছে, আরও অনেক দুরাশাবাদী যন্ত্রতন্ত্রের সাথে সাথে। বিগত সভ্যতার লক্ষ্য ছিল সূর্যশিকার – সূর্যের সাথে তাল রাখা বা তাকে পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া। অবিশ্বাস্য গতির রেসিং এরোপ্লেন আবিষ্কার আর তার চালনা করতে এই যুগের সেরা বুদ্ধিবৃত্তি ব্যয়িত। পশ্চিমে, আরও পশ্চিমে, আরও আরও পশ্চিমে পৃথিবীকে বেড়ে ঘুরতে থাকত তারা। করতালিতে ফেটে পড়ত দুই গোলার্ধ। কিন্তু হা হতোস্মি! পৃথিবীও তার পুবালী ঘূর্ণন বেগ বাড়িয়ে দিলো, আর ভয়াবহ নানা অঘটন ঘটতে লাগলো আকাশে। মেশিন কমিটি তখন ক্ষমতার মধ্যগগনে চড়ছে। তারা ফতোয়া দিল এই রেস বেআইনী, বেযন্ত্রতান্ত্রিক এবং এর সাজা বেঘরকরণ। বেঘরকরণ নিয়ে বিস্তারিত পরে।
কমিটি অবশ্যই ছিল সর্বতোভাবে সঠিক। কিন্তু “সূর্যশিকার” ছিল গ্রহব্যাপী মানুষের শেষ সম্মিলিত ও সাগ্রহ আন্দোলন। এর পরে গ্রহান্তরের কোন অগ্নিপিন্ড বা গ্রহের কোন জ্বলন্ত সমস্যা নিয়ে সবাই মিলে কখনও এক হয়নি। এই দৌড়ে সূর্য জিতল বটে কিন্তু হারালো তার সব প্রভাব-প্রতিপত্তি । সূর্য়ের দৈনিক কীর্তি – সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা, রাশিচক্র – মানুষের দৈনিক জীবনে-মননে সব গুরুত্ব হারাল। মানুষদের সাথে বিজ্ঞানও পাতালপ্রবেশ করলো। যে যে সমস্যা সে নিশ্চিত ভাবে মেটাতে পারবে, শুধু সে সে সমাধানের সাধনাতেই ব্রতী হ’ল সে।
ভোরের আলোর রক্তাভ আঙুল যখন ভাশ্তির কেবিন জুড়ে আর তাঁর নিমিলীত চোখে চোখ-গেল পাখির ডাকের মত অসহ হয়ে উঠলো, তিনি বিরক্তভাবে পর্দা আরও নিচে টেনে নামাবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পর্দা সপাটে ওপরে গুটিয়ে গেলো। ঘুলঘুলি জুড়ে গোলাপী খুদে মেঘেরা, নীলের সাগরে মৃদুমৃদু দুলছে। সূর্য যত চড়তে লাগলো সোনালী আলোর স্রোত কেবিন ততই ভাসিয়ে দিতে লাগলো। সেই আলোর চাল হাওয়া-জাহাজের মতই দুলকি হলেও তা যেন চোরা জোয়ারের মত ধেয়ে আসছিলো ভাশ্তির দিকে। এখুনি যেন তাঁর মুখে ঝাপটা দেবে। আতঙ্কিত হয়ে তিনি বোতাম টিপলেন, এটেন্ডেন্টকে তলব করলেন । সেও আতঙ্কিত, কিন্তু পর্দা মেরামতি তার সাধ্যের বাইরে। “ভদ্রমহোদয়াকে আরেকটি কেবিনে নিয়ে যাওয়া হবে, শীঘ্রই!”
সারা পৃথিবীর মানুষের আদবকায়দা অবিকল এক, কিন্তু বোধহয় তার পেশাগত কারনেই এটেনডেন্টের বিনয়শীল একটু আলাদা। যাত্রীদের সাথে সরাসরি কথা বলতে হয় তাকে তাই যেন একটু বিশেষ রকম রুঢ়তা তার স্বভাবগত। ভাশ্তি যখন ভয়ে চিৎকার করে আলোর থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলেন, এটেন্ডেন্ট তখন অভাবনীয় এক অসভ্যতা করে বসলো – তাঁর গায়ে হাত দিয়ে ঠেকা দিলো, যাতে তিনি পড়ে না যান।
“কি করছো তুমি? কোন সাহসে? ” হিসহিসিয়ে উঠলেন তিনি।
ঘাবড়ে গিয়ে মাপ চাইল সে। ভাশ্তির পড়ে যাওয়ার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা উচিত হয় নি তার। মানুষের শরীর স্পর্শ করার অভ্যাস মানুষের চলে গেছে, মেশিনের দৌলতে।
“আমরা এখন কোথায়?” ভাশ্তি বেশ তীব্রভাবেই জানতে চাইলেন।
“এশিয়ার ওপরে,” মাত্রাতিরিক্ত বিনয়ের সাথে উত্তর এলো।
“এশিয়া?”
“ক্ষমা করবেন। আমি খুব হালকাভাবে কথাটা বলে ফেলেছি। এটা আমার বদভ্যাস। যে সব স্থানের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি সেগুলোর মেশিন-অনুমোদিত নাম বলা উচিত আমার, পুরনো নাম না। ”
“ওহ, আমার এশিয়ার নাম মনে আছে। মোঙ্গোলরা ওখান থেকেই। ”
“আমাদের পায়ের ঠিক নিচে এক সময় খোলা হাওয়ায় সিমলা নামে এক শহর ছিল। ”
“তুমি কি মোঙ্গোল বা ব্রিসবেন স্কুলের নাম শুনেছো?”
“না।”
“ব্রিসবেনও খোলা হাওয়ায় ছিলো।”
“ডানদিকের এই পর্বতমালা – দাঁড়ান আমি দেখাচ্ছি আপনাদের।” ধাতুর পর্দা তুলতেই হিমালয়ের প্রধান শৃঙ্গমালা জেগে উঠলো। “একসময় এই পর্বতমালাকে পৃথিবীর ছাদ নামে ডাকা হ’ত।”
“কি বোকা বোকা নাম!”
“মহোদয়া, এ কথা ভুললে চলবে না, আমাদের সভ্যতার উদয়ের আগে এই পাহাড়ের উচ্চতা তারাদের সমান মনে করা হত। সবাই ভাবত এত উঁচুতে শুধু দেবতারাই থাকতে পারেন। মেশিনকে ধন্যবাদ সেখান থেকে আমাদের কিভাবে এগিয়ে এনেছে এখানে! “ “মেশিনকে ধন্যবাদ আমাদের কিভাবে এগিয়ে এনেছে এখানে! ” ভাশ্তি বললেন।
“ মেশিনকে ধন্যবাদ আমাদের কিভাবে এগিয়ে এনেছে এখানে! ” আগের রাতে হাত থেকে বই ফেলে দেওয়া যাত্রীটিও বলে উঠলো প্যাসেজে দাঁড়িয়ে। “আর ঐ ফাটলের ফাঁকে ফাঁকে সাদা সাদা? ওগুলো কি?”
“জানতাম, ভুলে গেছি।”
“”জানলাটা ঢেকে দিন দয়া করে। এই পাহাড় দেখে কোন নতুন ভাবনা আসছে না।”
হিমালয়ের উত্তরী ঢালে ঘন ছায়া : ভারতীয় ঢালে রোদ সদ্য উঠেছে। সাহিত্যযুগে খবরের কাগজ বানানোর জন্য তরাইয়ের সারা জঙ্গল মুড়িয়ে কাগজের মণ্ড হয়েছে, কিন্তু তবু বরফের বুকে ভোরের রোদ ঝিকোচ্ছে, কাঞ্চনজঙ্ঘার বুকে মেঘেরা এখনো দোল খাচ্ছে।সমতল জুড়ে শহরের ধ্বংসাবশেষ। পঙ্গু নদীরা ধুঁকে ধুঁকে তাদের দেয়াল আঁকড়ে ধরে চলছে। মাঝে মাঝে ভমিটারি, মানে একালের জীয়ন্ত শহর। পুরো নকশার ওপর দিয়ে হাওয়া-জাহাজদের অবিরাম ছোটাছুটি, নির্বিকার নির্লজ্জতায় সব সীমালঙ্ঘন আর নীচ বায়ুস্তরের ঝঞ্ঝাট এড়িয়ে ইচ্ছে হলেই ‘পৃথিবীর ছাদ’-এর পানে খাড়াই, উদাস উড়াল।
“আমরা সত্যিই এগিয়েছি মেশিনের কল্যাণে,” আবার বললো এটেন্ডেন্ট, আর ধাতুর পর্দা দিয়ে হিমালয়কে গায়েব করে দিল।
দিন শম্বুকগতিতে এগোতে লাগলো। সহযাত্রীরা নিজের নিজের কেবিনকুঠুরিতে বসে নিজ নিজ প্রতিবেশীর উপস্থিতিকে সর্বদেহান্তঃকরণে নীরবে ঘেন্না করে চললেন। আর ছেড়ে আসা নিজের নিজের পাতালকুঠুরির স্মৃতিতে উতলা হতে লাগলেন। তাঁদের মধ্যে আট দশ জন সদ্যপুং, পাবলিক নার্সারির ঘর ছেড়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে সদ্যমৃতদের খালি হওয়া কুঠরি দখল করতে চলেছে। বই-বাহিক ব্যক্তিটি ঘরে ফিরছে। সুমাত্রায় বংশবৃদ্ধি করার ঠিকে কাজ সমাধা ক’রে। একমাত্র ভাশ্তিই স্বেচ্ছাযাত্রী।
দুপুরে আরেকবার পৃথিবী দর্শন করলেন তিনি। হাওয়া-জাহাজ আরেক পর্বতমালার পাশ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ দেখা যায় না, মেঘে ঢাকা। কৃষ্ণপ্রস্তরের বিপুল চাঙর তাঁর পদতলে ভাসমান, তারা ছাইরঙ্গের মেঘে মিলিয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝেই। অপরূপ আচাভুয়া আকার তাদের; তার মধ্যে একটি যেন শায়িত পুরুষদেহ।
“কোনও নতুন ভাবনা নেই” বলে ভাশ্তি ককেশাস পাহাড়ের ওপর ধাতুর পর্দা ফেলে দিলেন। বিকেলে আরেকবার পর্দা তুললেন তিনি। সোনালী সাগরের মধ্যে ফোঁটা ফোঁটা দ্বীপ আর একটিমাত্র উপদ্বীপ।
আবার বলতে বাধ্য হলেন তিনি, “কোনও নতুন ভাবনার বংশও নেই,”আর গ্রীসকে ধাতুপর্দা দিয়ে ঢেকে দিলেন।
২ মেরামতির কল
সুড়ঙ্গ হয়ে, লিফট হয়ে, পাতালরেল হয়ে, প্ল্যাটফর্ম হয়ে, চিচিংদরজা হয়ে – ঠিক যে যে পথে যাত্রা শুরু হয়েছিলো, ঠিক ঠিক তার উলটপুরাণ করে ভাশ্তি তাঁর ছেলের ঘরে ঢুকলেন। অবিকল তাঁর নিজের ঘর যেন। যেন মনে হ’ল বলে উঠবেন এত দূর আসার কোনো মানেই হয় না। বোতাম, রেগুলেটর, পড়ার টেবিলে ‘বই’, ঘরের তাপমান, আর্দ্রতা , আলো – সব হুবহু নিজের কামরার মত। তিনি আর তাঁর নিজের রক্তমাংস কুনো, যদি শেষমেশ পাশাপাশি দাঁড়ায়, তাতে বাড়তি লাভ আছে কি কিছু, একজন ভদ্রমহিলা মা হয়ে নিজের ছেলের সাথে কি তিনি কি কখনো হ্যান্ডশেক করতে পারেন?
ছেলের চোখে চোখ না রেখে তিনি বলে উঠলেন:
“এসেছি আমি। খুব কঠিন ছিল আমার আসা, আমার আত্মা যেন তলিয়ে গেছে আরো। একেবারেই পোষায় না, কুনো, এসব আমার একেবারেই পোষায় না। আমার সময়ের অনেক দাম। আরেকটু হ’লে সূর্যের আলো সরাসরি আমার গায়ে পড়তো, জংলি লোকদের সাথে একাসনে বসতে হয়েছে। আমি খুব বেশি হলে কয়েক মিনিট থাকতে পারি। যা বলার বলে ফেলো, আমায় ফিরতে হ’বে। ”
“আমায় বেঘর করার হুমকি এসেছে মা,” কুনো বললো।
এবার ছেলের চোখে চোখ রাখলেন তিনি।
“আমায় বেঘর করার হুমকি এসেছে, এই খবর মেশিনের মধ্যে দিয়ে দেওয়া যায় না।”
বেঘরকরণ আসলেই মৃত্যুদন্ড। খোলা হাওয়ায় দন্ডিতের মৃত্যু অবধারিত। “তোমার সাথে শেষ কথা হওয়ার পর আমি বাইরে গেছিলাম। সেই বিরাট কান্ডের পর ওরা আমায় ধরে ফেললো। ”
“কিন্তু বাইরে গেলে কি সমস্যা?” বিরক্ত হলে তিনি, “বাইরে বেরোনো বেআইনি নয়, বে যান্ত্রিকও নয়। ভূপৃষ্ঠ সফর করাই যায়। আমিও তো গেলাম সমুদ্রের ওপর ভাষণ শুনতে; কোন মানা নেই; শুধু রেস্পিরেটর ডাকিয়ে নিতে হয় একটা আর সফর পারমিট। এটা ঠিক যে আধ্যাত্মিক ভদ্রলোকরা যান না ওখানে, আমি তো তোমায় পই পই করে বারণ করেছিলাম, কিন্তু আইনি বাধা তো এতে কিছু নেই। ”
“আমি সফর পারমিট নিই নি।”
“তাহলে বেরোলে কি করে?”
“আমি নিজে নিজে একটা রাস্তা খুঁজে বের করলাম।”
এই দুর্বোধ্য কথাটা দু’বার করে বলতে হ’ল।
“নিজে নিজে রাস্তা খুঁজলে?” তাঁর গলা বুজে এলো। ফিসফিসিয়ে বললেন, “কিন্তু সেটা তো ভুল।”
“কেন?”
এবার তাঁর প্রচন্ড ভাবে আঁতকে ওঠার পালা।
“তুমি কিন্তু মেশিনকে পুজো করতে শুরু করে দিয়েছ,” হিমশীতল কন্ঠে সে বললো, “তোমার ধারণা আমি নিজে নিজে রাস্তা খুঁজে অধর্মের পথে গেছি। কমিটি আমাকে বেঘর করার হুমকি দেওয়ার সময় ঠিক এই কথাই বললো।”
খুব চটে গেলেন তিনি, চেঁচিয়ে উঠলেন জোরে।“পুজো আমি করি না কখনোই। আমি আদ্যন্ত প্রগতিশীল। আমি তোমায় অধার্মিক ভাবিনি, ধর্ম বলে কিছুই টিকে নেই। ধর্মের নামে সব ভয় আর কুসংস্কার মেশিন আগেই ধ্বংস করে দিয়েছে। আমি শুধু বলতে চাইছিলাম যে নিজে নিজে রাস্তা খুঁজে বের করা আসলে – ব্যাপারটা হ’ল আলাদা বা নতুন রাস্তা নেই কোন।”
“সেটাই সবসময় ধরে নেওয়া হয়।”
“ভমিটারির ভেতর দিয়ে সফর পারমিট নিয়েই বেরোতে হয় ভূপৃষ্ঠে, এছাড়া বেরোনো অসম্ভব। বইয়ে তাই বলে। ”
“বই ভুল বলে। আমি নিজের পায়ে গিয়ে দেখেছি।”
কুনোর শারীরিক শক্তি কিন্তু বেশ ভালোই।
ইদানীং শারীরিক ভাবে শক্তপোক্ত হওয়াকে একেবারেই প্রশ্রয় দেওয়া হয় না। জন্মের সময় প্রতিটি শিশুর সম্ভাব্য দৈহিক শক্তি পরীক্ষা করা হয় আর বেশী শক্তপোক্ত হবে মনে হলে নিধন করা হয় তাকে। মানবিকতার ধ্বজাধারীরা হয়তো আপত্তি করবেন, কিন্তু শক্তপোক্ত শিশুদের বড় হয়ে ওঠার জন্য এই মেশিন পৃথিবী ঠিক জায়গা নয়। সেই শিশুদের মেরে ফেলে তাদের বাঁচিয়ে দেওয়া হয়, এটা করুণার প্রকাশ, নিষ্ঠুরতা নয়। গাছে চড়ার, পাহাড়ে ওঠার, নদীর উজানে সাঁতার কাটার, খোলা মাঠে দৌড়ানোর জন্য ক্রমাগত তাদের উদ্বৃত্ত দৈহিক শক্তি তাদের প্ররোচিত করবে, কিন্তু মেশিন পৃথিবী তাকে তা করার জায়গা দেবে না। নিজের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়া, অভিযোজিত হওয়া, এটাই মানুষের উচিত কাজ, নয় কি? সভ্যতার উষায় দুর্বল শিশুদের তাগেতোস পর্বতশিখরে বলি দেওয়া হ’ত, আর সভ্যতার সায়ংকালে সবল শিশুদের বেদনাহীন অনিচ্ছাবলি দিতে হ’বে, যাতে মেশিন এগিয়ে যেতে পারে, যাতে মেশিন এগিয়ে যেতে পারে, যাতে মেশিন এগিয়ে যেতে পারে, যাতে মেশিন এগিয়ে যেতে পারে, অনন্ত প্রগতিপথে।
“জানো, স্থান নিয়ে আমাদের বোধ হারিয়ে গেছে। আমরা বলি বটে ‘স্থানকে আমরা বিলীন করে দিয়েছি’ কিন্তু স্থান বিলীন হয়নি, বিলীন হয়েছে স্থান নিয়ে আমাদের শরীরের বোধ। আমাদের নিজেদের একটা অংশ হারিয়ে গেছে। আমি গোঁ ধরেছিলাম সেটা আমি ফিরে পাবই। প্রথমে আমি আমার কামরার বাইরের রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম ধরে হাঁটাহাঁটি শুরু করলাম। শুরু থেকে শেষ, শেষ থেকে শুরু, শুরু থেকে আবার শেষ, যতক্ষণ শক্তিতে কুলায়। আস্তে আস্তে ‘কাছে’ আর ‘দূরে’-র বোধ ফিরতে শুরু করলো। ‘কাছে’ মানে পায়ে হেঁটে খানিক গিয়েই যেখানে পৌঁছতে পারি, যেখানে ট্রেন বা হাওয়াজাহাজে করে দ্রুত যাওয়া লাগবে না। ‘দূরে’ মানে যেখানে পায়ে হেঁটে দ্রুত যাওয়া যাবে না; ভমিটারি ‘দূরে’, যদিও ট্রেনে করে সেখানে আটত্রিশ সেকেন্ডে পৌঁছানো যায়। ”
মানুষের মাপেই সব। এটাই শিখলাম প্রথম। মানুষের পায়ের মাপে দূরত্ব, হাতের মাপে স্বত্ব আর মালিকানা আর শরীরের মাপে প্রেম, কাম আর শক্তি। তারপর আমি আরে এগোলাম; তখনই আমি তোমাকে ডাকলাম, কিন্তু তুমি এলে না কিছুতেই।
“তুমি তো জানোই আমাদের এই শহর মাটির অনেক নিচে গড়া, শুধু ভমিটারিগুলোই ভূপৃষ্ঠ অব্দি খাড়িয়ে আছে। আমার কামরার পাশের প্লাটফর্মে পায়চারি করতে করতে লিফট নিয়ে তার পরের তার ওপরের প্ল্যাটফর্মে গেলাম, সেখানে পায়চারি করলাম। তারপর পর পর প্ল্যাটফর্ম পার করতে করতে সবার ওপরেরটায় গেলাম। যার ঠিক ওপরেই ভূপৃষ্ঠ। প্রত্যেকটা প্ল্যাটফর্ম অবিকল এক। এত প্ল্যাটফর্ম এত ঘন্টা পায়চারি করে লাভের মধ্যে আমার স্থানবোধ আর পেশীশক্তি বাড়ছিলো। এতেই আমি খুশি থাকতে পারতাম – এও কম কি – কিন্তু পায়চারি করতে করতে আমার মাথায় এলো যে আমাদের শহরগুলো যখন বানান হয়েছিলো মানুষ তখনো খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিত, মাটির ওপর থেকে নিচে শ্রমিকদের শ্বাস নেওয়ার জন্য নিশ্চয়ই ভেন্টিলেশন শ্যাফট ছিলো। এটা মাথায় আসার পর থেকে ভেন্টিলেশন শ্যাফট ছাড়া আর কিছু নিয়েই ভাবতে পারছিলাম না। মেশিন যখন মাটির নিচে ফুড টিউব, মেডিসিন টিউব, মিউজিক টিউব বানালো তখন কি এই শ্যাফটগুলো সব নষ্ট করে দিয়েছিলো? নাকি সেগুলো এখনো আছে? একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম। যদি কিছু পাওয়া যায়, তাহলে সবচেয়ে ওপরের তলার রেলস্টেশনের আশেপাশেই পাওয়া যাবে। বাকি সব জায়গায় নতুন কাজ হয়ে গেছে।”
“আমি আমার গল্পটা গড়গড় করে বলছি বলে তুমি মনে কোরো না যে আমি ভয় পাইনি বা তোমার কথায় আমি কষ্ট পাইনি। আমি জানি যে এইটা ঠিক না, এটা অযান্ত্রিক, ভদ্রলোকেরা পাতাল রেলের লাইন ধরে হাঁটে না। ভেবো না আমি ভয় পাইনি যে লাইভ রেলে পা পড়ে আমি মরে যাব। কিন্তু তার থেকেও বেশি ভয় পেয়েছি অন্য এক ধোঁয়াশাকে – মেশিন এর ভাবনার বাইরে কিছু ভাবাকে। কিন্তু আমি নিজেকে আবারও বললাম ‘মানুষের মাপেই সব’, আর আমি বার বার খানাতল্লাশি করতে গেলাম। অনেকবার গিয়ে গিয়ে একটা ফাঁক পেলাম।”
“টানেল গুলো, তুমি তো জানোই, আলোয় ঝলমল। আলোয় আলো, নকল আলো; অন্ধকার সেখানে দুরস্ত। টালির সারিতে একটা ফাঁক দেখলাম, এটা অস্বাভাবিক, তাই আমি খুবই উল্লসিত হলাম। আমি হাত ঢোকালাম – জায়গা বেশি ছিল না – আর আনন্দে হাত ওর ভেতরেই নাড়তে শুরু করলাম। আরেকটা টালি আলগা হ’ল, মাথা ঢোকালাম ভেতরে, আর অন্ধকারে ছুঁড়ে দিলাম আমার চিৎকার: ‘ আমি আসবো, আমি পারবো, পারবো,’ শত শত শাখাসুড়ঙ্গ থেকে প্রতিধ্বনি ফিরে ফিরে এলো। সব পাতালশ্রমিকদের আত্মাদের ফিসফিসানি যেন কানে এলো, যারা প্রতি রাতে কাজের শেষে তারার আলোয় নিজের বঁধুর পাশে ফিরে যেত। খোলা হাওয়ায় জন্মজন্মান্তর কাটানো বিদেহীরা আমার ডাকে সাড়া দিলো, ‘তুমি পারবে, তুমি আসবে।’”
একটু থামলো সে, আর তার শেষের কথাগুলো আজগুবি হ’লেও , আশ্চর্য, যেন তাঁর মনেও একটু দোলা দিল। কুনো কিছুদিন আগে বাবা হবার জন্য দরখাস্ত করেছিল। কমিটি তা নাকচ করেছে। ওর মত আত্মাদের জন্মান্তর চায় না মেশিন, একেবারেই।
“হঠাৎ ট্রেন গেল একটা। আমার গায়ের পাশ দিয়ে গেল, কিন্তু আমার হাত আর মাথা তখন গর্তে। এক দিনের জন্য যথেষ্ট খাটুনি গেছে ভেবে ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে ফিরলাম, লিফটে ক’রে নিচে নামলাম, আর নিজের বিছানা ডাকলাম। আহ সেই রাত কি স্বপ্নমুখর ছিলো! আবার তোমায় ফোন করলাম, আবার তুমি আসতে নারাজ হ’লে। ”
এবার তিনি মাথা নেড়ে বললেন:
“না, না এসব ভয়ানক কথাবার্তা বন্ধ করো। তুমি জীবন জলাঞ্জলি দিচ্ছো। সভ্যতাকেও জলাঞ্জলি দিচ্ছো।”
“কিন্তু স্থানের বোধ নিজের শরীরে ফিরে পেলে মানুষ আর থেমে থাকতে পারে না। ঐ গর্তে আমাকে ঢুকতেই হবে। ঐ শ্যাফট বেয়ে আমাকে উঠতেই হবে। আমি কাঁধ আর হাতের ব্যায়াম করা শুরু করলাম। সারা দিন ধরে হাতের নানা অংগভঙ্গি করে করে হাতে ব্যথা হয়ে যেত, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আমি হাতে ভর দিয়ে পুরো শরীর ঝোলাতে পারতাম, হাত টান টান করে টানা কয়েক মিনিট আমার বালিশ ধরে রাখতে পারতাম।
এর পরেই রেস্পিরেটর ডাকিয়ে নিলাম আর কাজ শুরু করলাম।”
“প্রথম প্রথম সহজই ছিল ব্যাপারটা। গাঁথনি আলগাই ছিল, আরও টালি ভেঙ্গে ভেতরে ঠেলে দিলাম, অন্ধকারে হামাগুড়ি দিয়ে নিজেকে গর্তের ভেতর ঠেলে দিলাম। মৃত আত্মারা আমায় সাহস দিল। আমি ঠিক বলতে পারছি না, বোঝাতে পারছি না এই ব্যাপারটা। কিন্তু আমার এটাই মনে হচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এই প্রথম কোন প্রতিবাদ রুজু হল, তাই অতীতের আত্মারা আমায় সাহস দিচ্ছে, আর আমি সাহস দিচ্ছি ভবিষ্যতের আত্মাদের, যারা এখনো জন্মায়নি। আমার মনে হ’ল আছে, মানবতা আছে, সেই মানবতা পোশাকি নয়, নগ্ন। কিভাবে বোঝাই তোমায়? নগ্ন, মানবতা নগ্ন, এই টিউব, বোতাম, মেশিন আমাদের সাথে আসেনি, আমাদের সাথেও যাবে না, আর এখানে থাকার সময়েও এরা আমাদের জন্য খুব জরুরি না। আমার মনের আরও জোর থাকলে, আমার শরীরের সব কাপড়ের বাঁধন ছিঁড়ে ফেলে পৃথিবীর বুকে খোলা হাওয়ায় নগ্ন হয়ে দাঁড়াতাম। কিন্তু এ আমার দ্বারা হবে না, হয়তো আমাদের প্রজন্মের দ্বারাও হবে না। আমি রেস্পিরটরে চড়ে বসলাম, স্বাস্থ্যসম্মত কাপড় আর পুষ্টিকর ট্যাবলেটের সাথে! এটাই মন্দের ভালো আপাততঃ।”
“মই পাওয়া গেলো একটা, কোন আদিম ধাতু দিয়ে গড়া। রেলওয়ের থেকে আলো চুঁইয়ে পড়ছে মইয়ের নিচের ধাপে, দেখলাম শ্যাফটের নিচের ভাঙ্গাচোরা রাবিশ থেকে ধাপে ধাপে মই খাড়া উঠে গেছে শ্যাফট বেয়ে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা সারাদিন বহুবার করে ওঠানামা করতেন, এখান থেকে নিজেদের বিল্ডিং-এ যাওয়া-আসা করতেন। মইয়ের ধাপ অব্যবহারে কর্কশ, গ্লাভসের মধ্যে দিয়ে আমার হাত ছড়ে রক্ত পড়তে লাগলো। আলো ফুরিয়ে গেল, আঁধার এলো, আর সাথে এলো অসহ্য নৈঃশব্দ। সেই নৈঃশব্দ আমার কানে তরোয়ালের মত বিঁধতে লাগলো। মেশিন কিন্তু কখনো নিঃশব্দ না। জানো? গুনগুন, গমগম করে ক্রমাগত, সেই আওয়াজ আমাদের রক্ততন্তুর মধ্যে ভরে দেয়, হয়তো আমাদের চিন্তাকেও চালায়, কে জানে! আমি এর শক্তির আওতার বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম। আমি ভাবলাম, ‘মেশিন চুপ করে আমার ভুল দেখছে।’ কিন্তু আবার আমি কিছু আওয়াজ শুনতে পেলাম, মনে জোর এলো। ” হেসে ফেললো সে, “আমার দরকার ছিল ঐ আওয়াজগুলো শোনার। পরের মুহূর্তেই আমার মাথা খুব জোরে ঠুকে গেলো। ”
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“যে বায়ুছিপিগুলো বাইরের বাতাস ঢুকতে দেয় না ভেতরে, তার একটাতে আমার মাথা ঠুকে গেলো। হাওয়াজাহাজেও ঐ ছিপি দেখেছো নিশ্চয়ই। নিরেট অন্ধকারের মধ্যে আমি নিরালম্ব, আগে পিছে কিছু নেই, হাত রক্তে ভেজা; কি করে কি আমি সামলাবো? কিন্তু সেই গলার আওয়াজ তখনো শুনছি, সাহস দিয়ে যাচ্ছে তারা আমায়। আমি হাতড়ে হাতড়ে ঐ ছিপির জোড় খুঁজতে লাগলাম। বায়ুছিপিগুলো প্রায় আট ফুট চওড়া, আমি হাতড়াতে হাতড়াতে কোন জোড়, কোন খোঁচ কিছুই পেলাম না। পুরোপুরি সমান। আমার মাথা বোধহয় ছিপির মাঝবরাবর ছিল। ঠিক মাঝে কি না বোঝার উপায় নেই, আমার হাতের নাগালের একদম সীমায় রয়েছে বায়ুছিপির নিচের তল। আবার সেই কন্ঠস্বর আমার কানে বললো: ‘মই ছাড়ো। লাফাও। লাফিয়ে ছিপির মাঝের হ্যান্ডেলটা ধরে ঝুলে পড়ো। করো বা মরো। কোন হ্যান্ডেল যদি না থাকে তবে তো মরবেই। শ্যাফট বেয়ে নিচে পড়ে খানখান হয়ে মরবে। তবু এস্পার নয় ওস্পার তোমায় করতেই হবে। নিজের পথ আটকে তুমি কি চিরকাল এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকবে?’ লাফালাম আমি, হ্যান্ডেলও ছিল, আর -”
ও থামলো। মায়ের চোখে জল এল। এই আছে ছেলের কপালে, জানতেন তিনি। আজ না মরলেও কাল মরবে সে। এরকম ছেলের জন্য এই মেশিনের দুনিয়ায় ঠাঁই নেই। তাঁর করুণার ধারায় ঘেন্না মিশলো। তাঁর মত মায়ের এরকম ছেলে! এত শ্রদ্ধেয়া এত ভাবনাশীল তিনি! এটা ঠিক হতে পারে না। এই ছেলে কি সেই ছেলে যাকে তিনি হাতে ধরে বোতাম টেপা, স্টার্ট, স্টপ, সব শিখিয়েছেন, ‘বই’ পড়া শিখিয়েছেন? ওর ঠোঁটের ওপর বালের রেখা দেখেই মনে হচ্ছে ও যেন আদিম হবার পথে হাঁটছে। আদিম পুরুষদের জন্য মেশিন তাঁর করুণা নষ্ট করেন না।
“হ্যান্ডেলও ছিল, ধরতেও পেরেছিলাম। ঝিমধরা অন্ধকারে ত্রিশঙ্কু হয়ে ঝুলতে ঝুলতে শুনলাম মেশিনের শেষ গুঞ্জন আমার পায়ের তলায় মিলিয়ে যাচ্ছে, যেন স্বপ্ন ভাঙ্গছে। যা কিছুকে এতদিন এত জরুরি ভেবেছি, টিউবের মধ্যে দিয়ে যাদের সাথে এত কথা বলেছি এতদিন, সব তুচ্ছ মনে হ’ল। এদিকে হ্যান্ডেল ঘুরতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে। আমার ওজন কিছু যন্ত্রের ওপর চাপ ফেলেছে, আমি ঘুরতে শুরু করলাম, আর তারপর – ”
“বুঝিয়ে বলা মুশকিল। খোলা রোদালো আকাশের নিচে মুখ থুবড়ে পড়ে আছি আমি, কান আর নাক রক্তে ভেসে যাচ্ছে, আর শুনতে পারছি প্রচন্ড গর্জন। বায়ুছিপি আমাকে নিয়ে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে আর আমায় আছড়ে ফেলেছে ভূপৃষ্ঠে। কলে বানানো নিচের নকল হাওয়া খোলা ভেন্ট দিয়ে হু হু করে বাতাসের ফোয়ারার মত খোলা হাওয়ার সাথে মিশছে। হামাগুড়ি দিয়ে সেই নকল হাওয়ার কাছে গেলাম – মুখ দিয়ে নিচের থেকে আসা চেনা হাওয়া পিয়ে খাবো ব’লে, খোলা হাওয়া বুকে লাগছিল। আমার রেস্পিরেটর না জানে কোথায় উড়ে গেছে, গায়ের জামা ফর্দাফাঁই, ফোয়ারার ধারে কাত হয়ে শুয়ে মুখ দিয়ে হাওয়া খেতে লাগলাম, যতক্ষন না নাক আর কান দিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ হয়। এর থেকে অদ্ভুত আর কি হতে পারে, ঘাসজমির মধ্যে এই খোলা গর্ত – পরে আরও বলছি এই ব্যাপারে – ভাঙ্গা মেঘের মধ্যে দিয়ে টুকরো টাকরা সূর্যের আলো – নির্ভার শান্তি, সারা শরীর ঘিরে খোলা জায়গা আর আমার গালের ওপর নকল হাওয়ার ঝর্না! ”
একটু পরেই আমার রেস্পিরেটরটা চোখে পড়লো। আমার মাথার ওপর ভাসছে, হাওয়ার স্রোতে একটু একটু দুলছে, আর তারও ওপর হাওয়ায় ভাসছে অগণন হাওয়া-জাহাজ। হাওয়া-জাহাজের জানলা দিয়ে নিচে কেউ তাকায় না, আর তারা তো আর আমায় তুলতে আসেনি। পড়ে রইলাম, অসহায়। সূর্যের ভাঙ্গা আলোয় শ্যাফটের ভেতরের মই কিছুটা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু ফেরার পথ নেই। নামতে গেলে হাওয়ার ফোয়ারা আমায় আবার ওপরে ছুঁড়ে ফেলে দেবে, বা আমি নিচে পড়ে গিয়ে মরবো। শুধু ঘাসের ওপর শুয়ে হাওয়ায় চুমুক দিতে দিতে চারপাশ দেখা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।
“আমি ওয়েসেক্সে আছি বুঝতে পেরেছিলাম, কারণ যাত্রা শুরুর আগে আমি একটা লেকচার শুনে নিয়েছিলাম। আমার এই কামরার ঠিক ওপরেই ওয়েসেক্স। এক সময় বেশ দুঁদে রাজ্য ছিল ওয়েসেক্স। এই রাজাদের দখলে ছিল পুরো দক্ষিণ উপকূল এন্ড্রেডসঅয়াল থেকে কর্নওয়াল অব্দি। উত্তরে ওয়ান্সডাইকের উঁচু জমি থেকে সুরক্ষা পেত রাজ্য। লেকচারার শুধু ওয়েসেক্সের উত্থান নিয়েই বলছিলেন। আন্তর্জাতিক শক্তি হিসাবে তারা কতদিন টিঁকে ছিল তা জানা হয়ে ওঠেনি, আর জেনেই বা কি হত। সত্যি বলতে কি আমার একটু হাসিই পাচ্ছিল। আমি, আমার পাশে বিরাট এক বায়ুছিপি, আর আমার মাথার ওপর রেস্পিরেটর, তিনজনেই এই ফার্নঘেরা ঘাসজমিতে বন্দি। ”
আবার গম্ভীর হ’ল কুনোর মুখ।
ভাগ্যক্রমে নিচের নকল হাওয়ার ফোয়ারা বন্ধ হল। ওপরের খোলা হাওয়া হু হু করে গর্তের ভেতর ঢুকতে থাকলো বাটিতে জল ভর্তি হওয়ার মত। হামাগুড়ি দেওয়ার মত শক্তি শরীরে আছে মনে হ’ল, আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালাম। শ্বাস নেবার সময় দু’রকম হাওয়ার স্বাদ পাচ্ছিলাম, যখন একটু চড়াই বাইছিলাম, যে হাওয়াটা বুকে লাগে সেটা বেশি পাচ্ছিলাম। খুব খারাপ লাগছিল না। আমার ট্যাবলেটগুলো হারায় নি, হঠাৎ খুব ফুর্তি হতে শুরু করল। মেশিনের কথা এতটুকু মনে পড়ছিল না। আমায় শুধু ঢাল বেয়ে উঠতে হ’বে আর ওপরে ফার্ণের ঝোপের কাছে দাঁড়িয়ে দেখতে হ’বে ওপারে কি আছে।
“ঢাল বেয়ে ওঠার জন্য পা চালালাম। ওপরের হাওয়া খুব তেতো, চোখে ঝাপসা ছাই রঙ্গের কিছু দেখলাম, আর পা পিছলে গড়িয়ে পড়লাম আবার। সূর্যের আলো আরও কমে এলো, হঠাৎ মনে পড়ল সূর্য এখন কর্কট রাশিতে – ওটাও ক’দিন আগে একটা লেকচারে শোনা। সূর্য যদি কর্কটে থাকে আর এটা যদি ওয়েসেক্স হয়, তাহ’লে আমার হাতে সময় বেশি নেই, দিনের আলো নিভে আসছে। (লেকচার থেকে আমার পাওয়া এটাই প্রথম তথ্য যেটা কাজের, আর এটাই বোধহয় শেষ। ) আমি হাঁকপাক করে খোলা হাওয়া বুকে ভরতে ভরতে চেষ্টা করতে লাগলাম যাতে নকল হাওয়ার ফোয়ারা-পুকুরের যত দূরে যেতে পারি। গর্তের মধ্যে হাওয়া ঢোকার গতি কমে আসছিল। পুকুর ধীরে ধীরে ভরছিলো। ফোয়ারার তেজ কমে আসায় রেস্পিরেটর শূন্য থেকে মাটির কাছাকাছি নেমে এসেছিলো। হাওয়ার হুহুঙ্কারও কমে এসেছিলো। ”
আবার দম নেবার জন্য থামলো সে।
“তোমার বোধহয় এই অব্দি শুনে আর ভাল লাগছে না। বাকিটা শুনতে তো আরোই ভালো লাগবে না। কোনো পছন্দসই ভাবনা পাবে না এতে, তোমায় এত কষ্ট দিয়ে নিয়ে আসা বোধহয় ঠিক হয়নি। আমরা খুব আলাদা, মা।”
তিনি বললেন বাকিটা তিনি শুনতে চান।
“চড়াই ভেঙ্গে পুরোটা ওপরে উঠতে উঠতে সন্ধে হয়ে গেলো। সূর্য পুরোপুরি ঢলে গেছে প্রায়। আশপাশ ভালো দেখা যাচ্ছে না। আমার পৃথিবীর ছাদে ওঠার বিবরণ শুনে তুমি ক্লান্ত তাই দূরের ঝাপসা পাহাড় দেখার গল্প শুনিয়ে তোমার ক্লান্তি আর বাড়াবো না। কিন্তু আমার মনে হ’ল ঐ পাহাড়গুলো জীবন্ত, তাদের ওপরের আচ্ছাদন যেন চামড়া, নিচে উচ্চাবচ মাংসপেশী, পাহাড়েরা অতীতের মানুষদের অসীম আকর্ষণে ডেকেছে, মানুষেরাও পাহাড়দের ভালোবেসেছে। এখন তারা যেন ঘুমন্ত – সেই ঘুম আর বুঝি ভাঙবে না। তারা বোধহয় স্বপ্নসঙ্কেতে মানুষের সাথে কথা বলে। ধন্য হোক সেই পুরুষ, ধন্যা হ’ন সেই নারী, যিনি ওয়েসেক্সের পাহাড়দের ঘুম ভাঙ্গাবেন। যতই ঘুমন্ত থাকুক, তারা কিন্তু জীবন্ত।”
আবেগে তার কন্ঠস্বর চড়ছিল।
“দেখতে পাও না, তোমরা কি দেখতে পাও না, মাটির নিচে যত আমরা মরছি, তত বেশি করে বেঁচে উঠছে মেশিন? মেশিন আমরাই বানিয়েছি আমাদের ইচ্ছাপূরণ করতে, কিন্তু মেশিন আর তা করছে না। মেশিন আমাদের স্থান আর স্পর্শের বোধ কেড়ে নিয়েছে, মানুষে মানুষে সম্পর্ককে ঝাপসা করে দিয়েছে, প্রেমকে শারীরিক ক্রিয়ায় সীমিত করেছে, পক্ষাঘাত এনে দিয়েছে আমাদের শরীরে আর মনে, আর এখন মেশিন চাইছে আমরা তার উপাসনা ক’রি। মেশিন প্রগতি করছে – কিন্তু আমাদের মতে না। মেশিন এগোচ্ছে, কিন্তু আমাদের রাস্তায় না। আমরা শুধু মেশিনের শিরায় শিরায় বহমান রক্তকণিকা, আর যেদিন থেকে মেশিনের বেঁচে থাকার জন্য আমাদের আর লাগবে না, সেদিনই মেশিন আমাদের মেরে ফেলবে। আমার কাছে এর কোনো চিকিৎসা নেই – বা হয়তো, হয়তো মানুষকে বার বার বলতে হবে, আমি ওয়েসেক্সের পাহাড় দেখেছি, নিজের চোখে দেখেছি, যেমন ডেনদের পরাজিত করার পর এলফ্রিড দেখেছিলো। ”
“সূর্য ডুবল। আমার পাহাড় আর দুরের পাহাড়ের মধ্যে কুয়াশার পর্দার রং বদলে গেলো। বলতে ভুলে গেছি, তার রং মুক্তোর মত। ”
দ্বিতীয়বারের মত থামলো সে।
“বলতে থাকো,” তার মা, ক্লান্ত স্বরে বললেন।
কুনো মাথা ঝাঁকালো।
“বলতে থাকো। তোমার কোন কথাই আর আমায় আঘাত করতে পারবে না। আমি এখন পাথর।”
“ভেবেছিলাম বাকিটাও তোমায় বলবো, কিন্তু পারছি না; আমি জানি আমি পারবো না: বিদায়।” ভাশ্তি শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর স্নায়ুতে স্নায়ুতে পুত্রের কৃত পাপের বিষ আছড়ে পড়ছে। কিন্তু এর শেষ না শুনে তিনি ছাড়বেন না। কৌতূহল তো আছে!
“এটা অন্যায় কথা,” অভিযোগ ফুটলো তাঁর গলায়। “তুমি আমায় আদ্ধেক পৃথিবী পার করিয়ে নিজের কথা শোনানোর জন্য নিয়ে এসেছো, আমি তো পুরোটা শুনেই যাব। বলো – যত ছোট করেই হোক, আমার সময় যত নষ্টই হোক – তুমি সভ্যতায় ফিরলে কিভাবে বলো।”
“অ- এই কথা!” বলে উঠলো সে। “সভ্যতার কথা তো তুমি শুনতে চাইবেই। নিশ্চয়ই। আমার রেস্পিরেটর পড়ে যাওয়ার কথা বলেছি?”
“না – কিন্তু এবারে আমি বাকিটা বুঝে গেছি। তুমি রেস্পিরেটর পরে নিলে আবার, তারপর পৃথিবীর ওপর দিয়ে চলতে চলতে তুমি একটা ভমিটারিতে এলে, সেখানে তোমার অপরাধের বিরুদ্ধে সেন্ট্রাল কমিটিতে নালিশ রুজু হ’ল। ”
“একেবারেই না।”
নিজের কপালের ওপর দিয়ে একবার হাত চালিয়ে দিল সে, যেন কোন অদৃশ্য ভাবনাকে পোকা তাড়ানোর মত করে তাড়ালো। তারপর আবার কাহিনীতে ফিরল, আগের খেই চেপে ধরে।
“সূর্যাস্তের সময় রেস্পিরেটর মাটিতে পড়লো। আমি বলেছিলাম না, হাওয়ার ফোয়ারা ঝিমিয়ে আসছিলো?”
“হ্যাঁ। ”
“সূর্য ডোবার পরে পরেই, হাওয়ার তেজ মরে গিয়ে ভাসমান রেস্পিরেটরকে ফেলে দিল। আমি আগেই বলেছিলাম যে মেশিনের কথা আমি প্রায় ভুলেই গেছিলাম, মন অন্যদিকে, অন্য নানা দিকে ব্যস্ত ছিল। আমার জন্য শ্যাফটের খোলা মুখ দিয়ে ফোয়ারার মত নকল হাওয়া বেরিয়ে বেরিয়ে নিচু গর্তে হাওয়ার পুকুর তৈরি হয়েছিলো। যখনই খোলা হাওয়া আমার বুকে বাজছিল, আমি হাওয়ার পুকুরে চুমুক দিচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম, খোলা হাওয়ার জোর যখন নকল হাওয়ার জোরের চেয়ে কম ঐ পুকুর আরও কয়েকদিন অন্তত ভরা থাকবে, তাই ফোয়ারা বন্ধ হবার বেশ অনেক পরেও আমি বুঝতে পারিনি এর মানে কি। এর মানে হ’ল – আমি ছিপি খুলে টানেলের মধ্যে বায়ুচাপের যে ফাঁক তৈরি করেছি, তা মেরামত হয়ে গেছে; এবার মেরামতি কল; মেরামতি কল, আমার খোঁজে হানা দিয়েছে। ”
“আরেকটা বিপদসংকেত পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি গুরুত্ব দিইনি, রাতের আকাশ দিনের থেকে অনেক পরিষ্কার ছিল। সূর্যের আধ আকাশ পেছনের চাঁদ উজ্জ্বল আলোয় আমার চারপাশ ভাসিয়ে দিচ্ছিল। আমি দুই হাওয়ামহলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ দেখালাম কালো মত কিছু একটা দূর থেকে ছুটে এসে শ্যাফটের ভেতর ঢুকলো। আমি বোকার মত পেছন পেছন ছুটে গিয়ে শ্যাফটের ভেতর উঁকি দিলাম। হাঁটু গেড়ে বসে কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম শ্যাফটের ভেতরের আওয়াজ শোনার। অনেক গভীর থেকে যেন কিছু আঁচড়ানোর আওয়াজ এলো।”
“এবার – এতক্ষণে- আমার মাথায় এলার্ম বাজলো। আমি ঠিক করলাম আমার রেস্পিরেটর কুড়িয়ে নিয়ে আমি এই এলাকা ছেড়ে বেরিয়ে যাব । কিন্তু রেস্পিরেটর তো নেই। আমি দেখতে না পেলেও ঠিক বুঝতে পেরেছিলাম, সেটাকে টেনে শ্যাফটের ভেতর নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি ঘাসের মধ্যে সেটা টেনে নিয়ে যাওয়ার দাগ দেখলাম। বায়ুছিপি আর ছিপির প্যাঁচের আরও নিচে অব্দি সেটাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমার সাথে খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে, আমায় পালাতে হবে খোলা হাওয়ার দিকে, দৌড়তে হবে ঐ মুক্তোরঙ্গা মেঘের দিকে। মরতে হ’লে দৌড়তে দৌড়তে বুক ফেটে মরবো। কিন্তু পা তোলার আগেই…শ্যাফটের ভেতর থেকে – ভয়ংকর, কি ভয়ংকর। একটা পোকা – দানবিক, সাদা কিলবিলে পোকা উঠে আসছে, চাঁদের আলো মাখা ঘাসের ওপর দিয়ে, এগিয়ে আসছে।”
“আমার গলা চিরে চিৎকার বেরিয়ে এলো। যা যা করলে বিপদ বাড়বে সব করলাম। ছুটে পালিয়ে না গিয়ে আমি কিড়াটাকে পা দিয়ে থেঁতলাতে চাইলাম, সাথে সাথে ওটা আমার পা পেঁচিয়ে ধরলো। এবার ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু হ’ল। মহাকৃমিটাকে পায়ে নিয়েই সারা মাঠ ঘুরতে লাগলাম, ভাবলাম পায়ের বাঁধন আলগা হচ্ছে বুঝি, কিন্তু বুঝলাম পা ছেড়ে ওপরদিকে বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছে সেটা। “বাঁচাও!” আমি চেঁচালাম। (আমার তখন কি ভয়ানক অবস্থা, কোনভাবেই বুঝবে না তুমি।) “বাঁচাও!” আবার আমি চেঁচালাম। (কেন আমরা নীরবে নিজেদের কষ্ট সইতে পারি না?) “বাঁচাও!” আমি চেঁচালাম। এবার আমার পায়ের বাঁধন শক্ত হ’ল। মুখ থুবড়ে পড়লাম আমি। বুঝলাম ঘাসের ওপর দিয়ে আমায় ছেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জীবন্ত পাহাড়, সবুজ ঘাস, সবুজ ফার্ণ থেকে দূরে, বিরাট ধাতব বায়ুছিপির পাশ দিয়ে (আমি বাঁচার জন্য ছিপির হাতল আঁকড়ে ধরতে চাইলাম, এটা তোমায় বলতে পারি। কিন্তু সেই হাতল জড়িয়ে ছিল আরেক কৃমি।) সারা মাঠ ভরে গেছিল কিড়ায়। চতুর্দিকে খুঁজছিল তারা আমায়, মাঠ উজাড় করে, শ্যাফটের গর্ত থেকে উঁকি দিচ্ছিল আরও সাদা সাদা মাথা, সঙ্গিনের সারির মত তৈরি, ডাক পড়লেই উঠে আসবে। ওপরের কৃমিবাহিনী ততক্ষণে উপড়ে এনেছে সারা মাঠের ঘাস, ফার্ন, মাটি, কুটো, সব জড়িয়ে মহাপিন্ড হয়ে উল্কাগতিতে নেমে চললাম আমরা নরকের গর্ভে। শেষবারের মত দেখলাম আকাশের তারা, ছিপি বন্ধ হয়ে গেলো। মনে হ’ল আমার মত আরেকজন মানুষ আকাশে আছেন যেন। আমি লড়াই চালিয়ে গেলাম, লড়েই চললাম, কিন্তু মইয়ের প্রতিটি ধাপে আমার মাথা ঠুকে ঠুকে আমার লড়াই শেষ হয়ে গেলো। আমার নিজের কামরায় জেগে উঠলাম আমি। কোথাও কোন কৃমি নেই। চারদিকে নকল হাওয়া, নকল আলো, নকল শান্তি, আর কথা-কলের মধ্যে দিয়ে আমার বন্ধুরা জানতে চাইছে ইদানীং আমার মনে কোন নতুন ভাবনা এসেছে কিনা।”
এখানেই কুনোর কাহিনী শেষ হ’ল। এ নিয়ে কোনো আলোচনা অসম্ভব। ভাশ্তি ফেরার জন্য পেছন ঘুরলেন। “বেঘর হতে চলেছো তুমি,” তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন।
“তাই হোক আশা করি,” কুনো জবাব দিল।
“মেশিন তোমায় পরম করুণা দেখিয়েছে।”
“তার থেকে ঈশ্বরের করুণা ভালো।”
“এই কুসংস্কারী কথা দিয়ে তুমি কি বলতে চাইছো যে তুমি খোলা হাওয়ায় বাঁচতে পারবে?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি কি কখনো ভমিটারির আশেপাশের কঙ্কালের স্তূপ দেখেছো?
“মহান বিপ্লবের স্মারক?”
“হ্যাঁ।”
“আমাদের সুশিক্ষার জন্য তারা নিহত হয়েছে। কেউ কেউ ঐ স্তূপ থেকে পালাতে পেরেছে খানিক দূর, কিন্তু খুব বেশি দূর না। নিঃসন্দেহ তো ? আমাদের সময়ে যাদের বেঘর করা হয়, তাদেরও ঐ দশা হয়। পৃথিবীর ওপরের হাওয়ায় কেউ বাঁচতে পারে না আর।”
“একদম।”
“ফার্ন আর ঘাস বাঁচতে পারে, কিন্তু কোন উন্নত প্রাণী পারে না। কোন হাওয়া-জাহাজ কি দেখেছে কোন জ্যান্ত প্রাণী?”
“না। ”
“কোন লেকচারার এরকম বলেছেন কিছু?”
“না।”
“তাহ’লে তোমার এই ঔদ্ধত্যের কারণ কি?”
“কারণ আমি দেখেছি নিজের চোখে,” রাগে ফেটে পড়ল সে।
“কী দেখেছ?”
“কারণ গোধূলির আলোয় তার মুখ দেখেছি আমি – আমার চিৎকার শুনে আমায় বাঁচাতে এসেছিলো – তাকেও কৃমিরা পাকে পাকে জড়িয়ে ধরেছিলো। কিন্তু মেয়েটির কপাল আমার থেকে ভালো ছিল। একটা কৃমি ওর গলা কেটে ওকে মেরে ফেললো। ”
পাগল, বদ্ধ পাগল। ভাশ্তি ফিরে গেলেন, এর পর নানা বিপদের মাঝেও, ছেলের মুখদর্শন করেন নি তিনি।
৩ বেঘর
কুনোর এই এডভেঞ্চারের পরের কয়েক বছরে, মেশিন দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিল। ওপর ওপর বৈপ্লবিক মনে হ’লেও, জনতাকে মানসিকভাবে আগেই প্রস্তুত করা হয়েছিলো। এগুলো কোন সুপ্ত বা গুপ্ত বাসনার প্রকাশ না। প্রথমে রেস্পিরেটর নিষিদ্ধ করে দেওয়া হ’ল।
ভাশ্তির মত প্রগতিপন্থী বুদ্ধিজীবীরা চিরকালই পৃথিবীর উপরিতল পরিদর্শনের বিপক্ষে। হাওয়া-জাহাজ হয়তো দরকারী, কিন্তু শুধু কৌতূহলী হয়ে ভূমোটরে চড়ে পৃথিবীর ওপরে কয়েক মাইল ঘুরে বেড়ানোর কোনো মানে হয়? একেবারেই সুঅভ্যাস নয়, সঠিক তো একেবারেই না, কোন নতুন ভাবনাও আসে না, কোন জরুরি অভ্যাসের পথও সুগম হয় না এতে। অতএব রেস্পিরেটর বাতিল হ’লো, সাথে অবশ্যই ভূমোটর। সবাই মোটামুটি বিনা প্রশ্নে মেনে নিলো ব্যাপারটা, শুধু কিছু লেকচারার অভিযোগ জানালেন যে তাঁদের সমীক্ষার ক্ষেত্র থেকে তাঁদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। তাও পৃথিবী সম্বন্ধে কেউ জানতে চাইলে গ্রামোফোন বা সিনেমাটোফোটে তো আছেই। এবং শেষমেশ লেকচারাররাও মেনে নিতে বাধ্য হ’লেন যে সমুদ্র বিষয়ক পুরনো লেকচার জুড়ে জুড়ে তৈরি লেকচার, নতুন লেকচারের থেকে কোন অংশেই কম নয়। “প্রাথমিক ভাবনা থেকে সাবধান!”এক উঁচু দরের বুদ্ধিজীবী জিকির তুললেন। “সত্যি বলতে কি প্রাথমিক ভাবনা বলে কিছু হয় না। ওগুলো শারীরিক অনুভূতি, কামনা আর ভয় দিয়ে মাখামাখি, তার ওপরে কি কোন দর্শন দাঁড়াতে পারে? প্রাথমিক ভাবনা ছেড়ে, দুই-হাত-ফেরতা, সম্ভব হ’লে দশ-হাত-ফেরতা ভাবনা নিন, কারণ তারা প্রাথমিক, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পঙ্কিলতা থেকে দশবার পরিশ্রুত আর দশগুণ পরিশুদ্ধ। আমার বিষয় ফরাসী বিপ্লব, তা নিয়ে আপনারা নিজে থেকে কিছুই শেখার চেষ্টা করবেন না। তার থেকে শিখুন আমি কি ভাবি এনিচারমন কি ভাবেন তা নিয়ে উরিজেন কি ভাবেন তা নিয়ে গুচ কি ভাবেন তা নিয়ে হো-ইউং কি ভাবেন তা নিয়ে চি-বো-সিং কি ভাবেন তা নিয়ে ল্যাফক্যাডিও হিয়ার্ন কি ভাবেন তা নিয়ে কার্লাইল কি ভাবেন মিরাবিউ যা লিখেছিলেন ফরাসী বিপ্লব নিয়ে। দশ জনের মনন দ্বারা পরিশ্রুত হয়ে প্যারিসের রক্তপাত আর ভার্সাই-এর ভাঙচুর এমন এক ভাবনায় পরিণত হবে যাকে আমাদের দৈনিক জীবনে লাভজনকভাবে ব্যবহার করতে পারবো। ঘটনা আর ভাবনার মাঝে যাতে যথেষ্ট পরিমাণ মধ্যবর্তী বিশেষজ্ঞ থাকেন। কারণ ইতিহাসে এক বিশেষজ্ঞ আরেক বিশেষজ্ঞকে খন্ডান। উরিজেন যেমন হো-ইউং আর এনিচারমন এর সন্দেহপ্রবণতাকে খন্ডান , আমিও তেমনি গুচের অসাবধানতাকে খন্ডাই। যাঁরা নিয়মিত আমার লেকচার শোনেন, তাঁরা কিন্তু ফরাসী বিপ্লব নিয়ে জ্ঞানচর্চার জন্য জরুরি নিরাবেগ দূরত্বের ব্যাপারে আমার চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে আছেন। আপনার সন্ততি আরও এক ধাপ এগোবে, আমার মতে, কারণ আরেকটি আস্তর যুক্ত হবে এই শৃঙ্খলায়। তারা জানবে আপনি কি ভাবেন আমার ভাবনা নিয়ে। এবং এমন এক সময় আসবে যখন – তাঁর কন্ঠ আরও সঘোষ হ’ল – এমন এক প্রজন্ম আসবে যারা তথ্য-উপাত্তের অতীত, প্রভাবের থেকে দূরে, ভাব থেকে দূরে, এক বর্ণহীন প্রজন্ম
‘ব্যক্তি-ত্ব থেকে দূরে
কায়া-হীনতার পুরে’
যারা ফরাসী বিপ্লব ঠিক কিভাবে ঘটেছিল তা দেখবে না, বা ঠিক কিভাবে ঘটা উচিত তাও দেখবে না, দেখবে ফরাসী বিপ্লব যদি মেশিনাব্দে ঘটতো তাহলে তা কিভাবে ঘটত। ” বিপুল সম্বর্ধনায় নন্দিত হ’ল এই লেকচার। মানুষের মনের অব্যক্ত ভাবনাকে কথাপ্রকাশ করলেন তিনি – পৃথিবীর উপরিভাগের উপাত্ত কোন কাজের নয়, বরং রেস্পিরেটর রদ করে কাজের কাজ হয়েছে। কথা উঠল হাওয়া-জাহাজও রদ করে দেওয়া হোক। সেটা করা গেল না, কারণ হাওয়া-জাহাজরা মেশিনতন্ত্রের সাথে একপাকে জুড়ে গেছিল কোনভাবে। কিন্তু যত বছর ঘুরলো, তাদের ব্যবহার ততই কমলো, আর চিন্তাবিদরা তাদের উল্লেখ করা প্রায় বন্ধ করে দিলেন কালে কালে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হ’ল ধর্মকে ফিরিয়ে আনা।
ঐ নন্দিত লেকচারেও এই প্রস্তাব রাখা হয়েছিলো। ভক্তিবিধুর কন্ঠে লেকচারের শেষদিকে যখন এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হ’ল, তখন সবার মনে সুমধুর ঘন্টাধ্বনি বেজে উঠলো। যাঁরা এতদিন নীরব উপাসক ছিলেন, তাঁরা কথা কয়ে উঠলেন। তাঁরা বললেন মেশিনের বইয়ের স্পর্শমাত্র কি অপরুপ শান্তিতে কানায় কানায় ভরে ওঠে মন। ঐ বইয়ের কিছু কিছু সংখ্যা বার বার উচ্চারণমাত্র কি হরিষ জাগে, অবিশ্বাসীদের কানে তা যতই অর্থহীন হোক না কেন। একটা বোতাম টেপাতে কত সুখ থাকতে পারে, কিংবা আলগোছে ইলেকট্রিক ঘন্টি ছোঁয়ায়।
তাঁদের ভাষ্যে, “মেশিন আমাদের খাওয়ায়, পরায়, থাকতে দেয়, মেশিনের মধ্যে দিয়ে আমরা অপরকে দেখি, অপরের সাথে কথা ব’লি, মেশিন আমাদের অন্তরের অন্তঃস্থলে থাকে। মেশিন নতুন ভাবনার ভক্ত, পুরনো কুসংস্কারের যম। মেশিন সর্বশক্তিমান, অনাদি, অনন্ত; মেশিন ধন্য, মেশিনের জয় হোক।” কিছুদিনের মধ্যেই মেশিনের বইয়ের প্রথম পাতায় ছাপা হ’ল এটি। পরের কিছু সংস্করণের মধ্যেই এই উপাসনাপদ্ধতি জয়জয়কার আর প্রার্থনাযুক্ত জটিল এক কর্মকান্ড হয়ে উঠলো। ‘ধর্ম’ কথাটি খুব সাবধানে এড়িয়ে যাওয়া হ’ল। তত্ত্বের হিসাবে মেশিন তখনো মানুষের কৃষ্টি, মানুষের দাস। কিন্তু কিছু পুরনোপন্থী বাদে, ব্যবহারিক জীবনে সবাই মেশিনকে দিব্যজ্ঞানে পুজা করত।
মেশিনকে সম্পূর্ণ মেশিন হিসাবে কেউ পুজতো না। কেউ নীল অপটিক প্লেটে অন্য ভক্তদের দেখতে পেয়ে প্লেটপুজা করত, আর পাপিষ্ঠ কুনো যাদের কিড়া, মহাকৃমি ইত্যাদি বলেছিল, কেউ কেউ সেই মেরামতি কলের পুজো করত, সেরকমই কেউ লিফটের আবার কেউ বইয়ের উপাসক। সবাই মেশিনের কোন এক অংশকে পুজা করে, মেশিনের সার্বিক পুজায় সেই অংশকে পৌরোহিত্য করতে ব’লত। নিপীড়নও চলত কিন্তু সেই নিপীড়ন মহামারী হয়ে ওঠেনি, তার কারণ পরে বলা যাবে। কিন্তু তা তলে তলে ছিল চোরাস্রোতের আর যারা একদমই এই “অনামিকা যান্ত্রিকতা”-য় একবারে বিশ্বাস করত না তারা বেঘর হ’বার ওরফে নিহত হবার পথে এক পা এগিয়ে থাকত।
এই দুটি বিরাট সিদ্ধান্তের কৃতিত্ব সেন্ট্রাল কমিটিকে পুরোপুরি দিয়ে দিলে, সভ্যতাকে ঠিক বিস্তারে বোঝা যাবে না। সিদ্ধান্ত দু’টির ঘোষক সেন্ট্রাল কমিটিই বটে কিন্তু কমিটি কি এর হেতু ? রাজাদের যুগে যুদ্ধঘোষণা করতেনতাঁরাই কিন্তু যুদ্ধের হেতুও তাঁরা ছিলেন কি ? তাঁরা কোন অজানা, অজেয় চাপের কাছে নতিস্বীকার করতেন, সেই চাপ সরে গেলে সে জায়গায় নতুন অজেয় চাপ আসতো। এই ধরণের ব্যাপারকে সহজ ভাষায় বলে প্রগতি। মেশিন যে হাতের বাইরে বেরিয়ে গেছে কেউ সে কথা খুলে বলত না। বছরের পর বছর বেশি, আরও বেশি দক্ষতার সাথে মেশিনের সেবা করা হত কিন্তু সেই সেবার ধরণ ক্রমশ বোকাটে হয়ে যাচ্ছিল। মানুষ যতই বেশি করে বুঝতে পারল মেশিনের সেবায় সে কিভাবে দায়িত্ব নিয়ে নিজেকে নিবেদন করবে , ততই তার প্রতিবেশীর দায়িত্ব নিয়ে তার বোধ কমে গেলো। সারা দুনিয়ার এমন একজনও ছিল না মেশিন নামক মহারাক্ষসকে যে সামগ্রিকভাবে বুঝতে পারে। সেই মহাজ্ঞানীরা সব গত হয়েছেন। নিশ্চয়ই তাঁরা পুরো নির্দেশিকা রেখে গেছেন , কিন্তু তাঁদের উত্তরাধিকারীরা এক এক জন নির্দেশিকার এক এক অংশ নিয়ে বিশেষজ্ঞ হয়েছেন। কিন্তু মানবজাতি সুখের লালসায় বেশ বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। প্রকৃতির সব সম্পদের শেষটুকু চুষে নিয়েছে। তারপর নীরব আলস্যের সাথে, সুখ আর আরামের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে মানুষ, প্রগতি আর মেশিনের প্রগতিকে সমার্থক ধরে নিয়ে।
শেষের সেদিন ভয়ঙ্কর আসার আগে অব্দি ভাশ্তির জীবন সুখে শান্তিতেই এগোচ্ছিল। কামরা আঁধার করে ঘুমালেন; জেগে কামরা আলো করলেন। লেকচার দিলেন, লেকচার নিলেন। অসংখ্য বন্ধুদের সাথে ভাবনা আদানপ্রদান করে তাঁর বিশ্বাস হ’ল যে তাঁর আধ্যাত্মিকতা বাড়ছে। এক এক সময় এক এক বন্ধুর স্বেচ্ছামৃত্যুর আর্জি মঞ্জুর হ’লে নিজের নিজের ঘর থেকে সব মানুষের বোধের অতীত বেঘরিস্তানে রওনা দিতেন। ভাশ্তির সেরম কিছু মনে হ’ত না। তাঁর নিজের লেকছার সেরম ভাল না গেলে, তিনিও কখনো স্বেচ্ছামৃত্যুর আর্জি পাঠাতেন। কিন্তু স্বেচ্ছামৃত্যুর হার যাতে জন্মের হার ছাপিয়ে না যায় মেশিন সেদিকে কড়া নজর রাখত। এখনও অব্দি ভাশ্তির আর্জি নামঞ্জুর।
মুশকিল শুরু হ’ল শনৈঃ শনৈঃ, তাঁর খেয়ালে পড়ার অনেক আগে থেকেই।
একদিন নিজের ছেলের থেকে এক বার্তা পেয়ে তিনি যারপরনাই অবাক হ’লেন। তাঁদের মধ্যে আর কথা হ’ত না, কিছু নিয়ে কথা বলার ছিল না, কিন্তু তিনি খবর পেয়েছিলেন কুনো এখনো বেঁচে আছে, উত্তর গোলার্ধ থেকে নির্বাসন দিয়ে তাকে দক্ষিণে পাঠানো হয়েছে তার বেয়াদবির শাস্তি হিসাবে। তাঁর কামরা থেকে বেশি দূরে না কুনোর নতুন কামরা।
“ও কি চাইছে আমি আবার ওর কাছে যাই?”ভাবলেন তিনি। “আর কোনদিন না, কখনো না, আমার সময় নেই।”
তা তো না, আরেক নতুন পাগলামি।
নিজের ছবি নীল প্লেটে দিলো না, শুধু নিজের ভারি আওয়াজে অন্ধকার থেকে বললো:
“মেশিন থামলো ব’লে।”
“কি, কি বললে?”
“মেশিন থেমে যাচ্ছে। আমি জানি, আমি সব লক্ষণ জানি। ”
হো হো করে হেসে উঠলেন তিনি। শুনে রাগে কথা বন্ধ করে দিল সে।
“এর থেকে আজব কিছু ভাবতে পারো তুমি?”এক বান্ধবীকে উচ্চৈঃস্বরে বললেন তিনি।”এক পুরুষমানুষের মুখে শুনলাম সে বিশ্বাস করে মেশিন নাকি থামলো ব’লে। সে আগে আমার ছেলে ছিল। পাগলের প্রলাপ, অপবিত্র! ” বান্ধবী উত্তর দিলো, “মেশিন থামলো ব’লে? মানে কি এ কথার? এটা তো একটা অর্থহীন বাক্য।”
“এর মানে আমিও জানি না।”
“মিউজিক নিয়ে যে নতুন কিছু গড়বড় শুরু হয়েছে, ও কি সেই বিষয়ে বলছে? ”
“না না, একেবারেই না। এসো আমরা বরং মিউজিক নিয়ে কথা বলি।”
“অথরিটিকে নালিশ জানালে?”
“হ্যাঁ, তাঁরা জানালেন সারাই হচ্ছে। আর আমার নালিশ মেরামতি কল কমিটিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন ওঁরা। ব্রিসবেন স্কুলের সিম্ফনিতে অদ্ভুত সব কষ্টের, শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে, মিউজিকটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মেরামতি কল কমিটি বললেন শিগগিরি সারানো হবে।
হাল্কা উদ্বেগ নিয়ে নিজের রোজনামচায় ফিরলেন তিনি। একদিকে, মিউজিকের এই খামতি তাকে বিরক্ত করছিলো। আরেকদিকে, কুনোর কথাটা তিনি ভুলতে পারছিলেন না।ও নেহাত মিউজিক একেবারেই সইতে পারে না তাই জানে না, কিন্তু যদি এই গড়বড়ের ব্যাপারে জানত, “মেশিন থামলো ব’লে” ঐ বিষাক্ত গোছের কথাটা আরেকবার বলতো।
যদিও কথাটা ও অন্য প্রসঙ্গে বলেছে কিন্তু এই কাকতাল ওনাকে বিরক্ত করছিল। মেরামতি কলের সাথে কথা বলার সময় সেই বিরক্তি বেরিয়ে এলো।
প্রতিবারের মত এবারেও তাঁরা বললেন, গোলযোগ শীঘ্রই মেরামত করা হ’বে।
“দ্রুত! শীঘ্রই!”কেটে কেটে বললেন তিনি। “খারাপ মিউজিক শুনে আমি কেন নিজের উদ্বেগ বাড়াবো? মেরামতি সব সময় তৎক্ষনাৎ করা হয়। তা না হ’লে আমি কিন্তু সেন্ট্রাল কমিটিতে নালিশ করবো।”
“সেন্ট্রাল কমিটিতে কোন ব্যক্তিগত নালিশ নেওয়া হয় না।” মেরামতি কল কমিটি উত্তর দিলো।
“কার মাধ্যমে নালিশ পাঠাবো তাহ’লে?”
“আমাদের মাধ্যমে।”
“নালিশ করলাম তাহ’লে।”
“আপনার নালিশ যথাসময়ে পাঠানো হ’বে।”
“অন্য কেউ কি এই নিয়ে নালিশ করেছে।”
মেরামতি কল কমিটি এই অযান্ত্রিক প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি হ’ল না।
“ভীষণ বাজে!”উত্তেজিত ভাবে তিনি নিজের এক বন্ধুকে বললেন, “আমার মত অভাগিনী কেউ আছে কি? মিউজিকটুকুও ঠিকভাবে শুনতে পারি না। প্রতিবার যখন মিউজিক ডাকি, আগের বারের থেকে খারাপ আসে।”
“আমার সমস্যাও কিছু কম না।” বন্ধু উত্তর দিলো।”আমার ভাবনাগুলোর মাঝে মাঝে ঝিঝি আওয়াজ আসে।”
“সেটা কিরকম?”
“”আমি জানি না ঠিক, আমার মাথার ভেতর হ’তে পারে, দেওয়ালের ভেতরও হ’তে পারে।”
“সে যাই হোক। নালিশ রুজু করে রাখো।”
“করেছি, আমার নালিশ যথাসময়ে সেন্ট্রাল কমিটিতে পাঠানো হ’বে জানানো হয়েছে।”
সময় কাটলো, আর নানা গড়বড় নিয়ে মানুষ নালিশ করা থামিয়ে দিলো। গোলযোগগুলো কিন্তু সারাই করা হয়নি। কিন্তু মানুষের স্নায়ুতন্তু এতই মেশিনপরবশ হয়ে পড়েছিলো যে মেশিনের সব রদবদলের সাথে তারা মানিয়ে নিত নিজেদের। ব্রিসবেন সিম্ফণির মাঝে মাঝে সেই কষ্টের, শ্বাসের শব্দ আর ভাশ্তির কানে বাজতো না। মনে হ’ত ওটা সিম্ফনির অংশ। দেয়াল বা মনের থেকে আসা সেই ঝিঁঝিঁ শব্দ আর বন্ধুর ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটাতো না। নকল ফলে যে আস্তে আস্তে ছাতা পড়তে শুরু করলো, চানের তরলে যে গন্ধ উঠতে শুরু করলো, কবিতার মেশিন থেকে বেরোনো কবিতায় যে আস্তে আস্তে ছন্দপতন ঘটতে লাগলো – সব মানুষের নজর এড়িয়ে যেতে লাগলো। প্রথমে সবাই তীব্রভাবে নালিশ রুজু করলো, পরে মেনে নিলো, ভুলে গেলো। খারাপ থেকে আরও খারাপ হতে থাকলো সব কিছু, বিনা আপত্তিতে।
কিন্ত নিদ্রাযন্ত্র যখন কাজ করা বন্ধ করল, সেটা মেনে নেওয়া গেল না। এটা একটা গুরুতর গন্ডগোল। এক দিন সারা পৃথিবীতে – সুমাত্রায়, ওয়েসেক্সে, কুরল্যান্ড আর ব্রাজিলের অগণন শহরে – ক্লান্ত মালিকদের ডাকা কোন বিছানাই তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে এলো না। এটা তুচ্ছ ব্যাপার মনে হলেও, ঠিক সেই সময় থেকেই মানব সভ্যতার পতনের প্রহর গোনা শুরু হ’ল। ভারপ্রাপ্ত কমিটিতে নালিশের ঝড় বইলো।তারা সেই নালিশ মেরামতি কল কমিটিতে পৌঁছে দিলো। তাঁরা আশ্বস্ত করলেন সেই সব নালিশ তাঁরা যথাসময়েসেন্ট্রাল কমিটিতে পৌঁছে দেবেন। কিন্তু অশান্তি বাড়তে থাকলো, কারণ মানুষ নির্ঘুম হয়ে বাঁচবার মত যথেষ্ট অভিযোজিত হয়ে উঠতে পারেনি তখনো।
আওয়াজ উঠলো, “মেশিনে কেউ অন্তর্ঘাত করছে !”
“কেউ রাজা হবার চেষ্টা করছে। ব্যক্তিস্বার্থকে ফিরিয়ে আনছে আবার!”
“সেই লোকটাকে বেঘর করো!”
“মেশিনকে বাঁচাও! মেশিনকে রক্ষা ক’রো! রক্ষা ক’রো!”
“লড়াই লড়াই লড়াই চাই! মার ব্যাটাকে!”
কিন্তু মেরামতি কল কমিটি এগিয়ে এসে বাছা বাছা সুচারু কথা ব’লে পরিস্থিতি সামাল দিলো। অকপটে স্বীকার করলো, মেরামতি কলের নিজেরই মেরামতির দরকার।
এই স্বীকারোক্তিতে প্রতিবাদের আগুনে শীতলজলধারা পড়লো।
সেই ফরাসী বিপ্লব-ওয়ালা প্রখ্যাত লেকচারার এবার মাঠে নামলেন মেশিনের সব নতুন দোষের ওপর নতুন গিল্টি ফলাতে, “অবশ্যই, অবশ্যই আমরা এখন নালিশের ওপর নালিশ করা থেকে বিরত থাকব।মেরামতি কল এত দিন ধরে আমাদের এত যত্ন করেছেন, এখন তিনি নিজেই অসুস্থ। আমরা ধৈর্য ধরব তাঁর সুস্থ হওয়া অব্দি, কারণ তাঁর প্রতি আমাদের সমবেদনা রয়েছে। তাঁর নিজের সময় মত তিনি তাঁর কর্তব্যপালনে আবার রত হবেন। ততদিন আমরা বিছানা ছাড়া, ট্যাবলেট ছাড়া, আমাদের নানা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চাহিদা ছাড়া থাকবো। এটাই নিশ্চয়ই মেশিনেরও ইচ্ছা। ”
হাজার হাজার মাইল দূরে তাঁর শ্রোতারা হাততালি দিয়ে উঠলো। তাদের সাথে মেশিনের যোগ তখনও কাটেনি। সাগরের নিচে, পাহাড়ের মূলে, মেশিনের লাখ লাখ মাইল লম্বা তারের মধ্যে দিয়ে তারা শুনলো ও দেখলো, সেই মহাচক্ষু সেই মহাকর্ণ তাদের ঐতিহ্য আর মেশিনের অবিরত গুঞ্জন তাদের প্রত্যেককে পৃথিবী জুড়ে এক ডোরাকাটা বন্দীপোশাক পরিয়ে রাখে। শুধু অসুস্থ আর বৃদ্ধরা মুক্তভাবে তাদের অকৃতজ্ঞতা জানালো, কারণ শোনা গেলো ইচ্ছামৃত্যু মেশিনও অচল। মানুষের মাঝে শারীরিক যাতনা আবার ফিরে এলো।
পড়া কঠিন হয়ে উঠলো। হাওয়ামন্ডলে কি এক রোগ ধরল, উজ্জ্বলতা কমে এলো। ভাশ্তির কামরার ভেতরটাও পুরোটা সাফ দেখা যেত না। কামরার হাওয়ায় সাফ রইল না। নালিশ যত জোরদার হ’ল, মেরামতি ততই কমজোর, শুধু জোর বাড়তে লাগলো লেকচারারের গলাবাজিতে: “বীর হ’ও, সাহসী হ’ও! মেশিন যতক্ষণ চলছে, কিসের ডর? আলো আর আঁধারের ফারাক করে না মেশিন!” কিছুদিন বাদে অবস্থার একটু উন্নতি হ’লেও আগের উজ্জ্বলতা আর ফিরল না, মানবসভ্যতা ধুসর গোধুলিপথের যাত্রী হ’ল। নানাখানে ক্ষুব্ধ চিৎকার উঠল “ব্যবস্থা “জরুরি স্বৈরতন্ত্র” ইত্যাদি নিয়ে, সুমাত্রার অধিবাসীদের ব’লা হ’ল তাঁরা যেন সেন্ট্রাল পাওয়ার স্টেশনের ক্রিয়াকলাপ নিয়ে নিজেদের আরও বেশি করে অবহিত করে। কিন্তু সেই পাওয়ার স্টেশন ফ্রান্সে। অতএব স্থায়ী, সর্বব্যাপী আতঙ্ক নেমে এল, মানুষ সর্বশক্তিমান মেশিনের বই হাতে ধরে প্রার্থনা করতে লাগলো তাদের সর্বশক্তি দিয়ে, যাতে কিছু জোর ফিরে আসে তাদের মনে। আতঙ্ক নানা ধাপের ছিল – মাঝে মাঝে আশাভরা গুজব ছড়ালো – মেরামতি কল প্রায় পুরো মেরামত হয়ে গেছে – মেশিনের শত্রুদের দমন করা হয়েছে – নতুন “নার্ভ-সেন্টার” অভিযোজিত হচ্ছে, আগের থেকে আরও দারুণভাবে কাজ করবে মেশিন। কিন্তু একটা দিন এল, যেদিন কোন সতর্কবাণী ছাড়াই, কোন দুর্বলতার চিহ্ন ছাড়াই পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ল, সারা দুনিয়ায়, দুনিয়া এক লহমায় অন্য দুনিয়া হয়ে গেলো।
ভাশ্তি তখন লেকচার দিচ্ছিলেন আর বেশ ভালোই করতালি-প্রতিক্রিয়া পাচ্ছিলেন। কিন্তু লেকচার যতই এগোতে থাকলো, নিরুত্তরতা ততই বাড়তে লাগলো আর যখন তিনি থামলেন – সম্পূর্ণ নীরবতা। বেশ অখুশি হয়ে এক বন্ধুকে কল দিলেন তিনি, বন্ধুটি সহানুভূতি বিশেষজ্ঞ। আবার নীরবতা: সে ঘুমায় বোধহয়। কিন্তু পরের বন্ধুও তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন না, তার পরের জনও না। কুনোর কূট কথাটা মনে পড়ে গেলো – “মেশিন থামলো ব’লে।”
কিন্তু বাক্যটি এখনো অর্থহীন। অনন্ত-র অন্ত কি ভাবে হ’তে পারে! হ’লেও বেশ দ্রুতই হ’বে বোধহ’য়। .
যেমন, একটু আলো হাওয়া তখনো ছিল। কয়েক ঘন্টা আগে আবহাওয়া একটু শুধরেছে। কিন্তু বই তখনো বজায় আছে, আর বই থাকলে ভরসাও আছে।
কিন্তু তিনি ভেঙ্গে পড়ছিলেন, কারণ ব্যস্ততা যখন থামলো, উদয় হ’ল এক নতুন আতঙ্ক- নৈঃশব্দ।
নৈঃশব্দ তাঁর একেবারেই অচেনা এক আক্রমণ, প্রাণঘাতী প্রায় – হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে এতে, এক ঝটকায়। জন্ম থেকে মেশিনের গুঞ্জন তাঁকে ঘিরে। নকল হাওয়া না পেলে ফুসফুস যেমন কষ্ট পায়, গুঞ্জনের অভাবে তাঁর কান সেভাবে পীড়িত হতে লাগলো, মাথায় তীব্র ব্যথা শুরু হ’ল। কোন দিশা না পেয়ে, তিনি হুমড়ি খেতে খেতে একটা অচেনা বোতাম টিপলেন। কামরার দরজা খোলার বোতাম।
কামরার দরজা এখন শুধু কব্জার জোরে চলছে। ফ্রান্সের আধমরা সেন্ট্রাল পাওয়ার স্টেশনের সাথে সে আর যুক্ত নেই। হাট হয়ে খুলে গেল দরজা, ভাশ্তির মনে হঠাৎ আশা ঝিলিক দিল, মেশিন মেরামত হয়ে গেছে বুঝি বা। সেই সর্পিল টানেল, স্বাধীনতার পথের উলটো মুখে, আলো ছায়া। একবার উঁকি দিয়েই আবার সিঁটিয়ে গেলেন তিনি কামরার ভেতর। টানেলে মানুষ থই থই করছে – মানুষের মাঝে অনেক আগেই আতঙ্ক ছড়িয়ে গেছে, তিনি টের পান নি।
মানুষ তাঁর কাছে সর্বদাই বিকর্ষক, কিন্তু এই মানুষেরা তাঁর ভয়ঙ্করতম দুঃস্বপ্ন থেকে উঠে এসেছে। হামাগুড়ি দিচ্ছে, চিল্লাচ্ছে, গুমরাচ্ছে, হাঁকপাক করছে, সবাই সবার গায়ে হাত দিয়ে ছুঁচ্ছে, আঁধারে মিলিয়ে যাচ্ছে, আবার মাঝে মাঝে প্ল্যাটফর্ম থেকে লাইভ রেলের ওপর পড়ে যাচ্ছে।
কেউ কেউ ইলেকট্রিক ঘন্টির আশপাশে আকচাআকচি করছে, যেই ট্রেন আর ফিরবে না, সেই ট্রেনকে ফেরাবে ব’লে। কেউ বা স্বেচ্ছামৃত্যু বা রেস্পিরেটর ডাকাডাকি করছে, কেউ মেশিনের নামে গালাগাল করছে। বাকিরা তাঁর মত কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে, না ঘরে না বাইরে, আতঙ্কে একূল ওকূল দুকুল হারিয়েছে।
আর এই সব চিৎকারের পেছনে নৈঃশব্দ – আগের পৃথিবীর, আগের প্রজন্মের।
না – এই নৈঃশব্দ একাকিত্বের থেকেও খারাপ। আবার কামরার দরজা এঁটে আবার বসে পড়লেন ভাশ্তি শেষের অপেক্ষায়। মেশিন-বুনট সভ্যতায় ভাঙ্গনের ধস নামলো, বিকট টঙ্কার আর গুরু গুরু গর্জনের সাথে। কামরার সিলিং-এর চিকিৎসা যন্ত্রের ধারক ভাল্ভ-ও বোধহয় আলগা হয়ে এসেছিল, সিলিং ফেটে বীভৎস ভাবে ঝুলতে লাগলো যন্ত্রের নাড়িভুঁড়ি। মেঝের টালিতে ঢেউ উঠলো, তারপর নিঃশব্দে ধসে পড়ল, শুধু কেদারার নিচের অংশটুকু বাকি রেখে। একটা টিউব হিলহিলে সাপের মত তাঁর দিকে এগিয়ে এসে কিছু বমি করে দিলো। আর সবশেষে এলো আতঙ্কের চরম ধাপ – আলো নিভু নিভু হ’ল, সভ্যতার দীর্ঘ সন্ধ্যার শেষ ঘনিয়ে এলো।
বই বুকে চেপে তিনি ধীরে ধীরে ঘুরপাক খেতে লাগলেন, তারণের প্রার্থনায়, মাঝে মাঝে বইইয়ে ধীরে ধীরে চুমু দিতে দিতে, মাঝে মাঝে নানা বোতামে এলোপাথাড়ি চাপ দিতে দিতে। বাইরের বিকট হট্টগোলের তার চড়ছিল, বন্ধ কামরার ভেতরও শোনা যাচ্ছিলো। আস্তে আস্তে কামরার আলোর জোর কমে এলো, ধাতুর বোতামে কামরার প্রতিফলন নিভে গেলো। প্রথমে আঁধার খেলো বই পড়ার স্ট্যান্ডটাকে, তারপর বইটাকে, কিন্তু তখনো বই তাঁর হাতে ধরা। আলো উধাও হবার পর উধাও হ’ল শব্দ, তার পর নকল হাওয়া। আদিম শূণ্যতা এত কাল বাদে তার হারানো রাজত্ব ফিরে পেলো, হয়ে উঠলো সর্বময়। ভাশ্তি ঘুরপাক খেতে থাকলেন, কোন আদিম ধর্মাবলম্বীদের মত, চিৎকার করতে করতে, প্রার্থনা করতে করতে, রক্তাক্ত আঙ্গুল দিয়ে বোবা বোতামদের আঘাত করতে করতে।
এই পথেই ভাশ্তির ক্রমমুক্তি হ’ল তাঁর কামরাগারদ থেকে – তাঁর মুক্তি নয়, তাঁর আত্মার মুক্তি; তাই মনে হ’ল আমার, কারণ আমার ধ্যানচক্ষুর দৃষ্টি এই অব্দিই। তাঁর দেহের মুক্তি হ’ল কিনা তা আমার নজরে পড়ছে না। কামরার দরজা খোলার বোতামে শেষমেশ হাত পড়ল তাঁর, দূষিত হাওয়া তাঁর মুখে আছড়ে পড়লো, কান বাজতে লাগলো ধক ধক, তাঁর মন তাঁকে বললো আবার তিনি সেই সুড়ঙ্গের মুখোমুখি, সেই বিরাট চাতাল যার ওপর পুরুষেরা লড়ছিল। সে লড়াই থেমে গেছে, শুধু কিছু ফিসফিস আর কিছু মরে আসা গোঙানি। শয়ে শয়ে মরছে তারা এই শেষ আঁধারে।
কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন তিনি।
আরেক কান্না তাঁকে সাড়া দিল।
মানুষের জন্য কাঁদছিল এই দু’টি কান্না, তাদের নিজেদের জন্য না। মেনে নিতে পারছিল না তারা যে এখানেই সব শেষ। শব্দ তাদের বুকে যে তালা এঁটেছিল, নৈঃশব্দ খুলে দিল সেই হৃৎকমল, তারা বুঝল এই ধরায় সব চেয়ে জরুরি কি ছিল। মানুষ, রক্তমাংসের গড়া সেরা ফুল, সব দ্শ্যমান প্রাণীর সেরা, ঈশ্বরের আভায় গড়া, তারায় তারায় যারা বয়ে নিয়ে গেছিল ঐশ্বরিক শক্তি, সেই মানুষ আজ মরছে। সেই সুন্দর আদিম পুরুষেরা, নগ্নতা ছিল যাদের সেরা ভূষণ, তারা নিজেদের বোনা পোশাকে দম আটকে মরছে। সেই পোশাক প্রথমে তার স্বর্গীয় লেগেছিল, টানায় তার সংস্কৃতির ঝিলিক, পোড়েনে আত্মবিস্মৃতির মায়া।
যতদিন সে পোশাক পোশাকিমাত্র ছিল, তার স্বর্গীয় বিভা ক্ষুণ্ণ হয়নি। মানুষ তখনো চাইলে ছাড়তে পারত সেই পোশাক আর উদযাপন করতে পারত তার নিজের নগ্ন, স্বর্গীয় নির্যাস তার আত্মা, তার মন, তার দেহ। দেহকে অগ্রাহ্য করার যে পাপ – সেই পাপে তারা কাঁদছিল; শতকের পর শতক পেশী আর স্নায়ুকে অগ্রাহ্য করার পাপ, পঞ্চেন্দ্রিয়ের রংধনু দ্বার রুদ্ধ করে তাকে মিথ্যা অভিযোজন তত্বের বুকনি দিয়ে ভরাট করতে করতে, শরীর হয়েছে নিরঙ, নিরক্ত মণ্ড, সে শরীর থেকে উদগত ভাবনাগুলিও সের’ম, তাতে সেই অতীতের নক্ষত্রচুম্বী চেতনার শেষ তলানি ছলছল করছে।
“কোথায় তুমি?” কেঁদে বললেন তিনি।
অন্ধকারের মধ্যে তার কন্ঠ বলল, “এখানে”।
“কুনো, আর কোনো আশা আছে কি?”
“আমাদের জন্য কিছু নেই।”\
“তুমি কোথায়?”
মৃতদেহের ওপর হামাগুড়ি দিতে দিতে রক্তমাখা হাত দিয়ে হাতড়াচ্ছিলেন তিনি। “তাড়াতাড়ি! আমি মরছি – কিন্তু মেশিনের বাইরে আমরা কথা বলছি, হাতে হাত মেলাচ্ছি।” হাঁপাতে হাঁপাতে বলল কুনো। মা ছেলেকে শেষ চুমু খেলেন।
“আমরা আমাতে ফিরছি মা। আমরা মরছি, কিন্তু জিয়নকাঠি পেয়েছি। ওয়েসেক্সে এলফ্রিড যেমন ডেনদের জিতেছিলো। আমরা জানি মেশিনের বাইরে কি আছে, মেঘে মেঘে যারা থাকতো তাঁদের রং মুক্তোর মত।”
“কিন্তু কুনো এ কি সত্যি? পৃথিবীর ওপর কি সত্যি মানুষ আছে এখনো? এই সুড়ঙ্গ, এক বিষভরা অন্ধকার – এটাই শেষ না?”
কুনো বলল:
“আমি ওদের দেখেছি, কথা বলেছি, ভালোবেসেছি। কুয়াশা আর ফার্নে লুকিয়ে আছে ওরা আমাদের সভ্যতা ধ্বংসের অপেক্ষায়। আজ তারা বেঘর – কিন্তু কাল- ”
“ওহ কাল – কাল কোনো মূর্খ আবার মেশিন চালু করে দেবে।”
“কক্ষনো না,” ফুঁসে উঠলো কুনো,”কখনো না। মানুষ উচিত শিক্ষা শিখেছে।”
কুনোর কথা শেষ হ’তে না হ’তেই সারা শহর শুকনো মৌচাকের মত মড়মড়িয়ে ভেঙ্গে পড়তে লাগলো। আকাশ থেকে এক হাওয়া-জাহাজ খসে পড়ে ভমিটারি ভেঙ্গে পুরনো এক হাওয়া-জাহাজঘাটা দিয়ে পাতাল ফুঁড়ে চলতে লাগলো নিচে । ধাপে ধাপে বিস্ফোরিত হতে হতে চললো সে, তার ইস্পাতের ডানা লাখ লাখ কামরা কাটতে থাকলো। শেষ মূহুর্তের আগের মুহুর্তে তারা দেখলো ধসে পড়া মৃত্যু উপত্যকা, আর সেই উপত্যকায় চিরকালের বাসিন্দা হবার মুহুর্তে দেখলো টুকরো টুকরো নির্মল আকাশ।
শেষ মূহুর্তের আগের মুহুর্তে
Translated from the transcription from The Eternal Moment and other Stories by E. M. Forster, Sidgwick & Jackson, Ltd. (London, 1928) and The Collected Tales of E. M. Forster, The Modern Library (New York, 1968).
![]()
















