Profile Photo

অরিন্দম সাইফুল্লাহOffline

  • Arindam-Saifullah
  • সেদিন সন্ধ্যায়

    অবশেষে জুয়েল ভাইয়ের ফুসকার দোকানেই বসতে হলো। এখানে ফুসকা-চটপটির দোকান বলতেই এ দোকানটা।সকলের অনুরোধ রক্ষার্থে ফুসকা খেতে গিয়ে বিপত্তিতেই পড়লাম।কারণ ফুসকাতে যে ডিম দেয়া থাকে তাতো খেয়ালই ছিল না।যদিও জানি আজকে, আমার এই (বিগত চার বছরের) নিরামিষী ওজর আপত্তি ওদের আট বছরের বন্ধুত্বের দাবির কাছে কোনভাবেই টিকবে না।তাই,-“অনুরোধে ঢেঁকি নয়, বরং রাইস মিল গেলা”-র প্রস্তুতি নিতে নিতে শেষ চেষ্টা করলাম। অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো- দু’টো চটপটি, একটা রাশেদের জন্য ব্যাপক ঝালযুক্ত আরেকটা পার্থ মামার জন্য মাঝারী ঝালের। আমার ও সেতুর জন্য দুটো বিশেষ মানে স্পেশাল ফুসকা [বিঃ দ্রঃ- আমারটাতে ডিম ছাড়া]।

    ফুসকা আর চটপটি আসবার পূর্বের স্বল্প অবসরেই ওরা জমে উঠে গল্পে কারণ রাশেদ ও পার্থ মামা দুজনেই যথেষ্ট মিশুক আর সেতু লাস্যময়ী। সারাক্ষণ শুধু হাসতেই থাকে। ওকে দুঃখরাও, বুঝি দুঃখ দিতে ভয় পায়। যেমন চন্দ্রপক্ষের ক্ষীণকায় চাঁদ কৃষ্ণ আঁধারকেও হাসিয়ে দেয় তেমনি। “স্রষ্টা মানুষের জিহ্বা দিয়েছেনই নাকি অন্তরকে আড়াল করবার জন্যে”- যদি ফরাসি এই প্রবাদটি সত্য হয়, তবে আমার মনে হয়, স্রষ্টা মানুষকে হাসিটাও দিয়েছেন মানুষের এই চেপে থাকা কষ্টগুলোকে আড়াল করার জন্য।
    অবশেষে আমিই বললাম, -জানিস, সেতু! কারা বেশী হাসে?
    – নাতো, কারা?
    – যাদের দুঃখ বেশী, তারাই বেশী হাসে। বলেই হেসে উঠলাম।
    যদিও আমার মুখের হাসিটা কিছুটা হলেও দুষ্প্রাপ্য।এটা লোকমুখে প্রচলিত।
    ও হেসে উঠে বলল,- যা বলেছিস! বলেই আবার হাসি…

    ওর হাসির ছটায় দোকানের সবাই তাকালো কিনা জানিনা, আমার মনে হলো ওর আদলে অন্য কেউ হাসছে, যার হাসির আভায় আজকের সান্ধ্য দেবীরা তাঁদের পূজারীদের স্তুতি শুনতে পারছেন না । আমি ডুবে গেলাম সেই পদ্মায় যেখানে কারো দুল আজো বালির অন্তরালে আমাকেই খুঁজে যায়। আমাকে আবার সেই সবুজ নখপালিশেরা ডেকে নিয়ে গেল কোর্টপাড়ের সেই বড় পুকুরটায় যেখানে সবুজ বাঁধনের রাখিরা গল্প করে ফেরে..সেতুর হাসির ছটায় টেবিলে ফিরে এসে দেখি আমার সামনে ফুসকা। সেতু অবাক হয়ে, কি রে খাবিনা?
    – হু। আমি আবার কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি কারণ এর আগে কখনই এমন সামাজিকতায় আসিনিতো তাই।
    – খেয়ে নে..

    ইতিমধ্যেই কোনটার ঝাল বেশী এটা নিয়ে সন্দেহের অবসান হয়েছে রাশেদ আর মামার মধ্যে।তবে আশার কথা হলো ঝাল কোনোটাতেই বেশী দেয়া হয়নি।তাই অতিরিক্ত মরিচ আনতে না আনতেই সেতু আমাকে বলল,
    -“কি রে তেঁতুলের টকটা মিষ্টি লাগছে না?
    – জানিনা, তবে তোর কপালটা ভালো, টক খেতে গিয়ে মিষ্টি মুখ করিয়ে দিলো।

    সেতু ওর জন্য এনে রাখা নতুন তেঁতুল টকের বাটিতে মরিচের গুঁড়া মেশাতে মেশাতে বলল, – ভালো না ছাই (কপালটা), তোদের এখানের ফুসকার চেয়ে আমাদের লেক পাড়েরটা অনেক ভালো।

    যাক ভালো, আমি বুঝতেই পারলাম না, এর আগে কোনদিন না খেয়ে ভালোই হয়েছে, ভালো আর মন্দের ব্যাপারটা অজান্তে আর অগোচরেই রয়ে গেল! যাক্ না! অগোচরে রয়ে যায় কত কিছু। থাক অগোচরে।

    সেতু পরম যত্নে আমার থালার(অবশ্যই পূজার নয়) ফুসকাতে, নিজের জন্য গোলানো তেঁতুলের টকের কিছুটা চামচ দিয়ে ঢেলে দেয় ।
    আমি মুখে নিতে না নিতেই-
    – কি রে, ভালো… না…?

    আমি দেখলাম উৎসুক চোখ নিয়ে সেতু তাকিয়ে আছে। চোখে তাঁর ভালোবাসা মিশ্রিত জিজ্ঞাসা…

    সন্ধ্যারা তখন শহরের তীব্র আলোয় চাপা পড়ে মরে গেছে।

    [ সম্মানিত পাঠক! এ ভালোবাসাকে অবশ্যই প্রেম পর্যায়ে নেবেন না। এখানে সেতু চিরন্তন নারী চরিত্র, যারা নিঃস্বার্থ ভাবে পরিবারকে, সংসারকে, সমাজকে, নিজের থেকেই কোন প্রতিদানের আশা না করেই ভালোবেসে যায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে।]

    ১৪ই পৌষ. ১৪২৫ বঙ্গাব্দ।
    ২৮.১২.২০১৪
    রাত্রি দ্বিপ্রহর হবে হয়তো্।

    12
    9 Comments

অরিন্দম সাইফুল্লাহ্

Skip to toolbar