Profile Photo

অরিন্দম সাইফুল্লাহOffline

  • Arindam-Saifullah
  • জানালার ওপারে

    গল্প বা কবিতা যাই বলিনা’ক, যা খুশি তাই অর্থাৎ যাচ্ছেতাই লেখতে আমি যতই সিদ্ধ হস্ত হইনা কেন, সাহিত্যের মাপকাঠিতে এ লেখা যে চিরকাল অপাঙতেয়ই নয় বরং আবর্জনাও বটে। তাই গো-ভাগাড়ই এর যথোপযুক্ত স্থান। এবার মূল কথাটা বলি…. এই অখাদ্য বা অযাচিত, যাচ্ছেতাই লেখাটাও লেখা হয়ে উঠতো না যদি, সেদিন মেঘময় বিকালে এ সরুপথ দিয়ে যেতে না হতো, আর খোলা জানালায় চোখ না পড়ত…

    দুপুর থেকেই মেঘ জমতে শুরু করেছে। মেঘ জমে আর ক্ষণে ক্ষণে বাতাসের ধাক্কায় মেঘের চাইগুলো কোথায় যেন উড়ে চলে যায়… কে জানে? আবারও মেঘ জমে, মেঘের পরে মেঘ… এবার শুধু নেমে আসার অপেক্ষা। এই মৌন মেঘাচ্ছন্ন বিষাধিত বিকালে খোলা জানালায় বকুল গাছের দিকে ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকা তন্বী মেয়েটির নাম স্বরণী।

    নাতিদীর্ঘ উচ্চতা, দীঘল কালো কুঞ্চিত চুল, পাকা তেলাকুচা রঙা অধরৌষ্ঠ, ফর্সা মুখশ্রী ও কপোলের তিলের সৌন্দর্য-এ মেয়েটিকে তিলোত্তমা বা সান্ধ্য দেবী মনে করে, ভুল হয়- এ পথে নীড়ফেরা যাত্রীদের; যারা নিজের ভুলেই চোখ রাখেন এ জানালায় নিয়মিত।

    কিন্তু আজকের দৃশ্যপটটা একটু ভিন্ন।

    -স্বরণী কাঁদছে…
    কিন্তু কেন? এ সদা চঞ্চলা, লাস্যময়ীরও কাঁদবার মতো কোন দুঃখ থাকতে পারে, ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন চৈত্রের নিরাক পড়া আকাশের বুকে চিলের আওয়াজের মতো চিরে যায়, শূণ্য লাগে, বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠে।

    -যাই হোক স্বরণী কাঁদছে… শব্দহীন ভাবে জানালায় তাকিয়ে। মাঝে মাঝে শুধু চোখ মোছার প্রয়াসটা কান্নাকে আরো কাব্যিক সুন্দর করে তুলছে। আসলে যে সুন্দর, তার সবটুকুই সৌন্দয্য মন্ডিত।

    এ কান্নার অনেক রকম কারনই থাকতে পারে।
    চঞ্চলা কিশোরী মন। হয়তো বা ছেলেবেলার কোন কথা মনে পড়ে আবেগায়িত হয়ে পড়েছে। বাবার ভালবাসা আর মায়ের বকুনী মিশ্রিত স্নেহের অভাববোধও মেয়েটাকে কাঁদাতে পারে। শিউলী ফুল ওর বড্ডো প্রিয়। হয়ত বকুল ঝরা বিকালে শুভ্র শিউলীর জাফরানী বোঁটার শুভ্র স্মৃতিই তাঁর চোখকে ঝাপসা করে দিচ্ছে। প্রতি শারদ ভোরেই শিউলি তুলে মালা গেঁথে পূজার বেদীতে রাখা ছিল এই কিশোরীর প্রাতাভ্যাস।কিন্তু এখন আর কুড়ানো হয়ে উঠে না সংসারের কাজের চাপে, সংসারের গূঢ় নিয়মের বাধ্যবাধকতায়। শুধু শিউলীই কেন, যে বকুলের মালা যে গাঁথত না, তা আমি জোর করে বলতে পারি না।

    তবে কিছুদিন হলো, সে পাগলপ্রায় একটা বীজের নাম খুঁজছে। পাচ্ছে না, কাউকে যে জিজ্ঞাসা করে জানবে এমন ভরসাও পাচ্ছে না সে। কারণ কিশোরী মনের এ ঠুনকো জিজ্ঞাসা হয়তো কারো ধমকের নিচে পড়েই আত্মহত্যা করবে।কিন্তু তবুও, বীজের কালো খয়েরী চেহারাটা তার সামনে বারবার ভেসে উঠছে। এত চেনা, স্মৃতিবিজড়িত… কিন্তু নামটা মনে না পড়ায় একটা অস্বস্তি কাজ করছে।

    -আমি কিন্তু জানি, যে বীজ গরম করে কিশোরী কালে সে মালা গেঁথেছিল তা ইপিল ইপিল বা লিগিউম(শিম) জাতীয় গাছের বীজ।কিন্তু এ বীজের নাম না মনে পড়াতে কাঁদবার মতো বয়স তার আর নেই। তবে কি…? এ মালার অন্তরালে অন্য কেউ আছে? আছে অন্য কোন কাহিনী? যার কথা মনে পড়ে আজ নিজের অজান্তেই চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছে তার?

    -হ্যাঁ দুঃসম্পর্কের কোন আত্মীয় তার নামে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল তার বাবার প্রযত্নে। প্রেমপত্র কিনা জানিনা। তবে, বাবার কাছে কন্যার প্রেমপত্র পাঠানো ইতিহাসটা বেশ হাস্যরসাত্মকই বটে! তবে মেয়েটি কিছু না জেনেই সেদিন বাবার বকুনীটা খেয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে অঝরে কেঁদেছিল শুধু। না, সেই ডাক্তার ছেলেটার কথা (যে কিনা তার জন্য এখনো বিয়ের পিঁড়ি অবধি যায়নি)। তার কথা মনে করে কাঁদছে স্বরণী?
    বর্তমান বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁকে একটু অন্যমনস্ক দেখা যাচ্ছে, উড়ুউড়ু ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে কি…. থাক বিবাহিত জীবনে সে যে অন্যকারো সাথে পরকীয়ায় জড়াবে তা যদিও বিচিত্র নয়, তবুও মেয়েটা এতটা নির্বোধ হয়তো নয়।

    মেয়েটি তখনো চোখ মুছছে…
    হঠাৎ ভারী মেয়েলী গলার স্বরে আমার চিন্তায় ভাটা পড়ল.

    – বৌ মা, রান্নাটা কি হলো, রান্না কি আগামীকালের মধ্যে হবে না পরশু লাগবে?
    – মিষ্টি করে মেয়েটি বলল, না মা, এই হয়ে এলো, পাটকাঠি জ্বলছিলনা তাই…

    বিকালের মেঘ তখন হালকা হতে শুরু করেছে।

    ০৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
    ২২/০৫/২০১৮
    পাটকাঠির আলোতে দেখবার পর।

    13
    10 Comments
    • চমৎকার

    • অভিনন্দন

    • স্মরণীর স্মরণে প্রিয় শিল্পী অর্ণবের একটা গান,
      “সে যে বসে আছে একা একা
      রঙিন স্বপ্ন তার বুনতে,
      সে যে চেয়ে আছে ভরা চোখে
      জানালার ফাঁকে মেঘ ধরতে।

      তার গুনগুন মনের গান বাতাসে উড়ে
      কান পাতো মনে পাবে শুনতে,
      তার রঙের তুলির নাচে মেঘেরা ছুটে
      চোখ মেল যদি পারো বুঝতে।”

    • তুলটের পক্ষ থেকে অজস্র অভিনন্দন! আপনার এই লেখাটি আজ 23 June 2022 তারিখে ‘জনপ্রিয় অবদান’ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। আজ সারাদিনের জন্য এই লেখাটি লেখকমঞ্চের সকল সদস্যের দেয়ালে (বন্ধু/অবন্ধু নির্বিশেষে) প্রদর্শিত হবে। তুলটে আমাদের সাথে থাকার জন্য এবং এই মঞ্চকে একটি আনন্দদায়ক ও জনপ্রিয় মঞ্চ হিসাবে চালু রাখাতে আপনার এই অবদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ ও আনন্দিত!

    • যতটা খারাপ বলছেন ততটা নয় । অনেক ভাল লেখা ।

    • চমৎকার লেখা

    • জনাব Drako Shajib -এর জন্য অনেক অনেক ভালোবাসা, একই সাথে আমাকে সাথে রাখবার জন্য তুলটসহ সকল সৃষ্টিশীল বন্ধুদের প্রতি কৃতজ্ঞতা

    • ধন্যবাদ লেখকপ্রিয়! আপনার জন্যেও অফুরান ভালোবাসা রইল!

অরিন্দম সাইফুল্লাহ্

Skip to toolbar