কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব ৬ থেকে ১০)

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অসমাপ্ত আত্মজীবনী (পর্ব ৬ থেকে ১০)


প্রমিত বাংলা ভাষা

সুভাষের পূর্বপুরুষরা, রবীন্দ্রনাথের মতোই বৃহত্তর খুলনা-যশোরের মানুষ, পরবর্তীতে বিবাহসূত্রে নদীয়ার কৃষ্ণনগর ও দর্শনা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। বাবার আবগারি চাকুরিসূত্রে শিশু-কিশোর সুভাষের এক মধুময় সময় কেটেছে উত্তর বঙ্গের নওগাঁতে, গাঁজা গোলায়। তখন ব্রিটিশের হাত থেকে ভারতকে মুক্ত করতে উঠে পড়ে লেগেছে বাঙালিরা। নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু তখন স্বাধীনতাকামীদের কাছে মঙ্গল তারকা। সুভাষ মুখোপাধ্যায় নামকরণেও সেই ছাপ পরিলক্ষিত হয়, যদিও বাড়িতে তাঁকে ‘গোবিন্দ’ নামেই ডাকা হতো।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুভাষ প্রভাবিত হন রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লবের বিশ্বব্যাপী জোয়ারে। সাতচল্লিশের দেশভাগে মানসিকভাবে কলকাতার উদ্বাস্তু বাঙালে পরিণত হন তিনি। সার্বক্ষণিক কম্যুনিস্ট হিসেবে জেল-জুলুমও ভোগ করতে হয়েছে।

বজবজের শিল্পাঞ্চলে মেহনতি মানুষদের সংগঠিত ও জীবনমান উন্নয়ন করতে সুভাষ দম্পতি তাঁদের যৌবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়টা অতিবাহিত করেছেন। মুসলমান আর বাঙালদের মাতৃভাষা নিয়ে তাঁর অসম্ভব রকমের বাড়াবাড়ি ছিলো।

সুভাষের সাহিত্যে নজর দিলেই বোঝা যাবে, অপ্রয়োজনীয় মেদহীন, অত্যন্ত সুখপাঠ্য এক সাহিত্য তিনি রচনা করে গেছেন, যার কারণে তাঁর সময়ে এবং এখনো এক অপ্রতিরোধ্য সুভাষই একক ও অনন্য।

পূর্ববঙ্গের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবোধ তাকে সর্বক্ষণ মর্মাহত করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে নিজেকে বিলীন করে দিয়েছিলেন তিনি। দুই বাংলার বিভাজন রেখাকে আমৃত্যু তিনি মেনে নিতে পারেন নি।

সুভাষ একদিন তাঁর প্রাত্যহিক লেখালেখির কলম থামিয়ে আমাকে বললেন, “সোহেল তোমাদের ঢাকায় বাংলা টাইপরাইটার কিনতে পাওয়া যায় না? মুনির অপটিমা না কী যেন নাম!”

বুঝলাম খোঁজখবর রাখেন ঠিকই। বললাম, “হ্যাঁ, পাওয়া যায়। অধ্যাপক মুনির চৌধুরীর আবিষ্কার। এটা পূর্ব জার্মানিতে তৈরি হয়।” তিনি আবদার করলেন, আমি যেন তাঁকে একটা বাংলা টাইপরাইটার কিনে দিই।

আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হওয়ায়, তিনি আবদার প্লাস জুড়ে দিলেন, সঙ্গে যেন বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘বাংলা ভাষার আঞ্চলিক অভিধান’টাও যোগাড় করে দিই। কলকাতার অভিধান নিয়ে তাঁর বিরক্তি-ভাবও প্রকাশ করলেন। এখানে নাকি বাংলা ভাষা আর এগুচ্ছে না! থেমে আছে! সংস্কৃত ধুতির কাছায় আটকে গিয়ে হিন্দি আর ইংরেজি ভাষার নবগঙ্গায় বাংলা ভাষার বিসর্জনকাল চলছে।

বললেন, “বাংলা বেঁচে থাকবে বাংলাদেশেই। অগ্রগতি অথবা অবনতির সব দায়দায়িত্ব বাংলাদেশের বাঙালদের হাতেই। তবে….”

জিজ্ঞেস করলাম, “তবে কী?”

হেঁ হেঁ সেই ন্যাকামার্কা হাসিটা হেসে তখন তিনি ইতিহাসের অপ্রকাশিত এক গোপন তথ্য বিনিময় করলেন আমার সঙ্গে।

বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন সাফল্য-পরবর্তী ঢাকায় ‘বাংলা একাডেমি’ গঠন করা হয়। করণীয় নির্ধারণের জন্য একটা সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সুভাষ তখন সোভিয়েত পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা বিশ্বব্যাপী লেখকদের সংগঠনে যুক্ত ছিলেন। সেই সম্মেলনে তিনিও আমন্ত্রিত হয়ে অনুষ্ঠান মঞ্চে বসেছিলেন, ঠিক সভাপতির পাশের আসনটিতে। সভাপতিত্ব করছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।

চলমান অনুষ্ঠানের মধ্যেই সুভাষদা শহীদুল্লাহর কানে কানে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা যে এত বাংলা বাংলা করছেন, কিন্তু সেই বাংলা ভাষার কোথাকার ভাষাটা আপনারা গ্রহণ করবেন? বাংলা ভাষা তো একেক জায়গায় একেক রকম!”

অনুষ্ঠান পরিচালনার ফাঁকে শহীদুল্লাহ্ ঘাড় বাঁকিয়ে সুভাষের কানে কানে উত্তর দিলেন, “কেন, আমাদের কলকাতার বাংলা ভাষা!” তারপর একটা নিঃশব্দ হাসি ছুঁড়ে দিলেন সুভাষের দিকে।

স্মরণীয় যে, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দেশভাগের পর কলকাতা ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থিতু হয়েছিলেন। তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য নিয়ে সুভাষের কাছে আরো অনেক কিছুই শুনেছিলাম।

এই গল্প শেষে আবার নিজের প্রসঙ্গে ফিরে এলেন সুভাষদা। বললেন, “বুঝেছ তো, যতই ক্ষয়িষ্ণু হোক কলকাতার ‘ঘটি বাংলা’, বাংলা ভাষার পোশাকি প্রতিমাটির জন্য কলকাতাকেই বেছে নিতে হবে। বাংলা ভাষার মঙ্গলই তাতে নিহিত, হেঁ হেঁ হেঁ…..।”

সুভাষদার বাংলা টাইপরাইটার আর বাংলা ভাষার আঞ্চলিক অভিধানের আবদার যে সিরিয়াস, সেটা বোঝা গেলো কিছুদিন বাদেই। ঢাকায় তিনি আমার স্ত্রীকে ফোন করে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিতে বললেন। আমি তখন মধ্যপ্রাচ্যে কাতারের রাজধানী দোহায় ব্যবসা করি। স্ত্রীর ফোন পেয়ে আবদার রক্ষার বিলম্বে একটু লজ্জিতও হলাম।

কিন্তু কিভাবে এই টাইপ-মেশিন শরৎ ব্যানার্জি রোডে পৌঁছাবো! ঢাকা থেকে মেশিনটা দোহাতে এনে, তারপর কলকাতায় নিয়ে যাবো?

কিন্তু না, সেই দিনগুলোতে ভারতের, বিশেষ করে কলকাতার, কাস্টমস আচরণ অনেকটাই আফ্রিকার জঙ্গলের মত ছিলো। প্রিয়জনদের জন্য কোনো উপহার এয়ারপোর্ট দিয়ে নিয়ে যেতে খুবই অপমানিত হতে হতো। বিদেশি পণ্য যেন ওদের জ্বালা ধরিয়ে দিতো! ভাবখানা এমন, যেন চোরাচালান করতে এসেছি।

সমাধানটা সুভাষই বের করে দিলো। মনে পড়লো, প্রায়শ তিনি বলতেন, দুই বাংলার মধ্যে চোরাচালান মোটেও অন্যায় কিছু না। এতে অন্য এক শ্রেণির স্বার্থ ভণ্ডুল হয় বলেই চোরাচালান ঠেকাতে দু’পক্ষের একই শ্রেণিস্বার্থ তৎপরতা!

এমনকি, ভিসা নিয়ে কলকাতা যাওয়াটাও তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। তাঁর ভাষায়- “বিশাল বর্ডার দিয়ে টুপ করে লাফ দিলেই তো আমরা আসা-যাওয়া করতে পারি।” পাকিস্তান আমলে তিনি তা নিজেই অনেক বার করেছেন। তখন কম্যুনিস্ট আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে পশ্চিম বাংলা থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বহুবার তিনি ওভাবেই আসা-যাওয়া করেছেন।

সুভাষদার মতো এই বিনা ভিসায় আসা-যাওয়াটা আমিও একবার পরীক্ষা করে দেখেছিলাম, তাঁরই প্ররোচনায়! তবে সে অভিজ্ঞতা আজকে থাক, অন্য আরেক দিন। আজকে চোরাচালানেই ক্ষান্ত থাকি।

যোগাযোগ করলাম কুষ্টিয়ায় আমার বাল্যবন্ধু মারোয়াড়ী ব্রাহ্মণ রামঅবতার শর্মা’র সঙ্গে (বর্তমানে ভারতীয় নাগরিক)। স্বতঃস্ফূর্তভাবেই চোরাচালানের দায়িত্বটা সে নিজ কাঁধে তুলে নিলো। তারপর, ঢাকা থেকে পাচার হয়ে গেলো ‘বাংলা ভাষার আঞ্চলিক অভিধান’ ও বাংলা টাইপরাইটার!

সুভাষদা বেজায় খুশি হয়েছিলেন এই চোরাকারবারিতে। তাঁর পরবর্তী লেখালেখির কাজটা তিনি ঐ টাইপরাইটার দিয়েই আমৃত্যু চালিয়ে গেছেন। আঙুল ঠুকে ঠুকে নিজেই হয়ে উঠেছিলেন বাংলা টাইপিস্ট। কলকাতার কবিভক্তরা সুভাষের দখলে থাকা সেখানকার একমাত্র সেই বাংলা টাইপ মেশিনটা অনেকেই দেখেছে, এমনকি মেশিনটাকে নিয়ে লেখালেখিও করেছে।

০৭.০৮.২০১৮


রেডমিট

গোমাংস বা রেড মিট নিয়ে সুভাষের জন্মশতবার্ষিকীতে ভারতে যে নব-উন্মাদনা দেখছি, তাতে কলকাতার অনেক সমাজচিন্তকই নিশ্চয় আতঙ্কিত। আমার শৈশবে পবিত্র গরুকে দেখেছি গাধার মতো কৃষকের বলদ খাটতে। গরু যে দুধ দেয় তা ‘গরু’ রচনা লিখতে গিয়ে প্রথম জেনেছিলাম। সেই রচনায় কোথাও লেখা হতো না গরু জবাই করে বা বলি দিয়ে হত্যা করে সেই মাংসের নানা রেসিপির কথা।

মায়ের শেষ সন্তান হিসেবে তাঁর দুধের খনিসদৃশ ভরপুর স্তন্যলেহনে আমার মাতৃদুগ্ধ পর্ব একটু দীর্ঘই হয়েছিলো বটে! তবে, গোদুগ্ধের আগমন ঘটতো পালাপার্বণে অথবা আমার বাৎসরিক টাইফয়েড কালপর্বে। গরুর বাছুরটাকে বেঁধে রেখে, মা-গরুটার শরীর ছেঁকে দুগ্ধ আহরণের নির্মম দৃশ্য দেখেছি আরো বড় হয়ে। ভাগ্যিস আমাকে এই পাপাচারে অংশীদার হতে হয়নি। মায়ের বুকেই লুকিয়ে ছিলো আমার প্রাথমিক পুষ্টি।

আমি যে ভূগোলে বড় হয়েছি, সেখানে কুরবানির উৎসবে গরু হত্যা এতোটা চোখে পড়েনি। আরব দেশে বসবাস সূত্রেও গরু হত্যার কোনো আলামত দেখিনি। সাক্ষাত ঘটেনি কোনো গরুর সঙ্গে! সে কথা রসগোল্লা পর্বে লিখেছি। তবে সেমেটিক ধর্ম পর্যালোচনায় গরুর গল্প এসেছে অবশ্যই।

দিনে পাঁচবার যথেষ্ট ভক্তি সহকারে নামাজ পড়া আমার পিতাকে কখনো কুরবানি দিতে দেখিনি। তা কি অর্থাভাবে, না বাসায় রেফ্রিজারেটর ছিলো না বলে, সেটা এখন ভাববার বিষয়। আমাদের বাসায় গোমাংস ভক্ষণ হতো নিঃসন্দেহে, তবে তা সস্তা ও নিম্নমানের আমিষ হিসেবে।

একদিন সুভাষ আর গীতা খাবার টেবিলে ‘গরুর গোস্ত’ প্রকল্প উত্থাপন করলো। ইতোমধ্যে আমার উপর শুয়োরের মাংস ছাড়া কাঁকড়া এবং কচ্ছপও পরীক্ষা করা হয়েছে। আমি সে পরীক্ষা না দিয়েই উত্তীর্ণ হয়েছি তাদের কাছে। তাঁরা আমার শূকর অভিজ্ঞতার গল্পেই সন্তুষ্ট।

এখন গরুর গল্প! সুভাষ-গীতা দুজনের গোমাংস প্রীতিতে বিস্মিত হলাম। ওদের জিহ্বা দুটো যেন লকলক করো উঠলো। গোয়ালন্দের লঞ্চে খালাসিদের রান্না করা সেই গোমাংসের ঝোল এখনো যেন সুভাষের জিভ থেকে মুছে যায়নি। পথহারা সমাজতন্ত্রের মতো এখনো তিনি সেই ঝোল খুঁজে ফিরছেন।

অমৃত সেই স্বাদের বর্ণনা শুনে আমি বলেই ফেললাম ঐ ঝোল আমি রান্না করতে পারি। মায়ের রান্না দেখে শিখেছি।

বাঙালি মুসলমানদের দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, স্বাধীনতা অর্জনের সাহসিকতা রহস্য ও ডাক্তারদের ব্যবসা প্রসারের সামাজিক ‘গরুত্ত্ব’ (গুরুত্ব?) আলাপ করে সে রাতের ডেজার্ট শেষ হলো।

পরদিন সকালে একটা ঝোলা হাতে সুভাষ আমাকে সঙ্গে করে লেক মার্কেটে হাজির। বোঝা গেলো বাজার করতে নয়, এখানে তিনি বেড়াতে আসেন। এটাও তাঁর আরেকটা সংসার।

নানা বিক্রেতার সঙ্গে অনেক কথাবার্তার ফলো-আপ। ‘সুভাষদা, সুভাষদা’ করে এদিক-ওদিক থেকে ডাক পড়তে থাকে। সুভাষ কোন্ দিক রেখে কোন্ দিকে যাবেন! আলোচনার বিষয় রাজনীতি, বিক্রেতার ঘর-সংসারের খবরাখবর, অসুখ-বিসুখ, এমনকি কবিতাও।

অনেকে জানতে চাইছেন, “কী সুভাষদা, একদম যে লিখছেন না?” ভাবখানা যেন সুভাষ কবিতা লিখছেন না বলে ওদের সব্জির দাম পড়ে যাচ্ছে!

এখানে এসে জানতে পারলাম সুভাষ অনেকদিন লেখালেখি করছেন না, আর সব্জিবিক্রেতারা এবং তাদের স্ত্রী-সন্তানরাও সুভাষের কবিতার ভক্ত। ক্রমে বিরক্ত হচ্ছি ভেবে সুভাষ আমাকে এক কোণে ডেকে নিয়ে খালি ঝোলাটা আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। কানে কানে বললেন, “ঐ দিকে মাংসের দোকানগুলো- তুমি গিয়ে গরুর মাংস কিনে আনো।”

তাঁকে রেখে আমি চললাম সেদিকে। দেখি সব শুয়োরের মাংস ঝুলছে। জিজ্ঞেস করলাম গরুর মাংস কোথায়? ওরা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো। গোমাংসের দোকানে দেখলাম ব্যবসা রমরমা, তবে কেউই এক-আধপোয়ার বেশি কিনছে না! ক্রেতারাও সব বস্তিবাসী অথবা ঝি-চাকরানি।

বিক্রেতা আমার দিকে তাকালো; জিজ্ঞেস করলো, “দাদা, লাগবে নাকি? কতটুকু দেবো?” সুভাষের বাড়ির লোকসংখ্যা ভেবে বললাম– “দু’কেজি।”

লোকটা মাংস কাটার ফাঁকে ফাঁকে আমাকে বেশ ক’বার দেখে নিলো! বাংলাদেশ থেকে এসেছি বলার পর তার প্রশ্নবাণ থেকে রেহাই পেলাম।

পয়সা চুকিয়ে ভাবছি, এই ভিড়ে সুভাষকে খুঁজে পাবো তো! আসার সময় তাঁর গল্প শুনতে শুনতে এসেছি, রাস্তাঘাট দেখিনি। তাঁকে না পেলে বাসা খুঁজতে আবার বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না তো! ততদিনেও আমার ৫/বি ডাক্তার শরৎ ব্যানার্জী রোড মুখস্থ হয়নি।

ঘাড় ঘুরিয়ে দুশ্চিন্তা মুক্ত হলাম। লেক মার্কেটের সেই জনসমুদ্রে সুভাষের মাথাটা সবচেয়ে উঁচু! অন্যদের সেরকম উঁচু মাথা থাকলেও যেন নুয়ে আছে। সুভাষকে দ্রুত পেয়ে যাওয়ার আনন্দ নিয়ে এবার আমরা ঘরমুখো হাঁটা দিলাম।

সুভাষের মুখে শুনলাম, কেন তিনি আমাকে দিয়ে মাংস কেনালেন। কুকুরের জন্য মাঝে-মধ্যে মাংস কিনতে তিনি নিজেই যান আর তার পরিমাণ খুব কম, যা রান্না করলে মানুষের পোষাবে না। বেশি পরিমাণ কিনলে বাজারে রটে যাবে সুভাষ গরুর মাংস খাচ্ছে!

এই প্রথম সুভাষকে নিয়ে আমার খটকা লাগলো- এত বড় প্রগতিবাদী কম্যুনিস্ট কবি প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেতে ভয় পায়! পরবর্তীতে সেই খটকা আমার অবশ্য কেটে গিয়েছিলো। সে অন্য কাহিনী।

মাংসের পরিমাণ দেখে গীতার চোখ কপালে উঠলো। সুধাপিসি বাসার অল্পস্বল্প কাজ সেরে কেটে পড়লেন তাড়াহুড়ো করে- সুভাষের পীড়াপীড়িতেও কাজ হলো না। পাপু মুখ শুকিয়ে তোতার বাড়িতে ভেগে গেলো।

সেদিন গীতার আর কর্মক্ষেত্রে যাওয়া হলো না। আমার রান্নার হেল্পর হিসেবে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করলেন। দুপুর গড়াতেই পুপে-প্রদ্যোত, মিউ-বোমলার দল সেজেগুজে হাজির। গোমাংসের একটা গতি হলো।

খাওয়া শেষে আমরা সবাই তাকিয়ে আছি সুভাষের দিকে, রান্না কেমন হয়েছে সে-ব্যাপারে মতামত জানতে। সুভাষ অনেক বিজ্ঞভাব নিয়ে রামশূন্য গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভালো হয়েছে।” তারপর একটু দম নিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, “তবে সেই খালাসি রান্নার মতো হয় নি। সেটা যে কি মজার ছিল…..!”

সুভাষের অতৃপ্ত ঝোলের গল্পটা ঢাকায় ইন্ডিয়ান হাইকমিশনের ‘ভারত বিচিত্রা’ অফিসে কবি বেলাল চৌধুরীকে যখন বলছি, তখন বর্তমানের জগৎখ্যাত তসলিমা নাসরিনও উপস্থিত ছিলো। সেই দিনগুলোতে আমি ব্যবসা লাটে উঠিয়ে ভারত বিচিত্রার অফিসে বেলালদার সঙ্গে আড্ডা দিই।

ভারত বিচিত্রা অথবা বেলালের প্রেমে এতোটাই পড়েছিলাম যে, পত্রিকাটার একটা সংখ্যার প্রেস বিল পর্যন্ত আমাকে দিতে হয়েছিলো। দূতাবাসের ফান্ড ছিলো না, অথচ আমাদের প্রিয় পত্রিকাটার প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে আমি অর্থকষ্টের সেই দিনেও ঐ বিনিয়োগ করেছি, যেটা ভারত সরকার হয়তো জানেও না, তাই আমাকে এখনো ফেরত দেয়নি।

সে যাই হোক, তসলিমা ঐ ঝোলের গল্প শুনেই যখন তার ‘লাল পিঁপড়ে আর কালো পিঁপড়ে’র অভিযানে কলকাতায় গিয়ে আনন্দ পুরস্কার বাগিয়ে বসলো, সে যাত্রায় সে সুভাষদার জন্য গরুর মাংস রান্না করে ঢাকা থেকে কলকাতা নিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু তসলিমার রান্নায় ঝোল ছিলো কিনা বা রান্নাটা খেতে কেমন হয়েছিলো সেটা অবশ্য জানা হয় নি! সুভাষের জন্মশতবার্ষিকীতে প্রসঙ্গটা একটু উঁকি দিলো মাত্র।

০৯.০৮.২০১৮

 ৮
সুকান্ত সমগ্র

শুরুতেই লিখেছিলাম, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে সুভাষ আমাকে প্রায় অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে শ্রীমতী গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খোঁয়াড়ে বন্দি করে ফেলেছিল। গীতার যৌবনের ফরাসী সৌরভ আর সিঙ্গাপুর-রেঙ্গুনের বাল্যস্মৃতিতে মন্ত্রমুগ্ধ আমার মন তখন উল্লিখিত খোঁয়াড়ের সঙ্গে আমৃত্যু বন্ধন খুঁজছিলো।

আমার হাতে তখন সময় ও পয়সা দুটোই ঝনঝন করছিলো। দিল্লী থেকে ডাক এলেই ফিরে যেতে হবে, তার পরেরটুকু জানা নেই। আমি যেন কাঁঠালের আঠা হয়ে লেপটেই যাচ্ছি শরৎ ব্যানার্জী রোডে দিনকে দিন। অল্প কয়েকদিনেই সুভাষ বুঝে ফেললো, লোকটাকে আমি আদৌ চিনি না, তাঁর লেখালেখি সম্পর্কে কিছুই জানা নেই আমার। গীতার নিজের গল্প শুনেই আমার দিনরাতের একান্ত সময়গুলো কেটে যাচ্ছে। আর তা ছাড়া গীতাও ভাবে নি যে আমি এতটা সুভাষ-মূর্খ!

সুভাষ আমাকে জিজ্ঞেস শুরু করলেন, “তুমি সুকান্তের কবিতা পড়েছো?”

 “কী যে বলেন, ‘সুকান্ত সমগ্র’ তো আমার এক সময়ে মাথার বালিশে পরিণত হয়েছিলো! তবে সুকান্তের পৃথকভাবে কোনো বই চোখে পড়েনি। ‘সুকান্ত সমগ্র’ বাংলাদেশে যে কী জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো, সেটা আপনাকে বলে বোঝানো যাবে না! আমি বইটা পাকিস্তান আমল থেকে বাংলাদেশে ’৭৪ পর্যন্ত বুকে-পিঠে করেই ঘুরে বেড়িয়েছি। কবিতার বাইরে ওঁর চিঠিপত্রগুলো ছিলো আমার অশেষ প্রিয়। সুকান্তের চিঠি থেকেই আমি চিঠি লেখা শিখেছিলাম এবং হাত পাকিয়েছিলাম। কী দারুণ মাস্টারপিস সেগুলো!”

সুভাষ খুব খুশি হলেন। চোখেমুখে তৃপ্তির ছাপ তুলে প্রশ্ন করলেন, “ভূমিকাটা পড়ো নি?”

এবার কিন্তু আমি ঢোঁক গিললাম! লজ্জায় মুখটা ফ্যাকাসে করে বললাম, “না তো, ভূমিকাটা পড়া হয় নি!” আসলে নিশ্চয় পড়েছিলাম, কিন্তু ভয় পেলাম, সেখান থেকে যদি আবার কোনো প্রশ্ন করে আর আমি ফেঁসে যাই! তা ছাড়া কবিতার বইয়ের ভূমিকা আমার কাছে খুবই মূল্যহীন ছিলো; যেখানে নিজেই সেই কবিতা পড়তে যাচ্ছি, অন্যের মুখে প্রেসক্রিপশন শুনে লাভ কী? তাতে বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

সুভাষ মুখের নিঃশব্দ হাসিটা দীর্ঘরেখায় মিলিয়ে দিয়ে বললেন, “ওটা তো আমারই লেখা!”

তাই তো! মনে পড়ে গেলো, ভূমিকাটার শেষে ‘সুভাষ’ শব্দটা ছিল, কিন্তু তারপর যে ‘মুখোপাধ্যায়’ ছিল সেটা তো সত্যিই দেখি নি! সেকালে ‘সুভাষ’ নামটার পাশেই যে ‘চন্দ্র’ অথবা ‘বোস’ থাকবে, এটাই মনে হতো আমার। এখন যেমন ‘বঙ্গবন্ধু’ বললে আর ‘শেখ মুজিব’ লাগে না।

বলে কি লোকটা! এই শুরু হলো সুভাষের প্রতি আমার গদগদ ভক্তির সূচনাপর্ব। জানা হলো সুকান্ত সমগ্রের শুধু ভূমিকাই লেখেন নি তিনি, অভিনব সেই গ্রন্থটির পরিকল্পনা,  গ্রন্থনা, সম্পাদনা, প্রুফ দেখা, প্রেসের কাজ তদারকি সবকিছুই তিনি নিজ হাতে করেছিলেন। সুকান্তের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিক এবং আত্মিক সম্পর্কের কাহিনী শুনতে শুনতে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেলো। দু-একদিন আমরা সুকান্তে ডুবে থাকলাম।

সুভাষের সঙ্গে সুকান্তের যখন দেখা হয়, সুকান্ত তখন নিতান্তই স্কুল-পড়ুয়া বালক। সুকান্তের কাকাবাবুর সঙ্গে ছিলো সুভাষের পলিটিক্যাল দহরম মহরম এবং বন্ধুস্থানীয় সম্পর্ক। কলকাতার বেলেঘাটার হরমোহন ঘোষ লেনে সুকান্তদের বাড়িতে কবির আনাগোনা ছিলো।

একদিন সেই বাড়িতে একজন কিশোর বালক উঁকিঝুঁকি দিয়ে কবিকে দেখছিলো। কে সেই বালক জানতে চাইলে কবিবন্ধু কবিকে বললেন, তাঁর ভাতিজা, “তোমার ভক্ত, কবিতা-টবিতা লেখার চেষ্টা করে, তাই তোমাকে দেখলেই এর মধ্যে একটা ছটফটানি ভাব আসে। মনে হয়, তোমার সঙ্গে পরিচিত হতে চায়। একদিন দেখো তো, ও কী ছাইপাঁশ লেখে!”

সুভাষ তখনই ওকে ডাকতে বললেন, আর কবিবন্ধু ভাতিজাকে ডেকে সুভাষকে ধরিয়ে দিয়ে অন্দরমহলে চলে গেলেন। অমনি ঘটে গেলো বাংলা কবিতার এক অমর কাব্য-সংগঠন (পরিবর্তে ‘কাব্যসংযোগ’ শব্দটি কি ব্যবহার করা যায়?)!

সুভাষ বালককে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী গো?”

 “সুকান্ত, আজ্ঞে, সুকান্ত ভট্টাচার্য।”

 “বাহ্, বেশ সুন্দর নাম তো! তা তুমি লেখো?”

বালকের উত্তর নেই, চুপ করে আছে। সুভাষ অভয় দিয়ে বললেন, “লজ্জা কী? কোনো ভয় নেই! যাও, তোমার কবিতার খাতাটা নিয়ে এসো।”

বালক নীরবে ভীত-বিহ্বল পায়ে কবির নির্দেশ পালন করলো। কবি স্বহস্তে খাতাটা লুফে (এ শব্দটা বাদ দিলে ভালো হয়। নবীন কবিযশোপ্রার্থীর কবিতার খাতা সাধারণত কেউ ‘লুফে’ নেন না, কিঞ্চিৎ হেলাভরে বা অনুকম্পার দৃষ্টিতেই নেন) নিয়ে খুলে দেখেই চমকে উঠলেন! একের পর এক পাতা উল্টিয়ে যাচ্ছেন আর বালকের দিকে তাকাচ্ছেন। বালকের তখন কী অবস্থা, সুভাষের তা দেখার কথা নয়, আর তাই আমারও জানা হয়নি। তবে সুভাষের কী ঘটেছিল সেটা জেনেছিলাম।

সুভাষ, সুকান্তের খাতাটা আরো পড়বেন বলে বগলদাবা করে নিয়ে এসেছিলেন। বাড়ি ফেরার পথে এই বালক কবি তাঁর ঘাড়ে ভূত হয়ে চেপে বসেছিলো। সুভাষ তাঁর সেই অনুভূতি এত ন্যাংটো করে এতকাল আর বলার সময় পান নি। বহু স্মরণসভায় সুকান্তকে নিয়ে অনেক বক্তৃতা করেছেন তিনি, তবে সেসব ছিলো কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দুর্বার স্নেহ-মমতা-তাড়িত অঙ্গীকারেরই বহিঃপ্রকাশ।

সুভাষ দেখলেন যে, তিনি এতকাল কবিতা লিখে যে সাধনায় সংগ্রামরত তার ফল ফলেছে। নতুন কবির হাতে এখন লেখা হবে আগামী প্রজন্মের কবিতা সংযোগ। মেহনতি মানুষেরা নতুন দিনের গান শুনবে নতুন কবির কণ্ঠে।

সুভাষের ঘাড়ে তখন কম্যুনিস্ট পার্টির মুখপত্র প্রকাশের দায়িত্ব। সুকান্তের কবিতা ছাপা শুরু হলো সেই পত্রিকায়। কিছুদিনের মধ্যে সেই পত্রিকার কিশোর পাতার দায়িত্ব পেয়ে গেলেন সুকান্ত নিজে। সুভাষের চেয়ে দ্রুতগতিতে সুকান্ত এগিয়ে যেতে থাকলেন কম্যুনিস্ট দুনিয়ার রোম্যান্টিক বাস্তবতায়।

যথারীতি প্রবেশিকা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। ছাড়পত্র, পূর্বাভাস, ইস্তেহার, মিঠেকড়া, অভিযান, ঘুম নেই কতই না বই প্রকাশিত হতে থাকলো সুকান্তের। [এ অংশটুকুর পুনর্বিবেচনা ও পুনর্লিখন প্রয়োজন বলে মনে হয়। আমার জানামতে সুকান্তের জীবৎকালে তাঁর কোনো বই প্রকাশিত হয় নি। শুধু তাঁর প্রথম বই ‘ছাড়পত্র’-এর ছাপানো পাতাগুলো দিয়ে বানানো একটা ডামি কপি দেখে গিয়েছিলেন হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে। ছাড়পত্রসহ তাঁর সব বই-ই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর মৃত্যুর পর]

আর মাত্র ২১ বছর বয়সেই সুকান্তের জীবনাবসান ঘটে গেলো। সে-কথা তো সকলেরই জানা। কবিত্ব স্ফুরণ, রোগ-শোক, চিকিৎসা, শেষকৃত্য সবই যে এই অগ্রজ কবির হাত দিয়েই ঘটেছে, সে-কথা কি সকলের জানা থাকা সম্ভব? এই যেমন সুকান্ত সমগ্রের ভূমিকার এই লেখকের নামই আমার চোখে পড়ে নি এতকাল। সুকান্তের প্রতি আমি আরো কৃতজ্ঞ হয়ে পড়লাম সুভাষকে আমার হাতে ধরিয়ে দেয়ার জন্য।

আমাদের এই আলোচনা পর্ব একখণ্ডে সমাপ্ত হয়নি। ফাঁকে ফাঁকে এসেছে বাম রাজনীতির কথাও। তেমনই এক প্রসঙ্গে উঠে এলো পশ্চিমবঙ্গের সে সময়ের সাংস্কৃতিক মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কথা, যিনি পরবর্তীতে মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছিলেন। আমি অবাক হলাম সুকান্তের ভাতিজা এখানকার সাংস্কৃতিক মন্ত্রী শুনে। সুকান্তের পেছনে সুভাষের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের কি কোনো মূল্যই নেই! থাকলে সুভাষের প্রতি রাজ্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা নেই কেন? সুভাষ এতো অর্থকষ্টে থাকবে কেন?

গীতাদি দাঁত কেলিয়ে ব্যঙ্গ করে বললেন, “ও তুমি বুঝবে না সোহেল, এসব রাজনীতির গ্যাঁড়াকল…!”

সুভাষদার কাছ থেকে সুকান্তের ভাতিজা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নাম শুনে ভদ্রলোকের প্রতি কেমন যেন একটা আত্মীয়-সুলভ (যেহেতু আমি একজন প্রগাঢ় সুকান্তভক্ত) ভক্তি ও কৌতূহল তৈরি হলো। তাঁর সঙ্গে দেখা করার সাধ জাগলো। ভাবলাম, দেখা হলে সুভাষদার একটা বিহিত করা যাবে।

আমার সেই সাধ আহ্লাদ মিটিয়ে দিয়েছিল ‘দি লাস্ট বেঙ্গলি লিজেন্ড’ সৌমিত্র মিত্র, তবে আরো বেশ কিছুদিন পরে। তখন সৌমিত্র রবীন্দ্র সদনে তথ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। আমি বুদ্ধদেবের সঙ্গে দেখা করতে চাই শুনে বললো, “সত্যি দেখা করবি?” ঘাড় নেড়ে বললাম, “হুঁ।”অমনি টেবিল থেকে ফোন তুলে কোথায় যেন কথা বললো ও, যেভাবে বলে থাকে। তারপর ফোনটা রেখে একটা বাঁদরামি হাসি হেসে বললো, “যা, কাল সকাল ১০টায় চলে আসবি। অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়ে গেছে।”

এমনভাবে সে কথাটা বললো, যেন আমার বিশ্বাস না হয়। তারপর জিজ্ঞেস করলো, আমার কোনো কবিতার বই আমার কাছে আছে কিনা? বললাম, “আমি কি বই নিয়ে ঘুরে বেড়াই?”

“তাও তো কথা,” এটা বলে জিজ্ঞেস করলো, “সুভাষদার বাসায় তোর বই নেই?”

বললাম, “সেটা আমি কী জানি?”

 “ঠিক আছে, দেখি, আমার বাসায় থাকতে পারে। তুই কাল ঠিক সকাল ১০টায় চলে আসবি। রাতে বেশি মালটাল খাবি না কিন্তু।”

ভাবলাম, কবিতার বই কেন? নিশ্চয় সুকান্তের ভাতিজার সামনে আমার একটা সম্মানজনক উপস্থিতি কামনা করছে সে। কিন্তু নিজের বই নিয়ে এরকম কেলিয়ে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা আমার খুবই কম, তাই মনের মধ্যে একটা খটকা রয়েই গেলো। তবুও সুকান্তের ভাতিজা দর্শনের শুভক্ষণ আমাকে প্রতীক্ষায় রাখলো।

পরদিন যথারীতি যথাসময়ে সৌমিত্রের সঙ্গে রওনা দিলাম, কোথা থেকে মনে নেই। তবে ড্রাইভারকে সৌমিত্রের দেয়া ধমকে বুঝলাম, আমরা যাচ্ছি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে! নাম শুনেছি, আশপাশ দিয়ে প্রচুর ছোটাছুটিও করেছি, কিন্তু ভেতরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়ে নি। আজ সেখানে ঢুকছি ভেবে ভালোই লাগলো।

আমার একটা কবিতার বইও যোগাড় হয়েছে, তবে সেটা সুভাষের বাসা থেকে, নাকি সৌমিত্র এনে দিয়েছিলো, আজ আর মনে পড়ছে না। বইটার নাম ‘আল্লাহ মার্শাল-ল দে’। কলকাতায় আল্লাহর কী দশা হবে? আর এরা তো মার্শাল-ল দেখেই নি! আমার অন্য কোনো বই পাওয়া গেলো না!

ভাগ্যিস বইটা উৎসর্গ করা ছিলো ‘সাগরময় ঘোষ’-কে (সেটাও সুভাষদার কারণেই; ঘোষবাবুর ‘দেশিকোত্তম’ পুরস্কার পাওয়ায় সুভাষদার কাছে তার সেসব গুণকীর্তন শুনে এ বই তাঁকে উৎসর্গ করেছিলাম। সেসব কথা এখানে লিখছি না, কম্পোজ যিনি করছেন তাঁর বিরাগভাজন হতে চাই না) কিন্তু সাগরময় ঘোষদের আনন্দবাজার তো সিপিএম সরকারের উল্টোডাঙা! হিতে বোধহয় বিপরীতই হলো।

সৌমিত্রকে বললাম, “বইটা না দিলে হয় না?”

‘আরে গাণ্ডু, তোকে যা বলছি সেটাই কর’ বলে সৌমিত্র খিস্তি করে উঠলো। ততক্ষণে আমরা ঢুকে পড়েছি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে!

ব্রিটিশ আমলের রেলস্টেশন-সদৃশ একটা ঘরে আমরা ঢুকলাম। বেশ বড়সড় ফাঁকা সেই ঘরে একজন বসেছিলেন। তাঁর সামনে আমরা দুজন বসলাম। আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম হয়তো। ওদের দুজনের কথোপকথনের ফাঁকে সৌমিত্র আমাকে একটা দরজা দেখিয়ে বললো, “যা, ঢুকে যা!”

আমি বললাম, “তুইও সঙ্গে চল।”

এবার সৌমিত্র তেড়ে উঠলো বললো, “যা বলছি!” তবে এবার আর গাণ্ডু বললো না।

চেয়ারে বসা লোকটি বললো, “যান না! কোনো অসুবিধে নেই, চলে যান।”

আমি দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলাম। যে রুম থেকে এখানে এলাম, সেটার চেয়ে এটা ছোট। তারপর আরো দরজা দেখা যাচ্ছে। ছোট টেবিল পেতে কেরানি গোছের একটা লোক বসেছিলো, উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে অভ্যর্থনার ভঙ্গিতে স্বাগত জানালেন।

বুঝলাম, মন্ত্রীর পিএ-টিএ কিছু একটা হবে। নমস্কার দিয়ে বললাম, “আমি বুদ্ধদেব বাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, বাংলাদেশ থেকে।”

খুবই বিনীত কণ্ঠে তিনি বললেন, “আমিই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।”

মুহূর্তে নিজেকে সৌমিত্রের গণ্ডু ভেবে দ্রুতবেগে সোহেলে ফিরে এলাম। দরজাগুলো দেখিয়ে ক্ষমা চেয়ে বললাম, “সরি, সরি! আমি ভেবেছিলাম, যাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি তিনি ওই দরজাটার ওপারে আছেন। সত্যি বলতে কি, আমি আপনার কোনো ছবিও এর আগে দেখি নি (দেখবো কি করে, পড়তাম তো আনন্দবাজার!”

আবারো ‘সরি’ বলাতে তিনি বাধা দিয়ে পরিবেশ স্বাভাবিক করে দিলেন। আমার কবিতার বইটি তাঁর হাতে দিতেই তিনি সেটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাতিজার হাতে আমার বইটা নড়াচড়া করছে দেখেও সুখ অনুভব করলাম না। বরং ভাতিজার এই অসামান্যতায় মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না। বুঝতে বাকি রইল না, সিপিএম কেন এত বছর ধরে পশ্চিম বাংলায় জেঁকে বসে আছে।

তিনি বইটির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে জানতে চাইলেন, বাংলাদেশের খবর কী? অর্থাৎ রাজনীতির খবর। বললাম, ভালো। এদিকে তখন এরশাদকে হটিয়ে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেছে। আমি আর এসবের কতটুকুই বা জানি। এই আলোচনায় আমার অনাগ্রহ দেখে তিনিও আর বেশিদূর এগোলেন না।

তারপর রাশেদ খান মেননের ওয়ার্কাস পার্টি নিয়ে কিছু সংলাপ হলো আমাদের দুজনের মধ্যে। চা-পানের আপ্যায়ন করেছিলেন কিনা মনে পড়ছে না (কলকাতায় আবার অতিথির বিদায়কালে বলা হয়, একটু চা খেয়ে গেলে হতো না!)।

সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে এসে মনে পড়লো, সুভাষদার কথা তো কিছুই বলা হলো না। অবশ্য ততদিনে বুঝে গিয়েছিলাম, সুভাষদার কথা বলেও কোনো লাভ হবে না।

১১.০৮.২০১৮


মুজিববাদ

দিল্লী থেকে যখন প্রতীক্ষার সেই ডাক এলো, সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাগদাদে ফিরে এলাম। এখানেও আমার একটা বুড়ো ভাম একান্ত বন্ধু জুটেছিলো, যাঁর সঙ্গে দিবানিশি মদ্যপান আর নাইট ক্লাবে শ্রীলঙ্কান অথবা ফিলিপিনো মেয়েদের উদোম বুকে মাথা গুঁজে দু’জনে কী যেন খুঁজতাম আর দেশ জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অহর্নিশ চিন্তাভাবনা করতাম।

আমার কলকাতার অভিজ্ঞতা শুনতে বুড়োর আগ্রহের কোনো ক্লান্তি নেই। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানা প্রশ্ন করে জানতে চাইতেন, আমি সেখানে কী করলাম আর কী-ই বা ছিঁড়লাম। কেন-না, বুড়োটার নিজেরও অনেক স্মৃতি কলকাতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

কথা প্রসঙ্গে যখন সুভাষের নাম এলো, বুড়ো একদম লাফ দিয়ে উঠলেন! বললেন, “বলো কী! তুমি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করেছো!’

বললাম, “শুধু দেখা করবো কেন? একেবারে গড়াগড়ি খেয়ে এসেছি!”

শ্রীলঙ্কান ললনার স্ফীত বক্ষের ঢিবি থেকে মুখ উঠিয়ে নিলেন তিনি, যেন নারকেল বাগানের মোহমুক্তি ঘটেছে তাঁর।

সুভাষের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে কিনা, সেই রহস্য উপন্যাস বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি। সুভাষকে নিয়ে যতই বলি, চাতকের প্রতীক্ষা নিয়ে আরো বৃষ্টি বাড়াতে বলেন তিনি। সবই শোনেন গভীর মনোযোগ দিয়ে, কিন্তু তবুও তাঁর বিশ্বাস হয় না, আমি সত্যিই সুভাষের সঙ্গে দেখা করতে পেরেছি কিনা।

বড় ল্যাঠায় পড়লাম; সুভাষের কাছ থেকে আমি দেখা হওয়ার কোনো সার্টিফিকেট সংগ্রহ করিনি যে তাঁর সন্দেহ দূর করবো। সেকালে এমন সেলফি তোলার চলও ছিলো না।

শেষমেশ যখন কলকাতা থেকে গীতাদির প্রেমপত্রগুলো আসতে শুরু করলো, তখন বুড়োকে ঠাণ্ডা করতে পারলাম। গীতার চিঠিগুলো যেন আমার চেয়ে তাঁর কাছেই প্রিয় ও পবিত্র। চিঠিগুলো যেন আমাকে নয়, ওই বুড়ো ভামকেই উদ্দেশ্য করে লেখা!

আমি এক-দুবার পড়লেও, চিঠিগুলো নিয়ে বুড়ো হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকে! ব্ল্যাক লেবেলের বোতল শূন্য হয়ে যায়, বুড়োর চিঠি পিপাসা মেটে না।

চিঠিগুলো মেরে দিতে পারে এই বুড়ো- এমন ভয়ও আমার মাথায় ঢুকে গেলো। তাহলে তো মহাবিপদ! চিঠিতে গীতার খুব গোপন ও ব্যক্তিগত কথাবার্তা থাকতো। আমাদের দুজনার মধ্যকার এসব ফাঁস হয়ে গেলে কলকাতার সঙ্গে আমার নির্ভেজাল সততা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তাই চিঠিগুলোর প্রতি আমিও কড়া নজর রাখতাম।

এসব ঝামেলায় কিন্তু একটা উপকার হলো, আমি সুভাষের আসল হাইট’টা অনুধাবন করতে পারলাম, যেটা কলকাতায় সম্পূর্ণ হতে পারেনি। তখনই সুভাষকে মিস করতে শুরু করলাম।

এই বুড়ো ভামটা কিন্তু কোনো সাধারণ কেউ নন, একেবারে কালকেউটে! আমি বাগদাদে এসে সৌভাগ্যক্রমে তাঁর স্নেহধন্য হয়েছিলাম। ইনিই আমাকে ব্ল্যাক লেবেলে আসক্ত করেছিলেন। বুঝিয়েছিলেন, ব্ল্যাক লেবেলের সঙ্গে অন্য মদের পার্থক্য কোথায়। তার বিনিময়ে আমি তাঁকে নাইট ক্লাবে বসিয়ে দিয়েছিলাম।

তাঁর মতো এমন এনসাইক্লোপিডিয়া’র সাথে এযাবতকাল আর আমার সাক্ষাৎ ঘটে নি। তিনি হলেন ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’র বিখ্যাত লেখক খন্দকার মোহাম্মাদ ইলিয়াস। আর ঐতিহাসিক ‘মুজিববাদ’-এর অজ্ঞাত লেখকও তিনি।

তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মার্কসবাদ, লেনিনবাদ, মাওবাদ– এসব বাদের বাদীরা নিজেরাই তাঁদের মতবাদ লিখেছেন; আপনি কেন ‘মুজিববাদ’-এর রচয়িতা হলেন? এটা তো লেখার কথা শেখ মুজিবুর রহমানের।

প্রশ্নটি খুব যুতসই হওয়ায় কী যেন ভাবলেন তিনি। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আমাকে একটু মেপে নিলেন। বললেন, “তোমাকে তাহলে বলেই ফেলি। ১৯৭২ সাল। আমাদের নতুন জাতির পিতা শেখ মুজিব পাকিস্তান জেল থেকে মুক্ত হয়ে ঢাকায়। আমাকে খবর দিলেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে দেখা করতে।

“এমন আহ্বানের জন্য নিশ্চিত অপেক্ষায় ছিলাম। আমার সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে রিকশা চেপে রওনা হলাম। পথে স্বাধীন রাজধানীর পরিচিত পথঘাট দেখতে দেখতে আর ভাবতে ভাবতে যাচ্ছি, লিডারের সঙ্গে কী নিয়ে আলাপ হতে পারে!

“আমি ৩২-এ পৌঁছে গেলে বঙ্গবন্ধু দর্শনার্থীদের সাক্ষাৎ সংক্ষিপ্ত করে আমাকে বাসার ভেতরে শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন। গম্ভীরভাবে বললেন, ‘ইলিয়াস, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তোকে ইরাকে আমাদের রাষ্ট্রদূত করে পাঠাবো। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ইরাকই আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে আর ওখানে সমাজতন্ত্রের একটা প্র্যাকটিস চলছে। তুই গেলে ওদের অভিজ্ঞতা আমরা শেয়ার করতে পারবো। তাছাড়া দেশ চালাতে গেলে আমাদের জ্বালানী তেল ইমপোর্ট করতে হবে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমি ভেবে দেখেছি, এটা তোকে দিয়েই সম্ভব হবে।’

“আমি আকাশ থেকে পড়লাম! কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললাম, ‘লিডার! এত সংগ্রাম করলাম, এত জেল-জুলুম ভোগ করলাম আপনার সাথে! এখন দেশ স্বাধীন হলো, আর আপনি আমাকে দেশ থেকে বের করে দিচ্ছেন!’

“বঙ্গবন্ধু অবাক হয়ে বললেন, ‘তাহলে কী করবো, তুই-ই বল্।’

“চট করে আমার মাথায় একটা সিদ্ধান্ত এসে গেলো। আমি বললাম, ‘আপনি বরং আমার ছোটভাই কে জি মোস্তফাকে রাষ্ট্রদূত করে ইরাকে পাঠিয়ে দেন। ও দেশে থাকলে আপনাকে বিরক্ত ও বিব্রত করবে (কে জি মোস্তফা তখন সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা)। কে জি যেহেতু বামপন্থী, ওর জন্য ইরাক খুব আগ্রহের বিষয় হবে এবং আমাদের উদ্দেশ্যও সফল হবে।’

“বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ঠিক আছে তুই যা ভালো মনে করিস। কে জি-কে জানিয়ে দিস রেডি হতে।’

“দেশান্তর হওয়া থেকে মুক্তির আনন্দে এবার বঙ্গবন্ধুকে অন্য-প্রসঙ্গে নিয়ে এলাম। বললাম, ‘আচ্ছা লিডার! বাসা থেকে আসার পথে দেয়ালে দেয়ালে এসব কী লেখা দেখলাম?’

“বঙ্গবন্ধু জানতে চাইলেন, ‘কী দেখলি!’

“বললাম, ‘বিশ্বে এলো নতুন বাদ- মুজিববাদ মুজিববাদ। এগুলো কী লিডার!’

“বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘এগুলো কী, সেটা তো তুই-ই ভালো জানিস।’

“আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘আমি জানি মানে?’

“বঙ্গবন্ধু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আমি দেশ চালাবো না মুজিববাদ লিখবো বসে-বসে? বিদেশে যখন যাবি না, তাহলে বসে বসে তুই-ই ‘মুজিববাদ’ লিখে ফেল।’

“যেই কথা সেই কাজ। আমি নেতার নির্দেশে জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ‘মুজিববাদ’ লিখে প্রকাশ করে দিলাম, যে-কারণে পৃথিবীতে একমাত্র এই বাদটিই 

কোনো মৌলবাদীর হাতের লেখা না। আমার লেখা। তবে আমি গভীরভাবে বঙ্গবন্ধুর ভাবনাকেই প্রতিফলিত করেছি। বঙ্গবন্ধু খুশিও হয়েছিলেন।”

আমার বুড়ো ভামের উত্তর পেয়ে আমিও সন্তুষ্ট হলাম। ভাবলাম, এই মানুষের সুভাষদা সম্পর্কে আগ্রহ থাকবে না তো কার থাকবে!

১৯৫৪’র মার্চ মাসে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘ভূতের বেগার’ প্রকাশিত হয়। কার্ল মার্কসের ‘মজুরী ও পুঁজি’ অবলম্বন করে সহজ ভাষায়, ছড়া মিশিয়ে মার্কসীয় অর্থনীতির কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন সুভাষ এই বইটিতে। বইটি উৎসর্গ করেছিলেন ‘বন্ধু মুহম্মদ ইলিয়াস’-কে!

উল্লেখ্য, এই বিখ্যাত ‘ভূতের বেগার’ বইটি লিখেই সুভাষ পার্টির বিরাগ ভাজন হয়েছিলেন, যার পরিণতিতে সুভাষের পার্টি-বিচ্ছিন্নতার বীজবপন হয়।

কম্যুনিস্টদের মধ্যে বহুলালোচিত এই গ্রন্থ রচনায় সুভাষের বুদ্ধিদাতা যে আমার বাগদাদের সেই বুড়ো ভাম, তা কি আর বলতে! নইলে বইটি উৎসর্গ ইলিয়াসকে করা হলো কেন?

১৩.০৮.২০১৮

[লেখায় সুভাষ-ইলিয়াসের পুরনো সম্পর্কের ওপর আরেকটু বিশদ আলোকপাত করা গেলে ভালো হতো মনে হয়]

 ১০
শ্রীমতি গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়

গতরাতে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বাসা থেকে আমাকে সাদার স্ট্রিটের হোটেলে নামিয়ে সুভাষ একই ট্যাক্সিতে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। রাত অনেক হওয়ায় তাঁকে আর হোটেলে ঢুকতে বলিনি।

যাওয়ার সময় তিনি তাঁর বাসার ঠিকানা আর ফোন নম্বর দিয়ে গিয়েছিলেন, আর বলেছিলেন সকালে এসে আমাকে কোথায় যেন নিয়ে যাবেন। হয়তো কোনো এক সাহিত্য সভায়।

আমি ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে বসে বসে ভাবছি, কলকাতা এসে আমার প্রথম ও একমাত্র উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে।

কিন্তু এ কোন্ শক্তি! যাঁর কবিতার রহস্যময়তা আমাকে টেনে হিঁচড়ে এই কলকাতায় হাজির করেছে, সেই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কোনো আলোকছটাই তো চোখে পড়লো না! এই কি সেই কবি, যাঁকে চোখের দেখার জন্যে পাগল হয়ে ছিলাম! কবিতার চিত্রকল্প আর কবির বাস্তবতার সঙ্গে তাহলে কি এত ফারাক! শক্তিকে অমন জড়পদার্থের মতো ম্রিয়মাণ দেখলাম কেন? কী হয়েছে তাঁর?

ঘড়িতে প্রায় দশটা বেজে গেলো। ভাবলাম, সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে একটা ফোন করি। কলকাতার টেলিফোনের রিংটোনটা কেমন একটু পরখ করি। তা ছাড়া রাতে মাল খেয়ে ঐ বুড়োটার আজকের কথা মনে থাকবে তো!

তাঁর দেয়া নাম্বারে ফোন করে কলকাতার রিংটোন শুনছিলাম, অনেকক্ষণ ধরে। ধৈর্য যখন দিশেহারা, ফোনের অপর প্রান্ত থেকে এক নারীকণ্ঠ ভেসে এলো। দূরালপনীতে কলকাতার প্রথম নারীকণ্ঠ।

 “হ্যালো, কে বলছেন?”

 “আমি সোহেল, সোহেল অমিতাভ বলছি…:”

 “এই সুভাষ, তোমার সেই সোহেল না কে যেন ফোন করেছে।”

রিসিভার হাতে রেখেই নারীকণ্ঠ সুভাষকে আমার সংবাদ দিয়ে আবার ফিরলেন আমার

দিকে।

 “সুভাষ রেডি হচ্ছে, আপনাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন।

বেহায়ার মত জানতে চাইলাম, “আপনি কে বলছেন?”

আমার না-দেখা তাঁর হাসিটার অডিও উত্তাপ এসে আমার কানে বাজলো, “গীতা…”

তারপর ফোনটা কেটে গেলো।

বুড়োর দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় মিললো। ভাবলাম, আমাকে কোথায় নিয়ে যাবেন তিনি; নিশ্চয় কোনো মেঠোপথে জলাভূমি পেরিয়ে সাহিত্য-কীটদের সস্তা সমাবেশে, নাকি কোনো সাহিত্যরত্নদের পাথর প্রদর্শনীতে! যেখানেই হোক, তিনি যে আমাকে বাজিয়ে দেখবেন এটা নিশ্চিত ভেবে একটা ঠাণ্ডা বিয়ারের পিপাসা পেলো। এ হোটেলে কোনো বার নেই, তাই রুম থেকে বেরিয়ে হোটেলের সদর দরজায় নেমে এলাম। গতরাতে যে নাইট গার্ডকে মোটা বকশিস দিয়েছিলাম, সে এগিয়ে এলো। Ôসেলাম বাবুÕ বলে সে আমার কাছে জানতে চাইলো, আমার কিছু লাগবে কিনা?

আমি বললাম, “তোমাকে না রাতে ডিউটি করতে দেখলাম! এখনো ডিউটি করছো! বাসায় যাওনি?”

লোকটা হেসে গলে পড়লো। বললো, “বাসা কি আর বাড়ির কাছে!”

জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায় তোমার বাড়ি?”

 “পাটনায় বাবু, বিহারের পাটনায়।”

আঁতকে উঠলাম, শালা বিহারীর খপ্পরে পড়লাম নাকি? `৭১-এর পর থেকে বিহারী সম্পর্কে আমার ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা ছিল, এবং সেটাই তো স্বাভাবিক।

আমি আনমনা হচ্ছি দেখে লোকটা এবার জিজ্ঞেস করলো, “বাবু, কিছু লাগবে?”

বললাম, “না।” তারপর আবার একটু ভাব নিয়ে বললাম, “ঠাণ্ডা বিয়ার খেতে যাচ্ছি। গ্র্যান্ড ওবেরয় ছাড়া কাছেপিঠে কোনো বার নেই?”

“এখনো তো বার খোলে নি! আমি এনে দিই বাবু- ঠাণ্ডা বিয়ার?” “আবার আবদার করলো লোকটা।

কটা বিয়ার লাগবে জানার জন্যে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। উপায়ান্তর না পেয়ে বললাম, “যাও, চারটা বিয়ার নিয়ে আসো।”

একটা বড় নোট ধরিয়ে দিলাম, যেহেতু দাম জানি না; জিজ্ঞেসও করলাম না। লোকটা টাকাটা লুফে নিয়ে উধাও হয়ে গেলো।

বুঝতে পারলাম না, কোন্ দিকে গেলে ঠাণ্ডা বিয়ার এই অসময়ে আমিও যোগাড় করতে পারি। হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে পায়চারি করছি আর নোংরা কলকাতাকে দেখে দুঃখ পাচ্ছি। এমন সময় চুলছাঁটা মাথা আর নোংরা পোশাকে এক রোগা পাতলা যুবক এসে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো।

আমি প্রথমে তাকে ভিক্ষুক অথবা অপ্রকৃতিস্থ ভেবেছিলাম। সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “স্যার, চরস লাগবে? ভালো চরস আছে- নেপালি চরস।”

বুঝতে বাকি রইল না যে, সে একজন মাদকসেবী এবং বিক্রেতা। তার প্রস্তাবে আমার জিহ্বা থেকে যেন জল গড়িয়ে পড়লো। বললাম, “কই, দেখি!”

সে প্যান্টের পকেট থেকে চরসের দলাটা বের করে আমার চোখের সামনে তুলে ধরলো। দাম চুকিয়ে দিতেই কোথায় যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো সে।

ততক্ষণে আমার হোটেলের দারোয়ানও হাজির। আমাকে একঝোলা ঠাণ্ডা বিয়ার আর বাকি পয়সা বুঝিয়ে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, “বাবু, ওসব খুব খারাব আদমি আছে! বাত মৎ কীজিয়ে, বাবু, বহৎ খরাব আদমি হ্যায় সালা।”

আমিও উর্দু বলার ভঙ্গিতে বললাম, “হাম জানতা হ্যাঁয়।”

তাকে বকশিস দিয়ে মুখবন্ধ করতে চাইলাম, তবুও সে পিছু ছাড়লো না। হোটেলের একজন বয়কে ডেকে আমার রুমের গ্লাস পরিষ্কার করে দিতে বললো সে। বুঝলাম, এই প্রবীণ কর্মচারী মালিকের খুব বিশ্বস্ত। হোটেলের আনাচে-কানাচে কোথাও হয়তো বসবাস করে।

তবে আমি যে ওর চোখের আড়ালে চরস কিনে ফেলেছি, সেটা ও বুঝতে পারে নি। হোটেল বয় পরিষ্কার গ্লাস অহেতুক আবার ধুয়ে মুছে দিয়ে একটা কর্ক ওপেনার রেখে গেলো। তাকে বকশিস দিয়ে বিদায় করে দরজা বন্ধ করে দিলাম।

পাঁচ বেডের বিশাল ঘর এটা। বিশাল বিশাল জানালা– ছাদ থেকে লম্বা লম্বা পাইপের মাথায় ফ্যানগুলো ঝুলছে। একটা জানালা বেশ কষ্ট করে খুলে দিলাম। মনে হলো “৪৭ সালের পর এই প্রথম এটা খোলা হলো।

জানালা দিয়ে অন্য ঘরবাড়ি আর ড্রেনের ওগরানো সুগন্ধি নাকে ঢুকে পড়লো! বাহ্, এমনটাই তো চাচ্ছিলাম! পকেট থেকে দ্রুত চরসের দলাটা বের করে সিগারেটের তামাকে মেশানোর আগে দেশলাইয়ের আগুনে পুড়িয়ে নিলাম। তারপর মেশাতে মেশাতে বুঝতে পারলাম জিনিসটার কোয়ালিটি ভালো।

এরপর যখন চরস টানা শুরু করেছি, এবং বিয়ারের বোতল খুলবো, ঠিক তখনই হোটেলের রিসেপশন থেকে ফোন এলো– সুভাষ মুখার্জী এসেছেন। আমি তাঁকে রুম পর্যন্ত পৌঁছে দেবার অনুরোধ করে ফোন রেখে দিলাম।

খোলা জানালার ধারে এসে মনের সুখে চরসে টান দিতে লাগলাম। কতদিন পরে দেখা  পেলাম এই বস্তুর। সুভাষ আরেকটু দেরি করতে পারলেন না!

৭৫-এর ধানমন্ডি হত্যাযজ্ঞের পরে বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে ড্রাগাসক্ত করার একটা নীল নকশা হাতে নিয়েছিলো ’৭১-এর পরাজিত পক্ষ। বহু নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু হয়। সে সময় আজিজ মোহাম্মাদ ভাই নামে এক বিখ্যাত আগাখানী পাকিস্তান থেকে জন্মদিনের কেকের মধ্যে চরস ঢুকিয়ে এয়ারপোর্ট দিয়ে নিয়ে আসতো। বনি নামে তার এক ভাগ্নের মাধ্যমে এ চরসের চালান চলে আসতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শহীদ অধ্যাপক মুনির চৌধুরীর সন্তান আশফাক মুনির মিশুক-সহ প্রায় সব হতাশাগ্রস্ত প্রতিভাবান তখন এই চরসে আসক্ত হয়ে পড়ে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মফস্বলের কালিমা ধুয়ে আপগ্রেডেড হওয়ার জন্য প্রথমে সিগারেট, তারপর অল্প কিছুদিন গাঁজা, এবং ফাইনাল রাউন্ডে চরস ভুবনের প্রতি আকৃষ্ট হই। আমাদের ক্যাম্পাসে চরস জনপ্রিয় হওয়ার পর চট্টগ্রাম বন্দরে বিশাল এক চরসের চালান ধরা পড়ে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সেই চরসের চালানে আগুন ধরিয়ে সাফল্যের বিরাট এক মিডিয়া ক্যাম্পেইন সম্পন্ন করে। আর চরস ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে। গাঁজাখোরদের এক গ্রেড উন্নতি সম্পন্ন হয়।

সেদিন আগুন ধরিয়ে আসলে চরস নয়, পোড়ানো হয়েছিলো কিছু গার্বেজ কাগজপত্র। মূল চরসের চালান কারবারিদের হাতেই ফিরে যায়। চরসের পর দেশে ঢোকানো হয়েছিলো হেরোইন আর ফেনসিডিল। ভাগ্যিস, আমি তখন দেশান্তরে!

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মশতবার্ষিকীতে দেখছি– মানবতা বিরোধী অপরাধে দণ্ডিত, সাজাপ্রাপ্ত আসামি মীর কাশেম আলীর বার্মিজ উপহার ‘ইয়াবা’র রাজত্ব চলছে বাংলাদেশে!

দরজায় নক পড়তেই খুলে দিলাম। সুভাষকে ঘরে ঢুকিয়ে ক্ষমা চাইলাম, রিসেপশনে গিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা না করায়। তিনি সে কথায় কান না দিয়ে ঘরটার আকাশ পাতাল তাকিয়ে দেখতে লাগলেন। খোলা জানালাটায় এসে মুখ বের করে এদিক সেদিক দেখলেন। ভয় পেলাম- চরসের গন্ধ বুঝে ফেললো নাকি বুড়োটা।

সুভাষ বললেন, “সোহেল, জানালাটা বন্ধ করে দাও। এটা থেকে ড্রেনের ময়লা গন্ধ ঢুকবে।”

আমি জানালা বন্ধ করে তাঁকে বসতে বললাম। তিনি আসন গ্রহণের পর বিনয়ের সঙ্গে বললাম, “আপনার দেরি দেখে একটু বিয়ার খাবো ভাবছিলাম। এইমাত্র খুলেছি, যদি অনুমতি দেন।”

সুভাষের সম্মতিতে বিয়ারের ফেনায় ভরে উঠলো দুটো গাস। চিয়ার্স! গ্লাসের ধাক্কায় ঝঙ্কার তুলে শুরু হলো আমার আর কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অথঃ কথোপকথনের দিনলিপি।

১৬.০৮.২০১৮

Loading

1 Comment

  1. your writing are so real, you are the best thinking for reality.

Leave a Reply

Skip to toolbar