অবিচুয়ারি
মহিউদ্দিন আহমেদ
জীবনের ঘটনাগুলা ব্যাক-ওয়ার্ডে গিয়াই রিলিভেন্ট হয়া উঠে। মানে, যখন ঘটতেছে, আপনি এর সিগনিফিকেন্স সবসময় টের পাইবেন না। পরে অনেক ইম্পর্টেন্ট ঘটনাও ফানি লাগে, অনেক ছোট-খাট জিনিসও জরুরি হয়া উঠে। ইউপিএল’র মহিউদ্দিন আহমেদের সাথে আমার এনকাউন্টার’টা এইরকমের একটা ঘটনা।
ভার্সিটি লাইফে পাবলিকেশনের উপরে একটা কোর্স করতে গিয়া উনার লগে দেখা হইছিল, ৫/৭ বার। অই কয়েকবারই যেই জ্বালানি’টা জ্বালাইছেন আমারে, আমার এখনো মনে আছে। লেকচার দিতে আসতেন, কিন্তু ক্লাসে ১৫/২০ জনের প্রেজেন্স পুরাপুরি ইগনোর কইরা আমার সাথেই “তর্ক” করতেন। এইটা পড়ছেন? অইটা দেখছেন? এইটা নিয়া এইরকম কেন মনে হয়? এইরকম… বুড়া মানুশের বাতিক মনে হইতো আমার। এড়াইতেই চাইছি। কোর্সের পরে কোন যোগাযোগও রাখি নাই।…
পরে যখন বই-পত্র পড়ার পাশাপাশি বই-ছাপানোর ব্যাপারে যখন ইন্টারেস্টেড হইছি, তখন উনার কথা মনে হইছে। একটা পাবলিকেশন হাউজ খালি একটা বিজনেসের ঘটনা না, সোশ-পলিটিক্যাল ঘটনাও। এইটা যে কোন বিজনেসের ব্যাপারেই সত্যি। বিজনেস এক্টিভিটির ভিতর দিয়াই সোসাইটি চলে, কে কি বিজনেস করতেছেন, কেমনে করতেছেন, এইগুলা সোসাইটির কোর ঘটনা। মহিউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশে বইয়ের ব্যবসারে একটা বিজনেস এক্টিভিটি হিসাবে এস্টাবলিশ করতে পারছিলেন। এইটা বাংলাদেশে খুবই বড় একটা ঘটনা।
উনি যেইভাবে বইয়ের বিজনেস করছেন, অইটারেই আমি মডেল মনে করি না। কিন্তু উনি একটা এক্সাম্পল ক্রিয়েট করছেন। এইটা যেকোন বিচারেই মনে রাখার মতো একটা ঘটনা। মুক্তধারা’র চিত্তরঞ্জণ দাশ আর ইউপিএল’র মহিউদ্দিন আহমেদের বাইরে আর খুব বেশি নাম আমরা হয়তো নিতে পারবো না।
এইটা খালি একটা বিজনেস-বুদ্ধি’র ঘটনা না, বা একটা ভিশন থাকাও না; বরং দুইটা জায়গাতেই কোন স্যাক্রিফাইস না কইরা একভাবে মিলাইতে পারার ঘটনা। মহিউদ্দিন আহমেদ নিজের জন্য এই দুইটা জায়গারে কোন না কোনভাবে কিছুদূর পর্যন্ত মিলাইতে পারছিলেন বইলাই আমার ধারণা। আর এইটা বাংলাদেশের জন্য ছিল ভালো একটা ঘটনা। ফি আমানিল্লাহ!
আবদুল গাফফার চৌধুরী
ভাষা-আন্দোলনের গান হইতেছে আবদুল লতিফের “অরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়…”। অইটার ভাষা যেহেতু “গ্রাম্য” এবং “আধুনিক” (পড়েন, কলোনিয়াল) না, এই কারণে কাউন্টার হিসাবে আবদুল গাফফার চৌধুরী’র বিলো-এভারেজ (বিশ্বাস না হইলে পুরা কবিতাটা পইড়া দেইখেন, পাইবেন তো একটু খুঁজলেই) একটা কবিতার ফার্স্ট চাইর লাইন গান হিসাবে চালু আছে, শহুরে মধ্যবিত্তি-সমাজে। তো, এইটা আবদুল গাফফার চৌধুরী’র পলিটিক্যাল এচিভমেন্ট।
এর বাইরে, বাংলাদেশের আর্ট-কালচারে উনার সাহিত্যিক কন্ট্রিবিউশন হইতেছে, ঢাকা শহরে কলোনিয়াল-কলিকাতার ধামাধরা সাংবাদিকতা-বেইজড একটা ‘সাহিত্য-সমাজ’ গইড়া তোলা, যাদের মেইন কাজ ছিল সমাজে সাহিত্যিক-গুন্ডামি করা। পলিটিক্যাল গুন্ডামির সহযোগী হিসাবে কাজ করা। যতোটা না লেখালেখি তার চাইতে প্রপাগান্ডা করতে পারাটারে “সাহিত্য” বানায়া তোলা। উনাদের ‘সাহিত্য’ হয় নাই, ফেইল মারছে। উনাদের ফাঁপা-কলসের বাজনা এখন আর বাজানো যায় না, অনেক ট্রাই করলেও। যদিও উনাদের পোলা-মাইয়া, নাতি-পুতিরা ট্রাই কইরা যাইতেছেন এখনো।… কোন ট্রেডিশনই তো একদিনে শেষ হয়া যায় না, একটা বাজে সামাজিক-অভ্যাসেরও শেষ হইতে দুই-তিনটা জেনারেশন লাগে।
বাংলাদেশে, লেখালেখি’র জায়গাটাতে, আবদুল গাফফার চৌধুরী’র মতো সিউডো-লেখকরে “আইকন” বানানোর চেষ্টার ভিতর দিয়া টের পাওয়া যায়, কতোটা বাজে-অবস্থায় আছে এখনকার আর্ট-কালচারের গ্রাউন্ড’টা। এমন না যে, কোন সাহিত্যে সিউডো-রাইটার, আর্টিস্ট থাকতে পারবে না, এবং উনারা সেলিব্রেটেডও হইতে পারবে না। যে কোন সাহিত্যেই সিরিয়াস-রাইটার, ভালো-রাইটার খুব বেশি থাকার কথা না, কোন সময়েই, রেয়ার। কিন্তু তাদেরকে “গ্রেট” বানায়া তোলাটা বাজে-পলিটিক্সের ঘটনাই না, কোন সাহিত্য-বিচারের জায়গা না থাকারই ঘটনা আসলে।
আবদুল গাফফার চৌধুরী’র সাহিত্যিক-গুন্ডামি সবসময়ই ছিল বাকশালি-জুলুমের এনেবেলিং একটা ফোর্স। এই গুন্ডামি করতে পারাটারেই আমরা “সাহিত্যিক-সাহস” বানায়া রাখছি, যেইটা পলিটিক্যাল-ভন্ডামিগুলারে কাভার-আপ করার কাজেই ইউজ করা হইছে। আবদুল গাফফার চৌধুরী ছিলেন একজন সিউডো-রাইটার এবং বাকশালি-রাজনীতির সাহিত্যিক-গুন্ডা – এই সত্যি-কথা ভুইলা গেলে উনার কাজকামরেই ভুল বোঝা হবে।
উনি এমন একজন রাইটার, আজকে যার মারা-যাওয়ার দিনে, তার কোন সিগনিফিকেন্ট লেখার কথা কেউ মনে করতে পারতেছি না! এইরকম একজন লোকরে যে আমরা সেলিব্রেটেড-রাইটার বানায়া রাখছি, এই কারণে আমাদের নিজেদেরও তো মনেহয় একটু শরম পাওয়া দরকার!
উনার আত্মা শান্তি পাক!
বাংলা-সাহিত্যে যদি উনার কোন সাহিত্যিক কন্ট্রিবিউশন থাকে, সেইটাও রিভিল হোক। কিন্তু যেই জুলুমের রাজনীতির প্রোপাগান্ডা-মাস্টার উনি ছিলেন, তার হাত থিকা আল্লাহ আমাদেরকে যেন রক্ষা করেন!
আলম খান
আলম খান মারা গেছেন গত ৮ই জুলাই, ২০২২ সালে। গত ১০ বছর ধইরাই উনি অসুস্থ ছিলেন। উনার মারা যাওয়ার খবর অইভাবে চোখে পড়ে নাই। গতকালকে খেয়াল করলাম নিউজটা। অথচ গত কয়েকদিন ধইরা উনার মিউজিক শুনতেছিলাম। ১৯৭০-৭৫ থিকা উনার মিউজিক ক্যারিয়ার শুরু।
উনারে ফার্স্টে খেয়াল করছিলাম, আজম খানের বড়ভাই হিসাবে। আজম খান কইতেছিলেন, আমাদের ফ্যামিলির মিউজিয়ান তো হইতেছেন আমার মেজোভাই আলম খান। তখন খেয়াল কইরা দেখলাম, আরে, অনেক সুন্দর সুন্দর মিউজিক বানাইছেন তো উনি!
বাংলাদেশের সিনেমার মিউজিক তৈরি করছেন আসলে ৮-১০ জন মানুশ – খান আতাউর রহমান, রবীন ঘোষ, ফেরদৌসি রহমান, সত্য সাহা, আনোয়ার পারভেজ, আলম খান, আলাউদ্দিন আলী, সুবল দাস, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। (আরো দুয়েকটা নাম বাদ গেছে মেবি।) তো, আলম খান যখন মিউজিক শুরু করেন তখন ইন্ডিয়া থিকা হিন্দি-সিনেমা ইমর্পোট করা বন্ধ হয়া গেছে বাংলাদেশে। উর্দু গীতও বাজানো হয় না। এবং কলকাতার “আধুনিক বাংলা গান”-ও মারা গেছে একভাবে। উনি এই তিনটা জায়গারই এক ধরণের মিক্স অ্যান্ড ম্যাচিং করতেছিলেন উনার মিউজিকে। আলাউদ্দিন আলী’র মত মর্ডান না হইলেও বাংলাদেশের সিনেমায় পপ-ঘরানা উনিই ফার্স্ট ইন্ট্রুডিউস করছেন (“তুমি যেখানে, আমি সেখানে…” গানটা শুনতে পারেন)।
কিছু হিন্দি-গানের “নকল সুরে” গান বানাইছিলেন, কিন্তু অইগুলা ভালো এডাপ্টশন ছিল আসলে। যেইরকম আর.ডি.বর্মণ ইংলিশ-গানের সুর’রে হিন্দিতে নিয়া আসছিলেন। স্পেশালি ফেরদৌস ওয়াহিদের গাওয়া “ওগো তুমি যে আমার কতো প্রিয়” গানটা রিকমেন্ড করবো আমি। হিন্দিটার মতোই ভালো গান হইছে এইটা। এখন মুশকিল হইতেছে কবীর সুমন, অঞ্জন দত্তদের এডাপ্টশন আমরা নিতে পারি, কিন্তু আলম খানেরটারে কওয়া লাগে “নকল”! 🙁
মানে, আর অন্য গানের কথা বাদ দেন, এক “ওরে নীল দরিয়া” গানের লাইগাই তো উনার পায়ে ধইরা সালাম করার দরকার এখনকার মিউজিশিয়ানদের। কিন্তু এইটারে আমরা চিনছি, শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস হিসাবে! যেন এই গান লেইখা সুরও কইরা দিয়া গেছেন কায়সার সাহেব, সাহিত্য করছেন বইলা! এই যে, কন্ট্রিবিউশনের জায়গাগুলারে রিকগনাইজ না করতে চাওয়া – এইটা কোন ভালো জিনিস না। কেউ একটু দেশি-মেজাজের হইলে, এলাকার চাচা-ভাতিজা বইলা তার কাজকামগুলারে এতো বেশি ইম্পর্টেন্ট ভাবতে না পারা, এইটা কালচারালি আমাদেরকে ভুগাইছে, আর ভুগাইবোও অনেকদিন। (এর বিপরীতে এখন যে “বন্ধু বন্ধু গোলাপ ফুল” চালু হইছে, অইটাও কোন কাজের জিনিস না।…)
তো, আমি বলবো যে, আমাদের নিজেদের হিরো’দেরকে হিরো কইতে শরমাইয়েন না। খেয়াল কইরা দেখেন, আলম খানের না হইলেও ১০-১২টা গান আপনি শুনছেন, এমনকি আপনার পছন্দের গানের মধ্যেও আছে অইগুলা। কিন্তু জাস্ট এইগুলা যে উনার মিউজিক, সেইটা জানেন না! (কেন জানেন না? বা কেন উনার নাম “অনুচ্চারিত” থাকে, সেইটা নিয়া ভাইবেন…)
আমি কয়েকটা গানের নাম বলি, উনার সুর করা:
১. ওগো তুমি যে আমার কতো প্রিয়
২. ওরে নীল দরিয়া
৩. আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই
৪. হায় রে মানুষ রঙিন ফানুশ
৫. কি যাদু করিলা পিরিতি শিখাইলা
৬. তেল গেলে ফুরাইয়া বাত্তি যায় নিভিয়া
৭. তুমি যেখানে আমি সেখানে
৮. চাঁদের সাথে আমি দেবো না তোমার তুলনা
৯. ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে
১০. আমি একদিন তোমায় না দেখিলে
মানে, আলম খানরে না চিনলেও উনার গান শুনেন নাই, এইরকম লোক বাংলাদেশে রেয়ার, গত দুই-তিনটা জেনারেশনের। (২০০০-এর পরে যাদের জন্ম, উনারা না-ই শুনতে পারেন।) তো, এইটা একজন ক্রিয়েটিভ মানুশের পারসোনাল ক্রেডিট না যে, মানুশটারে চিনে না, কিন্তু তার ক্রিয়েশনটারে চিনে; বরং একটা সোসাইটির মানুশজনের নিজেদের কালচারের লোকজনরে এপ্রিশিয়েট করতে পারার ইন-এবিলিটি বইলাই আমি মনে করি। এই না-পারাগুলারে এটলিস্ট লোকেট করতে পারাটা দরকার আমাদের।
আলম খানের আমাদের এইসবকিছুর কোন দরকার নাই আর। কিন্তু আমাদের যে আলম খান’রে চিনা দরকার – এইটা যেন আমরা ফিল করতে পারি। উনি মারা যাওয়ার পরে এইটা আমাদের বুঝতে পারাটা আরো বেশি জরুরি।
সমরেশ মজুমদার
মেবি আমি বাংলাদেশের ‘বই-পড়া’ ‘শিক্ষিত’ ‘মিডল-ক্লাস কালচারের’ মধ্যে রেয়ার একজন মানুশ, যে কিনা সমরেশ মজুমদারের কোন বই না পইড়াই ‘বড়’ [বয়সের সেন্সেই] হইতে পারছিলাম।
মানে, আমার রিডিং-লিস্ট এর চে বড় বড় ক্লাসিক রাইটার দিয়া সবসময় ফিলাপ করা ছিল – সেইটাও না! দস্যু বনহুর পড়ছি আমি (রোমেনা আফাজের), মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, সেবা রোমান্টিক, এইসবও। কিন্তু সমরেশ মজুমদার আমার পড়া লাগে নাই।
কয়দিন আগে বলতেছিলাম, সতজিৎ রায়ের খুববেশি সিনেমা আমি দেখি নাই; তখন একজন আইসা বলছিল, না দেইখাও এতো কথা কইতে পারেন! এই-সেই। তো, এইরকম অনেককিছু দেখা ও অনেককিছু পড়া লোকজনরে আমি এড়াইয়া চলি, অনেকদিন ধইরাই। মানে, উনারা ফিল্ম-মেকার বা সাহিত্যিকই না খালি, সোশাল ফেনোমেনা তো, একটা ক্লাসের।
আমি না দেখলে, না পড়লেও এইসব “ইনোসেন্ট বিস্ময়” তো আমারে নিতে হইছে যে, সমরেশ মজুমদার পড়ো নাই! যেন এইটা সত্যি-কথা হইতেই পারে না! যেন আমি মিছা-কথা বলতেছি, বা কোন একটা ভাব নেয়ার ট্রাই করতেছি! কিন্তু সমরেশ মজুমদার না পইড়া তো পশ-ও হইতে পারতেছি না আমি! [মানে, এখনকার মতো কলকাতা-বিরোধিতার ফ্যাশন তো তখন চালু হইতে পারে নাই।] তাইলে কেন না-পড়ার কথা বলতেছি আমি!
আমি বলতে চাইতেছি, সমরেশ মজুমদারে বই না পইড়া আমি তেমন কিছু মিস করছি বইলা ফিল করি নাই। দুনিয়ার অনেক লিটারেচারই আমি পড়ি নাই, বাংলা-সাহিত্যেরও অনেককিছু পড়ি নাই; কিন্তু ভাবছি বা লিস্টে রাখছি যে, সময় পাইলে এইটা এইটা তো পড়া দরকার! কিন্তু সমরেশ মজুমদারের ব্যাপারে এইটা আমার কখনো হয় নাই।
কিন্তু আমার না-পড়াতে বা তার লেখা পড়াটা জরুরি মনে-না-হওয়াতে উনি খারাপ-রাইটার হয়া যান নাই অবশ্যই। একইভাবে যারা তাদের ‘কৈশোর-প্রেমের নস্টালজিয়া’রে মহান কইরা তুলতে চান, তাদেরকে বইলা রাখাটাও দরকারি যে, বাংলাদেশের একজন রিডারের কাছে উনার বই মাস্ট-রিড হওয়ার স্কোপটাও কমই। আপনাদের এডমায়ার করাটা যেমন মিথ্যা না, আমার না-পড়াটাও একইরকম।
সমরেশ মজুমদারের লেখার একজন রিডার হইতে পারাটা কোন ফরচুনেট ঘটনা কিনা আমি শিওর না, কিন্তু তার লেখার রিডার না-হওয়াটা যে অনেক সময় বাংলাদেশে ‘বিস্ময়’ হিসাবে পারসিভড হইতো, সেইটার একজন ভিক্টিম হিসাবে, উনার মরণে আমি হ্যাপি বা স্যাড না; জাস্ট একটা নিউজ হিসাবেই আমি নিতে পারতেছি। তো, রাইটার হিসাবে এইরকম নিউজ হইতে পারাটা বা সার্টেন অডিয়েন্সের ইমোশনাল নিড’রে ফুলফিল করতে পারাটা খারাপ-জিনিস না কোনভাবেই।
আমি জাস্ট নিজের জন্য এইটাই এক্সপেক্ট করি যে, একজন রাইটার হওয়ার মানে যেন এইটুকই না হয়!
সমরেশ মজুমদারের রিডার’রা আমারে মাফ করবেন। উনি তো মাফ করা বা না-করার জায়গাতে আর নাই! আর মরণ তো আমাদের সবার জন্যই ওয়েট করতেছে! গুডবাই, সমরেশ মজুমদার!
শাহেদ শাফায়েত
শাহেদ শাফায়েত অই সময়ের কবি যখন কবিতা-লেখার বাইরে কবি-হওয়াটাও ইম্পর্টেন্ট ঘটনা ছিল বাংলাদেশে।
ইন ফ্যাক্ট, এখনো এই ব্যাপারটা আছে। সিনেমার নায়িকার যেমন ‘সুন্দর’ হইতে হয় (কোন না কোনভাবে), ‘অভিনয়’ জানার বাইরে, এমনকি অইটা না হইলে হয়-ই না, ‘অভিনয়’-টা বরং সেকেন্ডারি ঘটনাই কিছুটা, সবাই তো কম-বেশি জানেই, বা শিখায়া নেয়া যায়; এইরকম কবি-হওয়া ব্যাপারটা খালি কবিতা-লেখার (নায়িকাদের ব্যাপারে যেইরকম ‘অভিনয়’ করার) ঘটনা না, কবি-হওয়ার (‘সুন্দর’ হওয়ার) একটা ঘটনাও। মানে, “কবি” আইডেন্টিটি’টা একটা কবিতা-লেখার এক্ট না খালি, একটা লাইফ-স্টাইল, এবং একটা পজিশন। একটু শো-অফের ঘটনাই না, এমন কিছু কাজ-কাম করতে পারা যেইটা কিছুটা ‘মিথিকাল’। কবিতা-লেখার বাইরেও এইটা রিকোয়ার্ড। একটা কবি-পজিশন ক্লেইম করতে পারাটা, কোন না কোন সোশাল-এবনরমালিটির ভিতর দিয়া।
সুইসাইড করা, পাগল হওয়া, নেশা করা, প্যারনয়েড থাকা – এইরকম জিনিসগুলা যে কবিদের (বা ক্রিয়েটিভ মানুশদের) থাকে না, তা না; কিন্তু এর বাইরেও মানুশ-জন সুইসাইড করেন, পাগল হয়া যান, নেশা করেন এবং প্যারানয়েড থাকেন। এইগুলা কবিতা-লেখাতে বা ক্রিয়েটিভ কাজ-কামে হেল্প করে না, বরং অনেক সময় সাইড-এফেক্ট হিসাবে দেখা যায়। কিন্তু থাকতেই হবে – এই এক্সপেক্টশনটা এখনো আছে। এইটিইসের ঢাকা শহরের সাহিত্য-সমাজে এইটা আরো বেশি ছিল। লাইফ-স্টাইলের ভিতর দিয়া আলাদা হইতে পারাটা, কিছুটা ‘বোহেমিয়ান’ থাকতে পারাটা। তো, শাহেদ শাফায়েত ঢাকা শহরে মোটামুটি উদ্বাস্তুই ছিলেন। (যতদূর আমি জানি।) ছিলেন একজন “মফস্বলের কবি”, যার ঢাকায় কিছু কবি-বন্ধু আছেন। (এখন তো, ঢাকার বাইরে থাইকা কবি হওয়া আরো টাফ 🙁 ) কিন্তু শাহেদ শাফায়েত ছিলেন চুপচাপ, নিরবতা ছিল উনার ট্রেডমার্ক। যেইটা রেয়ার ছিল তখনো, কবি-সমাজে। দুই-তিন ঘন্টায় হয়তো একটা কথা বলতেছেন, এইরকমের রেয়ার। আর কথা বলতেছেন কবিতা-পড়ার জন্যই।
আমি পরে ভাবছি, কেন আর কিভাবে এই লাইফ-স্টাইলের ব্যাপারটাই মেইন সিগনিফিকেন্সের ঘটনা হয়া উঠছিল ঢাকার এইটিইসের কবিদের মধ্যে? এর একটা মেজর কারণ মেবি উনারা গ্রসলি কবিতা-ধারণার জায়গাটা থিকা তেমন কিছু রি-ক্রিয়েট করতে পারতেছিলেন না, কিন্তু টের পাইতেছিলেন যে, এইটা দিয়া হইতেছে না! লিটল-ম্যাগাজিনের নামে কলোনিয়াল-কলকাতার ঘানিই টাইনতেছেন, বরং আরো বড় বিপ্লবী হওয়া লাগতেছে! আর এইক্ষেত্রে পলিটিকালি “সমাজবিচ্ছিন্নতা”-ই ছিল উনাদের মেইন হাতিয়ার। এইটিইসের ধারা, উপরাধা (মানে, ট্রেন্ডের) মধ্যেই এইটা ছিল কমন।
ফর্মের জায়গাতে যেই নড়াচড়াগুলা ছিল সেইটা নতুন কোন দিকে টার্ন করতে পারতেছিল না। যার ফলে অই সময়ের কবিতার রিয়ালিটিগুলাতে কোথাও গ্রাউন্ডেড হইতে না-পারার একটা ঘটনা ছিল। যেইটা শাহেদ শাফায়েতের কবিতাতেও ছিল। একটা ঘোর-লাগা ফিলিংস তৈরি করা, অনেকগুলা ইমেজ ও রেফারেন্সের মধ্যে ঘুরতে থাকা এবং কোন মিনিংয়ের ব্যাপারে আন-সেটেলিং থাকা – এইরকম কয়েকটা ফিচার ছিল। যেইগুলা পরে নানান দিকে ট্রাভেল কইরা গেছে। কিন্তু কেউ কেউ “খাঁটি কবিতা”র জায়গা থিকা সরতে রাজি হন নাই। শাহেদ শাফায়েত কম-বেশি অই জায়গাগুলাতে থেকে গেছিলেন। যার কবিতা পরে আমরা আর পাই নাই বা পড়তে পারি নাই। কিন্তু কবি হিসাবে আমাদের মেমোরিতে থেকে গেছেন। এখনকার সময়ের স্মার্ট-কবিদের ভীড়ে শাহেদ শাফায়েতের মতো কবি-চেহারা রেয়ার।
উনার সাথে দেখা-সাক্ষাত আমার কম-ই হইছে। কিন্তু কবিতা-লেখা শুরু করার সময়ে যাদের লেখা আমি পড়ছি, উনার কবিতাগুলা তার মধ্যে ছিল। উনারা বাজার-চলতি কবিতার বাইরে গিয়া কবিতা লেখতে চাইতেছেন – এইটা তো ইন্সপায়ার করছিলই, কিন্তু ধীরে ধীরে সময়ের সাথে সাথে এইটাও ফিল করতে পারছি যে, ট্রাডিশনরে এড়ায়া চলতে গিয়া উনারা ইন্ডিভিজুয়াল টেলেন্টই হয়া উঠতে চাইছেন, যেইটা ইচ্ছার জায়গা থিকা সুন্দর; কবিতার জায়গা থিকা খুব বেশি দূর পর্যন্ত নেয়ার স্কোপটা কমই।
শাহেদ শাফায়েতের কবিতা আমার কাছে একটা সময়ের মেমোরি। উনার কবি-বন্ধুদের কাছে মেবি এর চাইতে বেশি কিছু। আর বাংলাদেশের এখনকার কবিতা-রিডারদের কাছে একটা ভুলে-যাওয়া-নামই মনেহয়। তবে একটা জিনিস নিয়া আমরা যা বলতে পারি, সেইটা সবসময় তার চাইতে একটু বেশি কিছুই।
আর যে কোন জিনিস নিয়া যখন আমরা কথা বলি তখন আমরা খালি অই বিষয়টা (বা মানুশটারে) নিয়াই কথা বলি না, নিজেদেরকেও এনকাউন্টার করি, বা এর আশপাশের ঘটনাগুলা নিয়াও বলি। তো, শাহেদ শাফায়েতের মারা যাওয়ার ঘটনাটা নিয়া কথা বলতে গিয়া এই ব্যাপারটাই ঘটছে এইখানে। একজন মানুশ যেইরকম তার চারপাশটা নিয়া মানুশ, একইভাবে একজন মানুশরে আমরা যে যেইভাবে চিনি, সেই মানুশটা যে ততটুকই না, এই কন্সিডারেশনটা যেন আমাদের সবসময় থাকা দরকার।
আমি আশা করি, আমি খুব বেশি দূরে চইলা যাই নাই। যদি গিয়া থিকা, সরি! শাহেদ শাফায়েতের আত্মা শান্তিতে থাকুক!
মোহাম্মদ রফিক
বাংলাদেশের খুব বেশি ‘বড় কবিদের’ সাথে আমার দেখা-সাক্ষাত হয় নাই; যেমন ধরেন, আল-মাহমুদ, শামসুর রাহমান… উনারা তো তখনো বাঁইচা ছিলেন যখন আমি ঢাকা শহরে আসি, থাকতে শুরু করি, কিন্তু উনাদের দেখা হওয়ার মতো জায়গাতে যাওয়া হয় নাই আমার। তো, মোহাম্মদ রফিকের সাথে আমার দেখা হইছিল। উনিও ‘বড় কবি’দের কাতারে ছিলেন একটা সময়। মানে, তখনকার সময়ে ‘বড় কবি’ একটা টার্ম হিসাবে কয়েন করা হইতো, যারা আসলে কম-বেশি একটা গ্রুপের লোকই ছিলেন। পত্রিকায় কবিতা ছাপাইলে যাদের লেখা শুরুতে থাকতো বা রাখা লাগতো, এইরকম।
তো, উনার সাথে দেখা হইছিল জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটিতে, উনার টিচার্স কোয়ার্টারের বাসায়। আমরা (আমিনুল বারী শুভ্র আর আমি) তখন স্কুল পাশ কইরা কলেজে উঠছি। আমি ঢাকা কলেজের সাউথ হলে থাকি। শুভ্র ঢাকায় আসার পরে আমরা সুমন ভাইয়ের (সুমন রহমান) কাছে গেলাম একদিন জাহাঙ্গীরনগরের বাসে কইরা, সালাম-বরকত হলে। তখন আমরা কবিতার দুনিয়ায় ঢুকে গেছি।
দুই-তিন দিন থাকলাম। দুপুর-বিকাল-রাতে অনেক হাঁটলাম। অনেক উইড ইনহেল করলাম। পিয়াল ভাই, রোকন ভাই, চঞ্চল ভাইয়ের গান শুনলাম। খায়ের ভাইয়ের পিঞ্চিং এনজয় করলাম। কণা-আপা’র সাথে দেখা হইলো। এইরকম ঘটনার মধ্যে দিয়া একদিন দুপুরে মোহাম্মদ রফিকের কোয়ার্টারেও গেলাম।
বিশাল গোঁফ ছিল উনার। মিটিমিটি হাসতেছিলেন আমাদেরকে দেইখা। কফিল ভাইয়ের কথা জিগাইলেন। কফিল ভাই তখন জাহাঙ্গীরনগরে ছিলেন না। সুমন ভাই’রে উনি হাসতে হাসতে বললেন, তুমি তো বাচ্চা-ছেলেদেরকে নষ্ট করে দিচ্ছো! আমরাও হাইসা দিলাম। বললাম, না, না, আমরা তো কলেজে পড়ি!
তো, মোহাম্মদ রফিক পিয়াল ভাইরে (মাহবুব পিয়াল) পছন্দ করতেন বেশি, আমরা টের পাইলাম। পরেও খেয়াল করছি পিয়াল ভাই-ই মোহাম্মদ রফিকের কবিতার জায়গাটারে এক্সপ্লোর করতে বেশি ইন্টারেস্টেড ছিলেন। সুমন ভাই উনার কবিসঙ্গ’টারেই বেশি নিছেন, কবিতার জায়গাটারে এতোটা না।
উনার বাসা থিকা বাইর হয়া আমরা শুনলাম যে, জাহাঙ্গীরনগরের সাহিত্য-সমাজে দুইটা গ্রুপ আছে; তবে সবাই মোটামুটি সেলিম-আল-দীনের গ্রুপেরই লোকজন; মোহাম্মদ রফিকের দলবল তেমন নাই, কয়েকজন পারসোনাল এডমায়ারার-ই আছেন। উনিও নিজের প্রেম-ট্রেম নিয়াই ব্যস্ত থাকেন বেশিরভাগ সময়। উনার ছেলেও তখন জাহাঙ্গীরনগরের টিচার ছিলেন।
মোহাম্মদ রফিকের কবিতা পরে পড়ছি আমি। ‘কপিলা’ নামে একটা দীর্ঘ-কবিতা ছিল উনার। উনি হিস্ট্রিরে মিথিকাল এক্সপ্লোরেশনের জায়গা হিসাবে দেখতে চাইছেন বইলা আমার মনে হইছে। কবিতা দিয়া অই জায়গাটারে কন্সট্রাক্ট করতে চাইছেন। ব্যাপারটা কিছুটা একসেপশনাল ঘটনা হইলেও কবিতার জায়গাতে একসাইটিং কোন জিনিস হইতে পারে নাই।
সেইটা যা-ই হোক, কবিতা লেইখা আর কয়জন কবি হইতে পারছে বাংলাদেশে! একটা সামাজিক সার্কেলের মেম্বার হওয়ার ভিতর দিয়া কবি হওয়ার ঘটনাটা বেশি ঘটে। অই সার্কেলে একটা সময়ে প্রমিনেন্ট ফিগার বা বড়-কবি হইলেও অনেকদিন আগেই উনি ব্লার/ঝাপসা একটা ফিগার হয়া উঠছিলেন। তার অনেকদিন পরে গতকালকে উনি মারা গেলেন।
আর কবি’র মারা যাওয়া তো তার কবিতার মারা যাওয়া না; অনেক সময় অনেক আগেই কবিতা মারা যায়, অনেক সময় তারও অনেকদিন পর; আর সবসময় বাঁইচা উঠার একটা সম্ভাবনার মধ্যে তো থাকেই।
আসাদ চৌধুরী
আমি কবিতা-লেখার আগে থিকাই কবি হিসাবে আসাদ চৌধুরী’রে চিনতাম। উনার কবিতার কারণে না ঠিক, আমাদের এলাকায় একটা প্রোগ্রামে আসছিলেন। স্কুলে পড়ি আমি তখন। অই প্রোগ্রামে এম.সি. (মাস্টার অফ সিরমনি) মানে তখনকার দিনে কইতো – ‘উপস্থাপক’, ছিলাম আমি।
তো, স্টেইজে অতিথিদের সিরিয়াস-মুখ নিয়া বইসা থাকতে হইতো তিন-চাইর ঘন্টা। (মোবাইল টিপাটিপি করারও কোন উপায় ছিল না! মানে, মোবাইল ফোন তো তখন ছিল না।) অন্য বক্তাদের কথা শুনতে হইতো, এবং তেমন কোন এক্সপ্রেশন শো করা যাইতো না। এতোক্ষণ বইসা থাকতে থাকতে উনি মেবি টায়ার্ড হয়া গেছিলেন, এই কারণে একটু পরে উইঠা, পর্দার আড়ালে গিয়া সিগ্রেট ধরাইলেন, কাধের ঝোলা-ব্যাগ থিকা পান বাইর কইরা খাইলেন। (তখনকার দিনে কবি হইতে হইলে ঝোলা-ব্যাগ রাখতে হইতো।) আমি ব্যাক-স্টেইজের চেয়ারে বইসা উনার কাজ-কাম দেখতেছিলাম।
কবি জিনিসটা কি রকম – সেইটা বুঝার ট্রাই করতেছিলাম মনেহয়। স্টেইজে ফিরার সময় যখন আমারে ক্রস করে যাইতেছিলেন, তখন সালাম দিলাম, উনি হাসলেন একটু।
উনি বক্তৃতা দেয়ার সময় খুব রসায়া রসায়া কথা বলতেছিলেন। অডিয়েন্স খুব খুশি হইছিল।
পরে খেয়াল কইরা দেখলাম মোটামুটি ৩০ বছর পরে আমার মেয়ের স্কুলেও উনি একটা প্রোগ্রামে আসছিলেন। মানে, উনি স্কুল-কলেজের নানান প্রোগ্রামে যাইতেন। টিভিতেও ‘অনুষ্ঠান’ করতেন। উনার কথার ভঙ্গি ছিল সুরেলা। টাইনা টাইনা কথা বলতেন। মনে হইতো, পুঁথি পড়তেছেন। উনার কথা শুনতে ভাল-লাগতো। ভাল্লাগতো উনার টোনের কারণেই মনেহয়।
উনার কবিতা তো পড়ছি পরে, কিন্তু কবিতার কথা তেমন মনে নাই। “তবক দেয়া পান” নাম’টাই খালি বলা হয় উনার কবিতার ব্যাপারে। (উনার পয়লা কবিতার বইয়ের নাম এইটা।) কিছু ‘ভালো কবিতা’-ও উনি লেখছেন মেবি, অই সময়ের। কিন্তু কবি-হওয়াটা যে একটা পারফরমেন্সেরও ঘটনা – এই জিনিসটারে উনি কিছুটা ফিরায়া নিয়া আসতে পারছিলেন। মানে, একটা সময়ে কবিতা তো পারফর্ম করা লাগতো, গানের মতো না হইলেও আসরে, মজমায়, আড্ডাতে পড়া লাগতো। একটা ইন্ট্রো, কিছু ঘটনা, কনটেক্সট, রিলিভেন্সসহ। আসাদ চৌধুরী অই জায়গাটাতে ইউনিক ছিলেন।
সাহিত্য-সমাজ এবং কবি-সমাজের লোক তো ছিলেনই, কিন্তু অই গ্রুপগুলা কুটনামিগুলা করার ভিতরেই নিজেদেরকে পুরাপুরি লিমিট করে নাই তখনো; বরং অইখানে পারফরমেন্সের কিছু ঘটনাও ছিল (এখনো কিছু স্পেইস তো আছেই, সবসময় থাকেই কিছু…), অইখানে আসাদ চৌধুরী আমার ধারণা অনেকেরই কিছুটা ‘ঈর্ষার পাত্র’ হইতে পারতেন, কিন্তু মেবি ‘টিটকারি’-ই পাইছিলেন। নিজের কবিতা পড়ার জন্য যারে অন্য গলা ধার করতে হয় নাই! মানে, আবৃত্তিকার খুঁজতে হয় নাই। কিন্তু কবি যদি নিজেই কবিতা পড়েন, আবৃত্তিকাররা কি করবে তাইলে! যে কবিতা পড়ে সে তো ‘আবৃত্তিকার’, কবি তো ততোটা না! এই রিস্ক বা জাজমেন্ট (মানে, টিটকারি তার পাওনা) ছিল।
তো, ‘আধুনিক বাংলা-কবিতা’ অই জায়গাটা হারায়া ফেললেও, সমাজে অই ভ্যাকুয়ামটা এখনো আছে; আমরা এক্সপেক্ট করি যে, একজন কবি সুন্দর কইরা কথা বলতে পারবেন, ভালো ফ্লার্ট করতে পারবেন, খালি কবিতাই লেখবেন না, কবিতা নিয়া কথাও বলতে পারবেন; মানে, রিডারের লগে, অডিয়েন্সের লগে বাত-চিত করবেন। আসাদ চৌধুরী এই কাজটা করতে পারতেন। যদিও স্যাডলি এক ধরণের ‘আধুনিক কবিতা’-ই উনি লেখছেন বা লেখতে চাইছেন। (‘হয় নাই’ যদিও।) “ওপারে ভালো থাকবেন”রেই উনি আপনাইছেন। যারা উনার কথা শুনছেন এবং উনার কবিতা পড়ছেন – এই জিনিসটা টের পাওয়ার কথা যে, এর মধ্যে ব্রিজিংটা উনি তেমন তৈরি করতে পারেন নাই।
কিন্তু একজন কবি কি পারছেন তার চাইতে অনেক সময় কি পারেন নাই – সেইটাও অনেক ইম্পর্টেন্ট ঘটনা হয়া উঠে। মানে, আসাদ চৌধুরী তো একটা কবি-সমাজের ঘটনাই ছিলেন। সমাজে ‘কবি’ পরিচয় নিয়া বাঁইচা ছিলেন। আজকে মারা গেলেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!
- সম্পাদনার সময় লেখকের বানান-রীতি বজায় রাখা হলো।
![]()