-
নিরুদ্দেশ
হাসনাত সৌরভ
======================গওহরের এই নিয়ে তিনটে রাত ঘুম হলো না। ক্ষেতে যায়। গরুকে জাব দেয়। সন্ধ্যেবেলা তাস খেলতে বসে মাঠে। সব ঠিক আছে। কিন্তু মেয়েটাকে নিয়ে চিন্তা। বাঁ হাতের কব্জীর উপর এমন একটা ফুলো উঠছে। টিউমার। এই মাস গেলে বিয়ে। সবকিছু ঠিকঠাক হবে? কি যে দুশ্চিন্তা হচ্ছে।
গওহরের বউ নিরুদ্দেশ হয়েছে বছর এগারো হলো। মাথায় গোলমাল ছিল। লোকে বলে ননদ বাণ মেরেছে। ননদের অনেক ঝাড়ফুঁক জানা আছে। বাড়িতে বিরাট দরবারখানা। অর্শের মাদুলি দেয়। কত মানুষ যে অর্শের হাত থেকে বেঁচে গেল ওই মাদুলি পেয়ে সে মা’ই জানেন। কিন্তু ও কেন শম্পাকে বাণ মারবে?
লোকে কারণ বলে। কেউ বলে, শম্পার কুষ্ঠিতে নাকি লেখা ছিল সে গওহরকে বিষ খাইয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে পালাবে। কেউ বলে, শম্পাও নাকি তুকতাক জানত। সে নাকি আগে তার ননদকে বাণ মারতে চেয়েছিল। কাজ হয়নি।
গওহর সব শোনে। বিশ্বাস করে না। আবার করেও। গওহর দেখেছে কৃষ্ণপক্ষে তার যা না বিশ্বাস হয়, শুক্লপক্ষে তা-ই বিশ্বাস হয়। কি করে হয় গওহর বুঝতে পারে না। কিন্তু জুঁইকে নিয়ে কি করবে? বোন, অনুলেখাকে বলতে সাহস পায় না। পাছে হিতে বিপরীত করে বসে। এদিকে দুশ্চিন্তায় নিজের ঘুম-খাওয়া মাথায় উঠছে। টিউমার কমাতে না পারলে মেনে নেবে শ্বশুরবাড়ি?
গওহর ক্ষেত থেকে ফিরছে, রাস্তায় বাল্যবন্ধু পরিতোষের সঙ্গে দেখা। গৌরীপুরের স্টেশন মাস্টার। গ্রামে ছ’মাসে কি ন’মাসে এক-আধবার আসে। ওদের অনেক জমি-জায়গা এদিকে। থাকে না।
গওহরের মন বলল, পরিতোষই এর বিধান দিতে পারবে। না হয় গৌরীপুর গেলেই হবে। অচিন্তপুর থেকে আর কদ্দূর? অবশ্য তাদের গ্রাম থেকেই তো প্রায় দেড় ঘন্টার রাস্তা। গওহর বাইকে যাতায়াত করে।
পরিতোষকে নিয়ে পাশের মসজিদের চাতালে বসল। এ কথা সে কথা বলল। কিন্তু আসল কথাটা বলতে পারল না। কথা কানে হাটে। কে জানে যদি ছেলের বাড়ির কানে যায়? শেখরগাঁও অচিন্তপুরের কাছে? কে জানে বাপু!
পরিতোষ উঠে গেল। গওহর বসে থাকল। বড় একটা নিমগাছ পাশে। হাওয়া দিচ্ছে বেশ। চোখটা জুড়িয়ে আসছে। খিদে পাচ্ছে যদিও। এগারোটা তো হবে।
হঠাৎ ডাক আসলো… ‘‘ভাইজান”…
গওহর দেখে অনুলেখা দাঁড়িয়ে। লাল শাড়ি। কপালে বিরাট টিপ। কালো ছোটো মতন মানুষটা। চোখে চশমা।
গওহরের বুকটা ধক্ করে উঠল। বললো, ‘তুই এখানে’….
টুম্পু এসেছিল। অনুলেখা জুঁইকে টুম্পু বলে ডাকে। ওর হাতটা দেখালো। দেখ ভাই সামনেই ওর বিয়ে, ও জিনিস এসবে গলবে না, আমি দেখলাম। এই নিয়ে হুজ্জুতি হওয়ার আগে তুই ওকে হাসপাতালে নিয়ে যা আজই।
গওহর আমতা আমতা করে বলল, কিন্তু সেখানে অনেক লোক… যদি জানাজানি হয়ে যায়?
অনুলেখা এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। যেন কথা কটা বলেই চলে যাবে। এই কথাটা শুনে বসল গওহরের পাশে। বলল, আরে বাবারও হাতে ওরকম হয়েছিল, মনে নেই? তারপর মাইতি ডাক্তারের পুরিয়া খেয়েই তো সেরেছিল। মনে নেই তোর? ভালো হোমিওপ্যাথি দেখাবি?
গওহর বলল, তোর নিজের কিছু জানা নেই?
হঠাৎ চোখমুখের ভাব বদলে গেল অনুলেখার। রাগবে না কাঁদবে বোঝা যাচ্ছে না। গওহরের মুখ শুকিয়ে গেল। অনুলেখাকে সে ভয় করে। কেন করে জানে না। বউ নিরুদ্দেশ হওয়ার পর থেকে আরো ভয় পায়। অনুলেখা একাই থাকে। জমিদার পরিবারের গিন্নীর অর্শ সারিয়ে দেওয়ার পর তারাই জমি দিয়ে, দরবারখানা বানিয়ে দিয়েছে। ওরা ঠিক এখন জমিদার নয়, তবু মজুমদার বাড়িকে সবাই জমিদারবাড়িই তো বলে।
অনুলেখা বলল, ‘বউমণিকে আমি পাগল করিনি ভাই। সে নিজেই হয়েছে। গ্রামশুদ্ধ লোকে যখন বলে, আমি চুপ করে থাকি। কেন জানিস? কারণ ওই মিথ্যের ভয়ে লোকে আমার কাছে ঘেঁষে না। লোকে জানে আমি যেমন অর্শ সারাতে পারি তেমন বাণ মারতেও পারি।
গওহর বড় বড় চোখ করে বলল, পারিস না বোন?
অনুলেখার চোখ ফেটে জলের স্রোত নামলো। বলল, বাণ মারতে জানলে আমি নিজেকেই আগে মারতাম ভাই। তোর সুজনভাইকে মনে আছে? বাবার কাছে আসত পান কিনতে?
গওহরের মনে আছে। তাদের পানের বরজ ছিল। এখন নেই। মায়ের মুখটা মনে পড়ল। লাল ঠোঁট। পানে।
ওই মানুষটাকে আমি চেয়েছিলাম। ওই আমাকে বলেছিল। আমি নিজে বলতে পারিনি। বাবা দেননি, আমাদের কুষ্ঠি মেলেনি বলে। কি হলো বল, সে-ই তো মানুষটা রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে অকালে চলে গেল।
গওহর বলল, বাবা হয় তো জানতেন….
বাজে বকিস না ভাই। আমি থাকলে মানুষটা যেত না ওভাবে…. তুই জানিস আমি গৌরীপুর হাসপাতালে একা গিয়েছিলাম ওকে শেষ দেখা দেখতে? জানিস না। কেউ জানে না। আমি সে রক্তমাখা মুখ আজও ভুলতে পারি না। ভুলতে চাইও না। তাই আমিও আর মানুষ থাকলাম না। কারোর কাছে হলাম পীর, কারো কাছে ডাইনি।
অনুলেখার চোখে এতো জল? অবাক হয়ে দেখতে দেখতে চোখটা ঝাপসা হয়ে আসছে গওহরের। বোনের হাতটা ধরল। যেন কত যুগ পর মাকে ছুঁলো। বলল, চল, জুঁইকে নিয়ে হাসপাতালে যাই। যাবি?
অনুলেখা তাকালো গওহরের চোখের দিকে। তার নীচের ঠোঁটটা কেঁপে উঠল। বলল, না ভাই, তুই যা। আমার কপালের সঙ্গে আর নিজেকে জড়াসনি। আমার ভাগ্যের রাস্তা আমিই ঠিক করে নিয়েছি। অমন সোনার মানুষটাই যখন রাস্তায় পড়ে মরে গেল, আমার জন্যে এই রাস্তাই সব। কোথাও থাকব মরে পড়ে…. তোরা ভালো থাক। ওর একটা ছোটো অপারেশানে সব ঠিক হয়ে যাবে।
অনুলেখা উঠতে যাবে, গওহর হাতটা ধরে নিল। হাতে এত জোর আগে ছিল না তো! অবাক হল গওহর নিজের জোর দেখে। তার আটকাবার ক্ষমতা আছে?
তুই বিয়েতে আসবি না?
অনুলেখা হাতটা ছাড়াবার চেষ্টা করল না। ভাইয়ের হাতের উপর হাতটা রেখে বলল, দরবারের প্রসাদী ফুল পাঠিয়ে দেব। জুঁইয়ের মাথায় ঠেকিয়ে দিস। ওইতেই সব হবে।
অনুলেখা চলে যাচ্ছে। জুঁই চলে যাবে। মা, বাবা, বউ সব চলে গেছে। গওহর একবার মাথা ঘুরিয়ে মসজিদের দিকে তাকালো। হাত জোড় করে বলল, আমাকেও নিয়ে যাও খোদা।
গওহরের চোখের থেকে কয়েক বিন্দু জল মাটিতে এসে পড়ল। মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে বলল, অনুলেখা আর জুঁইকে দেখো খোদা।
এই প্রথম তার মনে হল বউকে খুঁজতে যাওয়া তার দরকার। জুঁইয়ের বিয়ে হলেই সে বউকে খুঁজতে বেরোবে। না পেলে সে-ও না হয় নিরুদ্দেশ হবে! ক্ষতি কি?
@হাসনাতের হস্তাক্ষর
2 Comments
Friends
ফরহাদ আহমেদ
@forhad2004
সাব্বির হোসেন।
@shadowhunter3d
তাজুল ইসলাম তন্ময়
@tazulumgmail-com
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
জিকরুল ইসলাম
@zikrul
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
Manik Kumar Sanjowal
@manikkumarsanjowal
অসীম রহমান
@ashim_rahman
Prithula Zaman
@prithula



অনেকদিন পর আপনার গল্প পড়ে সেই পুরনো অনুভূতি পেলাম, ঠিক যেদিন প্রথম গল্পের প্রেমে পড়েছিলাম। ভালোবাসা নেবেন প্রিয় গল্পকার!