-
নদীর স্রোত চিড়ে এগিয়ে যাচ্ছে ডিঙ্গি নৌকাটা। স্রোতের বিপরীতে নৌকা বাইছে মাঝি হানিফ, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।পশ্চিম দিকে ধূসর মেঘ জমে সূর্যকে ঢেকে দিয়েছে মনে হয় আর কিছুক্ষণ বাদে বৃষ্টি নামবে যদিও ঝড়ো বাতাস শুরু হয়নি এখনো। নদীটির নাম কৌলাস, দৈর্ঘ্যে সুবিশাল হলেও প্রস্থে কয়েকশ হাত মতো হবে। দুই ধার ঘেসে কুমোরদের বাড়ি, বাড়ির উঠানে সারি সারি করে রাখা হস্তশিল্প গুলো তোলায় ব্যস্ত সবাই। নদী কৌলাস কুমোর পাড়া চিড়ে গিয়ে মিশেছে কৌলাস বিলে, কৌলাস এ নদীর আসল নাম না, সেদিকেই যাচ্ছে ডিঙ্গিটা। ডিঙ্গির এক কোনে বসে মাঝি নৌকা বাইছে অন্য কোনে কালো চাদর জড়িয়ে বসে আছে আর একজন। চাদর গায়ে যার, তার নাম আবীর মাস্টার। এই এলাকার একমাত্র হাই স্কুল দায়াময়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বয়স প্রায় ত্রিশের কাছাকাছি , শিক্ষগত দিক থেকে তিনি উচ্চশিক্ষিত ফিজিক্সে এম পাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।ছোট থেকে বড় হয়েছেন স্থানীয় এতিমখানায়, পরিবার পরিজন বলতে ছোট বেলায় যাদের সাথে খেলে পড়ে বড় হয়েছেন তারাই। রক্তে সম্পর্কের বাইরেও অনেকেই আমাদের পরিবার হয়ে উঠে আবার রক্তে সম্পর্ক থাকার পরেও অনেকেই পরিবারের একজন হয়ে উঠতে পারে না। সেই খেলা পড়ার সাথিদের অনেকের সাথেই তার যোগাযোগ আছে। ছোটবেলায় সবাই পড়েছে “নিজে যারে ভালো বলে ভালো সেই নয় লোকে যারে ভালো বলে ভালো সেই হয়”। লোকজন যারা আবীর মাস্টারকে চেনে সবাই তাকে নিরানব্বই ভাগ ভালো মানুষ বলে।
প্রচন্ড শব্দে কাছে কোথাও একটা বাজ পড়লো, “লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতুম মিনাজ্বলিমিন” কাপাকাপা কন্ঠে বলে উঠলো হানিফ।
“কি হানিফ ভাই ভয় পাইছেন নাকি” বলল আবীর মাস্টার।
“তেমন একটা পাই নাই তয় কলিজা ধক কইরা উঠছিলো প্রতমে। তুমি মিয়া পাগল আছো বুঝলা, হুট কইরা কি কইরা উঠো না। বিষ্টি আইবো এক্টু পর বাড়ি গিয়া খেতা গায়ে দিয়ে ঘুমামু তা না নিয়া আইলা এই হবগা পানিতে ভিজাইতে।” বইঠা বাইতে বাইতে উত্তর দিলো মাঝি হানিফ।
মৃদু হাসলো আবীর মাস্টার তারপর বলল,“বৃষ্টিতে ভিজতে আপনার কেমন লাগে.?”
“ এক্টুও ভালা লাগে না, তয় তোমার মতো যহন বয়স আছিলো তহন ভালা লাগতো, কতো যে বিষ্টিতে ভিজছি বুঝলা বৃষ্টি আইলে আমাগো ছিল ইদের দিন, ফুটবল লইয়া মাঠে ঘন্টার পর ঘন্টা দাপাই বেড়াইতাম বুঝলা। চোখ ঠোখ লাল হই যাইতো তারপর বাড়ি আইতাম। তয় বাড়ি আইতাম না আইলেও লুকায়া আইতাম, আমার আব্বায় অনেক রাগি আছিলো এমন অবস্থায় যদি দেখতো তয় লাডি লইয়া পিছে দৌড়ানি দিতো তয় খুব একটা দৌড়াইতে পারতো না আব্বায়।” বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলল হানিফ।
“আপনি তাহলে অনেক ভাগ্যবান হানিফ ভাই আমার চেয়ে বেশিবার ভিজেছে বৃষ্টিতে” বলল আবীর।
কিছু বলল না হানিফ উত্তরে শুধু হাসলো।
ঝোড়ো বাতাস শুরু হয়েছে, হানিফ মাঝির লাল সবুজ ডোড়াকাটা গামছা পতপত করে উড়ছে। পশ্চিম দিক সম্পূর্ণ কালো হয়ে ভীতকর রুপ ধারণ করেছে। আর একটুপর… ঝড়ের সাথে শুরু হবে বৃষ্টি যার জন্য এতো প্রতিক্ষা করে বসেছিলো আবীর। এরকম ঝড় বৃষ্টি যে আগে হয়নি তেমন না, আসলে আবীর দেখত চেয়েছিলো খাটি কাল বৈশাখি ঝড় তাই বাজার থেকে তুলে এনেছে হানিফ মাঝিকে। চৈত্র পেরিয়ে আজ বৈশাখের প্রথম দিন। আবহাওয়া এরকম হবে আগে থেকেই জানতো সে।
ছিপ ছিপ করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে আবীর যেখানে নৌকা রাখতে বলছে সেখানে নগি পুতে নৌকা বেধে নিয়েছে হানিফ মাঝি এখন ডিঙ্গির ছোট ছাউনিটায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছে সে। আবীরকে ছাউনিতে ঢুকতে দেখে প্রশ্ন করলো হানিফ।
“ওকি মাস্টার এতো কইরা ডাইকা আনলা বিষ্টিতে ভেজবা বইলা এহন ভিতরে ঢোক যে? ভেজবা না বিষ্টিতে?”
“বৃষ্টি এখনো শুরু হয় নেই হানিফ ভাই, বৃষ্টিতে ভেজার শখ থাকলেও ছুচো মেরে হাত গন্ধ করার শখ আমার নেই, তাছাড়া এখানে ঢুকলাম একটা সিগারেট খেতে বাইরে যে বাতাস সেখানে তো আর সিগারেট ধরানো যায়না”
“তাই কও, আমি ভাবলাম আকাশ খারাপ দেইখা ভয় টয় পাইলা নাকি তয় আমি শুনছি তুমি নাকি বহুত সাহসী সরদার বাড়ির ভূত গুলারে নাকি পুলিশের হাতে তুলে দিছিলা।” বলে হাসলো হানিফ।
“ভূতটুত কিছু নয় ওরা ওখানে গাজা মদ লুকিয়ে রাখতো আর ঐখানে যাতে কেউ না যায় সেজন্য রাতের বেলা ভূত সেজে পথ চলতি মানুষদের ভয় দেখাতো” সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল আবীর
“তুমি কি করে জানলা যে ঐখানে এরম কাজ কারবার হইতো”
“ আসলে আমার কয়েকজন ছাত্র দল বেধে গেছিলো ভূত ধরতে, গিয়ে দেখে গর্তে মদের বোতল রেখে পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। ওরা এসে আমাকে জানায় আর আমি রাত হওয়ার অপেক্ষায় থাকি আর রাত হতেই থানায় ফোন করি তারপর তো আপনি জানেনই” বলল আবীর।
“হু জানি, বিষ্টি তো জমে উঠছে মনে হয় চলো বাইরে যাই এহন”
“চলেন” বলে হাতের সিগারেটটা নিভিয়ে বাইরে বেড়িয়ে এলো আবীর।
প্রকৃতি যেন ক্ষেপে উঠেছে আগের চেয়ে কালো হয়ে উঠেছে কিছুক্ষণ আগের ধূসর আকাশ, তার সাথে বেড়েছে বাতাসের বেগ। যেন উড়িয়ে নিতে চাইছে সব কিছু। খানিক পরপর ঝিলিক মেরে বাজ পড়ছে সাথে তীব্র শব্দ। সব মিলিয়ে ভয়াবহ এক অপার্থিব দৃশ্য দেখছে আবীর, যা আগে কখনো দেখেনি সে।
“কি বিষন্ন সুন্দর না আজকের এই ঝোড়ো বৃষ্টি”
“হ্যা সুন্দর,আজ তোমাকে আমার কয়েকটা কথা শুনতে হবে আবীর” ভাবলেশহীন কন্ঠে বলে উঠল হানিফ।
যতটা বুদ্ধিমান হলে মানুষ যথেষ্ট বলে তার চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান আবীর। সাথে সাথে বুঝে ফেললো কোনো কিছু আর আগের মতো নেই। তবে আবীর খুব একটা আবাক হলো না, আবাক হওয়ার মতো যথেষ্ট জিনিস দেখেছে এ জীবনে তাই আবাক না হওয়াকেই স্বাভাবিক মনে করে সে। তার পিছনে মাঝি হানিফ দাড়িয়ে তাই পিছনে ঘুড়ে দাড়ালো, আর দেখলো দেবদূতের মতো ভীষণ সুন্দর একজন মাঝ বয়সী মানুষ যার নাম হানিফ মিয়া অন্য এক রুপে দাড়িয়ে আছে। তার হাতে একটা দড়ি।কৌলাস নদীর মাঝি
3 Comments
Friends
Abu Taher
@abu-taher
Arif Muslimeen
@arif-muslimeen
Foyzur Khan
@foyzur-khan
Shohag arnob
@shohagarnobgmail-com
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
মাহ্দী সাকিব
@mahdi-sakib
Shovan Khan Sabuz
@methopath
শায়েরুল ইসলাম
@shaerulislam
Zahidul Jamy
@zahidul


ভালো✅