-
মায়াছত্র
হাসনাত সৌরভ
===========================তপন দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে। নার্স এসে জিজ্ঞাসা করল, কেমন আছো তপন?
তপন বলল, দিদি আমি বাড়ি যাব, না মারা যাব?
নার্স বলল, বাড়ি যাবে।
তপন বলল, জানো কাল যখন ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছিল, তোমাদের হাসপাতাল মনে হচ্ছিল ভাসিয়ে নিয়ে যাবে…আমি তখন একটা স্বপ্ন দেখলাম…তোমার চড়াই পাখির মত একটা বাচ্চা হয়েছে…
নার্স কপট ধমকের সুরে বলল, ওই, আমার তিপ্পান্ন বছর বয়স…সাতকূলে কেউ নেই…আমার কি করে বাচ্চা হবে শুনি?..তাও চড়াই!তপন বলল, আরে শোনোই না….সে তোমার বাড়ির সামনে পেয়ারা গাছে থাকে….
আমার বাড়ির সামনে ধুধু মাঠ…কোনো গাছ নেই…নার্স তাকে থামিয়ে বলল।
তপন শুনল না…সে বলে চলল..সেই মাঠে একটা পেয়ারা গাছ। সেই গাছে একটা চড়াই পাখি…আসলে ও তোমার ছানা…তুমি যেই না তালা লাগিয়ে রাস্তায় নামো হাসপাতালে আসবে বলে, অমনি সে বলে, মা…তাড়াতাড়ি চলে এসো…আমরা বেড়াতে যাব….
নার্স হাসতে হাসতে, বলতে বলতে চলে গেল.. শেষে কিনা চড়াইয়ের সঙ্গে বেড়াতে যাব! তপন নার্স যাওয়াটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চাদরটা ঢেকে শুয়ে পড়ল। তার পায়ের কাছে জানলায় এসে বসল একটা চড়াই।
পরেরদিন সকালে আবার নার্স এলো। তপনকে জিজ্ঞাসা করল, কেমন আছো ?
তপন বলল, আমি বাড়ি যাব, আবার ভ্যানে করে সবজি বিক্রি করব? না তোমাদের গাড়ি করে কবরে যাব গো?
নার্স বড় বড় চোখ করে বলল, ফের বাজে কথা। তোরও সাতকূলে কেউ নেই, আমারও নেই। আমি ওসব ছাইভস্ম বকি?
তপন বলল, তোমার তো ক্যান্সার নেই পেটে…
নার্সের মুখটা কালো হয়ে গেল।তপন বলল, আমি আবার একটা স্বপ্ন দেখেছি জানো…এবার তোমার একটা বেড়াল ছানা হয়েছে…তুমি যেই তালা লাগিয়ে তাকে বাড়িতে একলা ফেলে আসো…তোমার হুস করে মন খারাপ হয়ে যায়….এখন যেমন হল…তুমি জানো আমি বেশিদিন বাঁচব না…কিন্তু তোমার চড়াই আর বেড়াল অনেকদিন বাঁচবে দেখো….
নার্স ঝাপসা চোখে অন্য বেডের পাশে এসে দাঁড়ালো। বলল, কি যে বলে পাগলের মত।
তপনের বেডের নীচে একটা বেড়াল ডাকল, ম্যাও। তপন চাদরটা ভালো করে ঢেকে নিল। তার জ্বর আসছে আবার।
পরেরদিন সকালে আবার নার্স এলো। আবার একই কথা হল। তবে আজ তপন নিজের মারা যাবার কথা জানতে চাইল না। সে নার্সকে বলল, আমার কাছে এসে আমার হাতটা ছোঁও….
নার্স ছুঁলো। তপন বলল, আমি আজ স্বপ্ন দেখলাম, ভোররাতে দেখলাম, আমি তোমার পেটে জন্মেছি…আমি এমন বিশ্রী দেখতে হয়নি গো…তোমার মত ফর্সা, সুন্দর দেখতে হয়েছি….তুমি আমায় কোলে নিয়ে দোলা খাওয়াতে খাওয়াতে বলছ, আমি হাসপাতালে যাচ্ছি, তুমি খুব লক্ষ্মী হয়ে থাকবে হ্যাঁ…চড়াই আর মিনি তোমার সঙ্গে খেলা করবে….হাসপাতালে একজন তপনকাকু আছে…সে আজ বাড়ি যাবে..আমি ওকে এগিয়ে দিয়ে আসি? তোমার কোলে যে আমি, তার নাম তখন তো তপন না…তুমি নতুন নাম দেবে আমার …দেবে না?
হাসপাতাল থেকে ফিরে সুনন্দা বাড়ির দরজা খুলল। সারাটা ঘর এত ফাঁকা লাগেনি কোনোদিন। আজ ভোরে তপন মারা গেল। সুনন্দা খেল না কিছু। শুয়ে পড়ল তাড়াতাড়ি। এত ফাঁকা লাগেনি কোনোদিন সব কিছু। অসহ্য লাগছে সব।
রাতে তুমুল বৃষ্টি শুরু হল। ঘুম ভেঙে গেল। বৃষ্টির ছাঁট আসছে। জানলাগুলো ধুমধাম পড়ছে। আলো জ্বালল সুনন্দা। অবাক হয়ে দেখল, একটা চড়াই আর একটা বেড়াল ভিজে চাপ হয়ে একজন পাখার উপর আর একজন তার সোফার উপর বসে। সুনন্দা মাটিতে বসে পড়ল।
ফোয়ারার মত কান্না এলো গলা চিরে। এত এত কান্না সে মা, ভাই কেউ মারা যাওয়াতে কাঁদেনি। চুপ করে সহ্য করেছে। মনে হয়েছে সব কান্নাকে চেপে পিষে শেষ করে দিয়েছিল এতদিন। ছেলেটা সব জেনে গেল কি করে? এত এত কান্না?
ঝড়ের আওয়াজে কান্নার আওয়াজ গেল ঢেকে। সুনন্দা দেখল তার কোলের কাছে এসে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বেড়ালটা…যেন বলছে…মা…আমায় কাছে নাও।
সুনন্দা চোখের জল মুছে বলল, দাঁড়া দুধ গরম করি…
@হাসনাতের হস্তাক্ষর
7 Comments
Friends
ফরহাদ আহমেদ
@forhad2004
সাব্বির হোসেন।
@shadowhunter3d
তাজুল ইসলাম তন্ময়
@tazulumgmail-com
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
জিকরুল ইসলাম
@zikrul
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
অসীম রহমান
@ashim_rahman
Prithula Zaman
@prithula



শুভেচ্ছা!