-
শিশিরদীঘি
হাসনাত সৌরভ
================দুটো দেওয়ালের খাঁজে ঝুলটা অনেকদিন ধরেই আছে। মহুয়া তাকায়। সরাতে চায় না। ছোটো একটা মাকড়সা এক কোণে বসে থাকে। মহুয়াকে দেখে। বলে, আমি তো পাঁচিলের এক কোণে আছি দেখো। তোমাদের এতবড় বাগান, আমার কি একটুও জায়গা হবে না?
মহুয়া কিছু বলে না। মহুয়া আসলে কথা বলতে পারে না। সেদিন ঝুলের উপর একটা ফুল এসে পড়েছিল। কি ফুল মহুয়া জানে না। কোথা থেকে উড়ে এসে পড়েছে। এ বাগানের ফুলই নয়। মহুয়া ভালো করে তাকিয়ে দেখল। ফুলের রেণু গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে আছে ঝুলের এদিক ওদিক। বিকেলের আলো এসে পড়েছে ঝুলের উপর। মহুয়ার মনে হল এই বিকেল, এই আলো, এই ঝুলের উপর এমন সাদা আর নীলে মেশা ফুল সে আগেও দেখেছে। অন্য কোনো যুগে।
পরেরদিন ভোরে মহুয়া এসে আবার দাঁড়ালো ঝুলের সামনে। শিশিরবিন্দু জমে যেন মুক্তাহার। ফুলের পাপড়িগুলো শুকিয়ে গেছে। এরই মধ্যে! মহুয়ার মনটা খারাপ হল। মহুয়ার কাছে জগতটা নিঃশব্দ। এই যে পাতাগুলো মাঝে মাঝেই এমন অস্থির হয়ে ওঠে, তার বুকের মধ্যে হৃৎপিণ্ডটা যেমন ধড়ফড় করে ওঠে তেমন, তার কি শব্দ? জানে না সে। মায়ের গলার ডাক, বাবার গান, পাখির আওয়াজ, জলের আওয়াজ কিছুই শোনেনি সে। বাবার তানপুরাটার তারে হাত বোলায়। সুর ওঠে নিশ্চিয়ই। সে শুনতে পায় না। দেওয়াল শুনতে পায়, ধুলোপড়া পাখা পায়, সোফারা পায়। এত বড় বাড়ির নৈঃশব্দতাকে মহুয়ার শুধু নিজের বলে পায়। সেই শুধু তাকে বোঝে।
মহুয়া শুকনো ফুলটা তুলল। অল্প একটু ঝুল লেগে গেল হাতে। একটা শুকনো পাতা দিয়ে ছাড়িয়ে নিল। কুয়োতলায় এসে জল তুলে হাত ধুলো। পায়ে জল দিল। আবার এসে ঝুলটার সামনে দাঁড়ালো। মাকড়সাটা গুটিসুটি মেরে একদিকে বসে। ভয় পায় না সে মহুয়াকে। জানে তার বাসা সে ভাঙবে না। যেটুকু ভেঙেছে সে আবার বানিয়ে নেবে।
মহুয়া বাগানের মধ্যেখানে যে সিমেন্ট বাঁধানো বসার জায়গাটা সেখানে এসে বসল। চতুর্দিকে ঝরাপাতা। ঘাস দেখা যাচ্ছে না। শুকনো পাতা মাড়ালে কেমন শব্দ হয়? শব্দ হয়। নইলে সেদিন বেড়ালটা চমকে উঠল কি করে, যেই না মম শুকনো পাতায় পা রেখেছে অমনি? বেড়ালটা তার নয়। মহুয়া কিছুই পোষেনি জীবনে। না পশু, না ভালোবাসা। নিজেকেও পোষ্য হতে দেয়নি কারোর। জীবনকে পোষা যায় না। জীবনকে তার স্রোতে ছেড়ে দিতে হয়। আজ এই একান্ন বছর বয়সে এই সত্যকে রোজ দেখতে পায় বাগানে। বাগানে ঋতু পরিবর্তন হয়। এক এক ঋতুতে এক এক ফুল, এক এক রঙ, এক এক গন্ধ, এক এক পাতার সাজসজ্জা। কেউ স্থির নয়। কেউ কাউকে আটকায় না। কেউ বায়না করে না আরেকটু থেকে যাও বলে। সবাই আসে আর যায়। মহুয়া সন্ধ্যবেলা যখন ছাদে বসে। এক আকাশ তারা যেন ভেলা ভাসিয়ে অন্ধকারের নদীতে আসে। মহুয়া নিজেকে জিজ্ঞাসা করে, তীর দেখতে পাচ্ছিস মহুয়া…আর কতদূর? মহুয়া উত্তর পায় না। কান পেতে থাকে। জলের শব্দ কেমন জানে না মহুয়া, কিন্তু অপেক্ষার শব্দ তার পাঁজরে এসে বসে। পক্ষী শাবকের মত তার দিকে হাত বাড়ায়। মহুয়া জীবনকে বলে, আচ্ছা, তুমি ধীরে ধীরেই এগোও, আমার কোনো তাড়া নেই।
সন্ধেবেলা আকাশ ঘিরে এলো কালো মেঘ করে। দেখতে দেখতে এলো তুমুল ঝড় আর বৃষ্টি। মহুয়া বাড়ির সব জানলা দরজা লাগাতে লাগাতে মনকে বলতে লাগল শান্ত হ, মন শান্ত হ। মহুয়া শান্ত হ।
মহুয়ার ঝড়কে ভীষণ ভয়। ঝড়ের মধ্যে যে জুলুম তাকে সে সহ্য করতে পারে না। তার বাগানকে কতবার তছনছ করে চলে গেল। এত জুলুম! এত এত কেন? মহুয়া মোমবাতি জ্বালিয়ে কাঁচের জানলার পাশে বসে। বাইরে তাণ্ডব চালাচ্ছে ঝড়। দরজা জানলা কেঁপে কেঁপে উঠছে। মহুয়া বাবার তানপুরাটা কোলের উপর নিল। মধ্যমা দিয়ে তারগুলোর উপর তুলল সুর। ঝড়কে ভয় দেখাবে। ঝড়কে অপ্রস্তুত করবে। মায়ের শাঁখ নিয়ে এলো ঠাকুর ঘর থেকে। দিল ফুঁ। ঝড়কে সাবধান করবে সে।
ঝড় থামল। টর্চ হাতে মহুয়া বেরোলো বাগানে। তছনছ হওয়া বাগান। মহুয়ার কান্না পেলো। মেঘ কাটল। চাঁদ উঠল। চাঁদের আলো মাটিতে পড়ল বৃক্ষের পাতার ফাঁক দিয়ে ফাঁক দিয়ে। যেন আলো ছায়ার আলপনা আঁকা হল। পাতা থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে জল। ডানা ভেজা পাখিরা ডানা ঝাপটিয়ে জল ঝেড়ে ফেলছে একে একে। মহুয়া টর্চটা জ্বেলে এসে দাঁড়ালো ঝুলের সামনে। কোথায় ঝুল? কিচ্ছু নেই। সব পরিষ্কার। কে বলবে এখানে একটা প্রাণের বাসা ছিল এই খানিক আগেই। কত সপ্তাহ, মাস ধরে সে অল্প অল্প করে বানিয়েছিল তার ঘরবাড়ি। সব মুছে গেল এক লহমায়।
মহুয়া টর্চটা বন্ধ করে এসে বসল ভেজা বসার জায়গায়। চাঁদের আলো উদাসীন। এই যে এত ঝড় হল। এই যে বাসা ভেঙে গেল এতগুলো। তারারা উদাসীন। মহুয়া মনকে বলল উদাস হ মন। একলা একলা আকাশের মত হ।
মহুয়ার চোখের কোল বেয়ে নামছে জল। বুকের মধ্যে তবু ঝড়। মহুয়ার মনের ভিতর তুলছে তানপুরার ছড়। শাঁখের আওয়াজ। মহুয়া মনকে জিজ্ঞাসা করছে, তীর দেখতে পাচ্ছিস মন? মহুয়া তোর তীর এলো? ভেলা বাঁধবি তীরে?
উত্তর নেই। শিশিরে ভিজছে মাথা। মমর সাদা সিঁথি বেয়ে জমছে শিশিরদীঘি। বিন্দু বিন্দু। চাঁদের আলোয় জমছে মুক্ত। মহুয়া চোখ বন্ধ করে বসে। বাবা গান গাইছে। রাগ বেহাগ। মা তরকারি কাটছে। আজ রাতে হবে খিচুড়ি আর বেগুনী। মহুয়া গন্ধ পাচ্ছে মায়ের আঁচলের। রান্নার। মহুয়া ঘুমিয়ে পড়ল। ঝড়ের পরে ঘুম পায়। এ ঘুম ক্লান্তির না, উত্তরণের।
@হাসনাতের হস্তাক্ষর
6 Comments
Friends
ফরহাদ আহমেদ
@forhad2004
সাব্বির হোসেন।
@shadowhunter3d
তাজুল ইসলাম তন্ময়
@tazulumgmail-com
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
জিকরুল ইসলাম
@zikrul
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
অসীম রহমান
@ashim_rahman
Prithula Zaman
@prithula



সুন্দর